somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

মুহাম্মদ তমাল
আমি তমাল। তমাল মানে তমাল বৃক্ষ! আমি বৃক্ষের মতোই সরল, সহজ এবং মোহনিয়। পেশায় একজন পুরঃ কৌশল প্রকৌশলী। কাজ করেছি দেশের স্বনামধন্য কোন এক দপ্তরে। বর্তমানে উচ্চশিক্ষার জন্য জার্মানীতে অবস্থান করছি। আমি ভালবাসি মানুষ,দেশ এবং পরিবেশ। ধন্যবাদ।

অন্ধকারেরও ওপারে অন্ধকার

০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৫:৫১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

রাত, ৩টা ২২ মিনিট।
সারাদিনের ক্লান্তি আজ একটু আগেভাগেই ঘুমের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জানালাগুলো বন্ধ ছিল। ঘরের বাতাসে কেমন একটা বদ্ধ, ভারী ভাব—নিঃশ্বাসের সঙ্গে নিজেরই অস্তিত্ব যেন আরও ঘন হয়ে উঠছিল। বাইরে হালকা শীত। রাত যত গভীর হচ্ছে, তাপমাত্রা ততই নেমে আসছে দশ ডিগ্রির আশপাশে। শেষ রাতের শীত শরীরের চেয়ে বোধহয় মনকেই বেশি কাঁপিয়ে দেয়।

হঠাৎ একটা দুঃস্বপ্নে ঘুম ভেঙে গেল।

সারা শরীর ঘামে ভেজা। বুকের ভেতর ধুকপুকানি। বারবার লম্বা করে নিশ্বাস নিচ্ছি, যেন কোথাও থেকে একটু বাতাস ধার করতে পারলেই বেঁচে যাই। কয়েক মুহূর্ত বিছানায় বসে বোঝার চেষ্টা করলাম—কী ঘটেছে? কোথায় ছিলাম এতক্ষণ? কী দেখে ফিরলাম এই জগতে? অথচ কিছুই মনে পড়ছে না। শুধু মনে হচ্ছে, ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। গলা, জিহ্বা, সমস্ত শরীর যেন এক বিন্দু জলের জন্য হাহাকার করছে।

দু পা বাড়িয়ে ডাইনিং রুমে গেলাম। ঢকঢক করে পানি খেলাম। গ্লাসের তলায় জমে থাকা শেষ ফোঁটাটুকুও যেন তখন অমৃত। তারপর আবার ফিরে এলাম বিছানায়।

আর ঠিক তখনই শুরু হলো ঘুম না আসার যন্ত্রণা।

মোবাইলটা দূরে সরিয়ে রাখলাম। চোখের পাতার ওপর চোখ চেপে ধরে শুয়ে রইলাম। শরীর ক্লান্ত, অথচ মস্তিষ্কের ভেতর যেন হাজারটা জানালা খুলে গেছে। ঘুম কোথাও নেই। শুধু একের পর এক দৃশ্য ভেসে উঠছে।

পৃথিবীর দুঃখ-দুর্দশা।

রক্ত। যুদ্ধ। বোমা। মিসাইল। গুলি। ড্রোন। বারুদ। ক্ষুধা।

কোথাও একটা শিশু ধ্বংসস্তূপের পাশে বসে কাঁদছে। কোথাও কোনো মা সন্তানের নিথর শরীর বুকে নিয়ে পাথর হয়ে গেছে। কোথাও আকাশ থেকে আগুন নেমে আসছে, অথচ সেই আকাশেরই নিচে কেউ একজন পরদিনের রুটির হিসাব করছে। কারও কাছে যুদ্ধ মানে মানচিত্রের ওপর কয়েকটা বদলে যাওয়া রেখা, কারও কাছে যুদ্ধ মানে নিজের ঘর, নিজের শহর, নিজের সমস্ত পৃথিবীটাকে এক রাতের মধ্যে হারিয়ে ফেলা।

কত সহজেই আমরা যুদ্ধের খবর পড়ি! এক কাপ চায়ের পাশে, দুপুরের খাবার খেতে খেতে, কিংবা ঘুমানোর আগে মোবাইলের পর্দায় আঙুল চালাতে চালাতে। কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও, কিছু ছবি, কয়েকটা সংখ্যা—তারপর পরের খবর।

কিন্তু একটা মৃত মানুষের পেছনে যে একটা গোটা পৃথিবী পড়ে থাকে, সে খবর কে রাখে?

একটা মানুষ মারা যায়। সংবাদে সংখ্যাটা বাড়ে। অথচ তার সঙ্গে মারা যায় কারও অপেক্ষা, কারও ভবিষ্যৎ, কারও সংসারের একমাত্র অবলম্বন, কারও বুকের ভেতর যত্ন করে লুকিয়ে রাখা অসংখ্য ছোট ছোট স্বপ্ন। পৃথিবীর পরিসংখ্যানে সেগুলোর কোনো আলাদা ঘর নেই।

চোখ বন্ধ করে থাকি। তবু দৃশ্যগুলো বন্ধ হয় না।

এরপর ভেসে আসে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। রাজনৈতিক নেতাদের বাটপারি। মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা। যারা মানুষের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় বসে, তারাই কখনো কখনো মানুষের ভয়কে নিজেদের সবচেয়ে লাভজনক সম্পদ বানিয়ে ফেলে। যারা শান্তির কথা বলে, তাদের টেবিলেই যুদ্ধের হিসাব তৈরি হয়। যারা ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শপথ নেয়, তাদেরই ছায়ায় কোথাও না কোথাও ক্ষুধা আরও দীর্ঘ হয়।

আর মানুষ?

মানুষের কী হয় শেষ পর্যন্ত?

মানুষ ভোট দেয়, মানুষ কর দেয়, মানুষ শ্রম দেয়, মানুষ সন্তান হারায়, মানুষ ঘর হারায়, মানুষ পালিয়ে বেড়ায়। মানুষই মরে, মানুষই কাঁদে, মানুষই আবার ভোরবেলা উঠে কাজে যায়। পৃথিবীর সমস্ত নিষ্ঠুরতার ভার যেন শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাঁধেই এসে পড়ে। অথচ পৃথিবীর ভাগ্য নির্ধারণের টেবিলে তাদের জন্য একটা চেয়ারও থাকে না।

ভাবতে ভাবতে নিজের ঘরের অন্ধকারটাকে আরও গভীর মনে হয়।

বাইরে নিশ্চয়ই পৃথিবী ঠিকঠাক চলছে। কোথাও কোনো ট্রেন ছুটছে, কোথাও কোনো দোকান বন্ধ হচ্ছে, কোথাও কোনো প্রেমিক তার প্রেমিকাকে শেষবারের মতো শুভরাত্রি জানাচ্ছে। কোনো হাসপাতালে কেউ জন্ম নিচ্ছে, কোনো বাড়িতে কেউ মৃত্যুর খবর শুনছে। পৃথিবী একই সঙ্গে কত রকমের জীবন বহন করে চলে! একই আকাশের নিচে কেউ সুখের সংজ্ঞা খুঁজে পায়, কেউ কেবল আরেকটা দিন বেঁচে থাকার কারণ খোঁজে।

আর আমি, একটা বন্ধ ঘরে শুয়ে, পৃথিবীর সমস্ত অসুখ নিজের মাথার ভেতর টেনে নিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করছি।

এ কি কোনো দায়িত্ববোধ, নাকি নিছক অসহায়তা?

আমি কি সত্যিই পৃথিবীর জন্য কষ্ট পাচ্ছি, নাকি পৃথিবীর কষ্টের ভেতর নিজের কোনো অদৃশ্য ক্ষত খুঁজে বেড়াচ্ছি? এত মানুষের দুঃখের সামনে আমার এই জেগে থাকা কতটুকু অর্থবহ? আমার অস্থিরতা কি কারও ক্ষুধা কমায়? আমার নির্ঘুম রাত কি কোনো যুদ্ধ থামায়? আমার চোখের নিচে জমে ওঠা কালি কি কোনো শিশুকে তার হারিয়ে যাওয়া মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারে?

পারে না।

এই না-পারার বোধটাই বোধহয় মানুষের সবচেয়ে নিঃশব্দ যন্ত্রণা।

আমরা সব জানি, অথচ কিছুই করতে পারি না—অথবা, কিছুই করতে পারি না বলে অনেক সময় কিছু জানতেও চাই না। পৃথিবীর ভয়াবহতাগুলো থেকে চোখ ফিরিয়ে নেওয়াকে আমরা মানসিক শান্তি বলি। অন্যের দুঃখ ভুলে নিজের আরামটুকু বাঁচিয়ে রাখাকে বলি বাস্তবতা। তারপর একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের ভালো মানুষ বলে পরিচয় দিই।

কিন্তু মানুষ কি কেবল নিজের চারপাশটুকু ভালো রাখলেই ভালো মানুষ হয়ে ওঠে? নাকি দূরের কোনো অচেনা মানুষের কান্নাও মাঝেমধ্যে নিজের বুকের মধ্যে এসে আঘাত করার নামই মানুষ হয়ে থাকা?

জানি না।

শুধু জানি, এই রাত আমাকে ঘুমাতে দিচ্ছে না।

জানালার ওপাশে অন্ধকার। ঘরের ভেতর জমে আছে শীত। কম্বলের নিচে পা দুটো গুটিয়ে নিই। তারপরও বুকের ভেতর কেমন একটা হিমশীতল শূন্যতা।

হয়তো আমার ঘুম ভাঙিয়েছে একটা দুঃস্বপ্ন। কিন্তু জেগে ওঠার পর থেকে যা কিছু দেখছি, সেগুলো কি সত্যিই স্বপ্নের চেয়ে কম ভয়ংকর?

কখনো কখনো মনে হয়, পৃথিবীটা আসলে একটা বিশাল ঘুমন্ত ঘর। সবাই নিজের নিজের বিছানায় শুয়ে আছে। কেউ ক্ষমতার স্বপ্ন দেখছে, কেউ সম্পদের, কেউ প্রতিশোধের, কেউ কেবল পরদিন সকালে বেঁচে থাকার। আর এই ঘরের কোনো এক কোণে, অন্ধকারে, কেউ একজন হঠাৎ জেগে উঠে বুঝতে পারছে—ঘুমিয়ে আছে পৃথিবী, কিন্তু তার দুঃস্বপ্নের শেষ নেই।

রাত, ৩টা ২২ থেকে কতক্ষণ পেরিয়ে গেছে, জানি না।

মোবাইলটা এখনও দূরে পড়ে আছে। চোখ দুটো ক্লান্ত। শরীর ঘুম চাইছে। অথচ মনের ভেতর একের পর এক প্রশ্নের মিছিল।

আমি আবার চোখ বন্ধ করি।

নিজেকে বোঝাই, সবকিছু একা বহন করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। পৃথিবীর সমস্ত কান্না নিজের বুকের ভেতর জমিয়ে রাখার মতো প্রশস্ত কোনো হৃদয় মানুষের নেই। তবু কিছু কান্না শুনতে হয়, কিছু অন্যায় মনে রাখতে হয়, কিছু প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়—শুধু এই কারণে যে, একদিন যেন নিজের কাছেই অপরিচিত হয়ে না যাই।

হয়তো কাল সকালে ঘুম ভাঙবে। জানালা খুলব। ঠান্ডা বাতাস ঢুকবে ঘরে। এক কাপ চা বানাব। আবার দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট কাজে ডুবে যাব। পৃথিবীও তার নিয়মে চলবে। নতুন খবর আসবে, পুরোনো দুঃখ চাপা পড়বে নতুন দুঃখের নিচে।

কিন্তু এই রাতের কিছু প্রশ্ন থেকে যাবে।

থেকে যাবে সেই অস্বস্তি, সেই অসহায়তা, সেই অদ্ভুত অপরাধবোধ—আমি যখন নিরাপদ বিছানায় শুয়ে ঘুমাতে পারছি না, তখন পৃথিবীর কোথাও কেউ হয়তো নিরাপদ একটা বিছানাও পাচ্ছে না।

আর আমি জানি, আমার এই জেগে থাকা পৃথিবীকে বদলে দেবে না।

তবু চোখ বন্ধ করার আগে মনে মনে একটা কথাই বলি—

পৃথিবীটা এত নিষ্ঠুর হওয়ার কথা ছিল না। মানুষ অন্তত মানুষের কাছে একটু নিরাপদ আশ্রয় হতে পারত।

-মুহাম্মদ তমাল
ফ্রাঙ্কফুর্ট, জার্মানী
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৬:০৩
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মুহাম্মদ আলি জিন্না

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:৩৫



১৮৭৬ সালে করাচিতে এক দুষ্ট বালকের জন্ম হয়।
এবং ৭৬ বছর বয়সে দীর্ঘদিন যক্ষা রোগে ভূগে- দেশ ভাগের পরের বছর মারা যান। এই দুষ্ট বালক'ই পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা। নাম তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

মতামত পোস্ট: ২২ সালে লিখেছিলাম: যে শঙ্কা ছিলো তা আজকের বাস্তবতা

লিখেছেন অর্ক, ০৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:৩১



আমাদের কওমি জননী সত্যি কি অসাম্প্রদায়িক? হলে কতোটা? প্রশ্ন থাকলো সবার কাছে। তেতুল হুজুর মাওলানা শফি খুব ভক্তিভরে তাকে কওমি জননী উপাধি দিয়েছিলেন। এমনি এমনি তো আর নয়। অত্যন্ত মহব্বত... ...বাকিটুকু পড়ুন

"রিকন্সিলিয়েশান"....ইহা কি খায় নাকি মাথায় দেয়?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ০৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:০০



সত্যি সত্যিই তাদের সুযোগ ছিলো ২৫ শে মার্চ এর পর যাবতীয় অপকর্ম জনগণের কাছে স্বীকার পূর্বক,
/মুক্তিযুদ্ধে তাদের দ্বারা নৃশংসতার শিকার জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা,
/তাদের ক্ষতিপূরণ দিয়ে এবং,
/সব... ...বাকিটুকু পড়ুন

সেরা লেখক

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৪৭



বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভালো লেখক এক কথায় - হুমায়ূন আহমেদ। হুমায়ূন আহমেদের লেখা উপন্যাস মধ্যাহ্ন বা দেয়াল - এর পাশাপাশি রাখার মতো বাংলাদেশে আর কোনো উপন্যাস আছে কিনা আমার জানা... ...বাকিটুকু পড়ুন

=ডায়াটে একদিনের খাবার=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:৫১

ডায়াটের প্রথম দিকে-একদিনের খাবার। বর্তমানে আমাদের দেহে রোগসুগের অভাব নাই। ডায়াবেটিস, প্রেসার, ক্যান্সারসহ নানাবিধ রোগ বলা নাই কওয়া নাই শরীরে এসে বাসা বাঁধে।

আর এসব রোগের একমাত্র কারণ আনহেলদি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×