যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম অংশে বড় বড় কিছু পর্বতমালা আছে, নর্থ আমেরিকান টেকটোনিক প্লেটের সাথে, প্যাসিফিক, হুয়ান ডি ফুকা ইত্যাদি প্লেটের যেখানে সংঘর্ষ হচ্ছে। অনেকগুলো জীবন্ত আগ্নেয়গিরিও আছে এখানে। এর মধ্যে মাউন্ট সেন্ট হেলেন্স এ 1980 তে বেশ বড় বিস্ফোরণ হয়েছিল। আমি তখন থাকতাম যেখানে ওটা ছিল প্লেটের পশ্চিমাংশে, আর জার্মান শহরটা পুর্বাংশে। মাঝে ক্যাসকেড পর্বতমালা। পর্বতমালার মধ্য দিয়ে বেশ কয়েকটি গিরিপথ তৈরী করেছে এরা, (যেমন ভুগোল বইয়ে আমরা পড়তাম পাকিস্তানের খাইবার গিরিপথ), গিরিপথগুলো বেশীরভাগই পুর্ব-পশ্চিম হাইওয়ের ওপরে। কত বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে কে জানে, কারণ একটা স্টপেজে সাইনবোর্ড দেখলাম লেখা, আগে মাইন্টেন পাস থেকে কাছের শহরে যেতে লাগত একদিন, এখন হাইওয়ে আর পাহাড় কেটে রাস্তা বানানোর পর লাগে এক ঘন্টা।
সকালে ক্যামেরা, কিছু কাপড়-চোপড় নিয়ে রওনা হওয়ার প্ল্যান ছিল। নানা আলসেমীতে রওনা দিতে দিতে দুপুর হয়ে গেল। এমনিতেই বেশ শীত, তার ওপর গিরিপথের ওপাশে আরও বেশী ঠান্ডা। পাহাড়ের ওপর শীতকালে মেঘগুলো একটু কম উচুতে থাকে, প্রায়ই রাস্তার ওপরে মেঘের কুয়াশা তৈরী হয়। ঘন্টাখানেক গাড়ি চালানোর পর যখন পাহাড় চড়তে শুরু করলাম, দেখি কুয়াশায় অবস্থা খারাপ। রাস্তার পাশে অল্প বিস্তর শক্ত হয়ে যাওয়া বরফ। তুষারের চেয়ে শক্ত বরফ বেশী বিপদজনক, কারন চাকা পিছলে যেতে পারে। আর আমার গাড়ি 4WDও না যে একচাকা আটকে গেলেও অসুবিধা নাই। ডিসেম্বরের হলিডে সিজনে এখানে সবচেয়ে বেশী এক্সিডেন্ট হয়, কারন বোঝাই যাচ্ছিল, এত কুয়াশার মধ্যেও স্থানীয় লোকজন বেশ দ্রুতগতিতে গাড়ি চালাচ্ছে।
ঠান্ডায় চারপাশে কেমন একটা মৃত অবস্থা, মাঝে মাঝে ছোট শহর, গ্যাস স্টেশন দেখা যায়, তারাও জীবন্মৃত। প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখব ভাবছিলাম, কিন্তু প্রকৃতির মনে হয় মন ভালো নাই। ভ্যালীতে আসতে আসতে সন্ধ্যা নেমে এল, এখানে শীতকালে 4টার মধ্যেই রাত হয়ে যায়, আর ওইদিন কুয়াশা আর মেঘের জন্য মনে হয় রাত একটু তাড়াহুড়া করেই চলে এল। রাস্তার ওপরে বেশ ভালই বরফ পড়েছিল, দেখলাম কিছুটা পরিস্কার করেছে, তবে প্রতি রাতেই মনে হয় নতুন করে পড়ে। বেশ ভয় ভয় করছিল ফেরত যাবো কিভাবে এটা চিন্তা করে।
গন্তব্যে পৌছলাম রাত নামার পরেই। শহরের লোকজন বেশ নিরাসক্ত মনে হল। আমারও আগ্রহ শেষ, বিশেষ করে প্রথম 50 মাইল রাস্তার যে দশা, কেন আসলাম, আর কেন দেরী করে আসলাম এই ভেবে নিজের ওপর খুব রাগ হচ্ছিল। এরকম বেঘোরে দুর্ঘটনায় পড়ার কোন মানেই হয় না। 10-15 মিনিট এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করে জার্মান টাউন দেখা শেষ, গাড়ি ঘুরিয়ে বাসার পথ ধরলাম। মাইল বিশেক আসতে আসতেই ঘন কুয়াশা চেপে ধরল। হেডলাইটের আলোতে কিছুই দেখা যাচ্ছে না, ফগ লাইট জ্বালালেও তেমন উন্নতি নাই। এদিকে রাস্তার স্পিড লিমিট 50 মাইল। সাথে যেসব গাড়ি ছিল তারা বহু আগে আমাকে পার হয়ে গেছে, বিরান এলাকায় আমি একা। 15-20 মাইলের মধ্যে কোন জনবসতি আছে কিনা সন্দেহ। অনেকক্ষন পরপর উল্টো দিক থেকে দুএকটা গাড়ি আসে, তখন আরো ভয় লাগে যে ভালোমতো না দেখে না মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়ে যায়। কুয়াশায় যে পরিস্থিতি এত খারাপ হতে পারে কোন অনুমান ছিল না। এর মধ্যে দেখি উপরে ঘোলাটে পুর্নিমার চাদ দেখা যাচ্ছে, ভয়াবহ চেহারা। 40 মিনিটের রাস্তা ঘন্টাখানেকের বেশী লাগল, লোকালয়ে পৌছে কি যে ভালো লাগলো। কুয়াশাও এদিকে হালকা। তাও দেখলাম অনেক পুলিশের গাড়ি, এ্যাম্বুলেন্স, জায়গায় জায়গায় গাড়ি উল্টে আছে। আমার সাথের গাড়ি গুলোর কোনটা কি না কে জানে, এরা তো আমাকে কুয়াশার মধ্যে একা ফেলে এসেছিল। ফ্রিওয়েতে উঠে বেশ ভালো লাগলো, ফ্রিওয়েতে অনেক গাড়ি, কুয়াশা কিছুটা থাকলেও নির্জন না অন্তত।
আরও ঘন্টাখানেক পর বাসায় ফিরলাম, আহত-নিহত না হয়ে যে ফিরলাম এজন্য নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছিল। কুয়াশায় ড্রাইভিং আর না, পাহাড়ে তো নাই। ঘরের ছেলে ছুটিতে ঘরেই ভালো আছি।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০০৬ বিকাল ৩:০৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



