somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জীবনের না বলা গল্প -১

১৭ ই মে, ২০১৩ সন্ধ্যা ৬:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

জীবনে একটা মাত্র পরীক্ষা দিতে গিয়ে মনে হয়েছিলো, আমি কি পরীক্ষা হলে, নাকি কোনো দু:স্বপ্নের ভেতর আছি? দশম শ্রেণীর টেষ্টের কেমেষ্ট্রি পরীক্ষায়। ঘটনাটা গোড়া থেকে বলি।

১৯৯৯ সালের মাঝামাঝি সময়। সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র আমরা। বিজ্ঞান ক্লাসে আতাউর স্যারের সাথে বড় রকমের দ্বন্দ্ব হয়ে গেলো পুরো ক্লাসের। বিষয়টা হেড স্যার তৎক্ষনাত সমাধান করতে পারেন নি। পারেনি পরের দিন মিটিং ডাকা ম্যানেজিং কমিটিও।

ফলাফল। আমরা স্যারের ক্লাস বয়কট করলাম।
স্যার প্রচন্ড রকম মেধাবী, রাগী ও বদমেজাজী ছিলেন। ব্যাপক রাগী বলতে মারাত্মক ব্যাপক। এমনকি হ্যাড স্যারকেও তিনি ধমক মারতেন। আমরা ক্লাস বয়কট করায় তিনি আহত বোধ করলেন। এবং বললেন, এর শেষ দেখে ছাড়বেন।
কারণ স্যার ভাল করেই জানতেন, এই স্কুলে রসায়ন পড়ানোর মতো একমাত্র তিনিই আছেন। সুতরাং সাইন্স যারা পড়বে তাদেরকে ধর্না দিতেই হবে।

এভাবে সপ্তম শ্রেণী শেষ হলো। অষ্টম শ্রেণীতে উঠে আমি এবং আরও কয়েকজন ছাত্র বিষয়টা মীমাংসা করতে চাইলাম। কিন্তু বেশ কিছু ঘাওরা বন্ধু এবং আমাদের প্রতি স্যারের প্রচন্ড রকম ক্ষোভের কারণে বিষয়টা সফল হলো না।

এভাবে নবম শ্রেণী শুরু হয়ে গেলো। হেড স্যারের কঠিন নির্দেশ, ক্লাস করতেই হবে। বাধ্য হয়ে রসায়ন ক্লাস করতেই হয় আমাদের। স্যার ক্লাসে ঢুকেন, চোখ নিচু করে লেকচার দিয়ে চলে যান। আমরা মাথা নিচু করে শুনে যাই। এভাবে কেটে গেল আরও দু’টি বছর।

টেষ্ট পরীক্ষা ঠিক আগে, শেষ ক্লাসের দিন স্যার ক্লাস শেষ করে বের হয়ে যাচ্ছেন। এক পা ক্লাসরুমের বাইরে দিয়ে ঘাড়টা ঘুরিয়ে আমাদের দিকে তাকালেন আর বললেন, দেখুম কোন বাপের বেটা কেমেষ্ট্রিতে পাস করে।

ব্যাস! যা হবার তাই হলো।
এমন রসায়ন প্রশ্ন জীবনে দেখিনিরে বাপ। ১ ঘন্টার আগে খাতা জমা নেয় না। সাইন্সের সবাই মিলে ১ ঘন্টা ঘুমালাম। প্রথম বেলটা বাজতেই সবাই ত্যাগ।
সাইন্সের সকল ছাত্র রসায়নে ফেল করলো। এবং স্যার স্কুল কর্তৃপক্ষকে জানালেন, সাইন্সের একটা ছাত্রও এসএসসি দেওয়ার যোগ্য না। এদের পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি যেন না দেয়া হয়।
আমার বাবা স্কুলের মেনেজিং কমিটিতে ছিলেন। ভিতরের খবর অনেক কিছুই পেতাম। ঘটনার সেদিকে আর গেলাম না।

শেষ পর্যন্ত সাইন্সের সবাই এসএসসি পরীক্ষা দিলো। কোনো ছাত্র ফেল করলো না, মেধাবী একজন বাদে। তাও অন্যরকম একটা দুর্ঘটনার কারণে।
আমাদের SSC পরীক্ষার ঠিক চার দিক আগে স্যার রিটায়ার্ড করেছিলেন। সাইন্সের সব ছাত্ররা মিলে রিটায়ার্ডের তিনদিন আগে স্যারে পায়ে ধরে মাফ চেয়েছিলাম। মাফ করেছিলেন কিন্তু স্যার সেদিন কিছুই বলেননি। শুধু বলেছিলেন, ভাল করে পরীক্ষা দিস। সেদিন স্যারের ক্ষোভ আর জেদের মাত্রাটা আমরা বুঝতে পেরেছিলাম।
আমার বাবাও শিক্ষক হওয়ায় স্যারের সাথে আমার সম্পর্ক বেশ গভীর ছিল। কিন্তু ঘটনার পর সবকিছু কেমন যেন উলট-পালট হয়ে গেল।

ঘটনার পর কেটে গেল অনেকটা সময়। স্যারের সাথে অনেকদিন দেখা হয় না। বেশ কিছুদিন আগে ট্রলার ঘাটে দাঁড়িয়ে আছি। ঢাকা ফিরবো। স্যারও আসলেন সেখানে, তার ছেলেকে ট্রলারে উঠিয়ে দিতে। আমাকে দেখে স্যার ডাক দিয়ে একটু আড়ালে নিয়ে গেলেন। অনেক বিষয়ে কথা হলো। বেশ কিছু হতাশা নিয়ে কথা বলতে বলতে স্যার কেঁদে দিলেন। বাদ যায়নি ১৯৯৯ সালের সেইদিনের পরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোও। আমার কাঁধে হাত রেখে স্যার যখন কাঁদছেন তখন স্যারকে মনে হচ্ছিল ৫ বছরের কোন শিশু।

নাহ! আমি সেদিন কোনো শান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করিনি। স্যারকে কাঁদতে দিয়েছি। দেখতে চেয়েছি ইস্পাতসদৃশ্য কঠিন একটা মানুষের ভিতর কিভাবে একটা কোমল মন লুকিয়ে থাকে। তবে কান্না থামানোর জন্য স্যারের পিঠে হাত রেখেছিলাম। আমি নিজেই তখন শিক্ষক হওয়ায় স্যারের অনুভূতিটা বুঝতে কষ্ট হয়নি।

আমার ক্লাসমেটদের কাউকে ঘটনাটা বলিনি। ওদের কেউ হয়তো স্যারের ভেতরটা কোনদিন জানতে পারবে না।

স্যার, সাবানের বিক্রিয়াটা ভুল করার জন্য আপনার বজ্রকণ্ঠের ধমক আর খাওয়া হবে না !!
আমি দু:খিত স্যার,
১৯৯৯ সালের সেই ঘটনার পর আপনি আমার কাছ থেকে কি আশা করেছিলেন আমি তা জানতাম।
কিন্তু পারিনি, স্যার। আমি পারিনি। আমি আপনার জন্য কিছুই করতে পারিনি। :(

Note : সেদিন স্যারের কি এমন করেছিল সেটা জিজ্ঞেস করে আমাকে ব্যাথিত করবেন না। আমি ভুলে যেতে চাই।
[একটা বিশেষ ঘটনা পুরোনো ঘটনাকে আবার মনে করিয়ে দিলো]
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পুলিশ বনাম জনগণ

লিখেছেন জীয়ন আমাঞ্জা, ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৫৪

১.
বাংলা সিনেমা দিয়েই শুরু করি, নিরপরাধ ধরা প্রসঙ্গে সিনেমাতেই প্রথম অজুহাত হিসেবে বলা হয়, আগাছা নিরানোর সময় দুয়েকটা ভালো চারা তো কাটা পড়বেই! এই যে তার নমুনা! দশজন পতিতার সঙ্গে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কমলাপুর টু নারায়ণগঞ্জ - ৩ : (ছবি ব্লগ)

লিখেছেন মরুভূমির জলদস্যু, ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:০৭




সময়টা ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসের ৬ তারিখ।
উত্তর বাড্ডা থেকে রওনা হয়ে সকাল ১১টার দিকে পৌছাই কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন। উদ্দেশ্য রেললাইন ধরে হেঁটে হেঁটে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত যাবো

হাঁটা শুরু হবে কমলাপুর... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ এবং মোরাল পুলিশিং বন্ধ করতে হবে

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:০৬



১.
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক ছেলে পুলিশের সাথে তর্কের জেরে পুলিশ তাকে পিটাইছে দেখলাম।

ছেলেটা যে আর্গুমেন্ট পুলিশের সাথে করছিলো তা খুবই ভ্যালিড। পুলিশই অন্যায়ভাবে তাকে নৈতিকতা শেখাইতে চাচ্ছিলো। অথচ পুলিশের কাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

এমপি সাহেবের আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম!

লিখেছেন অপু তানভীর, ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:৩১


অনেক দিন আগে হুমায়ূন আহমেদের একটা নাটক দেখেছিলাম। সেখানে কোন এক গ্রামে একজন এমপি সাহেব যাবেন। এই জন্য সেখানে হুলস্থুল কান্ডকারখানা শুরু হয়ে যায়। নাটকে কতকিছুই না ঘটে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুখে ঠোঁটে

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ২৫ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৪২


এই সমগ্র বাংলাদেশে- এখন
ইরি ধানে ধানে সবুজ ছুঁয়ে গেছে;
মাঠে মাঠে পাখিদের নব আনন্দে
হেসে ওঠছে লাল সবুজের প্রাণ;
ফসল পাকবে সমগ্র মাঠে মাঠে
সুখে সমৃদ্ধি হবে জীবন সংসারে
কৃষকের প্রত্যায়শা ভরে তুলবে
গোলা ভরা ধান... ...বাকিটুকু পড়ুন

×