somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বৃষ্টির পরে ! (ছোট গল্প)

৩০ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ১২:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১।
বৃষ্টির পরের এই মুহূর্তটা যেন কেমন! প্রথম ঝাপটায় ধুলা ভরা বাতাসে সোঁদা মাটির গন্ধটা বেশ লাগে । তবে এই গন্ধটা অন্যরকম।বৃষ্টির বেশ খানিকটা পরে , ধুলো বিহীন বাতাস, ভেজা মাটি , ফেঁপে ওঠা গাছের বাকল ,কালচে আঁধারে সবুজ নীল পাতা আর কিছুটা বিব্রত পাখিদের সিক্ত ডানার গন্ধ মিলে কেমন একটা অপার্থিব অনুভূতি হয়। এই গন্ধকে বর্ননা করতে পারেনি কোন সাহিত্যিকের কলম।আঁচড়ে ধরতে পারেনি কোন তুলির কালো রঙ । কবিরাও এখানে স্তব্ধ । রাত্রি এই গন্ধকে বুকে ধারন করে প্রথম রজঃস্বলা কিশোরীর ভয় মিশ্রিত উত্তেজনার মত । কিংবা সন্তানহীনা কোন মায়ের আকুতির মত। কোন নববঁধুর আকুল বুকের ধুকপুকের মত । এক এক মুহূর্তে বুঝি এই গন্ধ বদলে যায় !

একটি ব্যাপারে বাবু নিশ্চিত । গন্ধ যার কাছে যেমনই লাগুক , এই গন্ধে ভয় ধরানো একটা ব্যাকুলতা আছে । স্মৃতি নামক হন্তারক চিতা দাউ দাউ আগুন নিয়ে তাড়া করে বাবুকে, এই রকম বৃষ্টির পরে! সেখানে একটু আগের ঝমঝমে জলের আগুন বিধ্বংসী কোন শীতলতা নেই। নেই কোন মেঘের আশ্রয় । কেবল বজ্রাহতের মত স্থির , অন্তরনাশী আগুনে পুড়ে অঙ্গার হওয়া !

২।

খামোখাই কিছুক্ষন মডেম , স্ক্যানার আর প্রিন্টার নিয়ে খুটখাট করে বাবু । আজকে ওর বাড়ি যেতে মন চাইছে । কিন্তু , বাইরে বৃষ্টি । ঝমঝম করতে না হলেও , ঝির ঝির করে কেঁদে চলেছে ।অনেকটা রাস্তার ভুলু কুত্তার মত । মালিকের মরার দুদিন আগে থেকে রাত ভর কাঁদতো কুত্তাটা । একটানা একঘেয়ে নাকি কান্না । শরাফত সাহেবের মড়া কবর চাপা পড়ার আগেই "বিশিষ্ট শরীফ" সন্তানরা এত বছরের প্রভুভক্ত দারোয়ানটিকে খেদিয়ে নিজেদের শরাফত বাড়িয়েছিলো ।বাবু বোঝে না , ভুলু কি তার মালিকের ভালোবাসা নাকি নিত্য খাদ্য আশ্রয়ের জায়গাটি হারানোর জন্য ছিলো এতটা ব্যথিত ?

গরীবের পেট মোচড় দিয়ে ওঠে । ১১টা বাজে , বাবুর খাওয়া হয় নাই । এই রাত বিরাতে , বৃষ্টি বাদলার মধ্যে কিছু পাওয়াও যাবে না। বিকেলে এনে রাখা বিস্কুট আর কলার দিকে চোখ পড়তে বাবুর মনটা বিদ্রোহ করে ওঠে । আগে না হয় টিউশনি করে পেট চালাতে হতো । তখন বাসি বন রুটি আর কলা , এই ছিলো বাবুর নাস্তা , লাঞ্চ , ডিনার । কিন্তু এখন তো বাবু ভালো চাকুরি করে । এখনো কেন ...................

৩।
বাবুর হঠাৎ কান্না পায় । অনুদির কথা মনে পড়ে । বাংলাদেশে নিম্ন মধ্যবিত্ত নারীদের আল্লাহ মনে হয় বিশেষ কোন ক্ষমতা দিয়ে পাঠান । টিউশনি শেষ করে কোন কোন দিন দিদির কাছে যেতে যেতে রাত ১২টা , ১টা বেজে যেত । উনি রাত একটার সময় কোন জাদুমন্ত্র বলে ১০ মিনিটের মধ্যে ধোঁয়া ওঠা ভাত আর একটা ডিম ভাজি , না হলে পিয়াজ মরিচ দিয়ে ডাল এনে হাজির করতেন , সে একমাত্র দিদিই জানে । আর জানে দিদির আল্লাহ। বাবুর ভালো লাগে বলে , একটা মাটির হাড়ি জোগাড় করে দিদি লেবু গাছ লাগিয়েছিলেন । যেদিন প্রথম লেবু পাড়া হলো , সেদিন ডাল , ডিমভাজি , আলুভর্তা , চানাচুর আর লেবু , এই দিয়ে ফিস্ট হলো । ডালের সাথে চানাচুর নাকি অমৃত – এইটা দিদির আবিষ্কার । এই লক্ষ্মী দিদিটা কাজ পেল না, টুপ করে মরে গেলো । বিয়ে করেছিলো যেই বদমাশটাকে , সেইটা নাকি ড্রাগ খেতো । গয়না গাটি সব শেষ করে যেই রাতে স্বামীটা একটা লোক এনে ঘরে ঢুকালো , অনেক চেঁচামেচি –কান্নাকাটির পরে ঐ ভোরেই দিদিকে পাওয়া গেলো সিলিং এ । বাবুর আর গরম ভাত খাওয়ার জায়গা রইলো না।

৪।
বাবু চাকরী নিয়ে চলে এসেছে এই শহরে । মার জন্য মন খারাপ হলেও উপায় ছিলো না। ঢাকায় থাকার অনেক হ্যাপা ।এত খরচ তো ওঠে না টিউশনিতে । পাড়াত মামা এই কাজটার খোঁজ দিলে বাবু এক মুহূর্ত দেরী করেনি ।
"ছোট চাকুরী হলেও , দেখিস বাবু , নাম আর টাকা দুটাই কামাতে পাবি । খালি একটু চোখ কান খোলা রেখে লেগে থাকিস ।"
মামার কথা ভুল হয়নি । মাত্র ২ বছরেই বাবুর প্রোমোশন হয়েছে । আছে লোকাল বসের সাথে বিশেষ খাতির ।

ভালোই আছে বাবু । তিন বেলা খাওয়া । সারাদিন রাত কাজ নিয়ে থাকা। মাঝে মাঝে গান শুনতে শুনতে সিগারেটে সুখটান দেওয়া । আগে নাসির খেত , এখন বেনসন। মোবাইল কিনেছে । সপ্তাহে দুই একটা কার্ড সে এমনি গল্প করেই খরচ করতে পারে । আর কি চাই!

৫।

শুধু এই বৃষ্টিটাই ঝামেলা করে । মাঝে মাঝেই উদ্ভ্রান্ত করে দেয় বাবুকে । রাধার কথা মনে করিয়ে দেয় । রাধা আসলেই ওর নামের মত ছিলো । উজাড় করে ভালোবাসা ছাড়া এই নারীর আর কোন কাজ ছিলো বলে মনে হয় না। বাবুর মত চাল চুলোহীন ছেলের মধ্যে ও কি পেল কে জানে ! মোবাইল ফোনে রাতের পর রাত কথা । আস্তে আস্তে বন্ধুত্ব । শেষ কুরিয়ারে গিফট পাঠানো । এস এম এস । বাবুর দিন গুলো কেমন একটা পৌরাণিক কাহিনীর মত মাতাল সুন্দর করে দিয়েছিলো । বাবু কোন দিন বলেনি ভালোবাসি । মাথার ওপর থেকে বাবার ছায়া আর হাতটা সরে গেলে কাউকে ভালোবাসি বলার ক্ষমতাটাও বুঝি লোপ পেয়ে যায় ।

রাধাও বলেনি কখনো । কিন্তু বাবু টের পেতো ।লুকিয়ে লুকিয়ে কুর আন পড়ার গল্প করলে , বাবুর বুকের ভিতর পঞ্চ পান্ডবের দামামা বেজে উঠেছিলো । মেয়ে তুমি কার জন্য মুসলমান হতে চাও !

৬।

ফোনটা এসেছিলো ভোরে । সারারাত ঝড়ের দাপাদাপিতে কম্পিউটার, ইন্টারনেট, সার্ভার - সব তাল পাকালে সেই সর্বনাশ সামাল দিয়ে বাবু মোটে তখন ঘুমের রাজ্যে হাটি হাটি পা পা । রাধার কন্ঠ শুনে , বাবু বিশ্বাস করতে পারছিলো না ।
"আমি তোমার কাছে চলে এসেছি ।"
"মানে?"
রাধা আর কিছু বলতে পারেনি। বাবু সব শুনে বাস স্টেশন পর্যন্ত যাওয়ার সাহসই করতে পারেনি । কি করতে হবে, সেটা ওর জানাই ছিলো । এই সব সিনেমাটিক প্রেম-ভালোবাসা বাবুদের মত ছেলেদের মানায় না। বাবুদের মা'দের কথা ভাবতে হয় । সমাজকে তোষন করে চাকরী টিকিয়ে রাখতে হয় । স্রোতের বিপরীতে চলে সমাজ পরিবর্তন বা বিপ্লবের স্বপ্ন দেখলে চলে না। মা হার্ট ফেল করবে, যদি এরকম কিছু শোনে।

৭।

রাধা ফিরে গিয়েছিলো । যে বন্ধু বাসে তুলে দিয়েছিলো , সে বলেছিলো , রাধা নাকি একটুও কাঁদেনি । শুধু মাথা নিচু করেছিলো । চিবুক বুকে ঠেকিয়েও সে বুঝি লুকাতে পারছিলো না তার অপমান, প্রেমের অপমান । বাবু আর ফোন ধরেনি কখনো ।খোঁজও নেয়নি রাধার । নো নিউজ ইজ গুড নিউজ । এই হলো বাবুর নীতি ।

বাবু গান ছাড়ে । কম্পিউটারে র‌্যান্ডম সিলেক্ট হয় কোন একটা গান। হঠাৎ বদ্ধ ঘরে বাবুর সমস্ত অস্তিত্ব কেঁপে ওঠে । গানটা ভারতের গায়িকা শ্রীরাধার ,
" বাঁশিটার একটাই দোষ বলে রাধা রাধা
বোঝে না সে রীতি নীতি চেনে নাত বাধা

রাধা মানে ভালোবাসা রাধা মানে প্রান
এ কথাই বাঁশী জানে তাই অভিমান ..........."

হঠাৎই বাবুর কল্পনায় রাধার বৃষ্টি সজল চোখ দুটি ভেসে ওঠে । বাবুর আর কিছু ভাবতে ইচ্ছে করে না। অফিসের দরজা টেনে সে বেরিয়ে পড়ে রাতের আঁধারে। তার নিজের চোখেও কি যেন জ্বালা ধরায় । অনেক দিনের খরার পরে আজ ভেতরে বুঝি প্লাবন জাগে । বাহিরের অনেক , অনেক বৃষ্টির পরে !
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ রাত ১০:২১
২৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ভারত কেন মক্কা চুক্তি নিয়ে শ্বাসকষ্টে ভুগছে?

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২৭ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:২৭


সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে চলতি মাসে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি যা মক্কা চুক্তি নামে পরিচিত। সবেমাত্র এতে বাংলাদেশকে যুক্ত করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। যা এখনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডানপন্থীদের তোয়াজ বা মক্কা প্যাক্টে ঢোকার আগ্রহ দ্রুতই বুমেরাং হতে পারে বিএনপি সরকারের জন্য

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ২৭ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৮



জামাত-এনসিপিকে 'বিরোধী দল হিসেবে' হাতে রাখতে বা আওয়ামী লীগের ফিরে আসাকে ঠেকাতে জামাত-এনসিপি বা এদের মতো ডা*নপন্থীদের দাবি-দাওয়াকে খুব বেশি প্রাধান্য দিলে সেটা বুমেরাং হয়ে দেখা দেবে বিএনপি সরকারের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মক্কাহ চুক্তি কি ?

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৭ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৪৯



মক্কাহ চুক্তি লেখা হয়েছে আরবি ভাষায়। বাংলাদেশের পত্র পত্রিকা - পূর্ণাঙ্গ “মক্কাহ চুক্তি” বাংলা অনুবাদ করে প্রকাশ করছে না কেনো ? দেশের মানুষ কিভাবে জানবে এই চুক্তিতে কি লেখা... ...বাকিটুকু পড়ুন

চিঠির সঙ্গে আমার এক অন্যরকম সম্পর্ক

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২৮ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৭:৫৩



চিঠির সঙ্গে আমার এক অন্যরকম সম্পর্ক

উনি আমাদের ভবেরচর পোস্ট অফিসের পোস্টমাস্টার। অত্যন্ত ভালো মনের একজন মানুষ। তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়টা শুধু পোস্ট অফিসের প্রয়োজনের কারণে নয়; বরং দীর্ঘদিনের এক আন্তরিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

নীরব আত্মপক্ষ।

লিখেছেন রাজা সরকার, ২৮ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:৪০

নীরব আত্মপক্ষ।

স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র আন্দোলনের মাসুল বাঙালি হিন্দুকে গুণে গুণে দিতে হয়েছিল ব্রিটিশকে । বাকিটা মুসলিম লীগ ও নেহেরুইয়ান কংগ্রেস মিলে যা করার করে গেছে। এবং পরবর্তীকাল থেকে মুসলিম... ...বাকিটুকু পড়ুন

×