বাংলা গান বাণী প্রধান। তাই বাণী বিষয়ের এবং গানের শ্রেণী অনুসারে উপযুক্ত না হলে তা সঠিক গান হিসেবে গৃহিত হবে না। যেমন প্রেমের গানের বাণীর মতো যদি দেশের গানের বাণী হয়; ভক্তিরসের গানের বাণীর মতো যদি সংগ্রামী বা যুদ্ধের গানের বাণী হয় তাহলে তো পুরো উদ্দেশ্যটাই মাঠে মারা যাবে।
আবার বিভিন্ন লয়ে ও তালে গান হয়। গানের ছন্দ ও মাত্রা যদি সেভাবে রচিত না হয় তাহলে গান হয়তো হবে-তবে তার রংঢং বজায় থাকবে না। যেমন গানটি যদি রাগ প্রধান, উচ্চাঙ্গ, কাওয়ালী, ঠুমরি বা গজলাঙ্গের হয় তাহলে তার বাণী, ছন্দ ও কাঠামো সেই মোতাবেক হতে হবে। সঙ্গীত বা গানের বৈচিত্র্য বিষয় এত যে তা লিখে বোঝানো এক কথায় অসম্ভব। আমার সীমিত জ্ঞানে তা শুধু অসম্ভবই নয় রীতিমতো ধৃষ্টতা। শুধু কবি ও গীত রচয়িতা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান যে গানের জন্য প্রয়োজনীয় বুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন সেই কথাটা বলার জন্যই এই দু-একটি বাড়তি কথার অবতারণা করলাম। গানের বাণী রচয়িতা হিসেবে কবি মনিরুজ্জামান যে কতটা সফল ও কালোত্তীর্ণ জনপ্রিয় গানগুলোই তার প্রমাণ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, কবি মনিরুজ্জামানের গানের বাণী শুধু গাওয়া বা শোনার জন্যই উপযুক্ত নয় পাঠের জন্যও সমান হৃদয়গ্রাহী। তার গানের বই ‘নির্বাচিত গান’ পাঠ করলেই আমার কথার প্রমাণ পাওয়া যাবে। এখানেই তিনি বর্তমানের গান রচয়িতাদের মধ্যে ব্যতিক্রম। তিনি গান রচনায় সঙ্গীত ঐতিহ্যের যোগ্য উত্তরাধিকারী।
তার দেশের গানের মধ্যে-‘আমার দেশের মাটির গন্ধে ভরে আছে সারামন, শ্যামল কোমল পরশ ছাড়া যে নেই কিছু প্রয়োজন’ সেরা গান। দেশ যতদিন আছে ততদিন এই গানও আমাদের গাইতে হবে। শহীদদের নিয়ে গান, ‘তারা এদেশের সবুজ ধানের শীষে, চিরদিন আছে মিশে।’
ছায়াছবির একটি অনন্য গান-‘তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়? দুঃখের দহনে করুণ রোদনে তিলে তিলে তার ক্ষয়।’ জীবন ঘনিষ্ঠ এই গানটি চিরদিন বেঁচে থাকবে।
এমন আরো গান আছে যেমন: এই পৃথিবীর রং মহলে কত যে নাটকের চলে অভিনয়, দুঃখ সুখের দোলায় দোলে ভব নদীর পানি, রাগ করবার আরো যে কত সময় রয়েছে পড়ে, হলুদ বাঁটো মেন্দি বাঁটো, বাঁটো ফুলের মৌ। প্রেমের গান লিখেছেন অনেক- তার মধ্যে ‘আঁখি তাই তো এমন ক’রে বলেছে’, ‘ কেন কথা দিয়ে তুমি কথা রাখো না’, তোমার প্রেমের চন্দন সুরভিতে’, ‘তোমার ভুবনে এসে ধন্য আমি’, ‘এই ভাল আমি চলে যাব দূরে’; যেগুলো আমার এই মুহূর্তে মনে পড়লো।
প্রসঙ্গত একটি কথা মনে হচ্ছে তিনি অধ্যাপক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক হওয়া সত্ত্বেও তার কবিতা, ছড়া এবং গান কোনো রকম পাণ্ডিত্যের ভড়ং বা ভারিক্কির বোঝা হয়নি এটা খুবই আশ্চর্যের বিষয়। এতে বোঝা যায় তিনি সত্যিকার অর্থেই একজন কুশলী শিল্পী ছিলেন।
প্রখ্যাত সুধী সুরকার আবদুল আহাদ কবি মনিরুজ্জামান সম্পর্কে বলেছেন-‘১৯৪৭ পরবর্তীকালে যে ক’জন কবি এ দেশে গান লিখতে এগিয়ে আসেন মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান তাদের মধ্যে একজন। আমি তার বহু গান সুর করেছি এবং গানগুলো সুর ও কথা মিলিয়ে সার্থক সৃষ্টি হয়েছে।’
সঙ্গীতঙ্গ মোবারক হোসেন খান বলেছেন-‘প্রকৃতপক্ষে বলা যেতে পারে সমসাময়িক গীতিকবিদের মধ্যে তিনিই একমাত্র ব্যক্তিত্ব যিনি আধুনিক ও দেশাত্মবোধক গান লিখে গানের ভুবনকে সচল রেখেছেন।’
চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় সঙ্গীত পরিচালক সত্য সাহা বলেন- গীত রচনার ক্ষেত্রে বর্তমান অচলাবস্থা ও অবক্ষয়ের ক্ষণে যে দু-একজন মুষ্টিমেয় গীতিকার আজও আমাদের মনে আশার সঞ্চার করে কিছু প্রকৃত মূল্যবোধের গান রচনা করে যাচ্ছেন, ডক্টর মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান নিঃসন্দেহে তাদের মধ্যে অন্যতম বিশিষ্ট।
কবি আবু হেনা মোস্তফা কামালের উক্তি: বাংলাদেশের কবিদের মধ্যে মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান পঞ্চাশের দশকেই বেতারের চুক্তিবদ্ধ গীতিকার হিসেবে গান লিখতে শুরু করেন। এখানে বলে রাখা ভালো যে পুরনো কবিদের মধ্যে অনেকেই বেতারের চুক্তিবদ্ধ গীতিকার ছিলেন কিন্তু তারা গান লিখেছেন খুবই সামান্য এবং তাও বৈশিষ্ট্য-বির্বজিত বলে চোখে পড়ার মতো সৃষ্টি নয়। সেদিক থেকে মনিরুজ্জামানকে ব্যতিক্রমই বলতে হয়। তিনি অজস্র গান লিখেছেন। তার কবিতায় যে মিতবাক বুদ্ধিদীপ্ত পরিচ্ছন্নতা লক্ষণীয় কোনো কোনো গানে তার সার্থক সঞ্চার আছে। অর্থাৎ তার কবি-ব্যক্তিত্ব ঐসব গানে মোটামুটি স্পষ্ট।
এসব মন্তব্যের পরে উপসংহারে কবি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান সম্পর্কে আর কিছু বলার থাকে বলে মনে করির না। তবে একটি কথা-কবি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানকে ডক্টর কবি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলে সম্বোধন করা সমীচীন নয়। কবি ডক্টর হলে তার মান তো বাড়েই না বরং তার কবিকীর্তি সম্পর্কে সাধারণে সন্দেহের সৃষ্টি হলে অবাক হবার কিছু থাকবে না। কারণ কবির কর্ম নিয়ে বহুজন ডক্টর হয়; ডক্টর হয়ে কেউ ইচ্ছে করলেই কবি হতে পারে না। ডক্টর হয় অগুনতি; আর কবির সংখ্যা গুনতির মধ্যে। কবি মনিরুজ্জামান সেই তেমন একজন যিনি গুনতিতে থাকবেন, স্মরণে থাকবেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


