রাজধানীর প্রায় সর্বত্রই অবৈধভাবে জ্বালানি তেলের বিপজ্জনক ব্যবসা জমজমাট হয়ে উঠেছে। যত্রেতত্রে এসব অবৈধ দোকান বৃদ্ধি পাওয়ায় হাতের নাগালে এখন পাওয়া যাচ্ছে পেট্রোল, অকটেন ডিজেল সহ অন্যান্য জ্বালানি তেল। সহজলভ্য হওয়ায় হরতাল সহ বিভিন্ন জ্বালাও-পোড়াও কর্মকান্ডে ব্যবহার হচ্ছে এ সব তরল জ্বালানীর ব্যাবহার। অন্যদিকে ভেজাল এসব জ্বালানি ব্যবহারে নষ্ট হচ্ছে যানবাহনের আয়ুষ্কাল । স্থানীয় প্রশাসনের দূর্বল নজরদারির কারনে রোধ করা যাচ্ছে না চোরাই ও ভেজাল তেলের কারবার। নগরির পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি মারাত্মক দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন নগরবিধরা।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, রাস্তার পাশে অধিকাংশ মোড়ে মোড়ে গড়ে উঠেছে চোরাই তেলের ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স এসোসিয়েশনের সূত্র মতে জানা যায়, সারা দেশে পেট্রোল পাম্প রয়েছে ১হাজার ৭৬টি, মাত্র ২শত ১২টি জ্বালানি তেল বিক্রির বৈধ লাইসেন্স রয়েছে ঢাকাতে। অথচ সকল প্রকার নিয়মনীতি উপেক্ষা করে এই নগরীতে প্রায় দেড় হাজার জ্বালানি তেল বা পেট্রোলিয়াম জাতীয় পদার্থ বিক্রির দোকান গড়ে উঠেছে। পেট্রোলিয়াম সংক্রান্ত আইন অনুসারে জ্বালানি তেল (পেট্রোল-ডিজেলের) ব্যবসার জন্য বিস্ফোরক পরিদফতরের পূর্ব অনুমতি নেয়া বাধ্যতামূলক। অথচ সাধারন ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে কিংবা কোন বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই চলছে এসব প্রতিষ্ঠান ।
কদমতলী থানাধীন অটবি ওয়ার্ল্ড ক্লাস ফার্নিচার ফ্যাক্টরীর দেয়ালঘেষা তেল, মবিল, গ্রীজের দোকান মালিক আব্দুল খালেকের সাথে আলাপকালে জানা যায়, দীর্ঘদিন তিনি এখানে তেলের ব্যবসা করছেন। তার সব বৈধ কাগজপত্রই নাকি আছে। কিন্তু এভাবে ফুটপাথে টংয়ের দোকানে তিনি কিভাবে বৈধ লাইসেন্স পেলেন, এমন প্রশ্নে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। এমনকি তিনি বৈধ-অবৈধ কোন কাগজই দেখাতে পারেননি এই প্রতিবেদককে। দক্ষিন বাসাবোর অতীশ দীপংকর সড়কের পাশে ২০/১ শাহজালাল অটো ট্রেডার্স, চানখারপুলের মোড়ে সাইফুলের দোকান, যাত্রাবাড়ি ধোলাইরপাড় রোডে ৩টি, মাদারটেক আব্দুল আজিজ স্কুল ও সরকারি পানির পাম্প সংলগ্ন ২টি, আনন্দবাজার, বাড্ডা, ডেমরা, চিটাগাংরোড এলাকায় কয়েকটি এবং খিলগাঁও এলাকার খিদমাহ হাসপাতাল সংলগ্ন মোড়ে আব্দুল মালেকের দোকান সহ বেশ কয়েকটি দোকানের মালিকের সাথে আলাপকালে জানা যায়, তাদের সকলেরই একই অবস্থা। কেউ শুধুমাত্র ট্রেডলাইসেন্স নিয়ে আবার কেউ কিছু না নিয়েই শুরু করেছেন চোরাই তেলের ব্যবসা। নগরীর ধোলাইখাল এলাকাতেই এ ধরনের দোকান সর্বাধিক। তাছাড়া প্রতিটি বাসস্ট্যান্ড ও বড় রাস্তার পাশে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী বা স্থায়ী দোকান ।
শুধু তাই নয়, তাদের দোকান যেমন অবৈধ, তেমনি এদের তেল সংগ্রহ পদ্ধতিও অবৈধ। বিভিন্ন দোকান মালিকের সাথে কথা বলে জানা যায়, সরকারি যানবাহনের এক শ্রেণীর অসাধু চালক এদের নিয়মিত সাপ্লাইয়ার। এরা বিভিন্ন সরকারি গাড়ির তেল এসব দোকানে প্র্রায় অর্ধেক দামে বিক্রি করে। তাছাড়া বেসরকারি কিছু গাড়ির ড্রাইভারও তেল বিক্রি করে তাদের কাছে। বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম জাতীয় গাড়ির চালকরাও চুরি করে এদের কাছে তেল বিক্রি করে । তাছারা বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প থেকে সংগৃহীত এবং চোরা পথে আসা গ্যাস কনডেনসেট বা তলানিসহ অন্যান্য নিম্নমানের পদার্থ মিশিয়েও বিক্রি করা হয় তেল । মাপনি কেটে পাত্র ছোট করে কম দেয়াও অবৈধ তেল ব্যবসায়ীদের আরেকটি প্রবণতা।
ভাড়ায় চালিত মিশুক, প্রাইভেটকারসহ টাউন সার্ভিসের বাসগুলো এই তেলের প্রধান ক্রেতা। আগে দুই স্ট্রোক বিশিষ্ট যানবাহন, যেমন টেম্পো, বেবিট্যাক্সি ছিল এর মূল খদ্দের। তাছাড়া বাস, ট্রাকসহ অন্যান্য যানবাহনকেও প্রায়শই এদের কাছ থেকে তেল সংগ্রহ করতে দেখা যায়। পাম্পে প্রতি লিটার পেট্রোল প্রায় ১০০ টাকা হলেও এরা বিক্রি করে ৬০/৭০ টাকা করে। নিম্নমানের ভেজাল তেল ব্যবহার করায় গাড়ির ইঞ্জিনের ক্ষতি তো হয়ই, এর কালো ধোঁয়া পরিবেশকেও দূষিত করে। এই তেলে যাত্রীদের চোখ জ্বলে এবং ইঞ্জিন থেকেও বেশি শব্দ হয়।
মিরপুর-১ নম্বরের তেল ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম জানান, তিনি প্রায় ৮ বছর ধরে ব্যবসা করছেন। কোন সমস্যা হচ্ছে না। টাকা না পেলে মাঝে মধ্যে পুলিশ ঝামেলা করে। তেল ক্রয়কারী গাড়ির একাধিক চালক জানান, দাম কিছুটা কম হওয়ায় এবং পেট্রোল পাম্পে ভিড় থাকায় বাধ্য হয়েই আমরা এই তেল নেই। এছাড়া পেট্রোল পাম্পগুলো হাতের নাগালে না থাকার কারণেও এ ধরণের দোকান থেকে তেল নিতে হয়। এসব দোকান থেকে তেল নেয়ার আরেকটি কারণ হলো, ১লিটার তেল কিনে ২লিটারের রসিদ নিয়ে মালিককে সহজে বুঝিয়ে দেয়া যায়।
অন্যদিকে, শুধুমাত্র রাস্তার পাশে বিক্রি করা অবৈধ জ্বালানী তেলের দোকানেই না, উচ্চমূল্যে ফুয়েল ষ্টেশন থেকে কেনা পেট্রোল, ডিজেল, অকটেনেও নিম্নমানের জ্বালানী সরবরাহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ভেজাল এসব জ্বালানী কিনে বিপাকে পড়ছেন ক্রেতারা। মারাক্তক ক্ষতি হচ্ছে যানবাহনে। অনেক ফুয়েল ষ্টেশনে কারচুপি চলছে পরিমাপেও। জানা যায়, বিএসটিআই ও ভেজাল বিরোধী ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান এসব ফুয়েল ষ্টেশনে অনিয়মিত। আরো অভিযোগ রয়েছে, রাজধানীর মতিঝিলের পূবালী ষ্টেশনের অকটেন ও পেট্রোল খুবই নিম্নমানের। এই তেল ব্যবহারে গাড়িতে কালো ধোঁয়া, ইঞ্জিনে বিকট শব্দ সহ নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়। অনেক ফুয়েল ষ্টেশনের সাথে আছে বিএসটিআই-এর অসাধু কিছু কর্মকর্তাদের যোগসাজস ও সখ্যতা। ফলে দিনের পর দিন প্রশাসনের সামনেই চলছে চোরাই ও ভেজাল তেলের রমরমা বানিজ্য।
কয়েকটি এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তেলের দোকানগুলো আবাসিক এলাকার মধ্যে গড়ে উঠায় নিরাপত্তা আতঙ্কের মধ্যে আছেন তারা। অতিসত্বর সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে এ বিষয়ে নজর দেয়া প্রয়োজন বলে তারা অভিমত ব্যাক্ত করেন।
বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স এসোসিয়েশনের নেতা আলহাজ্ব নাজমুল হক বলেন, সারাদেশে ১হাজার ৭৬টি পেট্রোল পাম্প রয়েছে। শুধু ঢাকাতেই রয়েছে ২শত ১২টি পাম্প। প্রশাসনের ঢিলে ঢালা নজরদারির ফলে শুধুমাত্র ঢাকাতেই দেড় হাজারের বেশি দোকানি অবৈধ জ্বালানি তেলের ব্যবসায় নেমেছে। এদের ভেজাল তেল ব্যবহারে বিনষ্ট হচ্ছে গাড়ির আয়ুষ্কাল । প্রশাসনের পক্ষ থেকে গত কয়েক বছরের মধ্যে নগরীতে জ্বালানি তেলের অবৈধ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহণের নজির নেই।
বিস্ফোরক পরিদফতরের বিস্ফোরক পরিদর্শক নূরুল আলম বলেন, কতটি জায়গায় এসব অবৈধ ও বিপজ্জনক ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে তার হিসাব রাখা কঠিন। আমরা অননুমোদিত প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পেলে পুলিশকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দেই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




