
চিঠির সঙ্গে আমার এক অন্যরকম সম্পর্ক
উনি আমাদের ভবেরচর পোস্ট অফিসের পোস্টমাস্টার। অত্যন্ত ভালো মনের একজন মানুষ। তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়টা শুধু পোস্ট অফিসের প্রয়োজনের কারণে নয়; বরং দীর্ঘদিনের এক আন্তরিক সম্পর্কের গল্পও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
একসময় চাকরির আবেদন মানেই ছিল পোস্ট অফিস। তখন চাকরির আবেদনপত্র, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ছবি খামে ভরে ডাকযোগে পাঠাতে হতো। আমি নিজেও একসময় প্রচুর চাকরিতে আবেদন করেছি। ভবেরচর পোস্ট অফিস থেকে অসংখ্য চাকরির আবেদন পাঠিয়েছি। আবার সেই পোস্ট অফিসের মাধ্যমেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ইন্টারভিউ কার্ডও হাতে পেয়েছি।
কিন্তু সময় বদলেছে। এখন প্রায় সব চাকরির আবেদনই অনলাইনে করা যায়। ফলে চাকরির আবেদন পাঠানোর ক্ষেত্রে পোস্ট অফিসের সেই আগের ব্যস্ততা আর নেই। একসময় যে পোস্ট অফিসে চাকরিপ্রার্থীদের ভিড় থাকত, প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রয়োজন অনেকটাই কমে গেছে।
তবুও আমার কাছে পোস্ট অফিসের গুরুত্ব একটুও কমেনি।
কারণ, আমি এখনো চিঠি লিখি।
সেদিনও জিপিও থেকে কয়েকটি হলুদ খাম এনেছি। মনে পড়ে গেল, এই খামের দাম একসময় ছিল মাত্র ২ টাকা। মাঝখানে ৩ টাকা হয়েছিল, আর এখন দাম বেড়ে ৫ টাকা। দাম বেড়েছে, কিন্তু খামের মান দেখে মনে হলো—আগের সেই কাগজই যেন রয়ে গেছে! ভাবছিলাম, দাম যখন এত বেড়েছে, হয়তো উন্নত কোনো উপকরণ দিয়ে নতুন ধরনের কাগজ তৈরি করে খাম বানানো হয়েছে। কিন্তু তেমন পরিবর্তন চোখে পড়ল না।
চিঠি লেখার অভ্যাসটা আমার অনেক পুরোনো।
আমি শুধু নিজের প্রয়োজনে চিঠি লিখি না। যেখানেই থাকি, সেখান থেকেই পরিচিত মানুষদের চিঠি লিখি। সমাজের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে একসময় মন্ত্রীদের চিঠি লিখেছি, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চিঠি লিখেছি। কোনো সমস্যাকে সামনে থেকে দেখলে মনে হয়েছে, বিষয়টি কারও কাছে জানানো দরকার—তখন চিঠিই ছিল আমার অন্যতম মাধ্যম।
আমার আব্বুর চাকরির সুবাদে জীবনের বিভিন্ন সময়ে দেশের নানা জায়গায় ঘুরেছি। সেই সূত্রে অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, কারও কারও সঙ্গে তৈরি হয়েছে আন্তরিক সম্পর্ক। দূরত্ব তৈরি হলেও সম্পর্কগুলো হারিয়ে যায়নি। তাদের অনেককেই বছরে অন্তত দুবার চিঠি লিখি।
হয়তো এখন মোবাইল ফোন আছে, ফেসবুক আছে, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ই-মেইল—কত দ্রুত যোগাযোগের মাধ্যম আমাদের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। একটি বার্তা পাঠালে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পৃথিবীর অন্য প্রান্তে পৌঁছে যায়।
তারপরও হাতে লেখা একটি চিঠির অনুভূতি যেন আলাদা।
একটি চিঠির কাগজে থাকে হাতের স্পর্শ, অপেক্ষার গল্প, ব্যক্তিগত অনুভূতি এবং অনেক না-বলা কথা। চিঠি লিখতে বসলে মানুষ একটু ধীর হয়, একটু বেশি ভাবে, শব্দ বেছে নেয়। আর সেই চিঠি যখন প্রাপকের হাতে পৌঁছায়, তখন শুধু একটি বার্তা পৌঁছায় না—পৌঁছে যায় একজন মানুষের অনুভূতিও।
আর মজার বিষয় হলো, পোস্ট অফিসও কিন্তু থেমে নেই। সময়ের সঙ্গে তারাও ডিজিটাল হয়েছে। এখন চিঠি বা ডাকের সঙ্গে বারকোড/ট্র্যাকিং ব্যবস্থা থাকে। অনলাইনে বসেই সেই ডাকের অবস্থান জানা যায়। অর্থাৎ চিঠির আবেগটা পুরোনো হলেও, চিঠি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাটি আধুনিক হয়েছে।
ভবেরচর পোস্ট অফিসের পোস্টমাস্টারের সঙ্গে আমার সম্পর্কটাও এই চিঠির গল্পের একটি অংশ। আমার কথা বলার ধরন দিয়ে হয়তো মানুষকে খুব সহজেই আপন করে নিতে পারি। সেই সুবাদে তাঁর সঙ্গেও একটা সুন্দর আন্তরিকতা তৈরি হয়েছে। এমনকি ২০১৯ সালের কুরবানির ঈদে তাঁর বাড়িতেও গিয়েছিলাম।
সময়ের সঙ্গে চাকরির আবেদন পোস্ট অফিস থেকে অনলাইনে চলে গেছে, চিঠির ব্যবহার কমেছে, ডাকঘরের ব্যস্ততাও আগের মতো নেই। কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের আন্তরিকতা তো অনলাইনে পুরোপুরি তৈরি হয় না।
তাই প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক, আমি চিঠি লেখা বন্ধ করতে চাই না।
হয়তো একদিন চিঠি আরও দুর্লভ হয়ে যাবে। হয়তো তখন হাতে লেখা একটি চিঠিই হয়ে উঠবে অতীতের কোনো সুন্দর স্মৃতি।
আর আমি তখনও হয়তো কোনো এক হলুদ খামে করে লিখে যাব—
“প্রিয় মানুষ, কেমন আছেন?”
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৭:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



