somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মীরজাফর নাকি বীর সন্তান: এডিট করা ইতিহাসের জটিলতা নতুন প্রজন্ম

২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বিগত সময়গুলোতে ফ্যাসিস্টরা ইতিহাসকে এমন নিখুঁতভাবে “মেকওভার” করেছে যে, সত্যি বলতে এখন এটি ইতিহাস নয়, বরং এক সিনেমার স্ক্রিপ্ট বললেই চলে

অনেক বীর সূর্যসন্তানকে এমনভাবে মীরজাফর বানানো হয়েছে যেন তারা জন্ম থেকেই বিশ্বাসঘাতকতার জন্য জন্মেছে। আর প্রকৃত মীরজাফরদের এমন পালিশ করা হয়েছে যে, তাদের দেখলে মনে হয় তারা জাতির ত্রাতা!

ইতিহাসের বীর সন্তান মেজর আঃ জলিল, অধ্যাপক গোলাম আযম, শহীদ আব্দুল মালেকদের এমনভাবে ভিলেনের পোশাক পরানো হয়েছে নতুন প্রজন্মের সামনে, যেন পুরো কাহিনিটাই একপাক্ষিক সত্য।

মেজর আঃ জলিলও মুক্তিযুদ্ধ করেছেন এবং মুক্তিযুদ্ধে তার অসামান্য অবদান রয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে ভারতের আধিপত্য ও মুজিববাদের বিরোধিতা করার কারণে তাকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। একইভাবে ছিলেন আ.স.ম. আব্দুর রব।

জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক হলেও ভারতীয় আধিপত্যবাদের ও মুজিববাদের বিরোধিতা করার কারণে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিতে তাকে রাখা হয়নি। পরবর্তীতে মুজিবের বাকশাল এবং তার ফ্যাসিবাদী মনোভাবের বিরোধিতা করার কারণে তার বর্ণাঢ্য দেশপ্রেমিক জীবনকে ইতিহাসে আংশিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে, তার বর্নাঢ্য দেশপ্রমিক জীবনকে চেতনার লিটমাস পেপার দিয়ে করেছে বর্নহীন। আজকের প্রজন্ম তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান সম্যকভাবে জানতে পারে না; বিভিন্ন ক্ষমতাসীন দলের ভাড়া করা সুশীল ও ইতিহাস লেখকরা দায়সারা ভাবে তাকে উপস্থাপন করেছেন।

মাওলানা ভাসানী বাংলাদেশের ইতিহাসে একমাত্র ব্যক্তি, যাকে ছাড়া পুরো মুক্তিযুদ্ধ অসম্পূর্ণ। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তরুণ প্রজন্ম তাকে সেভাবে চেনে না। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি ১৯৭৪ সালে “দৈনিক হক কথা” পত্রিকায় প্রবন্ধে শেখ মুজিবকে সরাসরি “শয়তান প্রধান” ও “ভারতীয় এজেন্ট” হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।

তিনি লিখেছিলেন, “শেখ মুজিব এককথায় যতজন মানুষকে পথভ্রষ্ট করতে পারেন, শয়তান প্রধান সারা জীবনেও তা করতে পারেন না। আর ৭ই মার্চের ভাষণে শেখ মুজিব এক বক্তৃতায় সাড়ে সাত কোটি মানুষকে গোমরাহ করেছেন, যা শয়তানের সকল সদস্য মিলে আগামী ১০০ বছরে করতে পারবেন না।” পরদিনই “হক কথা” পত্রিকাটি চিরতরে নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়।

শহীদ ওসমান হাদীর মত ন্যায়-ইনসাফের শাসন ও ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন শহীদ আব্দুল মালেক। ১৯৬৯ সালের ১২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মিলনায়তনে এয়ার মার্শাল নূর খান কমিশন প্রস্তাবিত পাকিস্তানের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে এক আলোচনা সভায় তিনি ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। সভা শেষে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী ও বামপন্থী ছাত্র নেতা তোফায়েল আহমেদ ও হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে অতর্কিত হামলায় তিনি আহত হয়ে হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

অধ্যাপক গোলাম আযম ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষা আন্দোলনের সমর্থনে থাকার কারণে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের হাতে তিনবার গ্রেফতার হন এবং পরে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে চাকরিচ্যুত হন। কিন্তু আমাদের পাঠ্যপুস্তকে তার ভাষার জন্যের এই অবদানকে সালাম, রফিক, জব্বারের মত ভাষা শহীদদের সঙ্গে তো পড়ানো হয়নি! ৭১’এর জন্য ৫২কে অস্বীকার করা এ কেমন মুনাফিকতা! এই মুনাফিকতা আজও দেখা যাচ্ছে।

যে ২৪ না হলে এদেশ আওয়ামী ফ্যাসিবাদের কবল থেকে মুক্ত হত না, দেশ নতুন করে ভারতীয় আধিপত্যবাদের অবশানের কল্পনা করতো না। সেই রক্তাক্ত ২৪শের অর্জনকে আজ ৭১'র চেতনা দিয়ে মুছে ফেলার চেষ্টা করছে আরেকটি ক্ষমতাসীন দল। এই চেতনার ট্যাবলেট যুগে যুগে আমাদের প্রজন্মকে খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

অধ্যাপক গোলাম আযমকে যখন সরাসরি প্রশ্ন করা হয়েছিল, “তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় কেন পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন?” তিনি তার দীর্ঘ জবাবে বলেন, তার অবস্থান ছিল ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এবং বাংলাদেশের অধিকার রক্ষার পক্ষে। তিনি ততকালীন সময়ে পুরো পাকিস্তানের অখন্ডতা চেয়েছিলেন। একই বিষয় শুরুতে শেখ মুজিবও চেয়েছিলেন। একটি সাক্ষাৎকারে শেখ মুজিব বলেছেন, তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা চান না, তবে দেশের মানুষের ন্যায্য অধিকার ও স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার চান। গোলাম আযমের চাওয়া ছিল, বাঙালিরাই পুরো পাকিস্তান শাসন করবে এবং ভারতীয় কর্তৃত্ব এ দেশে প্রবেশ করতে পারবে না।

তিনি বলেছিলেন,
"শুরুতে পূর্ব পাকিস্তানের অধিকার রক্ষা ও পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যের বিরুদ্ধে আমাদেরও জোরালো ভূমিকা ছিল আওয়ামী লীগের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ছিল, কিন্তু যখন আওয়ামী লীগ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত না নিয়ে ভারতের ইন্দিরা গান্ধীর কাছে সাহায্য চাইল এবং ভারতের ষড়যন্ত্রের অংশ হলো, তখন আমরা দেখলাম কাশ্মির নিয়ে পাকিস্তান ও ভারতের দু’বার যুদ্ধ হয়েছে। সেই যুদ্ধে ভারত কিছু করতে পারেনি, দু’বারই তারা পরাজিত হয়েছে এবং তৃতীয়বার প্রতিশোধ নেবার সুযোগ খুঁজছে। এই আশঙ্কা থেকেই আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারিনি এবং এই কারণে ১৯৭১ সালে ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তান রাখার পক্ষে ছিলাম।"
তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন আমাদের সাহায্যের নামে ভারতের তিনটি স্বার্থ ছিল:
১. দুইবার যুদ্ধ হেরে, প্রতিশোধ নেওয়া।
২. বাংলাদেশকে আলাদা করে আমাদের উপর ভারতের প্রভাব বিস্তার করা।
৩. এ অঞ্চলকে ভারতীয় বাজারে পরিণত করা।

আজ দেখা যায়, আমরা সর্বক্ষেত্রে স্বাধীন নই; অনেকটাই ভারতের প্রভাবের আওতায়। ভারত যা চায় আমরা দিতে বাধ্য।


আর নামধারী সুশীল ও বুদ্ধিজীবীরা? তারা সব জানে, কিন্তু মুখ খোলে না। কারণ মুখ খুললে সুবিধার চেয়ার নড়বড়ে হতে পারে। তাই চুপ থাকাই শ্রেয়—নীতির কথা মঞ্চে, বাস্তবে চাটাচাটির ধান্দা।

ইতিহাসকে এমনভাবে কাটা-ছেঁড়া করা হয়েছে যে, সত্য খুঁজতে গেলে আলাদা করে গবেষণা করতে হয়। সাজানো ইতিহাসে সব আছে—কিন্তু নিরপেক্ষ সত্য নেই।
কিন্তু একটি কথা মনে রাখতে হবে—ইতিহাস যতই এডিট করা হোক, সত্য একদিন নিজের মতো করেই প্রকাশ পায়।
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজাদি না মুক্তি? ইনকিলাব না বিপ্লব? ~ ভিনদেশী শব্দের মচ্ছবে বিপন্ন বাংলা ভাষা?

লিখেছেন সাজিদ উল হক আবির, ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৫৪

১।
বিগত ৮ বছরের মতো এবারের ২১ ফেব্রুয়ারিও সাতসকালে কর্মস্থলে এসে হাজির হয়েছি, কেননা আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই, সেখানে বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতাদিবসের মতো জাতীয় দিবসগুলিকে উৎযাপন করা হয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট গল্পঃ প্রমোশন

লিখেছেন সামিয়া, ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৫৫


একই ডিপার্টমেন্টে কাজ করতো দু’জন সায়ন চৌধুরী আর ঈশিতা রহমান। ঈশিতা এসেছিল সায়নের আগে। তাই শুরু থেকেই কাজের বেশিরভাগ দায়িত্ব ছিল তার হাতে। প্রেজেন্টেশন, ক্লায়েন্ট ব্রিফ, স্টোর রুমের... ...বাকিটুকু পড়ুন

জামায়াতে ইসলামী ভাষা আন্দোলনের বিপক্ষে ছিল না

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:০২


জামায়াতে ইসলামীকে আমি এখন নতুন চোখে দেখি। মানুষ ভুল করতেই পারে, ইতিহাসে ছোটখাটো কিছু ভুল তো সবারই থাকে। যেমন ধরুন, একটা দেশের জন্মের বিরোধিতা করা, সেটাকে ভেঙে দিতে চাওয়া, বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের শাহেদ জামাল- ৯২

লিখেছেন রাজীব নুর, ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ২:৫৫


রমজান মাসে শাহেদ জামালের সমস্যা হয়ে যায়।
দিনের বেলা সিগারেট খাওয়া যায় না। রাস্তার পাশে আরাম করে দাঁড়িয়ে চা খাওয়া যায় না। রেস্টুরেন্ট পর্যন্ত বন্ধ থাকে। এই দেশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যুক্তরাজ্যের ভিসা পাওয়া এতো কঠিন কেন?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১০:২৪

আমার বড় মেয়ে মারিয়ার সাথে আজ কথা হলো। সে যুক্তরাজ্যে পড়ালেখা করে। এখন ৭ম শ্রেণীতে। মারিয়ার নানাবাড়ি ইংল্যান্ডে হওয়ায় সেখানে থেকে পড়ালেখা করাটা একটু সহজ হয়ে গিয়েছে। আমার সাথে ফোনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×