Louisa (1950); লুইসা - শুধু দর্শক নয় নির্মাতাদেরও মাষ্ট ওয়াচ ছবি। ১৯৫০ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবি নিয়ে অনেক কথা বলা যায়, অনেক তথ্য জেনে আপনি নিশ্চিত আবেগে আপ্লুত হবেন। সামান্য কিছু কথা বলবো, আমেরিকার নির্বাক যুগের থেকে যখন সবাক যুগে আসলো, মানে ছবি বানানোর যখন মুল যাত্রা, সেই প্রথম দশকে এমন এমন ছবি হয়েছে যে, যেগুলো না দেখলেই নয় এবং আমি মনে করি সেই ছবি গুলোই এখনো ধুয়ে ধুয়ে নুতন ছবি করা হচ্ছে এবং সেই হলিউডের ছবি গুলো এখনো ক্লাসিক বা পথ প্রদশক। হলিউডের এই ছবি গুলো সারা বিশ্বে এমনই হয়ে আছে যে, ছবি বানাতে হলে এই ছবি গুলো দেখতেই হবে বা এই ছবি গুলো থেকে শিক্ষা নিতেই হবে। পূর্ন দৈর্ঘ ছবি কাকে বলে, ছবির সিকোয়েন্স, ক্যামেরার কাজ, ঘটনা, পাত্রপাত্রী, সংলাপ, হাঁটাচলা ইত্যাদি এখনো অনুকরণীয়।
লুইসা তেমনি একটা হলিউডি ছবি, ছবির পরিচালক আলেক্সজান্ডার হল (তিনি অনেক নামকরা পরিচালক এবং বহু ছবি পরিচালনা করেছেন), ১৯৫০ সালের মে মাসের শেষ দিনে এই ছবি মুক্তি পেয়েছিল এবং সারা দুনিয়া কাঁপিয়ে দিয়েছিল। ছবি মুক্তির কিছু দিনের মধ্যেই প্রায় দেড় মিলিয়ন ডলার কামাই (অংকটা চিন্তা করে দেখতে পারেন) করে ফেলেছিল। ছবিটা একটা পূর্ন দৈর্ঘের হালকা কমেডি ছবি। কমেডির ফাঁকে ফাঁকে বিনোদনের প্রায় সব ব্যবস্থাই আছে এই ছবিতে, নাচ গান পার্টি হালকা রেমান্টিসিজম সব কিছুর এক অপূর্ব মিশ্রন এই ছবি। ছবির মুল নায়ক মিঃ রেনাল্ড রিগ্যান (যাকে আপনারা নিশ্চয় সবাই চিনে থাকবেন, পরে তিনি আমেরিকার দুই দুই বারের নির্বাচিত প্রেসিডন্ট ছিলেন) এবং তার চরিত্রের নাম ছিলো নোটন, পিউর চাকুরীজীবি এবং ভেজাল মুক্ত জীবন। পিতাহারা এই পরিবারে বৃদ্ধ মাতা, স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে তার মুল পরিবার, সাথে ছিল একজন গৃহকর্মী (কম সময়েও যার অভিনয় অসামান্য)।

ছবির ঘটনা আপনাদের সামনে বলে দেই, ছবি দেখতে বসলে আনন্দ পাবেন। নোটন পরিবারে পিতা মারা যাবার পরের ১০ বছরে সময়, তার মায়ের যেন কিছুতেই আর সময় কাটে না। এদিকে বউ শাশুড়ির মধ্যেও ধন্ধ লেগে আছে, মি নোটন সব দেখে যাচ্ছেন কিন্তু কিছু করতে পারছেন না, অবশেষে একদিন মায়ের সাথে বসলেন এবং সব কথা বলে দিলেন, পরিবারে কোথায় কেমন সমস্যা হচ্ছে। মায়ের মনে আঘাত লাগলো। মা নুতন জীবন শুরু করার চিন্তা করলেন এবং নুতন করে আবারো প্রেমে পড়লেন, এই মায়ের নামই লুইসা, যার নামেই ছবির নাম। মিসেস লুইসা ভাল্বাসেন একজনকে এবং তাকে বিবাহ করার সিধান্ত নেন কিন্তু মাঝে এসে বাগড়া দেয় নুতন প্রেমিক, যে কিনা আবার মি নোটনের বস (এই দুই বৃদ্ধের অভিনয় আপনাকে সারা জীবন মনে রাখতে হবে, এত চমৎকার অভিনয় এদের)। এদিকে মি নোটনের ১৭ বছরে মেয়েও প্রেম করছে, প্রেমিকা নিয়ে বিরাট দহরম ঘরে বাইরে, ছোট ছেলেও সব দেখে যাচ্ছে। মি নোটনের স্ত্রী একজন টিপিক্যাল গৃহিণী, এই চরিত্র আমাদের দেশের প্রায় প্রতিটা ঘরে ঘরেই এখন!

যাই হোক, শেষে মায়ের পছন্দের দূর্বল পাত্রই জয়ী হয় এবং তারা বিবাহ করে নুতন জীবন শুরু করে! নানান ঘটনার মধ্যে দিয়ে, নানান হাস্যরসের মধ্যে দিয়ে ঘটনার সমাপ্তি হয়। ১৯৫০ সালের মুক্তি পাওয়া ছবিতে এমন ঘটনা চিন্তা করতে পারাও পরিচালকের মুন্সীয়ানা বটেই এবং এই ঘটনার কারনেই হয়ত এই ছবি সারা বিশ্বে হিট হয়ে পড়ে।
কেন এই ছবি দেখবেন?
১। ততকালীন আমেরিকান পরিবার ও সমাজ ব্যবস্থা, যার সাথে আমাদের পরিবারের অনেক কিছুর মিল পাওয়া যায়।
২। সংলাপ, এই ছবির সংলাপ শুনলে এমনিতেই হেসে গড়াগড়ি খাবেন, এই ধরেন একজন সাধারন নাগরিক পুলিশকে বকা দিচ্ছে, তোমরা কিসের চাকুরী করো, হারিয়ে যাওয়া কাউকে খুঁজে বের করে দিতে পার না!
৩। বুড়োদের প্রেমের সাথে সাথে একটা তৎকালীন টিনএজ প্রেম দেখানো হয়েছে।
৪। ফটোগ্রাফি, অসাধারন (আপনাকে অবশ্যই তৎকালীন ভাবনায় নিয়ে যাবে)।
৫। পূর্নাং গল্প, সাধারন গল্পে, সমাধান শেষে (পূর্ন দৈর্ঘের ছবি হয়ত এই জন্যই বলে)।
৬। হাস্যরস, যারা হাস্যরস পছন্দ করেন, তারা না হেসে পারবেন না।
৭। কেন দৃশ্যই অহেতুক মনে হবে না, মনে হবে এর পরের ঘটনা এমনি হবে, এবং হচ্ছিলোও তাই।
৮। অভিনয়, প্রতিটা চরিত্রের অভিনয় দূর্দান্ত, এদের অভিনয় দেখে আপনি অন্যদের অভিনয় বিচার করতে পারবেন।
৯। ভাষা ইংরেজী হলেও এমন সহজ করে প্রতিটা সংলাপ লেখা হয়েছে যে, বুঝতে কারোই সমস্যা হয় না, খুব সহজ এবং সাধারন ইংরেজী ভাষা। যারা ভাষা না বুঝার জন্য ছবি দেখেন না, তাদেরো এই ভাষা বুঝতে সমস্যা হবার কথা নয়, এতই সাধারন সংলাপে লেখা। ছবি বুঝতে ভাষার ব্যবহার প্রয়োজনীয়।
৮। নির্ভেজাল আনন্দ
ইত্যাদি ইত্যাদি
এই ছবিটাকে আমি মুভি লাভার্সদের জন্য একটা মাষ্ট ওয়াচ ছবি বলবো এবং সাথে এই কথাও বলবো যে, যারা ছবির নির্মাতা এবং আগামীতে ছবি বানাতে চান তারাও যেন এই ছবি দেখেন এবং ছবি কি, কাকে সিনেমা বলে সেটার ধারনা এই ছবি থেকে পাবেন। সিনেমা নির্মান মুলত একটা বিরাট অভিজ্ঞতার ব্যাপার, এমন ছবি না দেখলে ছবি নির্মান হয়ে উঠবে না। বিশেষ করে যারা ছবি নির্মানে উৎসাহী, তাদের আমি আরো পরিস্কার করে বলবো, হলিউডের ১৯৫০ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে নির্মানকৃত ছবি গুলো দেখুন (সাদাকালো ছবি সহ)।
এই প্রসঙ্গে আরো একটা কথা বলে দেই, যারা এই সময়ের (পুরানো) মধ্যে নির্মানকৃত বলিউড তথা বোম্বের হিন্দি ছবি গুলো দেখেন বা দেখেছেন তাদের অভিজ্ঞতা কম নয়, তবে আমি আমার হলিউডের এই সময়ের ছবি গুলো দেখার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে, এই যে আপনার বলিউডের ছবির কথা বলেন, এই সব ছবি মুলত হলিউডে পুরানো ছবি গুলোর নকল ছবি, বোম্বে মুলত সেই সময়ে কয়েকটা এমন ইংরেজী ছবি দেখে একটা হিন্দি ছবি বানানো হত, জুড়ে দেয়া হত ফ্যান্টাসী ও গান (গানের প্রতি এই উপমহাদের মানুষের আবেগ বলে শেষ করার মত না)। ইংরেজী এই ছবি গুলোই ছিল একমাত্র মৌলিক ছবি, যদিও এখন আর এমন চিন্তা করা যায় না।
সবাইকে ধন্যবাদ, ছবিটা আমি মুলত একটা এপস (ওল্ড হলিউড ফিল্ম) দিয়ে মোবাইল ভায়া হয়ে বড় টিভিতে দেখেছিলাম। পরে ইউটিউবে সার্চ করে দেখি, এই ছবি ইউটিউবে আছে! অহেতুক মাঝে মোবাইলের ব্যাটারী শেষ করলাম। আপনারা যারা ছবিটা দেখতে চান, তাদের জন্য লিঙ্ক তুলে দিলাম। আগেই বলে দিলাম, এটা একটা মাষ্ট ওয়াচ ছবি, না দেখলে পাস্তাবেন এবং এই ছবি দেখে শেষ করে নিশ্চয় আমাকে স্মরণ করবেন যে, উদরাজী ভাই সত্যই একটা ভাল হাসির ছবি সাজেষ্ট করেছেন। আবারো ধন্যবাদ।
ভালবাসা নিন, আনন্দে সবাই জীবন কাটান।

* মি রেনান্ড রিগানের অভিনয় আমাদের দেশের মি বুলবুল আহমেদের কথা মনে করিয়ে দেয়, আমাদের হিরো মি বুলবুল আহমেদ এমনি নিরীহ চরিত্রের জন্য অসাধারন অভিনেতা ছিলেন।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২০ দুপুর ১:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




