গত বছর বেশকিছু বই পড়া হয়েছে যার মধ্যে অনেকগুলোই ছিলো মনে রাখার মত। সেখান থেকে সেরা পাঁচটা বাছাই করা একটু কঠিনই ছিলো। দেশি লেখকদের চাইতে পড়া বেশি হয়েছে বিদেশি লেখকদেরটা।
২০১৭ সালে আমার পড়া সেরা পাঁচ বইঃ

৫। দ্য লাস্ট টেম্পলার – রেমন্ড খাওরি
কাহিনী সংক্ষেপঃ আলো ঝলমলে সন্ধ্যায় নিউইয়র্ক শহরের বুকে ভ্যাটিকানের ট্রেজার শোতে ঘটে যায় এক ভয়ঙ্কর আর বীভৎস ডাকাতি। নাইট টেম্পলারের পোশাক পরা ডাকাতেরা মূল্যবান সব জিনিসের সাথে নিয়ে যায় বহু প্রাচীন এক এনকোডার। ঘটনার তদন্ত করতে এগিয়ে আসে এফবআই স্পেশাল এজেন্ট শন রায়লি, ঘটনাচক্রে এতে জড়িয়ে পড়ে আর্কিওলজিস্ট টেস চৌকনি। দু’জনে মিলে রহস্য উদঘাটন করতে গেলে কেঁচো খুড়তে বেরিয়ে আসে সাপ। উন্মুক্ত হয়ে হয়ে পড়ে এমন এক রহস্য যা প্রকাশিত হলে থমকে যাবে মানব সভ্যতা। ধ্বংসরে মুখে পড়ে যাবে সমগ্র খ্রিস্টান জাতি। হাজার বছরের লুকানো সেই সত্যের সন্ধানে নামে একসাথে বেশ কয়েকটি দল। এসব দলরে অপচেষ্টার বিরুদ্ধে লড়াই করে টেস আর রায়লি কি পারবে ইতিহাসের বুকের গভীরে লুকিয়ে থাকা সেই সত্যের সন্ধান বের করে মানব সভ্যতাকে ধ্বংসরে হাত থেকে রক্ষা করতে? যারা ড্যান ব্রাউনের সারা জাগানো থৃলার দ্য দা ভিঞ্চি কোড পড়ে আলোড়িত হয়েছেন তাদের জন্য বইটি খ্রিস্টিয় ইতিহাসের অলিগলিতে লুকিয়ে থাকা সত্যের সন্ধান করার আরেকটি সুযোগ।
রিভিউঃ টেম্পলারদের নিয়ে আগ্রহ ছিলো আগে থেকেই। এই বইটার প্লট নজর কেড়েছে সে জন্যই। আড়াল করে রাখা ইতিহাস, বর্তমান যুগের আধুনিক সময়ের উত্তেজনা, অ্যাকশন আর রোমান্স- কোন কিছুরই অভাব ছিলো না। বইটার কলেবরও অন্যান্য থ্রিলারের চাইতে ছোট- ২৪০ পেজের হলেও কাহিনীতে উত্তেজনার ঘাটতি পাইনি কোথাও। রবিন জামান খানের অনুবাদও ছিলো ঝরঝরে। একবসাতেই শেষ করে ফেলার মত একটা বই।

৪। ব্রিজ টু টেরাবিথিয়া – ক্যাথেরিন প্যাটারসন
কাহিনী সংক্ষেপঃ ক্লাসের সবচেয়ে দ্রুততম বালক হতে চায় জেস অ্যারন, সেই লক্ষ্যে পুরো গ্রীষ্মের ছুটিতে ঘাম ঝরিয়েছে। কিন্তু স্কুলের প্রথম দিনেই ক্লাসের নতুন মেয়েটা দৌড়ে হারিয়ে দেয় সব ছেলেকে, এমনকি জেসকেও। কি মনে হচ্ছে? এর চেয়ে খারাপ সূচনা নিশ্চয়ই হতে পারতো না কোন বন্ধুত্বের? কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে গলায় গলায় ভাব হয়ে যায় জেস এবং লেসলির। দু’জনে মিলে পাশের বনে গড়ে তোলে টেরাবিথিয়া - এক মায়ানগরী, যেখানে উপস্থিত জাদুকরী সব সত্ত্বার। আর এই কল্পনার রাজ্যের রাজা এবং রাণীর আসন গ্রহণ করে ওরা, কিন্তু হঠাৎই এক ঝড় বয়ে যায় ওদের জীবনে... এরপর?
রিভিউঃ টানটান উত্তেজনা থেকে হুট করে চলে আসলাম শিশুদের জন্য লেখা একটি অসাধারণ বই নিয়ে। বইটি শেষ করে কিছুক্ষন বসে ছিলাম। প্রচন্ড একটা মন খারাপ লাগা ঘিরে ছিলো। সেইসাথে মনের কুঠুরিতে জায়গা করে নেয়া একটা বই পড়ার আনন্দও কাজ করছিলো। আবেগের এই মোহনাতে ছিলাম বেশ কিছুক্ষন। নির্মল-বিশুদ্ধ, ভালোলাগার একটা বই। বড়রাও উপভোগ করবে নিঃসন্দেহে।

৩। আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স
কাহিনী সংক্ষেপঃ কাহিনীর শুরু হয় ইয়ানোমামো আদিবাসীদের একটি গ্রামে, যেখানে আবির্ভাব ঘটে সিআইএ-এর এক প্রাক্তন এজেন্ট- জেরাল্ড ক্লার্কের। তাঁকে উদ্ধার করে একজন পাদ্রি। উদ্ধারের কিছুক্ষন পরই মারা যায় সে। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর খবর শুনে আলোড়ন সৃষ্টি হয় উঁচু মহলে। কারণ প্রধানত তিনটি- প্রথমত, সে চার বছর আগে হারিয়ে যাওয়া এক অভিযাত্রী দলের সদস্য। দ্বিতীয়ত, চার বছর আগে তাঁর হাত ছিল একটি, কিন্তু এখন তাঁর দুটি হাত দেখা যাচ্ছে। তৃতীয়ত, তাঁর সারা শরীরে গিজগিজ করছে ক্যান্সার এবং সারা আমেরিকায় মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছে এক অজানা ঘাতক ব্যাধি, যার বাহক জেরাল্ড ক্লার্ক নিজে। সবাই প্রায় নিশ্চিত- জেরাল্ড ক্লার্কের দ্বিতীয় হাতের রহস্যের চাবিকাঠি এবং এই অজানা রোগের প্রতিষেধকের সম্পর্ক রয়েছে চার বছর আগে হারিয়ে যাওয়া দলটির সাথে। প্রতিষেধক অনুসন্ধান এবং রহস্যভেদের জন্য নতুন একটি অভিযাত্রী দল গঠন করা হয়। তাতে রয়েছে ১০ জন রেঞ্জার এবং প্রায় ৭-৮ জন সিভিলিয়ান। সিভিলিয়ানদের মাঝে রয়েছে- নাথান, যার বাবা ছিল হারিয়ে যাওয়া দলটির নেতা, প্রফেসর কাউই, ইন্ডিয়ান শামান; কেলি ও ফ্রাঙ্ক, সি আই এ-এর সদস্য, জমজ ভাই-বোন কেলি আর ফ্রাংক, ম্যানুয়েল ও তাঁর পোষা জাগুয়ার টর টর। কিন্তু তাদের পিছু পিছু রওনা হয় আরও একটি দল, নাথান ও তাঁর বাবা কার্ল রেন্ডের শত্রু- ড. লুই ফ্যাভ্রি । এদের উদ্দেশ্য- নতুন দলটির অভিযান পন্ড করা ও তাদের আবিষ্কার হাতিয়ে নেয়া। এভাবেই শুরু হয় রুদ্ধশ্বাস এক কাহিনীর...
রিভিউঃ সেরা অ্যাকশন-থ্রিলার বইয়ের তালিকায় নাম করে নেয়ার মত একটা বই আমাজনিয়া। আমার মতে জেমস রোলিন্সের সেরা উপন্যাস আমাজনিয়া। এর পরে আরও বই পড়া হলেও আমাজনিয়াকে টপকাতে পারেনি। এক দমে শেষ করেছি বইটা নাওয়া-খাওয়া ভুলে। আমাজনের গহীন অরণ্যের ভয়ঙ্কর প্রাণী আর মারণঘাতী উদ্ভিদ আর প্রতিকূল পরিবেশ সবসময়ই আমাকে টানে; সেখানে যোগ হয়েছে চলমান দুনিয়ার চলে আসা মানুষের লোভ আর হিংসা আর ক্ষমতার দখলের লড়াই- কোন কিছুরই অভাব নেই।

২। মন্টেজুমার মেয়ে – হেনরি রাইডার হ্যাগার্ড
কাহিনী সংক্ষেপঃ ইংল্যান্ডের নরফোক কাউন্টির ডিচিংহ্যাম ডিস্ট্রিকে সুখে শান্তিতে বাস করতো থমাস উইংফিল্ডের পরিবার। একদিন যেন ঝড় এসে সবকিছু তছনচ করে দিলো। স্পেন থেকে আগত এক লোক, খুন করলো তার মাকে। খুনিকে হাতের কাছে পেয়েও ছেড়ে দিয়েছিলো থমাস, সেটার প্রায়শ্চিত্ত করতেই পিছু নিলো সে খুনির। তার প্রেমিকাকে উপেক্ষা করে। ঘটনাক্রমে গিয়ে সে উপস্থিত হয় অ্যাজটেকদের মাঝে। অ্যাজটেকরা তাকে দেবতা জ্ঞান করে রাখে এক বছর। এরই মাঝে দুই বার নরবলির হাত থেকে বেঁচে ফিরে আসে সে। শুধুই কি এই? থমাসকে যেতে হয় যুদ্ধে-বারে বারে, প্রতিহিংসার মাঝে, দেখা পায় ভালোবাসারও শত বিপদেও- বিলাসী জীবন যাপন করা থমাস পরিবর্তিত হয়ে পরিণত হয়ে অন্য এক মানুষে। কিন্তু আদৌ কি সে পেরেছিলো খুনের বদলা নিতে? কি হয়েছিলো শেষ পর্যন্ত তার ভাগ্যের?
রিভিউঃ বইটা বেশ পুরনো হলেও আমার পড়া হয়েছে এই বছরেই। অনেক পাঠক ইতিমধ্যেই শেষ করে রেখেছেন বইটা। আমার মতে হ্যাগার্ডের সেরা রচনা মন্টেজুমার মেয়ে। রাজা মন্টেরজুমার কন্যায় বুঁদ হয়ে একে একে শেষ করেছি আরো ১০-১২টা হ্যাগার্ড রচিত বই কিন্তু এটাকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি কোনটাই।

১। Six of Crows – Leigh Bardugo
কাহিনী সংক্ষেপঃ গল্পের প্রধান চরিত্র Kaz Brekker । সে কি নায়ক? না। সে কি ভিলেন? না। তাহলে সে কি? প্রতিনায়ক? না । সে হচ্ছে "ডেমন"। Kaz Brekker কেটারডাম এর স্বঘোষিত অপরাধ সম্রাট। টাকার বিনিময়ে এহেন কোন কাজ নেই যা সে করতে পারে না। তাঁর কাছে টাকাই সব। খোঁড়া এই অরপাধ সম্রাটের কুখ্যাতির জন্য অপরাধ জগতে তাঁর ডাক নাম " Dirtyhands" । তাঁর কোন বন্ধু নেই। কিন্তু শত্রুত অভাব নেই । তাঁর কোন অনুভূতি নেই । তাঁর কোন পাপ তাপ নেই । সুখ নেই । আহ্লাদ নেই। তাঁকে কেউ কোনদিন হাঁসতে দেখেনি। কেউ কোনদিন কাঁদতে দেখেনি ।তাঁর কোন দুর্বলতা নেই। একটা লাঠি আর কালো গ্লাভস পরে সে পুরো কেটারডাম রাজত্ব করে বেড়ায় । সারা কেটারডাম এর সব লোকের খবর সে জানে। কেটারডাম এর সব লোকের সব গোপন তথ্য তাঁর হাতের মুঠোয়। লোকে বলে সে একটা পিশাচ এবং সত্যিই সে মানুষ নামের পিশাচ। এহেন Kaz Brekker এর কাছে একটা প্রস্তাব আসে। এক কয়েদীকে ছাড়িয়ে আনতে হবে। যে কিনা আবার বন্দী পৃথিবীর সেরা জেলখানায় । যাকে মুক্ত না করলে পৃথিবী জুড়ে জাদুর ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাবে । কথিত "আইস কোর্ট " থেকে কাউকে মুক্ত করে আনা রীতিমত অসম্ভব। কিন্তু Kaz Brekker এর কাছে সব সম্ভব যদি টাকা দেওয়া হয় । সঙ্গী হিসেবে সাথে গেলো তাঁর ডান হাত Inej Ghafa । যাকে কিনা যাকা হয় অশরিরী নামে। সেই সাথে নিলো তাঁর মত আরো চার ক্রিমিনালকে । লেখিকার ভাষায় বলতে হয় -
A convict with a thirst for revenge
A sharpshooter who can’t walk away from a wager
A runaway with a privileged past
A spy known as the Wraith
A Heartrender using her magic to survive the slums
A thief with a gift for unlikely escapes
তারা কি পারবে পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্ধর্ষ কাজটা করতে?
রিভিউঃ প্রথম জায়গাটা আমাজনিয়াই নিয়ে নিচ্ছিল প্রায়। কিন্তু ডিসেম্বরের ২০-২২ তারিখের দিকে পড়া শুরু করে কিছুদূর যাওয়ার পরেই টের পেলাম সিক্স অফ ক্রোজকে টপকাতে পারে এমন কোন বই নেই এই মুহূর্তে। নায়কের প্রতিটা ডায়লগ ছুরির মত ধারালো, প্রতিটা চরিত্র যেন চোখের সামনে ধরা দিচ্ছে, রঙিন কিন্তু নোংরা একটা দুনিয়া যেখানে অর্থই সব আর দিন শেষে টিকে থাকাই মুখ্য, জাদুর মায়া আর অস্ত্রের ঝনঝনানিতে ভরপুর অন্ধকারাচ্ছন্ন কেটারডাম মুহূর্তেই গ্রাস করে নেবে পাঠককে। এটা শেষ করার পরপরই বুভুক্ষের মত একটানে শেষ করেছি এর সিকুয়েল Crooked Kingdom; সেটাও সেরা বইয়ের তালিকাতেই থাকবে নিশ্চিন্তে। তবে সেটার গল্প হবে আরেকদিন।
হ্যাপি রিডিং!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


