
(পদ্মানদীর মাঝী উপন্যাসের মূল চরিত্র ও প্রেক্ষাপট অবলম্বনে ২০২৬ সালের এক কল্পিত উত্তরকথা)
পদ্মা আর মেঘনার যেখানে বিয়ে হয়েছে, সেখান থেকে আরও গভীরে, বঙ্গোপসাগরের নোনা মোহনায় জেগে থাকা সেই দ্বীপের নাম ময়নাদ্বীপ।
তেতাল্লিশ বছর আগে হোসেন মিয়া যখন কুবেরকে এখানে নিয়ে এসেছিল, তখন এটি ছিল জল, জঙ্গল আর মশার এক হিংস্র রাজত্ব। ২০২৬ সালে এসে ময়নাদ্বীপ বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি তার মাটির খাঁজ আর মানুষের পেটের জঠরজ্বালা।
দ্বীপে কাঠের নৌকোর সাথে যুক্ত হয়েছে ডিজেল ইঞ্জিন। সস্তা চীনা সৌরবিদ্যুতের আলোর নিচে ভিড় জমায় মানুষ। কিন্তু জোয়ারের পানি এখন আগের চেয়ে অনেক উঁচুতে ওঠে। জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় সাগরের লোনা ফেনা ভাঙতে শুরু করেছে মানুষের ভিটেমাটি।
কুবের মাঝির বয়স এখন আশি পার হয়েছে। পিঠের চামড়া শুঁটকি মাছের মতো টানটান ও কালচে। চোখ দুটো ঘোলাটে—যেন সারা জীবনের দেখা কালবৈশাখী আর পদ্মার ঘূর্ণির চিহ্ন জমে আছে সেখানে।
বিকেলের রক্তিম আলোয় কুবের তালপাতার মাচায় বসে জাল মেরামত করছিল। তার কোলঘেঁষে বসে সুপারি চিবোচ্ছিল কপিলা। কপিলার মাথার চুল এখন ধবধবে সাদা কাশফুল, কিন্তু চোখের সেই মিটিমিটি বাঁকা দৃষ্টি আর ঠোঁটের হাসিটুকু এখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি।
কপিলা কুবেরের হাতের রগ-ওঠা আঙুলগুলোর দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল, "ও মাঝির পো, অত কী ভাবো? নদীর দিকে অমন কইরা চায়া থাকলে কি গহিন গাঙের মাছ জালে উঠব?"
কুবের জালের কাঠিটা শক্ত করে চেপে ধরে থুতু ফেলল। "মাছ উঠব না জানিরে কপিলা। আমি ভাবতাছি সাগরের কথা। একসময় এই জলে আমি খালি হাতে বৈঠা চালাইছি। আর এখন জলের ওপর লোহার প্রকাণ্ড জাহাজ চলে। এই জল আর আগের মতো নাই।"
কপিলা একটা সুপারি মুখে পুরে কুবেরের দিকে তাকাল। "তুমি সারাজীবন সাগরেরে বুঝছ মাঝি। কিন্তু সময় তো আর এক জায়গায় খাড়া অয়া নাই। জল বাড়তাছে, মানুষ বাড়তাছে, গাঙে মাছ কমতাছে। এখন শুধু কাঠের নৌকা আর পটের জাল দিয়া কতদিন পেট চলব, কবা?"
কুবের স্তব্ধ হয়ে কপিলার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কপিলার এই চরম সত্য কথাটা তার আশি বছরের পুরোনো হিসাবকে একমুহূর্তে নাড়িয়ে দিল।
হোসেন মিয়ার নাতি, বাইশ বছরের তরুণ কবির মিয়া যখন মাইক ফুঁকে দ্বীপে নতুন প্রকল্পের কথা ঘোষণা করছিল, তখন কুবের মাচায় বসে সব শুনছিল।
কবির মিয়া সস্তা ভিলেন নয়। সে ইউরোপের একটি পরিবেশ সংস্থার সহযোগিতায় ময়নাদ্বীপে 'ইকো-রিসোর্ট' আর 'ব্লু-ইকোনমি প্রজেক্ট' আনতে চায়। কবিরের যুক্তি খাঁটি এবং বাস্তববাদী।
সে কুবেরের কাছে এসে হাঁটু গেড়ে বসল। "দাদু, সাগরে এখন আর আগের মতো মাছ নেই। বড় বড় আন্তর্জাতিক মাছ-ধরা জাহাজগুলো সব ছেঁকে নিয়ে যাচ্ছে। সারাজীবন জাল বুনে কি তোমাদের মতো আমাদেরও পেট চালাবে? আমার ছোট ভাইবোনেরা কি সারা জীবন এই কাদাজলে ভেসে থাকবে? রিসোর্ট আর সরকারি প্রজেক্ট এলে দ্বীপের মানুষ কাজ পাবে, পাকা ছাদ পাবে।"
কুবের তার ঘোলাটে চোখ দুটি কবিরের দিকে ফেরাল।
"তোর কথা মিথ্যা না রে কবির," কুবেরের গলায় কোনো রাগ ছিল না, ছিল গভীর এক হাহাকার। "কিন্তু ওই কোম্পানির সায়েবরা যে কয় 'আমরা ময়নাদ্বীপের পরিবেশ বাঁচাইতে আসছি', ওটা কথার কথা। তারা আমাগো মাটির তলায় পাথর বসাইব, কিনারায় বাউন্ডারি দেব। তারপর একদিন দেখবি, কিনারায় মাছ ধরতে গেলে ওই সায়েবদের সিপাহিরা তোরেই চোর কইরা তাড়ায়া দেবে। নিজের ভিটায় মানুষ পর অয়া যাইব।"
কবির মিয়া চুপ হয়ে গেল। সে কুবেরের কথায় পুরোপুরি সায় দিতে না পারলেও, বুকের ভেতর একটা সূক্ষ্ম আশঙ্কার কাঁপন টের পেল।
২০২৬ সালের অক্টোবর। বঙ্গোপসাগরে জন্ম নিল এক তীব্র ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়।
স্যাটেলাইট ওয়েদার অ্যালার্টে দেখা গেল, ঝড়ের গতিবেগ ঘণ্টায় দুইশো কিলোমিটার ছাড়িয়ে যাচ্ছে। কবির মিয়া তার স্যাটেলাইট রেডিও আর ফোনের ডেটা দেখে দ্বীপে প্রথম বিপদের সংকেত দিল।
"দাদু! দুই ঘণ্টার মধ্যে দশ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাস আসবে! সাইক্লোন সেন্টারে সবাইকে সরাতে হবে!" কবির চিৎকার করে উঠল।
কিন্তু সমস্যা হলো, সরকারি যে আধুনিক সাইক্লোন শেল্টারটি কোম্পানির অর্থায়নে তৈরি করা হয়েছিল, তা ছিল উত্তরের নিচু কাদামাটির অঞ্চলে।
কুবের ধীরপায়ে বাতাসের গন্ধ শুঁকল। সাগরের গন্ধ আর মেঘের ঘন গাঢ় নীল রং দেখে কুবেরের বহু বছরের অভিজ্ঞ মন কেঁপে উঠল।
"না কবির!" কুবের গর্জে উঠল। "কোম্পানির ওই পাকা দালানের ভিত্তি দুর্বল! দক্ষিণের নতুন ভেড়িবাঁধ ভাঙব আগে। ওদিকে বাতাস ঘুরলে পানির তোড়ে ওই দালান মাটির সাথে মিশ্যা যাইব! মানুষকে উত্তরের উঁচু টিলা আর পুরোনো তালগাছের ভিটায় সরাইতে হইব!"
কবিরের এনভায়রনমেন্টাল ডেটা বলছিল এক কথা, আর কুবেরের আট দশকের রক্তের অভিজ্ঞতা বলছিল অন্য কথা।
ঠিক তখনই আঘাত হানল ঝড়।
বাতাসের বিকট শব্দে ভেঙে পড়ল সোলার প্যানেল, উপড়ে গেল স্যাটেলাইট টাওয়ার। মুহূর্তের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। আধুনিক প্রযুক্তির সিগন্যালগুলো অন্ধ হয়ে গেল।
কিন্তু কবিরের কাছে ছিল আধুনিক স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া শেষ জিপিএস ম্যাপ, যা দিয়ে সে কুয়াশা আর ঘোর অন্ধকারের মধ্যেও দ্বীপের ভেতরের নিচু ড্রেনেজ রুটগুলো চিহ্নিত করতে পারছিল। আর কুবেরের কাছে ছিল কোন মাটির সহ্যক্ষমতা কতটুকু, এবং বাতাসের গতি বদলালে পানি কোন দিকে ঘুরবে—তার এক নিখুঁত ঐতিহাসিক মানচিত্র।
কবির আর কুবের মুখোমুখি দাঁড়াল না; তারা এক হয়ে গেল।
"কবির! তোর ওই ফোনের আলো আর ম্যাপ দেখা!" কুবের চিৎকার করে বলল। "তুই পথ দেখা, আর আমি জল ঠেকানোর জায়গা খুঁজি!"
ঝড়ের রাতে সাগরের নোনা পানি যখন বাঁধ ডিঙিয়ে দ্বীপে ঢুকছিল, তখন কবিরের ডিজিটাল লোকেশন গাইডেন্স আর কুবেরের আদিম অভিজ্ঞতার জোড়াতালিতে তৈরি হলো এক অভূতপূর্ব উদ্ধার অভিযান। কুবের, কবির আর কুবেরের ছেলে পদ্মা—তিন পুরুষ মিলে প্রায় দেড়শো মানুষকে নিয়ে আশ্রয় নিল দক্ষিণের সেই শক্ত পাথুরে টিলায়।
সারা রাত ধরে চলল সাগরের নোনা জল আর মানুষের নিঃশ্বাসের লড়াই।
পরদিন ভোরের শান্ত রোদ ফুটল।
ঝড় থেমেছে। ময়নাদ্বীপের আধুনিক ইকো-রিসোর্টের মেটালিক অবকাঠামো আর কোম্পানির বাউন্ডারি দেয়াল গুঁড়িয়ে ছাতু হয়ে গেছে। কিন্তু কুবের আর কবিরের বুদ্ধিতে টিলায় আশ্রয় নেওয়া দ্বীপের একটি মানুষের প্রাণও যায়নি।
কবির ভাঙা সোলার প্যানেলটার পাশে হাঁটু গেড়ে বসেছিল। তার শত কোটি টাকার স্পনসরশিপের স্বপ্ন এখন ধ্বংসস্তূপ।
কবির কুবেরের দিকে তাকিয়ে চোখ মোছাল। "দাদু... সব শেষ হয়ে গেল। কোম্পানি আর ফান্ডের টাকা দেবে না। ময়নাদ্বীপ কি আর টিকবে?"
কুবের লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়াল। তার পাশে এসে দাঁড়াল কপিলা।
কপিলার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে কুবের সাগরের শান্ত বহমান জলের দিকে তাকাল। যে জলে কুবের একসময় রক্ত আর ঘাম ঝরিয়েছে, যে জল তাকে সব দিয়েছে আবার সবকিছু কেড়েও নিয়েছে।
"দ্বীপ টিকব কি না জানি না রে কবির," কুবেরের কণ্ঠে সেই মহাজাগতিক ও নির্মম সত্যতা ভেসে উঠল। "কোম্পানির লোহার ছাদ ভাইঙা গেছে, তোর কম্পিউটারের সিগন্যাল নিভ্যা গেছে। কিন্তু মানুষগুলা তো জিন্দা আছে? কুবের-কপিলারা যতদিন বাঁচার লাইগা যুদ্ধ করব, মানুষ আবার এই মাটিত ঘর তুলব।"
কপিলা কুবেরের কাঁধে হাত রাখল। সেই চিরচেনা মিটিমিটি বাঁকা হাসিটা হেসে বলল, "হায় রে কুবের! মাঝির পো আবার গাঙে নাও ভাসাইবা তো?"
কুবের এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাসল।
পদ্মা নদীর ঢেউগুলো বঙ্গোপসাগরের সাথে মিশে ময়নাদ্বীপের তটে আছড়ে পড়ছে। সময় বদলে ২০২৬ হয়েছে, জলবায়ুর রূপ বদলেছে, ক্ষমতার হাত বদল হয়েছে—কিন্তু প্রকৃতির নিষ্ঠুরতার সামনে মানুষের বেঁচে থাকার জেদ, পারস্পরিক নির্ভরতা আর সেই মাংস-রক্তের সংগ্রাম এতটুকু বদলায়নি।
কুবের আর কবির—দুই প্রজন্মের দুই পথিকের হাত ধরে ময়নাদ্বীপের মানুষের নতুন দিনের যাত্রা শুরু হলো।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



