শ্রীমদভাগবতগীতার উদ্গাতা শ্রীকৃষ্ণের সঠিক পরিচয়কে উদ্ঘাটন কোরতে গিয়ে বহু মনীষী, জ্ঞানী-গুণী পণ্ডিত ব্যক্তি সুগভীর গবেষণা কোরেছেন। তাদের অনেকেই অভিমত দিয়েছেন যে, আল্লাহ সকল জাতিগোষ্ঠীতে ও জনপদে ঐ এলাকার ভাষায় রচিত ধর্মগ্রন্থ সহকারে তাঁর নবী-রসুলদেরকে পাঠিয়েছেন। কিন্তু ঐ নবীদের বিদায়ের পরে তাঁর শিক্ষা ও ধর্মগ্রন্থ বিকৃত কোরে ফেলা হোয়েছে। ফলে ঐ এলাকার মানুষকে নতুন কোরে পথ দেখাতে আবির্ভূত হোয়েছেন অন্য নবী যারা পূর্বের বিকৃত গ্রন্থকে রদ ঘোষণা কোরেছেন এবং নতুন বিধান জাতিকে প্রদান কোরেছেন। কেউ তাকে মেনে নিয়েছে, কেউ মেনে নেয় নি। এভাবে জন্ম হোয়েছে একাধিক ধর্মের। কালক্রমে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, এক এলাকার ধর্মের অনুসারীরা অন্য এলাকায় অন্য ভাষায় নাযেলকৃত ধর্মকে ধর্ম হিসাবে এবং ঐ ধর্মের প্রবর্তককে নবী হিসাবে স্বীকৃতি দিতে নারাজ। যেমন ইহুদিরা ঈসা (আঃ) কে আল্লাহর প্রেরিত বোলে স্বীকার করে না, খ্রিস্টানরা আখেরী নবী মোহাম্মদ (দঃ)-কে নবী হিসাবে স্বীকার করে না একইভাবে মোসলেমরা ভারতীয় অঞ্চলে ভারতীয় ভাষার মানুষের প্রতি আল্লাহর প্রেরিত বৌদ্ধ ও শ্রীকৃষ্ণ এঁদেরকে নবী হিসাবে স্বীকার করেন না। কিন্তু তাদের প্রচারিত ধর্মগ্রন্থের মধ্যে আখেরী নবীর আগমনের বহু ভবিষ্যদ্বাণী উল্লেখিত আছে যা গবেষণা কোরলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে ঐ ধর্মগুলিও আল্লাহরই প্রেরিত (যা এখন বিকৃত হোয়ে গেছে), এবং স্বভাবতই সেগুলির প্রবক্তারা আল্লাহরই বার্তাবাহক অর্থাৎ নবী ও রসুল। এমনই একজন গবেষক ন্যাশনাল ব্যাংক ট্রেনিং ইনস্টিটিউট এবং ধর্মীয় বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও ইসলাম প্রচার মিশনের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ কে.এম.এ হোসাইন তার গবেষণা গ্রন্থ ‘ইসলাম কি ও কেন’- তে গৌতম বুদ্ধ ও শ্রীকৃষ্ণের নবী হওয়ার পক্ষে বিস্তারিত যুক্তি ও প্রমাণ উল্লেখ কোরেছেন। লিখিত প্রবন্ধটি এমনই একটি গবেষণাকর্ম যাতে জনাব কে.এম. হোসাইনের বইসহ আরও বেশ কিছু বইয়ের সহায়তা নেওয়া হোয়েছে।
ভারতীয় অবতার শ্রীকৃষ্ণ কে ছিলেন?
শ্রীকৃষ্ণকে হিন্দু ধর্মের অবতার বলা হোলেও প্রকৃতপক্ষে হিন্দু বোলে কোনো ধর্ম বা হিন্দু শাস্ত্র বোলে কোনো শাস্ত্র পৃথিবীতে নেই। বেদ, উপনিষদ, গীতায়, পুরাণে কোথাও হিন্দু শব্দই নেই। শব্দটি এশিয়া মাইনর, খুব সম্ভব তুর্কী দেশ থেকে এসেছে সিন্ধু শব্দের অপভ্রংশ হিসাবে। উপমহাদেশে প্রচলিত এই ধর্মের প্রকৃত নাম সনাতন ধর্ম, কোর’আনে যেটাকে বলা হোয়েছে দীনুল কাইয়্যেমা, শ্বাশ্বত, চিরন্তন ধর্ম, অর্থাৎ তওহীদ (কোর’আন- সুরা রূম, আয়াত ৪৩, সুরা বাইয়্যেনা, আয়াত ৫)। অবতার শব্দের অর্থ পৃথিবীতে আগমন। ঈশ্বরের অবতার বলিতে বুঝায় যে, নিখিল বিশ্বে ঐশী প্রত্যাদেশ প্রচারকারী মহামানবের পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করা। সেই সময় হতেই মানবজাতি যাতে পৃথিবীতে শান্তিতে বসবাস করতে পারে, মানবে মানবে হানাহানি, রক্তারক্তি, অন্যায়-অবিচার, যুলুম-অত্যাচার না করে তাই সৃষ্টিকর্তা দুনিয়াতে ধারাবাহিকভাবে নবী রসুল (অবতার, মহামানব) প্রেরণ কোরেছেন।
আল কোর’আন বলছে,
প্রত্যেক জাতির জন্য রয়েছে রসুল (সুরা ইউনুস ৪৮)।
প্রত্যেক জাতির জন্য হাদী বা পথ প্রদর্শক রয়েছে (সুরা রাদ ৮)।
আমরা প্রত্যেক জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে কোনো না কোনো রসুল পাঠিয়েছি” (সুরা নাহল-৩৭)।
এমন কোনো জাতি নেই, যার কাছে সতর্ককারী (নাযের) আগমন করে নাই (সুরা ফাতির -২৫)।
কোর’আনের এইসব বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে আল্লাহ বিভিন্ন যুগে নবী-রসুল, পথ-প্রদর্শক, সতর্ককারী ও সুসংবাদাতা পাঠিয়েছেন। মোসলেম হওয়ার শর্ত হিসাবে ঐ সব নবী-রসুলগণের উপর বিশ্বাস স্থপন করা অবশ্য জরুরি। তাদের মধ্যে কোনরূপ পার্থক্য করতেও আল্লাহ নিষেধ কোরেছেন। মো’মেনদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নেয়া হোয়েছে।
• মো’মেনরা বলে, আমরা রসুলগণের মধ্যে কোনো তারতম্য কোরি না (সুরা বাকারা- ২৮৫) অর্থাৎ কোনো নবীকে মানবো, কোনো নবীকে অস্বীকার করবো তা হবে না, তারা সকলেই আল্লাহর রসুল। এ বিষয়েই আল কোর’আন বলছে,
• যারা চায় আল্লাহ এবং কতককে অস্বীকার, আর তারা চায় যেন এই দুয়ের মধ্যে একটি মাঝামাঝি পথ অবলম্বন করতে। এই সমস্ত লোকেরাই হোচ্ছে পাক্কা কাফের। মো’মেন হ’ল তারা যারা আল্লাহ এবং রসুলগণের উপর ঈমান আনে এবং তাদের মধ্যে – কোনো পার্থক্য করে না (সুরা নেসা ১৫০-১৫২)।”
এইসব বর্ণনা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, যুগে যুগে আগত সকল নবী-রসুলগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা প্রতিটি মো’মেন মোসলেমের জন্য অবশ্য কর্তব্য (ফরদ)। যদি একজন নবীকেও অস্বীকার করা হয়, তবে সে ব্যক্তি “সত্যিকার কাফের” হোয়ে যায় এবং পরিণাম হোচ্ছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি (সুরা বাকারা-১৫২)।
পাঠকগণ, পবিত্র কোর’আনে মাত্র ২৫ জন নবীর নাম উল্লেখ করা হোয়েছে। হাদিস পাঠে আমরা এক লক্ষ চব্বিশ হাজার বা মতান্তরে দু-লক্ষ চব্বিশ হাজার নবী রসুলগণের পৃথিবীতে আগমনের কথা জানতে পারি। কোর’আন বলছে-
• আমরা তোমার পূর্বেও অনেক রসুল পাঠিয়েছি, যাদের মধ্যে কারো বিষয় তোমার কাছে বর্ণনা করেছি এবং তাদের মধ্যে কারো কারো বিষয় বর্ণনা করি নাই (সুরা মো’মেন-৭৯)।
যদি সব নবীদের নাম-ধাম বৃত্তান্ত আল-কোর’আনে বর্ণনা করা হত তাহোলে একটি বিশ্বকোষের আকার ধারণ করতো। বাইবেলে বর্ণিত সকল নবীর নামও কোর’আনে উল্লেখ করা হয় নাই, আর তার প্রয়োজনও নেই। প্রত্যেক নবী-রসুলগণ তাঁদের জাতির ভাষায় তথা মাতৃভাষায় ঐশীবাণী প্রচার কোরেছেন, যাতে তাদের জাতির লোকেরা সহজেই নবীর শিক্ষাকে বুঝতে ও অনুসরণ করতে পারে। আর এ বিষয়েই আল-কোরআন বলছে, –
• আমরা প্রত্যেক রসুলকেই তাঁর জাতির ভাষায় পাঠিয়েছি, এই জন্য যে, যেন তাদের নিকট স্পষ্ট করে (আমার বাণী) প্রচার করতে পারে (সুরা এব্রাহীম-৫)।
এই আয়াতের মর্মবাণী হোচ্ছে, অতীতের প্রত্যেক নবী-রসুলগণ যে যে অঞ্চল ও জাতিতে আগমন কোরেছেন, সেই জাতি ও সেই জাতির ভাষাতেই তারা ওহী, এলহাম, দিব্যজ্ঞান, বোধি লাভ করে সেই অঞ্চলে একই ভাষা-ভাষীর মধ্যে প্রচারকার্য চালিয়েছেন। ঐসব ভাষা হিব্র“ পার্শী, সংস্কৃত,পালি, চীনা বা অন্য যে কোনো ভাষাই হোক না কেন। সুতরাং অতীত জাতির নবীদের জানতে হলে আমাদের অবশ্য বিভিন্ন ভাষায় রচিত ধর্মগ্রন্থগুলি যথা ‘বেদ-বেদান্ত, পুরাণ-গীতা-সংহীতা, উপনিষদ, মহাভারত, ত্রিপিটক, দিঘা-নিকায়া, জেন্দাবেস্তা, তওরাত-যবুর-ইঞ্জিল’ ইত্যাদি গবেষণা ও পাঠ করে কোর’আনের আলোকে অতীত নবীদের সম্বন্ধে সত্যিকার পরিচয় জানতে হবে।
উপরোক্ত আলোচনার সাপেক্ষে নিশ্চিত করে বলা যায় যে, পাক-ভারত উপমহাদেশেও আল্লাহ নবী-রসুল-অবতার প্রেরণ কোরেছেন এবং তাঁদের প্রচারিত বাণী-ঐশীগ্রন্থ বিকৃত অবস্থায় হলেও ঐ জাতির মধ্যে এখনও বংশ-পরম্পরায় অনুসৃত হোয়ে আসছে, তাদের ভক্ত-অনুরক্ত অনুসারীদের মাধ্যমে। এখন আমরা জানার চেষ্টা করবো যে, শ্রীকৃষ্ণ ও মহামতি গৌতম বুদ্ধ আমাদের প্রস্তাবিত উপমহাদেশের আল্লাহ প্রেরিত নবী-রসুল-অবতার ছিলেন কিনা।
( সাথেই থাকুন চলবে …………….)
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই আগস্ট, ২০১৫ দুপুর ২:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


