somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রিপোষ্ট: একজন বিডিআরের আত্ন-কথনঃ পিলখানা ট্রেজেডী, কাশিমপুর কারাগার ও একটি অশ্রু সিক্ত পরিবার

১১ ই অক্টোবর, ২০১০ সকাল ৮:৪৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অরিজিনাল পোষ্ট লিখেছেন অগ্নিবীনা।


ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস চাকুরির শেষ প্রান্তে এসে আজ আমি সবাইকে ছেড়ে আলো বাতাসহীন অন্ধকার কারাগারে দিনাতিপাত করছি। অথচ এখন আমার পরিবার পরিজন নিয়ে সুখে অবসর জীবন যাপন কারর কথা ছিল। কারণ ২০০৯ সালের জুন মাসে আমার অবসর নেবার কথা। ২৫ ফেব্রুয়ারীর ঘটনার পর থেকে একের পর এক বদলে যাচ্ছে আমার জীবনের গতি পথ। ঐ দিনের আকস্মিক ঘটনায় প্রথমে হতবিহব্বল হয়ে পরি। কি করবো? কোথায় যাবো? বুঝতে পারছিলাম না। আমার ঐ দিন ছিল অফিসিয়াল ডিউটি। দরবার হলে কি হচ্ছিলো প্রথমে বুঝতে পারিনাই। গুলির শব্দ শুনে বুঝতে পারলাম কিছু হচ্ছে। সবাই খালি দিক বিদিক ছুটছে। কিছুক্ষণ পর বিষয়টা কিছু বুঝতে পারলাম। তখন আমি সিদ্ধাহীনতায় ভুগছিলাম কি করবো। অবশেষে আমি আরো কয়েক জনসহ মসজিদে আবস্থান করি। পরের দিন যখন সবাই একে একে পালাতে লাগলো তখন আমিও নিজের জীবনের কথা চিন্তা করে বের হয়ে এলাম। আবার সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী পিলখানায় গেলাম। যথারীতি কাজও করতে লাগলাম। একদিন আমাকেসহ সাত জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবি অফিসে রিমান্ডে নেয়া হলো। এর পর থেকেই এই কারাগারে।

বাড়ি থেকে আমার স্ত্রীসহ ছেলে মেয়ে দেখতে আসে মাঝে মাঝে। অল্প কিছু সময় পাই দেখা করার। চিৎকার করে কথা বলতে হয়। সহজে কথা শোনা ও বোঝা যায় না। আমার আরও ৬ ভাইসহ অনেকেই আসে সাক্ষাত করতে। আসে দেখা করে চলে যায়। তাদের অশ্রুসিক্ত চোখ দেখে আমি আর নিজে শক্ত রাখতে পারিনা। তারা চলেগেলে আমি তখন শতশত আসামীদের মাঝে শুধু একা শুধু একা। কাঁদি, গুমরে গুমরে কাঁদি। আর ভাবি কি অপরাধ আমার। আমার বিরুদ্ধে লিখিত কোন অভিযোগ নাই। গোয়েন্দা রিপোর্টেও কোন অভিযোগ নাই। তবে কেন আমার এই কারাজীবন।

দুই বছর যাবত আমার অচল বৃদ্ধ মায়ের মুখটি দেখতে পাই না। শুনেছি আমার আম্মা আমার কথা বলে আর কেঁদে বলে- আমার ছেলেকে কবে ছুটি দিবে। কবে আসবে। উল্লেখ্য আমার আম্মা জানেন না আমি কারাগরে আছি।

আমার স্ত্রী ভংঙ্গুর ও রুগ্ন হয়ে গেছে আমার চিন্তায়। খাওয়া দাওয়া নাকি ঠিক মতো করেনা। আমার এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলেটা এবার অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছে। অর্থ অভাবে সে এখন আর ম্যাচে থেকে পড়াশুনা করতে পারে না। তাই বাড়ি থেকেই চলছে। কারণ এখন আমার বেতন দেওয়া হয় অর্ধেক। এই টাকায় কিভাবে তারা চলে আমার বুঝে আসে না। তার পর দেশের এক প্রান্ত হতে আমার সাথে দেখা করতে আসার জন্য অর্ধেক টাকা চলেই যায়।

মেয়েটার বিয়ে ঠিক ছিলো এক ছেলের সাথে। আমি পেনশনে বাড়ি গেলে ধুমধাম করে মেয়ের বিয়ে দিবো। বিধাতা মনে হয় মানুষের সকল চাওয়াকে পূর্ণ করেন না। কত দিন আর ছেলে পক্ষকে বুঝিয়ে রাখা যায়। অবশেষে একেবারেই ঘরোয়া পরিবেশে নিরুত্তাপ ভাবে আমার মেয়ের বিয়ে হয়েছে কিছু দিন আগে। আমি সে দিন কারাগারে কিভাবে যে দিন কাটিয়েছি তা শুধু আল্লহ তালাই জানেন। আমার এক মাত্র মেয়ের বিয়ে আর আমি কারগারে ভাবতেও আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিলো। সেই দিন আমার অন্য সহকর্মীরা আমাকে অনেক শান্তনা দেয়ার চেষ্টা করেছে। আমি শুধু মহান আল্লহর কাছে এই প্রার্থন করেছি- আল্লাহ তুমি এই হতভাগ্য পিতার মেয়েকে সুখি করো।

একে একে অনেক গুলি মাস চলে গেছে। এই কয়েক দিনে আমার চুল দাড়ি যেন আরো দ্রুত পেকে গেছে। এর মাঝে আমার শাশুড়ি বিদায় নিয়েছেন। ছোট ভগ্নিপতির মৃত্যু সংবাদ পেয়েছি। অকালে ঝরে পরেছে আমার ভাগিনা মাসুম। আরো অনেকেই পরপারে চলে গেছেন যার তালিকা অনেক বড়। এখন আগের তুলনায় অনেকটা শক্ত হয়েগেছি। এতো কষ্টও আর লাগে না। চোখের জলও যেন কমে গেছে। ভাবি সেই সহকর্মীর চেয়ে আমি অনেক ভালো আছি। যার বাড়ি হতে এক বছর পর প্রথম দেখা করতে আসে তার ভাই। তখনে সে রাগে-দুঃখে দেখা করে নাই। আমি তো কয়েক দিন পর পর স্বজনদের সাক্ষাত পাই।

দেশ সেবার ব্রত নিয়ে বিডিআরে এসেছিলাম। ৩২ বছর জীবনবাজী রেখে দেশের সিমান্ত পাহারা দিয়েছি। কিন্তু আজ সবচেয়ে কলঙ্কের বোঝা মাথায় নিয়ে চাকুরী জীবন শেষ করতে হবে। আমি জানি আমি কোন অপরাধ করিনি। কিন্তু পরিস্থিতির স্বীকার। সবাই আজ বিডিআরকে ঘৃণা করে। কিন্তু কেন এই ঘটনা ঘটলো? এই কলঙ্কের হোতা কে বা কারা? কে লাভবান হলো? দেশবাসী হয়তো কোনদিন জানবে না।

একটা বিষয় এখন আমাকে কুড়ে কুড়ে খায় তা হলো- আমার দুখিনী মাকে মনে হয় আমি আর দেখতে পাবো না। আমি মাঝে মাঝে দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠি। আর ভাবি আমার মা বুঝি আর নাই। আমি এমনই হতভাগা সন্তান যে আমার পিতার জানাযায়ও শমিল হতে পারি নাই শুধু এই চকুরীর জন্য। অবশেষে কি আমার দুখিনী মায়ের বেলায়ও তা হয় কিনা চিন্তা করি। আল্লহর কাছে শুধু ফরিয়াদ- হে আল্লাহ তুমি আমার মাকে আমার মুক্তির দিনটি পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখো।
৬টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

অভিনব প্রতারনা - ডিজিটাল প্রতারক

লিখেছেন শোভন শামস, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:১৮



একটি সাম্প্রতিক সত্য ঘটনা।
মোবাইল ফোনে কল আসল, একটা গোয়েন্দা সংস্থার ছবি এবং পদবী সহ। এই নাম্বার সেভ করা না, আননোন নাম্বার। ফোন ধরলাম। বলল আপনার এই নাম্বার ব্যবহার করে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আগে নিজেকে বদলে দিন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:৪১



"আমার স্বামী সংসারের কুটোটাও নাড়ান না। যেখানকার জিনিস সেখানে রাখেন না। মুজা খুলে ছুঁড়ে যেখানে সেখানে ফেলে দেন। নিজেকে পরিষ্কার রাখতে বারবার ভুল করেন! এতো বছর বিবাহিত জীবন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×