রাজধানীর অদূরে সাভারের আশুলিয়া থানাধীন নিশ্চিন্তপুরে ঘটে যাওয়া স্বরণকালের ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনায় কাঁদছে সারাদেশ। সরকার নিহতদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলেও একই থানার প্রায় মাইল খানেকের ব্যাবধানে জামগড়া ছয়তলা বাজার নামক স্থানে প্রকাশ্যে চলছে মেলার নামে জুয়া, চড়কি, মাদক ব্যবসা এবং রাতব্যাপি অপ্রাপ্ত বয়ষ্ক মেয়েদের উদোম নৃত্য। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রভাবশালী মহল, ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতাকর্মী ও কতিপয় অসাধু কিছু প্রশাসনিক কর্মকর্তাগনের ছত্রছায়ায় চলছে অবৈধ এসব কর্মকান্ড। বিভিন্ন সংস্থা থেকে প্রশাসনের কাছে আবেদন নিবেদন করেও বন্ধ করা যাচ্ছে না অশালীনসব কর্মকান্ড। প্রশাসনিক নিরবতায় একদিকে যেমন বিপথে যাচ্ছে উঠতি বয়সের স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা, অন্যদিকে নিশ্চন্তপুরের পুড়ে যাওয়া নিহতদের আতœার অবমাননা করা হচ্ছে। এসব অবৈধ কর্মকান্ডে পুলিশের ভূমিকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে জনমনে ।
সরজমিনে দেখা যায়, সাভারের আশুলিয়া থানাধীন নিশ্চন্তপুরে প্রায় মাইল খানেক ব্যাবধানে জামগড়া ছয়তলা বাজার নামক স্থানে শীত কালীন আনন্দ মেলা ও সার্কাসের নামে চলছে প্রকাশ্যে উদোম নৃত্যের যাত্রা আর হরেক স্টাইলের জুয়ার রমরমা কারবার। চলছে মাদক বেচাকেনা ও সেবনের পাল্লাপাল্লি। মেলা প্রাঙ্গন এখন পরিনত হয়েছে জুয়াড়–, মাদক ব্যবসায়ী ও দেহপসারিনীদের অবাধ মিলনমেলায়। মাইকে মডেল কণ্যা আর বিভিন্ন প্রিন্সেসদের খোলামেলা নাচ দেখানোর ঘোষণা দিয়েই চলছে অশ্লীল নৃত্যের নগ্ন প্রদর্শনী। সেখানে ঝকঝকে আলোচ্ছটায় রমরমা জুয়ার মেলা বসিয়ে হররোজ আগত মানুষজনের পকেট কেটে নেয়া হচ্ছে কাড়ি কাড়ি টাকা। নিছক হাউজি খেলার কথা বলে সচল হলেও রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বসতে থাকে ওয়ান এইট, ওয়ান টেন, চর্চরি বোর্ড, ফরগুটি, ফিতা খেলাসহ হরেক রকম জুয়ার আসর। জুয়ার নেশা শুধু যুবক, শ্রমিক, ব্যবসায়ি লোকজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী আর মহল্লা পর্যায়ে উঠতি বয়সের তরুণদেরকেও দারুনভাবে আকৃস্ট করে ফেলেছে এসব। সন্ধ্যা পেরোলে কোমলমতি শিশুদেরও বাড়িঘরে আটকে রাখা যাচ্ছে না। দল বেধে তারাও হাজির হচ্ছে জুয়ার আসরে। জুয়ায় টাকা খুইয়ে আবার পুঁজি সংগ্রহের জন্য নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডেও জড়িয়ে পড়ছে তারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জামগড়া ছয়তলা স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, গত ১৪ নভেম্বর থেকে এই এলাকায় বিশাল প্যান্ডেল বানিয়ে মেলার সাইনবোর্ড ঝুলানো হয়েছে। শীতকালীন আনন্দ মেলা বলা হলেও সেখানে নগ্ন যাত্রা আর জুয়া ছাড়া অন্য কোন আনন্দ উপকরণ নেই। মেলা প্রাঙ্গনে গড়ে উঠেছে ওয়ান টেন, চর্চরী বোর্ড, ফিতা খেলা, চরকি বোর্ড, রিং ছোঁড়া, ওয়ান এইটসহ বিভিন্ন নামের হরেক স্টাইলের জুয়ার আসর। সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এসব জুয়ার বোর্ডকে ঘিরে শত শত মানুষের হৈচৈ, চিৎকার-চেচামেচীতে হট্টগোল পরিস্থিতি বিরাজ করে। মধ্য রাত থেকে মূল ষ্ট্রেজের সবগুলো লাইট নিভিয়ে রঙ-বেরঙের টিপ লাইটের আলো আধারীতে শুরু হয় প্রায় নগ্ন নৃত্যের মহড়া। ষ্ট্রেজের দক্ষিণ পাশে আলীর জুয়া বোর্ড ঘেষেই বসেছে মাদকের স্পট। সেখানে ফেন্সিডিল, ঘুমের বড়ি, বিয়ার বিক্রি ও সেবনের আড্ডা চলে সারারাত। মেলা গেটের মুখোমুখি পশ্চিম কোণে বেচাকেনা চলে বাংলা মদের, চটের উপর বসে মদ্যপান আর মাতলামীর দৌরাত্ম্য। শুধু প্যান্ডেলের ভিতরেই আছে গাঁজা বিক্রির চারটি স্পট। গতকাল রাতে সরেজমিন গিয়ে এসব অপরাধমূলক কর্মকান্ডের দৃশ্য দেখা গেছে। অজ্ঞাত ক্ষমতার জোরে ঢাকঢোল পিটিয়েই চলছে এসব নগ্ন প্রায় নৃত্য ও জুয়ার আসর।
তারা আরো জানান, জুয়ার মেলাটি এলাকাবাসীর শান্তি কেড়ে নিয়েছে। প্রতি রাতেই চুরি-ছিনতাই ঘটে চলছে, বেড়ে গেছে নানা অসামাজিক কার্যকলাপ। কিন্তু প্রভাবশালীদের ভয়ে কেউ টু শব্দটি করতেও সাহস পায় না। সন্ধ্যা থেকেই চিহ্নিত সন্ত্রাসী-দুর্বৃত্তরা সেখানে অবস্থান নেয়, তাদের ছত্রছায়ায় চলে জুয়ার এই মেলা। এই জুয়ার মেলাকে ঘিরেই আশপাশে নতুন দুটি মাদক স্পট গজিয়ে উঠেছে। রাত দিন হরহামেশা মাদক কেনাবেচা ও সেবন চলছে প্রায় প্রকাশ্যেই। এর পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে চলছে চুরি-ছিনতাই। সেখানে সার্কাস আনন্দ মেলার নামেই চলছে এসব অপরাধমূলক কর্মকান্ডের উৎসব । রাতব্যাপী পুলিশি পাহাড়ায় কথিত মেলা প্রাঙ্গন পরিনত হচ্ছে অসামাজিক কার্যকলাপের আখড়াস্থলে। এর ফলে এ এলাকায় বাড়ছে চুরি, ছিনতাইসহ নানামুখি অপরাধ।
আশুলিয়া থানার একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, সরকারি পারমিশনেই মেলা বসেছে-এটা বন্ধের ক্ষমতা আমার নেই, তবে মেলাকে কেন্দ্র করে যাতে অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা না ঘটে সে ব্যাপারে আমরা সতর্ক রয়েছি।
জানা যায়, স্থানীয় প্রভাবশালী মহল, ক্ষমতাসিন দলের কিছু নেতাকর্মী ছাড়াও এই মেলার মূল পৃষ্ঠপোষক হলেন পেশাদার মেলাবাজ টঙ্গীর মো. রমজান আলী, সুমন এবং দেলোয়ারসহ আরো ৫-৬ জন। এদের উদ্যোগে কতিপয় পেশাদার অস্ত্রধারী, অপরাধী ও ফেরারী আসামীদের সহযোগিতায় মেলার নামে চলছে সীমাহীন বেলেল্লাপনা। সন্ধ্যার পর থেকেই ওই মেলা আঙ্গিনায় অশ্লীল নৃত্যের পাশাপাশি বসে ব্যাপকভাবে জুয়ার আসর। বিভিন্ন নামের ৭/৮টি জুয়া বোর্ডের মাধ্যমে প্রকাশ্যে ঢাকঢোল পিটিয়ে পরিচালিত এ জুয়ার আসরে সাধারণ মানুষকে সর্বশান্ত করা হচ্ছে। প্রতি মুহূর্তে চলছে সেখানে হাজার হাজার টাকার খেলা । থানা পুলিশের উপস্থিতিতে চিহ্নিত অপরাধীরা এসব জুয়ার আসর পরিচালনা করে বিধায় স্থানীয় বাসিন্দারাও প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না। ঘটনার বিষয়ে মেলাবাজ রমজান, সুমন, দেলোয়ার হুমকির সুরে একটি মানবাধিকার সংস্থার কর্মকর্তাদের জানায়, পুলিশের সর্বত্র মহলে টাকা ঘুষ দিয়ে এ মেলার অনুমোদন নেয়া হয়েছে- মদ, জুয়া, নারী ব্যবস্যা সবই চলবে। ঘুষের বিষয়ে দম্ভউক্তি তাদের, প্রতি রাতে মেলা থেকে আশুলিয়া থানার ওসিকে ৩০ হাজার, এসপিকে ২০ হাজার, র্যাবকে ২৫ হাজার, ডিবিকে ২০ হাজার, স্থানীয় সন্ত্রাসীদের ৫০ হাজার এবং আমাদের পোলাপানদের ৫০ হাজার টাকা দেয়া হয়। এ টাকা তুলতে হলে মদ-জুয়ার বিকল্প কি? ফলে প্রশাসনের ছত্রছায়ায় রাত যত বাড়তে থাকে জুয়া-মদ ও অশ্লীল নৃত্যের আসর ততই জমে উঠতে থাকে। মেলার জুয়া ও মাদক ব্যবসা প্রকটতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এ এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
আয়োজক যারা : সূত্রে জানা যায়, হাতেগোনা কয়েকজনের নিয়ন্ত্রনে রয়েছে সারা দেশের মেলা বানিজ্যের ছড়ি। এদের মধ্যে টঙ্গীর মো. রমজান আলী, বড় সুমন, আশুলিয়ার শিরীন, দেলোয়ারসহ (বর্তমান মাঠ- আশুলিয়ার জামগড়া মাঠ), চিটাগাংয়ের সুলতান, জাফর, খোকন, মিরপুরের বাচ্চু, মজনু, কুষ্ঠ তাহের, গাবতলীর জলিল, গাজিপুরের হান্নান, মির্জাপুরের সরর, শাহেব আলি, মিন্টু, (বর্তমান মাঠ-বি-বাড়িয়ার, বাঞ্ছারামপুর থানার পরিকান্দি ফেরিঘাট), ঢাকার কামরাঙ্গীর চরের নুর হোসেন, হাজারীবাগের হানিফ, ক্লাব পাড়ার শাহজাহান, আলম, চট্টগ্রামের শাহআলম, খোড়া জামান, মাহতাব, নোয়াখালীর সৈয়দ, সিদ্দিরগঞ্জের রহমআলি, ছোট রফিক, গাবতলীর লাদেন বাচ্চু, নুরইসলাম, নারায়নগঞ্জের রফিক, রুমি, রুবেল, কুইচ্চামারার লাভলু, কেরানীগঞ্জের আবু, গেন্ডারিয়ার মো.আলি, বরিশারের আসলাম,স্বপন, ফারুক, সেলিম, আশুলিয়ার আমজাদ, ডেমরার কালাম, যাত্রাবাড়ির দুলাল, বাড্ডার মনির , বিরøাল, জামান (এ্যাড), টঙ্গীর মজিবর অন্যতম। তাদের এক একটি গ্রুপে রয়েছে প্রায় অর্ধশতাধিক কর্মী বাহিনী।
যেভাবে মেলার আযোজন : প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পরামর্শে, মেলাগুলোর অনুমতির জন্য স্থানীয় প্রভাবশালীদের নিয়ে প্রথমে বানানো হয় একটি কমিটি, তারপর একটি খালি জায়গাকে মাঠ বানিয়ে ভিন্ন ভিন্ন নামে স্থানীয় ডিসি, এসপির লিখিত অনুমোদন নেয়া হয় আনন্দ মেলা-সার্কাসের নামে। পরবর্তিতে স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে এমাঠে চালানো হয় অবৈধসব কর্মকান্ড। অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদনের তোয়াক্কা না করেই চালানো হয় মেলা।
এসব মেলায় আনন্দ মেলা বলা হলেও সেখানে নগ্ন যাত্রা আর জুয়া ছাড়া অন্য কোন আনন্দ উপকরণ রক্ষ করা যায় না। মেলা প্রাঙ্গনে গড়ে উঠে ওয়ান টেন, চর্চরী বোর্ড, ফিতা খেলা, চরকি বোর্ড, রিং ছোঁড়া, ওয়ান এইটসহ বিভিন্ন নামের হরেক স্টাইলের জুয়ার আসর। তাছাড়া ক্রীড়া পরিষদের অনুমোদন ছাড়াই প্রকাশ্যে চালানো হয় বাহারি নামের ভ’য়া লাকি ক’পন ব্যবসা। সেখানে নিজেদের মনোনিত সেটে ৮-১০টি শিশু বাচ্চাদের ব্যাবহারের মাধ্যমে নিজেরাই হাতিয়ে নেয় টিভি, ফ্রিজ, গরুবাছুর, ফ্যান, মোটরসাইকেলের মতো মূল্যবান সব উপহার। ফলে রাত জেগে গ্রাহকরা দাড়িয়ে থাকলেও লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় মেলার আয়োজকরা।
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বদরুল আলম জানান, অনুমতি নিয়েই তারা চালাচ্ছে আনন্দ মেলা। আমাদের পুলিশ সার্বক্ষনিক সেখানে পাহারায় রয়েছে। এরকম কোনো ঘটনা এখনো আমাদের নজরে পড়েনি। অভিযোগের সত্যতা পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। মেলার আয়োজকদের সাথে সখ্যতা এবং ঘুষের টাকার বিষয়ে তিনি অভিযোগ অস্বীকার বলেন আগামীকাল এ বিষয়ে ব্যাবস্থা গ্রহন করা হবে।
সাভার থানার সহকারী পুলিশ কমিশনার (এএসপি) মনোয়ার হোসেন আশুলিয়ার নিশ্চন্তপুরে ঘটে যাওয়া স্বরণকালের ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনায় একদিকে স্বজনদের আহাজারি অন্যদিকে একই থানার প্রায় মাইল খানেকের ব্যাবধানে জামগড়া ছয়তলা বাজার নামক স্থানে প্রকাশ্যে অশালীনসব কর্মকান্ডের বিষয়ে জানান, এক জায়গায় দূর্ঘটনা ঘটলে অন্য জায়গার আনন্দতো আর থেমে থাকবে না। তাছাড়া তারা সার্কাসের নামে অনুমতি নিয়েইতো মেলা চালাচ্ছে বলে জানি। এই সার্কাস মেলা থেকে প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ টাকা পাচ্ছে প্রশাসন এমন প্রশ্নে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, অনৈতিক কর্মকান্ডের সত্যতা পেলে ব্যাবস্থা গ্রহন করা হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




