আসলে মুজাহিদর মতো এত জানা একটা ছেলের মনোজগত সম্পর্কে জানা আমার মতো ব্যবসা বুদ্ধির অশিক্ষিত এক মানুষের কাছে অসাধ্য ছিল বললে খুব বেশী বলা হয় না। আমি শুধু অনুমান করতে চাইতাম। তার মনের কি অবস্থা। আমার ইচ্ছা ছিল আমার ছেলে পড়ালেখা শেষ করে গ্রামে ফিরবে, আমার ব্যবসাটাকে আরো বাড়িয়ে তুলবে। তারপর এলাকায় জনপ্রতিনিধি হিসাবে দায়িত্ব পালন করবে। কিন্তু আমি জানতাম না আমার শাসন ব্যবস্থা ভেতরে ভেতরে ক্ষুদ্ধ করে তুলেছে তাকে। ধীরে ধীরে আমি যা করি সে তার বিরোধীতা করতে লাগল। মাঝে মাঝে আমার ইচ্ছে করতো তাকে পিষে ফেলি। আমার সাথে সে কথা বলা বন্ধ করে দিল। যা বলার তার মাকে বলতো।
যাইহোক ব্যবসার কাজে এত বেশী ব্যস্ত ছিলাম যে কয়েক মাস আমি তার কোনো খোঁজই রাখতে পারিনি। বাড়ীতেই ছিলাম না বলা যায় দীর্ঘদিন। বুঝতে পারি নিজের সন্তানের সাথে দূরত্ব তৈরী হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। আমার কি করার ছিল, কিছুই না। আমি ইচ্ছে করলেই তার সাথে সখ্যতা করতে পারতাম না। কারন যে বিচিত্র খাতে সে নিজেকে ঢেলে দিয়েছে সে পটভূমিতে তাকে বুঝা আমার দ্বারা কখনোই সম্ভব না। আমি শুধু তাকে আমার মতো করতে চাইতাম। একজন বাবা হিসাবে আমার সন্তান আমার পরিকল্পনা মতো এগোবে এটাতো স্বাভাবিক একটা ব্যাপার আর প্রক্রিয়া। কিন্তু তার গোর্য়াতুমি আমাকে রাগের সপ্তচুড়ায় নিয়ে যায়। একদিন বাসায় আছি। দেখি তার নতুন আরেক অভ্যাস শুরু হয়েছে। একদিন সকালে বাড়ীর দাওয়ায় বসে রোদ পোহাচ্ছি। সকালে সারা শরীরে খাটি সরিষার তেল মেখে রোদ পোহানো আমাদের পারিবারিক উত্তরাধিকার বলা যায়। সদর দরজা খুলে দেখি গুটি গুটি পায়ে অনেক গুলো ছন্নছাড়া ছেলেমেয়ে ঢুকে মুজাহিদের রুমের দিকে যাচ্ছে। আমি তার মার কাছে জানতে চাই এসব কি? তার মা জানায় এটা তার নতুন ঝোক। পাড়ার যে সব ছেলেমেয়ে স্কুলে যেতে পারেনা । তাদেরকে সে প্রতিসকালে একঘন্টা পড়ায়। এতে আমি আরো রেগে যাই। নিজের পড়ার কোনো খবর নাই। সে শিক্ষা দেয় অন্যকে। আমি গভীর চিন্তামগ্ন হয়ে পড়ি এ ছেলের ভবিষ্যত ভেবে। তাকে আমার নিজের সন্তান বলেই মনে হয় না। তার মায়ের উপর রাগারাগি করি।
ভোরে জেগে প্রথমেই কোরাণ তেলওয়াত করতে হবে সবাইকে এটা ছিল আমাদের পারিবারিক রেওয়াজ। মুজাহিদ সকালে কোরাণ পড়া বন্ধ করে দেয়। সে এখন নিয়মিত মসজিদে যায় না। বিভিন্ন কানাঘুষা আসতে থাকে যে সে নাকি গ্রামে বিভিন্ন মানুষজনকে বলে বেড়াচ্ছে। ধর্ম নাকি এক ধরনের বিণোদন। নামাজ পড়ে নষ্ট করার মতো সময় তার নেই ইত্যাদি। এলাকার মানুষজনের ভেতর তার বিরুদ্ধে একটা চাপা ক্ষোভ লক্ষ্য করলাম। আমার অভ্যন্তর নীল হয়ে গেছে এসব শুনে। আমাদের এলাকাটা খুবই ধর্মান্ধ এলাকা। এমনিতে লোকজন খুব একটা ধর্মকর্ম করেনা। সামুদ্রিক এলাকা হওয়াতে সবাই যার যার মাছ ধরা, লবন উৎপাদন নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু ধর্ম নিয়ে কথা উঠলে সবাই ধর্মান্ধ।
কোন এক সালমান রুশদি নাকি ইসলামকে ব্যঙ্গ করে বই লিখেছে। এলাকার মানুষরা সেটা নিয়ে মাতে।
সোলেমান তো মুসলমানের নাম! মুসলমানের পোলা হইয়া ! নাউজুবিল্লাহ। ইহুদির টাকা খাইছে মাদারচুদ। এই হচ্ছে মনোভাব।
বাড়ীতে তার কথা উঠলেই আমি রাগারাগি করি । তার চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করি। মুজাহিদ যে শুধু ঘরের ভেতরই একা হয়ে গেছে তা নয় এলাকার যে কোনো বন্ধুবান্ধবের সাহচার্যও সে ত্যাগ করেছে।
চলবে....?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


