প্রচলিত বিশ্বব্যবস্থায় যেন খুব দ্রুতই একের পর এক পরিবর্তনের আলামত পরিদৃষ্ট হচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিজয়ী শক্তি সারা বিশ্বে যে ভূরাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করেছিলো, তাতে আসছে একের পর এক ভূকম্পন।
ইতোমধ্যে প্রধান ধর্মসমূহের উৎপত্তিস্হল মধ্যপ্রাচ্যের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সাজানো রাজনৈতিক কাঠামোতে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। ইরাক বা সিরিয়ার মতো প্রাচীন ভূখণ্ডের নবীন রাষ্ট্রদ্বয় কার্যত তাদের রাষ্ট্র কাঠামো হারিয়ে ফেলেছে। শেষ মুসলিম সাম্রাজ্য উসমানীয় সালতানাতের ধ্বংসস্তূপের উপর গঠিত মোস্তফা কামাল পাশার নাস্তিক্যবাদী তুর্কী প্রজাতন্ত্র এখন রজব তাইয়েব এরদোগানের ডানপন্থী তুর্কীতে পরিণত হয়েছে, যেটি এখন স্পষ্টভাবেই নিজেদের অটোমানদের ভাবগত উত্তরসুরী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতঃ নিজেকে মুসলিম জাহানের নেতৃত্বের আসনে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
স্নায়ুযুদ্ধোত্তর বিশ্বে আমেরিকার নেতৃত্বকে ভূলুণ্ঠিত করতে ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া বেশ শক্ত দাও মেরেছে। প্রতিক্রিয়ায় দেশটিকে পশ্চিমের অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে পড়তে হলেও রাশিয়ার পাল্টা পদক্ষেপে ইউরেশীয় ভূখণ্ডে নতুন এক স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নকে ভেঙ্গে দিতে রাশিয়া ইউরেশীয় অর্থনৈতিক সমিতি গড়েছে। সাথে আছে তেজী অর্থনীতির চীনের নিবিড় সমর্থন।
চীনারা এখন খোদ আমেরিকা মহাদেশে মার্কিন স্বার্থে নাক গলাচ্ছে। মার্কিন কতৃত্বাধীন পানামা খালের আরো উজানে নিকারাগুয়ায় চীনের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি নতুন খাল নির্মাণ করে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগীয় সমুদ্র বাণিজ্যে আমেরিকার একাধিপত্য খর্ব করার প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে। প্রস্তাবিত নিকারাগুয়া খাল হয়ে গেলে পানামা খালের রাজস্ব ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব উভয়ই ভূলুণ্ঠিত হতে পারে। এমনকি আমার সন্দেহ হয়, ভবিষ্যতে নিকারাগুয়া খাল ব্যবহারকে পুঁজি করে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় লাতিন আমেরিকান দেশগুলোর পাশিপাশি মেক্সিকোর মতে খিড়কীর দেশও ওয়াশিংটনের দিকে চোখ পাকাতে পারে। হয়তো এই সম্ভাবনার কারণেই পাঁচ দশকের শত্রু কিউবার দিকে দোস্তির হাত বাড়িয়েছেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।
প্রাচীত্যের এহেন পরিস্থিতির মধ্যেই প্রাচ্যেও পরিবর্তনের হাওয়া অনুভূত হচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গ্লানি মুছে জাপান সামরিক পরাশক্তি হতে চাইছে। তুরস্কের এরদোগানের মতো জাপানেও প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ধীরে ধীরে বৃহৎ এক উদ্দেশ্যে নিজের ক্ষমতা সংহত করছেন। অর্থনীতির স্থিতাবস্থা ধরে রেখে আভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে উদার মুদ্রাব্যবস্থা ও কাঠামোবদ্ধ সংস্কারের ডাক দিয়ে আবেনোমিক্স নামে এক নতুন অর্থনৈতিক ফর্মুলার জন্ম দিয়েছেন শিনজো আবে। পাশাপাশি দেশটিতে কার্যত নিষিদ্ধ সামরিকায়ন পুনরায় চালু করা এবং চীন, দুই কোরিয়ার মতো নিকট প্রতিবেশীদের সাথে বিবাদ সৃষ্টিতেও সফল হয়েছে টোকিও, যার একমাত্র উদ্দেশ্য প্রাচ্যের মূল শক্তি হিসেবে জাপানকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা। এটাও অত্র অঞ্চলে আমেরিকার একাধিপত্যকে খর্ব করবে।
বিস্ময়কর হলেও সত্যি, উপরিউক্ত দেশসমূহ বাদে বিশ্বের বাদবাকি দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাও মার্কিন প্রভাব থেকে বের হতে চাচ্ছে। ইতোমধ্যেই মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক লগ্নি সংস্থাগুলোর প্রভাব কমিয়ে চীনের পরোক্ষ কতৃত্বাধীন ব্রিকস ব্যাংক, এবং সরাসরি নেতৃত্বাধীন এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকে যোগ দিতে তোড়জোড় করছে ঢাকা।
আর এই একটা কারণেই সম্ভবত প্রবল শক্তিশালী বিরোধী জনমত থাকার পরও আওয়ামী লীগ বারবার টিকে যাচ্ছে। কারণ এরা পরিবর্তিত বিশ্ব প্রেক্ষাপটের মূল খেলোয়াড় চীন, রাশিয়া ও জাপানকে তোষণ করার নীতি গ্রহণ করেছে। অপরদিকে বিএনপি এখন অনেক বেশি মার্কিন নির্ভরতায় ফেঁসে গেছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশে এখন মার্কিন প্রভাবে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ দৃশ্যমান।
এভাবেই বিশ্বজুড়ে একের পর এক তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন কাহিনীর। আল্লাহ সর্বজ্ঞ...!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

