somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালাঃ কুয়াশা

৩১ শে ডিসেম্বর, ২০০৬ বিকাল ৩:০২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কয়েক বছর আগের ঘটনা, বছরের শেষাশেষি কোথায় যাওয়া যায় ভাবছিলাম। ক্রিসমাস, নিউ ইয়ার অনেকগুলো বন্ধ একসাথে। তখন একটু অর্থ সংকটে ছিলাম, প্লেনে উঠে দুরে যাবো না তাই, ধারে কাছেই বা কোথায় যাই চিন্তা করতে করতে দুদিন নষ্ট হয়ে গেল। মাঝে মাঝে আমি খুব সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগি। প্রায় দেড়শ মাইল দুরে (আড়াইশ কিমি) মাউন্টেন রেঞ্জের অপর পাশে একটা ভ্যালী আছে, মুলত আপেল বা চেরী চাষ হয়, আর কিছু কিছু ছোট ছোট শহর আছে। জার্মান ইমিগ্রান্টদের একটা শহরের খ্যাতি আগে শুনেছি, কিন্তু কখনও যাওয়া হয় নি। ভাবলাম এবেলা ওখান থেকেই ঘুরে আসি, বিশেষ করে আমার বাজেট যেহেতু সংক্ষিপ্ত।

যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম অংশে বড় বড় কিছু পর্বতমালা আছে, নর্থ আমেরিকান টেকটোনিক প্লেটের সাথে, প্যাসিফিক, হুয়ান ডি ফুকা ইত্যাদি প্লেটের যেখানে সংঘর্ষ হচ্ছে। অনেকগুলো জীবন্ত আগ্নেয়গিরিও আছে এখানে। এর মধ্যে মাউন্ট সেন্ট হেলেন্স এ 1980 তে বেশ বড় বিস্ফোরণ হয়েছিল। আমি তখন থাকতাম যেখানে ওটা ছিল প্লেটের পশ্চিমাংশে, আর জার্মান শহরটা পুর্বাংশে। মাঝে ক্যাসকেড পর্বতমালা। পর্বতমালার মধ্য দিয়ে বেশ কয়েকটি গিরিপথ তৈরী করেছে এরা, (যেমন ভুগোল বইয়ে আমরা পড়তাম পাকিস্তানের খাইবার গিরিপথ), গিরিপথগুলো বেশীরভাগই পুর্ব-পশ্চিম হাইওয়ের ওপরে। কত বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে কে জানে, কারণ একটা স্টপেজে সাইনবোর্ড দেখলাম লেখা, আগে মাইন্টেন পাস থেকে কাছের শহরে যেতে লাগত একদিন, এখন হাইওয়ে আর পাহাড় কেটে রাস্তা বানানোর পর লাগে এক ঘন্টা।

সকালে ক্যামেরা, কিছু কাপড়-চোপড় নিয়ে রওনা হওয়ার প্ল্যান ছিল। নানা আলসেমীতে রওনা দিতে দিতে দুপুর হয়ে গেল। এমনিতেই বেশ শীত, তার ওপর গিরিপথের ওপাশে আরও বেশী ঠান্ডা। পাহাড়ের ওপর শীতকালে মেঘগুলো একটু কম উচুতে থাকে, প্রায়ই রাস্তার ওপরে মেঘের কুয়াশা তৈরী হয়। ঘন্টাখানেক গাড়ি চালানোর পর যখন পাহাড় চড়তে শুরু করলাম, দেখি কুয়াশায় অবস্থা খারাপ। রাস্তার পাশে অল্প বিস্তর শক্ত হয়ে যাওয়া বরফ। তুষারের চেয়ে শক্ত বরফ বেশী বিপদজনক, কারন চাকা পিছলে যেতে পারে। আর আমার গাড়ি 4WDও না যে একচাকা আটকে গেলেও অসুবিধা নাই। ডিসেম্বরের হলিডে সিজনে এখানে সবচেয়ে বেশী এক্সিডেন্ট হয়, কারন বোঝাই যাচ্ছিল, এত কুয়াশার মধ্যেও স্থানীয় লোকজন বেশ দ্রুতগতিতে গাড়ি চালাচ্ছে।

ঠান্ডায় চারপাশে কেমন একটা মৃত অবস্থা, মাঝে মাঝে ছোট শহর, গ্যাস স্টেশন দেখা যায়, তারাও জীবন্মৃত। প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখব ভাবছিলাম, কিন্তু প্রকৃতির মনে হয় মন ভালো নাই। ভ্যালীতে আসতে আসতে সন্ধ্যা নেমে এল, এখানে শীতকালে 4টার মধ্যেই রাত হয়ে যায়, আর ওইদিন কুয়াশা আর মেঘের জন্য মনে হয় রাত একটু তাড়াহুড়া করেই চলে এল। রাস্তার ওপরে বেশ ভালই বরফ পড়েছিল, দেখলাম কিছুটা পরিস্কার করেছে, তবে প্রতি রাতেই মনে হয় নতুন করে পড়ে। বেশ ভয় ভয় করছিল ফেরত যাবো কিভাবে এটা চিন্তা করে।

গন্তব্যে পৌছলাম রাত নামার পরেই। শহরের লোকজন বেশ নিরাসক্ত মনে হল। আমারও আগ্রহ শেষ, বিশেষ করে প্রথম 50 মাইল রাস্তার যে দশা, কেন আসলাম, আর কেন দেরী করে আসলাম এই ভেবে নিজের ওপর খুব রাগ হচ্ছিল। এরকম বেঘোরে দুর্ঘটনায় পড়ার কোন মানেই হয় না। 10-15 মিনিট এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করে জার্মান টাউন দেখা শেষ, গাড়ি ঘুরিয়ে বাসার পথ ধরলাম। মাইল বিশেক আসতে আসতেই ঘন কুয়াশা চেপে ধরল। হেডলাইটের আলোতে কিছুই দেখা যাচ্ছে না, ফগ লাইট জ্বালালেও তেমন উন্নতি নাই। এদিকে রাস্তার স্পিড লিমিট 50 মাইল। সাথে যেসব গাড়ি ছিল তারা বহু আগে আমাকে পার হয়ে গেছে, বিরান এলাকায় আমি একা। 15-20 মাইলের মধ্যে কোন জনবসতি আছে কিনা সন্দেহ। অনেকক্ষন পরপর উল্টো দিক থেকে দুএকটা গাড়ি আসে, তখন আরো ভয় লাগে যে ভালোমতো না দেখে না মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়ে যায়। কুয়াশায় যে পরিস্থিতি এত খারাপ হতে পারে কোন অনুমান ছিল না। এর মধ্যে দেখি উপরে ঘোলাটে পুর্নিমার চাদ দেখা যাচ্ছে, ভয়াবহ চেহারা। 40 মিনিটের রাস্তা ঘন্টাখানেকের বেশী লাগল, লোকালয়ে পৌছে কি যে ভালো লাগলো। কুয়াশাও এদিকে হালকা। তাও দেখলাম অনেক পুলিশের গাড়ি, এ্যাম্বুলেন্স, জায়গায় জায়গায় গাড়ি উল্টে আছে। আমার সাথের গাড়ি গুলোর কোনটা কি না কে জানে, এরা তো আমাকে কুয়াশার মধ্যে একা ফেলে এসেছিল। ফ্রিওয়েতে উঠে বেশ ভালো লাগলো, ফ্রিওয়েতে অনেক গাড়ি, কুয়াশা কিছুটা থাকলেও নির্জন না অন্তত।

আরও ঘন্টাখানেক পর বাসায় ফিরলাম, আহত-নিহত না হয়ে যে ফিরলাম এজন্য নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছিল। কুয়াশায় ড্রাইভিং আর না, পাহাড়ে তো নাই। ঘরের ছেলে ছুটিতে ঘরেই ভালো আছি।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০০৬ বিকাল ৩:০৩
৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমার একশততম পোস্ট!

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:১৮



আমার একশততম পোস্ট!

আজ আমার লেখকজীবনের এক ছোট্ট কিন্তু হৃদয়ের গভীরে দাগ কাটা দিন- সামহোয়্যারইন ব্লগ এ আমার একশততম পোস্ট। সংখ্যার হিসেবে হয়তো ১০০ খুব বড় কিছু নয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভুল শুধু ভুল, আমি কি করছি ভুল?

লিখেছেন রবিন.হুড, ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১২:৪১

আমি টাকার পিছনে না ছোটার কারনে আমার হাতে যথেষ্ট সময় থাকায় সে সময়টুকু সামাজিক কাজে ব্যয় করার চেষ্টা করছি। আবার বিলাসিতা পরিহার করার কারনে অল্প কিছু টাকা সাশ্রয় করছি যা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সংসদের বায়না : ৩০ সেট গয়না

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১:১৪

একসময় এই প্রবাদটি খুব প্রচলিত ছিল, এমনকি পণ্ডিত মহলেও এটি নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করা হতো।
সময় বদলে গেছে; যমুনা নদী দিয়ে বহু জল বয়ে গিয়ে সাগরে মিশেছে।



বাস্তবতার নিরিখে আমাদের সমাজে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফুল ট্যাঙ্ক স্বপ্ন

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৫:৩৬



শহরের সকালগুলো এখন আর আগের মতো নয়। সূর্য ওঠার আগেই পেট্রোল পাম্পের সামনে লম্বা লাইন পড়ে যায়। সেই লাইনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে রিদম—একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, আর জীবনের বাস্তবতায় আটকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশি দৃষ্টিতে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন ও ভারতের হিন্দুরাষ্ট্র হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ২৩ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:০৬


কাল থেকে দুই ধাপে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন শুরু হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা ও মতাদর্শ দ্বারা যেমন প্রভাবিত, তেমনি এর প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশেও প্রতিফলিত হয়। হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদী শক্তি যখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×