somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

এম টি উল্লাহ
জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।

চেকের মামলার খুঁটিনাটি / চেক ডিজঅনার মামলা করার নিয়ম ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

১৫ ই অক্টোবর, ২০২১ সকাল ১১:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক লেনদেন এবং অর্থ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি হিসেবে একে অপরকে ব্যাংক চেক প্রদান করে থাকি। পরবর্তীতে অর্থ পরিশোধের ব্যর্থতায় চেক প্রদানকারীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে হয়। আসুন আমরা বিস্তারিত জেনে নিই কখন, কিভাবে মামলা দায়ের করতে হবে।

চেক ডিস্অনার কি:
চেক ডিস্অনার বলতে টাকা উঠোনোর জন্য ব্যাংকে চেক জমা দেয়া হলে ওই চেকটির বিপরীতে টাকা প্রদান করতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের অস্বীকৃতিকে বোঝাবে।

কী কী কারণে ডিস্অনার হয়:
অপর্যাপ্ত তহবিল, চেকের মেয়াদ উত্তীর্ণ, প্রদানকারীর স্বাক্ষরের মিল না থাকা, টাকার পরিমাণ অংকে এবং কথায় মিল না থাকা, ইত্যাদি।

আদালতে প্রতিকার : চেকের মাধ্যমে প্রতারণার অভিযোগে ক্ষেত্রমতে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত অথবা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করতে হবে। চেকটি ব্যাংকের যে শাখায় ডিজঅনার হয়েছে ওই শাখাটি যে এলাকায় অবস্থিত, ওই এলাকা যে আদালতের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে সে আদালতে মামলা করতে হবে। তবে এ অপরাধের বিচার হবে দায়রা আদালতে।

মামলা দায়ের পদ্ধতি : মামলা দায়েরের আগে কতিপয় শর্ত পূরণ করতে হবে। প্রথমত, মেয়াদের মধ্যে চেকটি পরিশোধের জন্য ব্যাংকে উপস্থাপন করতে হবে। ইস্যুর তারিখ থেকে ছয় মাস পর্যন্ত ব্যাংক চেকের মেয়াদ থাকে। এরপর চেকটি তামাদি হয়ে যায় অর্থাৎ কার্যকারিতা হারায়। দ্বিতীয়ত, চেক ডিজঅনার সংক্রান্ত তথ্য ব্যাংক থেকে প্রাপ্তির ৩০ দিনের মধ্যে চেক ইস্যুকারীকে চেকের অর্থ প্রদানের লিখিত দাবিনামা সংক্রান্ত নোটিস প্রেরণ করতে হবে। চেকের প্রাপক অথবা যথানিয়মে ধারক এই নোটিস প্রদান করবেন। নোটিস প্রাপ্তির ৩০ দিনের মধ্যে চেক ইস্যুকারী যদি চেকের মূল্য পরিশোধে ব্যর্থ হন তবেই হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইনের ১৩৮ ধারার আওতায় তিনি শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন বলে গণ্য হবেন। তৃতীয়ত, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে আদালতে মামলা দায়ের করতে হবে।


নোটিশ প্রদান : চেক ইস্যুকারীকে উপরে বর্ণিত নোটিস তিনভাবে প্রদান করা যায়। প্রথমত, চেক ইস্যুকারীর হাতে নোটিসটি সরাসরি পৌঁছে দেওয়া। দ্বিতীয়ত, প্রাপ্তি স্বীকার রসিদসহ (এডি) রেজিস্টার্ড ডাকযোগে বাংলাদেশে তার জ্ঞাত ঠিকানায় নোটিস প্রেরণ করা। নোটিস জারির তৃতীয় পদ্ধতি হচ্ছে, বহুল প্রচারিত কোনো বাংলা জাতীয় দৈনিকে নোটিসটি প্রকাশ করা। কোনো কারণে যদি প্রথমবার চেকটি ডিজঅনার হওয়ার পর ৩০ দিনের মধ্যে নোটিস পাঠানো সম্ভব না হয়, তাহলে দ্বিতীয়বার চেকটি পরিশোধের জন্য ব্যাংকে উপস্থাপন করতে হবে। এভাবে একাধিকবার চেকটি ব্যাংকে উপস্থাপন করা যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, চেকটি ইস্যুর তারিখ থেকে ছয় মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে পরিশোধের জন্য জমা না দিলে চেকটি কার্যকারিতা হারায়। নোটিস জারি ও মামলা করার জন্য কোনো অভিজ্ঞ আইনজীবীকে নিযুক্ত করা যেতে পারে।

কোম্পানির ক্ষেত্রে : হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন-এর ১৩৮ ধারায় বর্ণিত অপরাধ সংঘটনকারী যদি কোনো কোম্পানি হয় এবং ওই কোম্পানি যদি সংঘটিত অপরাধের জন্য দায়ী বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে ওই অপরাধ সংঘটনের সময় কোম্পানির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সংঘটিত অপরাধের জন্য দায়ী হবেন এবং আইন অনুযায়ী দণ্ডিত হবেন। কোম্পানির ক্ষেত্রে হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইনের ১৩৮ ধারার পাশাপাশি ১৪০ ধারা উল্লেখ করে মামলা করতে হয়।

আদালতে যা দাখিল করতে হবে : মামলা করার সময় আদালতে মূল চেক, চেক ডিজঅনার সংক্রান্ত ব্যাংকের চিঠি, আইনি নোটিস অথবা পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির কপি অথবা পোস্টাল রসিদ ও প্রাপ্তি স্বীকার রসিদের ফটোকপি ফিরিস্তি আকারে মামলার আবেদনের সঙ্গে দাখিল করতে হবে।

শাস্তি : তহবিল অপর্যাপ্ততার কারণে ব্যাংক চেক ডিজঅনার সংক্রান্ত অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ এক বছর মেয়াদ পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা চেকে উল্লিখিত অর্থের সর্বোচ্চ তিন গুণ পরিমাণ অর্থদণ্ড অথবা উভয় প্রকার দণ্ডের বিধান হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইনে আছে। নগদ টাকার পরিবর্তে চেকের মাধ্যমে ঋণ অথবা অন্য কোনো দায়দেনা পরিশোধ উৎসাহিত করার লক্ষ্যে আইনে এ বিধান করা হয়েছে।

আপিল : আদালত কর্তৃক প্রদত্ত দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ আছে। চেকে উল্লিখিত টাকার কমপক্ষে শতকরা ৫০ ভাগ যে আদালত দণ্ড প্রদান করেছেন, সে আদালতে জমা দিয়ে আপিল করতে হবে। দেশের আদালতগুলোতে চেকের মাধ্যমে প্রতারণার অভিযোগে মামলা-মোকদ্দমা হরহামেশাই হচ্ছে। শাস্তিও হচ্ছে। কাজেই, সাবধান! ব্যাংক চেক দিয়ে প্রতারণার দিন শেষ।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যঃ
১) একটি চেকের মেয়াদ চেকের গায়ে চেক দাতার দেওয়া উল্লেখিত বা লিখিত তারিখ হতে ৬ মাস পর্যন্ত।তাই উক্ত সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর ব্যাংক গ্রহন না করার কারনে আদালতে Negotiable Instrument Act এর ১৩৮ ধারা অনুযায়ী আর টাকা দাবি করা যায় না।তাই ৬ মাস এর ভিতর চেক এর টাকা তোলার জন্য ব্যাংক এ উপস্থাপন করতে হয়।
২) উপরল্লিখিত নির্দিষ্ট সময়ের ভিতর উপস্থাপনে চেকদাতার একাউনট এ টাকা না থাকলে ডিসঅনার স্লিপ সংগ্রহ করে চেকের টাকা দাবি করে এক মাসের সময় দিয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে Negotiable Instrument Act এর ১৩৮ ধারা মোতাবেক টাকা পরিশোধের দাবি জানিয়ে নোটিশ সরবরাহ করতে হয় এবং নোটিশটি ছাড়তে হয় ডিসঅনার হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে।
৩) নোটিশ প্রাপ্তির ৩০ দিন পর মামলার কারন উদ্ভব হয়।মামলার কারন উদ্ভব হওয়ার ১ মাসের মধ্যে একজন ১ম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বরাবরে লিখিতভাবে অভিযোগ দায়ের করা যায়।আর নোটিশ গ্রহন না করলে নোটিশ ফেরত আসার তারিখ হতে এক মাসের মধ্যে অভিযোগ দায়ের করা যায়।
৪) চেকের প্রাপক বা দাবিদার এর পক্ষে তার নিজুক্তিও Attorney Holder মামলা করতে পারেন।
৫) অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে ডিসঅনার কয়বার করাতে হয়।উত্তরটা হল একবার ডিসঅনার করালে ও মামলা করা যায়।

৬) নোটিশ সরবরাহ না করলে বা নোটিশ জারি না করে চেকের মামলা করা যায় না। নোটিশ রেজিস্ট্রি ডাকযোগে প্রাপ্তি স্বীকারোক্তি সহ জারি করাই উত্তম অথবা জাতীয় পত্রিকায় নোটিশ প্রচার করা যায়।

৭) স্থানীয় অধিক্ষেত্রঃ যে ব্যাংকে চেক উপস্থাপন করা হয় সেই ব্যাংক আদালতের যে স্থানীয় অধিক্ষেত্রে অবস্থিত সেই আদালতে মামলা দায়ের করতে হবে।

৮) যে কোন ধরনের ডিসঅনার এর কারনে মামলা দায়ের করা যায়।

৯) কোন কারনে আইনের নির্ধারিত মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেলে প্রতারনার জন্য মামলা করা যায়।

১০)কখনও কোন চেক হারিয়ে গেলে সাথে সাথে নিকটস্থ থানায় জি, ডি দায়ের করে ব্যাংক এর মাধ্যমে চেক স্টপ করাতে হয়।

১১) হারান চেক উদ্ধারের জন্য মামলা করা যায়।

১২) কিছু না লিখে বা টাকার সংখ্যা না লিখে অর্থাৎ খালি চেক কখন কাওকে সরবরাহ করা উচিত নয়।

- মোহাম্মদ তরিক উল্যাহ
আইনজীবী
01733 594 270
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই অক্টোবর, ২০২১ সকাল ১১:৩০
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

" হিজি ;) বিজি " - ২ - আমি এবং আমার বই পড়া ও কিছু লেখার চেষ্টা।

লিখেছেন মোহামমদ কামরুজজামান, ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০২১ বিকাল ৫:৫০


ছবি - odhikar.news

" আমাদের সমাজে চলার পথে একেক মানুষের একেক রকম নেশা থাকে । কেউ টাকা ভালবাসে, কেউ ভালবাসে ক্ষমতা, কেউ ভালবাসে আড্ডা আবার কেউ ভালবাসে গান... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি আর ব্লগে আসবো না।

লিখেছেন ইমরোজ৭৫, ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০২১ সন্ধ্যা ৬:০৭



আমি অনিদিষ্ট কালের জন্য ব্লগে আসতেছি না। কারন আমার মন খারাপ। আর গ্রামীনফোন দিয়ে সামহোয়্যারইন ব্লগে ঢুকা যাচ্ছে না। আরবা ভিপিএন এ দিয়ে তখন আবার ঠিকই প্রবেশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

হেফজখানা জীবনের এক শীতের রাতের কথা

লিখেছেন আহমাদ মাগফুর, ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০২১ সন্ধ্যা ৭:২৫



তখন হেফজখানায় পড়ি। সাত - আট সিপারা মুখস্থ করেছি মাত্র। সিপারার সাথে বয়সের তফাৎটাও খুব বেশি না। তো একদিন রাতের কথা। শীতের রাত। সবাই ঘুমিয়ে গেছে। আমার ঘুম আসছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মেঘের কাছে রোদ্দুরের চিঠি-০৭

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০২১ রাত ১০:২৩


#মেঘের_কাছে_রোদ্দুরের_চিঠি_৭

#একটু_ভাল্লাগা_দিবে?
হ্যালো মেঘ,
আছো কেমন, আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। বাসায় মেহমান ছিল তাই চিঠি লেখা হয়ে উঠে নাই। মন খারাপ বা অভিমান হয়নি তো! আর মোবাইলে লিখতে লিখতে মে থাক গেয়ি। পিসি... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাবু খাইছো? - বাবা খাইছো?

লিখেছেন ঋণাত্মক শূণ্য, ০৬ ই ডিসেম্বর, ২০২১ রাত ৩:৫০

গত কিছুদিন থেকে আমি পরিবারের সাথে থাকছি না। তারা দেশে বেড়াতে গেছে। আর আমি একলা পুরা বাসা নিজের রাজত‍্য প্রতিষ্ঠা করে বসে আছি।



রাজত‍্য প্রতিষ্ঠার মূল ধাপ শুরু হয়েছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×