somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার বাবার জবানবন্দি

০৬ ই জানুয়ারি, ২০১০ বিকাল ৫:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার নাম হাজী আব্দুল গণি। বয়স প্রায় ষাটের কাছাকাছি।এই বয়সে এসে বিভিন্ন রকম রোগে আক্রন্ত হয়েছি। আমার সারাজীবন দুশ্চিন্তা এক মিনিটের জন্যও আমাকে ছাড়েনি। আমার দুই ছেলে তিন মেয়ে।
মেয়ে তিনটার গ্রামে বিয়ে দিয়েছি। ছেলে দুইটা ঢাকায় চাকরি করে।
বড় ছেলেটিও বিয়ে করেছে ঢাকায়। ছোট ছেলেটি এখনো বিয়ে করেনি।
এখন গ্রামে শুধু আমি আর আমার স্ত্রী ছাড়া বলতে গেলে কেউ থাকেনা।
আজন্ম পরিশ্রমি মানুষ আমি। আমার বাবার যখন মৃত্যু হয় তখন বলতে গেলে শুধু ছোট শনের ঘরটা ছাড়া যেখানে হালিখানেক মানুষ শুতে পারে। এটা ছাড়া আর কিছুই দিয়ে যায়নি। আমরা ছিলাম পাঁচভাই। বাকী চারভাইয়ের মধ্যে দুইভাই মুক্তিযুদ্ধে হারিয়ে যায়। হারিয়ে যায় বলছি এ কারণে এই দুইভাইয়ের এখনো কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। শৈশব ও কৈশোরে চরম দারিদ্রের রূপ আমরা দেখেছি।
আমরা সবসময় সবকিছুর ধ্বংশ চাইতাম। দ্রুত কিয়ামত কামনা করতাম। কারণ দেখতে পেতাম সিকদার মুহাম্মদের জৌলুস। এলাকার সমস্ত জমিজমা বলতে গেলে তাদের ছিল। বাকীরা ছিল ক্রীতদাসের মতো। সিকদার বাড়ীর দাপটে এলাকায় কেউ কিছু করতে পারতোনা। সিকদার বাড়ীর প্রায় লোকজনের চেহারা সুন্দর। ওরা দাবি করতো ওরা আরব থেকে এসেছে। ওরা মুহাম্মদের বংশধর।
ওদের মধ্যে দুই শ্রেণির মানুষ ছিল। এক শ্রেণির মানুষরা ধর্ম কর্ম করতো। অন্য এক শ্রেণী ছিল যারা এলাকার মানুষদের নিপীড়ন করতো। অত্যচারিদের ভীড়ে ভালমানুষদের ভালমানুষী চোখে পড়তোনা বললেই চলে।
আমার কৈশোরেই আমার বড় দুইভাই পাহাড়ে কাজ করতে গিয়ে কালাজ্বরে মারা যায় একের পর এক। আমার একটা অদ্ভুদ ভয় ছিল আমি দূরে কোথাও যেতাম না কাজ করতে। এই ভয় আমার মা আমার ভেতর ঢুকিয়ে দিয়েছিল। তিনি বলতেন তিনি স্বপ্ন দেখেছেন এক আউলিয়া বলেছেন যেন আমি দূরে কোথাও কাজ করতে না যাই। গেলে নাকি আমি আর ফিরে আসবোনা। মাই ছিল আমার একমাত্র মুরুব্বি । ফলে মায়ের কথা মতো আমি আর কোথাও যেতাম না। আমার ছোট দুইভাই একেবারে পিটেপিটি ছিল। দুই জনই দু:খকে চরম ভয় পেত। এবং অসুখি আর প্রতিবাদি ছিল। পাকিস্তান আমলে যখন সিকদারবাড়ীর অত্যাচার আর ক্ষমতা চরমে। তখন সিকদার বাড়ী বিরোধী একটা মনোভাব গড়ে উঠে এলাকার দরিদ্র মানুষদের ভেতর। আমার দুইভাই ও ফুসতে থাকে সেই আগুনে। আমাদের এলাকায় তেমন ভাবে যুদ্ধ না হওয়া সত্বেও একদল যুবক পাশ্ববতী জেলায় যেখানে যুদ্ধ হচ্ছিল সেখানে রওয়ানা দিয়েছিল। যুদ্ধের মাঝামাঝি অথবা যুদ্ধ শেষে অনেকে ফিরে এসেছে কিন্তু আমার দুই ভাই আর ফিরে আসে নি। তাদের লাশও কোথাও পাওয়া যায় নি। সে জন্য আমি তাদের শহীদ না বলে বলছি হারিয়ে গেছে।
আমার পুরো জীবনে আমি কখনো অবসর বা বিশ্রাম করিনি। আমি ভেবেছিলাম দু:খই যখন বহন করতে হবে। তাহলে পরিশ্রম থামিয়ে লাভ কি। সেই পরিশ্রমের ফসল আমি পেয়েছিলাম। সুযোগ না পাওয়ার কারণে আমি লেখাপড়া শিখতে পারিনি। কিন্তু টাকা আমি করেছিলাম। স্বচ্ছলতা পেরিয়ে আরো বহুকিছু আমি অর্জন করেছিলাম। সম্মান আর আভিজাত্যে আমি সিকদার বাড়ীর লোকদেরকেও অতিক্রম করে গিয়েছিলাম। এলাকার সব স্কুলে, মসজিদে, মাদ্রাসায়, আমাকে সভাপতি করা হয়েছিল। উপজেলার সব ক্ষমতাবান মানুষদের মধ্যে আমি স্থান করে নিয়েছিলাম। এমনকি পুরা জেলায় আমার নাম ছড়িয়ে পড়েছিল একজন দানশীল, ধনী, সৎ মানুষ হিসাবে। এলাকার দরিদ্র লোকজনকে আমি কখনোই ফিরিয়ে দিইনি।
যতদিন আমর ছিল। কিন্তু আমার একটা জিনিস ছিলনা সেটা হল লোকবল। আমি একলা মানুষ কতদিক দিয়ে সামলাতে পারি। বড় ছেলেটা ছিল সাংঘাতিক রকমের পড়ুয়া। এই অভ্যাস সে কোথায় পেয়েছিল আমি জানিনা। তাকে আমি প্রচণ্ড ভালবাসতাম আর সে আমাকে সবচাইতে বেশী দুখ দিয়েছিল। সে যখন যতটাকা চেয়েছে আমার ব্যবসা কেন্দ্রে বলে দেয়া ছিল তারা যেন তাকে টাকা দেয়। সে শুধু ঘুরে বেড়াতো আর বই কিনত। ক্লাসের বই হলে একটা কথা ছিল । সে ক্লাসের বই পড়তো না বললেই চলে। এমনকি বই কিনার জন্য সে কলকাতা পর্যন্ত চলে যেত। অচিরেই আমি দেখলাম বড়ছেলের ঘরটা একটা বইয়ের গুদাম ঘরে পরিণত হয়েছে। এবং আমরা তাকে হারিয়ে ফেললাম। আমি একদিন তার অনুপস্থিতিতে তার ঘরে ঢুকে হতভম্ব হয়ে গেলাম। পড়ার টেবিলে, বিছানায়, বাশের বই রাখার সেলফে, রুমের সানসেটে বই আর বই। সত্য কথা বলতে কি আমি ভয় পেলাম। আমি মুরুক্কু মানুষ। নিজের নাম ছাড়া বলতে গেলে কিছুই লিখতে পারিনা। যা পড়তে পারি সামান্য। কয়েকটা বই উল্টে পাল্টে দেখলাম। সবই গল্পের বই বলে মনে হলো। আমার মেজাজ চরম খারাপ হয়ে গেলো। স্কুলে যায়না ঠিক মতো, বাড়ীর শিক্ষকের কাছে পড়তে বসেনা, অদ্ভুদ এক পদ্ধতিতে সে বেড়ে উঠছে।
রুমে একবার ঢুকলে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাবেনা। প্রায় সারারাত জেগে জেগে বই পড়ে। দিনের অর্ধেক সময় ঘুমিয়ে কাটায়। আমার সাথে কথা বলে না বললেই হয়।
সেটারও একটু ইতিহাস আছে। আমাদের গ্রাম এলাকায় একটা কথা আছে। ছেলেপিলে মানুষ করতে চাও, সবসময় বেত তৈরী রাখো।
আমি ছেলেমেয়েদের তেমন একটা সময় দিতে পারতাম না। একা মানুষ ব্যবসা বড় হয়ে গেছে। কিন্তু তাদের কোনো অভাবও রাখিনি। খাতা কলম কেনার জন্য একটা দোকানে বলে দেয়া আছে। পোষাক কেনার জন্যও নির্দিষ্ট দোকান আছে। বাড়ীর ট্রলার থেকেই খাবার জন্য মাছ আসে। বাড়ীতে শিক্ষক রাখা আছে। কিন্তু এর মধ্যে যখন অনিয়ম দেখি তখন আমার মেজাজ ঠিক থাকেনা। এমনিতে ব্যবসা সংক্রান্ত হাজারো সমস্যা। এরকমই একটা ঘঠনা ঘঠে একদিন। ছেলেমেয়েদের জন্য যে দোকানটা ঠিক করে দেয়া হয়েছিল সেটা থেকে না নিয়ে আমার শত্রু ভাবাপন্ন একটা দোকান থেকে বড় ছেলে মুজাহিদ অনেক টাকা বাকী করেছে। শুনে আমার মাথা খারাপ হয়ে যাবার অবস্থা। রাগারাগি আমাদের জন্মগত। বাবাকে দেখেছি মাকে রেগে গেলে হাতের কাছে যা পায় তা দিয়ে মারতে। আমরাও বাবার হাতে প্রচুর মার খেয়েছি। পালোয়ান সাইজের মানুষ ছিলেন। তার ওপর মদ খেতেন নিয়মিত। ভয়াবহ রকম ভয়ংকর হয়ে বাড়ী ফিরতেন রাতে। কথা বলতেন দৈত্যের মতো। মুজাহিদ কই? আমি চিৎকার করি। তার মা বুঝতে পারে তার কপালে আজ খারাবি আছে। সে শুনে পালিয়ে যায়। সারাদিন সম্ভবত না খেয়ে ছিল। সন্ধ্যায় চুপি চুপি বাড়ী ফিরে রাতের খাবার খেয়ে বেরিয়ে যাবার সময় আমার মুখোমুখি পড়ে যায়। আমি তাকে ঝাপটে ধরি। সামনে একটা গাছের কাটা টুকরা পেয়ে যাই। তাকে সেটা দিয়ে মারতে মারতে রক্ত বের করি। ছেলেটার বিভিন্ন জায়গায় ফুলে উঠে। পরে গৃহশিক্ষকসহ অন্যান্য লোকজন মিলে আমার কাছ থেকে তাকে কেড়ে নিয়ে যায়। বহু বহুদিন পরে আমি বুঝতে পারবো তার অন্তরগত জগতের সন্ধান আমি কোনোদিন খোঁজে পাইনি। চলবে...
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×