গোস্তাকী মাফ করবেন ভদ্র পাঠক সমীপেষু, অবান্তর জেনেও মহান স্বাধীনতার এই মাসে বেশ কিছু প্রশ্ন নিয়ে উপস্থিত হয়েছি আমাদের এই স্বাধীন যোগাযোগ মাধ্যমে। প্রথমেই জানিয়ে রাখি, যে প্রসঙ্গ নিয়ে আমি গোস্তাকী করছি, ১৯৭১ সালের সেই ভয়াল মুক্তিযুদ্ধের সময় কিন্তু জন্মই হয়নি আমার। ছোটবেলা বাবা বলেছিলেন, ৭১-এর আগে পরাধীন ছিলাম আমরা পাকিস্তানিদের কাছে, পরে সর্ব কালের সর্ব শ্রেষ্ঠসন্তান জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে দীর্ঘ নয়মাস আন্দোলন ও যুদ্ধের মাধ্যমে পেয়েছি আমাদের আজকের স্বাধীনতা। মাতৃভাষা বাংলার জন্য আমরা সে সময় হারিয়েছি অসংখ্য নিরীহ মানুষকে। হারিয়েছি অগনীত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। এখানেই শেষ ছিল না, পাকিস্তানী ও এদেশের খারাপ কিছু মানুষের হাতে অনেক মা-বোনের ইজ্জতও কলুষিত হয়েছিল সে সময়। ধ্বংস হয়েছিল ঘর-বাড়ি, পুকুরের মাছ, গোলা ভরা ধান ছাড়াও ক্ষেতের ফসল আরো কতকি। সবই সেদিন হারাতে হয়েছিল এই মাতৃভাষার জন্য। বয়স বাড়ার সাথে সাথে শুনে আসছি স্বাধীনতার এসব গল্পবুলি।
ভালই লাগতো বাবার কথাগুলো। তখন গর্বে ভরে উঠতো সবুজ এদেশে জন্মানোর কারণে। কিন্তু ইদানিং দেশের পরিস্থীতি দেখে, শুধুমাত্র বছর বছর একটি দিন স্বাধীনতা দিবস পালন করা ছাড়া, স্বাধীনতার নামের অদৃশ্য অনুভ’তির নুন্যতম মিল খুঁজে পাচ্ছিনা আমি। বাবা আজ নেই। শুনেছি, যোগাযোগের এই মাধ্যমে অনেক জ্ঞানী-গুণীরা বিচরণ করেন। তাই অনেক আশা নিয়ে জানতে এবং জানাতে চেষ্টা করছি স্বাধীনতার গুন-ভাগ।
বাবা বলতেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল বিষয়বস্তু ছিল মাতৃভাষাকে ঘিরে। এছাড়াও রাজনৈতিক অঙ্গন, খাদ্য, ব¯ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদন, চাকরী, ব্যাবসায়ীক ক্ষেত্র ছাড়াও প্রায় প্রতিটি স্থলেই আমরা ছিলাম পরাধীন। পরবর্তীতে দীর্ঘ নয়মাসে ৩০ লক্ষ শহীদদের রক্ত ঝড়িয়ে আর মা-বোনদের সম্ভ্রমের বলি দিয়ে পেয়েছি আজকের এই স্বাধীনতা।
সময়ে সময়ে বাবার কথায় জানতে পারি ১৯৭১ সালের আগে রাজনৈতিক অঙ্গন বলতে বুঝাতো, আড়ালে আবডালে লুকিয়ে বলতে হবে মনের কথা, দেশের কথা। প্রকাশ্যে কিছু বললেই তখন ধরে নিয়ে যাওয়া হতো পাকিস্তানীদের কারাগারে। রাত পেরোলেই আমরা স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪১ বছরে পার করতে চলেছি। কিন্তু পরাধীনতার শৃংখল ভেঙ্গে রুপান্তরিত এই স্বাধীন দেশের দিকে এখন তাকালেই দেখা যায় হানা-হানি, কাটা-কাটি। পূর্বের মতো এখনো মনের ভাব প্রকাশ করতে দাবীর আবেদন নিয়ে মাঠে নামলেই পড়তে হয় গ্রেনেড হামলার মুখে, প্রান যায় লগী-বৈঠা আর জিহাদের নামে বাঁশের আঘাতে। হারাতে হয় আমাদের আইভী রহমানের মতো অসংখ্য জনপ্রিয় নেতা-নেত্রীকে। স্বার্থন্বেশীমহল কখনো কখনো অবৈধ ভাবে জনগনের শেষ সম্বল প্রতিরক্ষাবাহীনিকে ব্যবহার করেছে অবৈধভাবে।
আবার কখনো কখনো দেখা যায়, দাবী আদায়ের জন্য মাঠে নামলেই সত্য-মিথ্যা-বানানো মামলা দিয়ে যেখান সেখান থেকে তুলে নেয়া হয় পুলিশ বাহিনী দিয়ে। কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য না হলেও শুধুমাত্র জাতীয় পোশাক পড়ার দায়ে ভোগ করতে হয় কারাবাস। কিছু কিছু ক্ষেত্রে লাশ নিয়েও চলে রাজনিতি। বেঁচে থাকতে না খেয়ে কেউ মারা গেলেও কারো কিছু যেন যায় আসে না। কিন্তু হরতাল অবরোধ কিংবা রাজনৈতিক কোন কর্মসূচীতে প্রতিপক্ষ দলের আঘাতে কারো প্রানটা গেলেই হলো। মৃতদেহ নিয়ে শুরু হয় স্বস্ব দলের কর্মী বানানোর প্রতিযোগিতা। কখনোতো এই সব কর্মসূচীতে রাস্তা দিয়ে চলাই হয়ে পড়ে মৃত্যুকুপে ঝাপ দেয়ার শামীল। প্রতিপক্ষের কোন কর্মীকে পেলেই হলো, মারতে মারতে একেবারে দফা-রফা শেষ করেই ছাড়ে তারা। সম্প্রতি সাংবাদিক ভাইদের মাধ্যমে জানতে পারলাম বিভৎষ্য এক দৃশ্যপট। এক দলের ডাকা অবরোধ চলাকালে রাজধানীর সর্বোচ্চ সুরক্ষিত এলাকা আদালত পাড়ায়, দিনে-দুপুরে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মৃত্যু হলো নিরীহ পথচারী দর্জি ব্যাবসায়ী বিশ্বজিতের। এর আগেও এদেশের রাজনৈতিক দলের ডাকা হরতাল-অবরোধে কিংবা কোন কর্মসূচীতে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হয়েছিলো। বিচার না হলেও জজ মিয়া নাটকের দৃশ্য দেখার কুভাগ্য হয়েছিল আমার। মনে প্রশ্ন জাগে, তাহলে স্বাধীন দেশে কি স্বাধীন রাজনৈতিক চর্চা করতে পারছেন আমাদের নেতা কর্মীরা?
৭১-এর পূর্ববর্তী সময়ে আমাদের দেশে এত হানা-হানি, কাটা-কাটি, ভাইয়ে-ভাইয়ে দন্দ ছিল কিনা তা দেখার সৌভাগ্য আমার না হলেও শুনেছি যুদ্ধের আগে হাফপেন্ট পড়া একজন পুলিশ দেখলেও শহর-গ্রামের মানুষ ভয়ে তটস্ত থাকত। তখন আইনের শাসন ছিল কঠিন এবং সকলকেই তা মানতে বাধ্য করা হতো কিংবা স্বপ্রোনোদিত হয়ে আইনের শাসন মানতেন সবাই। কিন্তু দীর্ঘ দুই যুগের ও বেশীসময় পেরিয়ে এসে কি দেখছি আমরা ? হাজার হাজার মামলা ঝুলে আছে আদালত গুলোতে। অপরাধীরা এখন জনতার হাতে ধরা পড়লে নিরাপদ আশ্রয়ের স্থল হিসেবে তারা খোঁজে পুলিশ সদস্যদের। এই স্বাধীন দেশে টাকা দিলেই নাকি এখন সকল মুশকিল থেকে আছান পাওয়া যায় । মাদক, চোরাকারবার থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরণের অপরাধমূলক কর্মকান্ড সাধিত হয় আইন শৃংখলা বাহিনীর খারাপ কিছু কর্মকর্তাদের ছত্রছায়ায়। ওই সাংবাদিক ভাইদের মাধ্যমে আরো জানতে পাই, সাদা পোশাকে আইন শৃংখলা বাহিনীর নামে তুলে নেয়া হয় মানুষ, পরে তাদের লাশ পাওয়া যায় এখানে সেখানে। কালো-সাদা পোশাকে বিনা বিচারে পিপড়ার মতো গুলি করে মারা হয় অপরাধী এমনকি নিরপরাধীদেরও। কিন্তু এসকল কর্মকান্ডের দায়িত্বভার নিতে চায় না কেউই।
আশ্চার্য লাগে এই ভেবে, যুদ্ধে যারা নিজের শরীরের রক্ত ঝড়িয়ে, আপনজন হারিয়ে, জীবন বাজী রেখে মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন, তারাই আজ অবহেলীত, লাঞ্চিত, গঞ্জিত। পেটে পড়ে না তাদের দ‘ুমুঠো ভাত। কেউ করেন ভিক্ষা, কেউবা রিক্স্রা চালিয়ে জীবন কাটায়। দেশের এমন ভাব দেখে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা অনেকেই এখন নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা বলতেই সংকোচ বোধ করেন। অন্যদিকে, যুদ্ধ চলাকালিন সময়ে অনেকে স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান করলেও টাকার জোরে এখন নামের আগে বীর মুক্তিযোদ্ধা টাইটেল লাগিয়ে হাকিয়ে চলেন পাজেরো। বাবার কাছে শোনা, সর্ব কালের সর্ব শ্রেষ্ঠসন্তান জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান, স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান ছাড়াও আরো কতশত কৃতি সন্তান ছিলেন, যারা তাদের জীবনকে উৎসর্গ করে এনেছিলেন এই স্বাধীনতা, তাদের সকলকেই নাকি জীবন দিতে হয়েছে স্বাধীন রাজনৈতিক এই নোংরা কোন্দলে, এই স্বাধীন দেশে, স্বাধীন বাংলার মানুষেরই হাতে।
দেশের হর্তা-কর্তাদের মুখে প্রায়ই শোনা যায় আমাদের দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ন। কিন্তু আমাদের খাদ্য উৎপাদক চাষী ভাইয়েরা যে কি নিদারুন কষ্টে আছে তার খোঁজ কি আমরা রেখেছি। মধ্যস্বত্যভোগী ব্যবসায়ীদের হাতে জিম্মি এদেশের খানা-পিনার বাজার। মজুদদার আর অসৎ ব্যবসায়ীরা নাকি গ্রাস করেছে এদেশের বাজারকে। আগে ফসল উৎপাদন করে জমা দিতে হতো সরকারের কোষাগারে, এখন উৎপাদন করে বসে থাকলেও, ব্যবসায়ীদের মন না গললে দাম পায় না চাষীরা। এই চাষী ভাইদেরকেই মাঝে মাঝে গনমাধ্যমের ভাইদের কাছে বলতে শোনা যায়, তাদের ফসল উৎপাদন ব্যয় কেজি প্রতি ২৮ টাকা আর সরকার সেই ফসল কিনছেন কেজি প্রতি ২৬ টাকা হিসেবে। মাঝে মাঝে টেলিভিশনের পর্দায় দেখা যায়. চাষীরা মাথায় হাত দিয়ে হতাশা ব্যক্ত করছে। একদিকে কর্মের বাজার মন্দা। আর কোন পথ নেই জেনেই কৃষকরা সরকার ও ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি হয়ে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিনের পর দিন লোকসান গুনে উৎপাদন করে যাচ্ছেন তারা সোনার ফসল। অন্যদিকে নামে-বেনামে সরকারের টাকা লোন নিয়ে মধ্যস্বত্যভোগী ব্যবসায়ীরা নাকে তেল দিয়ে কামিয়ে নিচ্ছেন কাড়ি কাড়ি টাকা। কৌতুহলী মন মাঝে মাঝে জানতে চায়, যেখানে খাদ্য উৎপাদকরাই স্বাধীনভাবে তাদের পন্য সরবরাহে পরাধীন, সেখানে স্বাধীনতার গান কি আদৈা যুক্তিযুক্ত।
টেলিভিশন খুললেই দেখা যায় কি চমৎকার সব পোষাকের বাহার আমাদের নায়ক নায়িকাদের বদনে। বস্ত্রে অবস্ব আমরা বেশ এগিয়ে আছি এটা মানতেই হয়। তবে কাক ডাকা ভোরে কিংবা গভীর রাতে রাস্তায় বেরোলেই দেখা যায়, রাস্তার পাশের অসংখ্য পথশিশু এবং বৃদ্ধরা যখন শীতনিবারন করতে একটি পাতলা কাপড় নিয়ে টানা টানি করে এমনকি সিডরের মতো ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় মানুষের শরীরে বদনের যে হাল তা দেখে মেলাতে পারিনা স্বয়ংসম্পূর্ণের হিসাবটা। মাঝে মাঝে মনে হয় দেশটা বুঝি বড়লোকদেরই, গরীবরাই এখানকার উটকো ঝামেলা!
এদিকে ভূমীদস্যুরা টুকটুক করে যেভাবে নামে-বেনামে সরকারী-বেসরকারী সম্পত্তিগুলো দখলে নিচ্ছেন, অন্যদিকে নিজ সম্পত্তি থেকে বিতারিত ভুমিমালিকের মাথায় হাত দেখে বরাবরই বুঝতে কষ্ট হয় স্বাধীন দেশে কেন এমন পরাধীনতার শেকলে বাধা অসহায়রা।
যেদেশে সাধারণ একটি প্রাইমারী শিক্ষকের চাকরি নিতে লাগে দুইলক্ষ টাকা ঘুষ, যেখানে কিন্টারগার্ডেন স্কুলে ভর্তি হতে ডোনেশন দেয়া লাগে পঞ্চাশ হাজার টাকা, সেখানে লেখা পড়ার কি হাল হতে পারে, ভাবতেই পুলক সঞ্চারিত মনে অবান্তর একটা প্রশ্ন জাগে, এদেশে এমন বানীর প্রতিষ্ঠা কেন হয়না ‘আমাকে তোমরা শিক্ষিত একটি মা দাও, আমি যেভাবেই হোক একটা পয়সা কামানোর মেশিন দেব জাতীকে’। সাংবাদিক ভাইদের কাছে আরো জেনেছি আমি, স্কুল-কলেজের শিক্ষকের কাছে না পড়লে ছাত্র ভাল হলেও ভাল রেজাল্ট একেবারেই অসম্ভব। ফলে জিম্মি করেই যেন গরীব-ধনী ছাত্রদের পড়তে বাধ্য হয় সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের কাছে। অন্যদিকে হরিলুটের এই বাজারে, আকাশটাকে ছাদ বানিয়ে গ্রামের ছোটছোট সোনামনিরা যখন রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে মাটিতে পাটি বিছিয়ে নুন্যতম অক্ষরজ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করেও পায় না একজন শিক্ষক তখন আবারও ভাবনার ওই বিষয়টিকে (দেশটা বুঝি বড়লোকদেরই, গরীবরাই এখানকার উটকো ঝামেলা) মেনে নেয়া ছাড়া যেন কোন উপায়ই থাকে না। মনে প্রশ্ন জাগে স্বাধীন দেশে তাহলে এ কোন নিয়তী।
বড় বড় বিলেত ফেরত ডাক্তাররা এখন সেবাটাকে পেশা হিসেবে নিয়ে জগাখিঁচুরি পাকিয়ে ফেলেছেন। সাংবাদিক ভাইদের জন্য তারা, সরকারি চাকরি ফাঁকি দিয়ে নিজের কিংবা বেসরকারি ক্লিনীকে রোগী দেখে ইদানিং মজা পাচ্ছে না। পদে পদে ধরা খেয়ে যাচ্ছে ডাক্তার মহাশয়েরা। তবে সংখ্যায় নগন্য হলেও সেবার মনোভাব নিয়ে কেউ কেউ আছেন এই পেশায়। হাতুরে ডাক্তারে ভরে গেছে গোটা দেশ। যকৃত বিক্রির মতো ঘৃনিত পেশার সাথেও জড়িয়ে পড়ছেন মানব সেবার ব্রত নিয়ে আসা চিকিৎসকরা। লাশ নিয়েও ব্যাবসা হয় এ স্বাধীন দেশে! টাকা দিলে ময়না তদন্তের রিপোর্টও বদলানো যায় বলে শুনেছি। তাছাড়া আসন খালি থাকা সত্বেও মামা-চাচার জোর না থাকলে পায়না মুমূর্ষ রোগীরা হাসপাতালের খালি আসন। অগত্যা বাধ্য হয়েই শীত-গরমে মাটিতে পড়ে থেকে থেকে অসুস্থ রোগীরা পরিনত হয় মুমূর্ষ রোগীতে। সেবার মাঝেও এখন ধনী-গরীবের বৈষম্যের ঘুনপোকা যেন আষ্টেপৃষ্টে গ্রাস করেছে স্বাধীন চিকিৎসা মাধ্যমকে।
জেনেছি, স্বাধীন এদেশে সুস্থ বিনোদনের ধারা অব্যাহত রাখতে গেলে হতে হয় গ্রেনেড হামলার শিকার। উদীচি, রমনা বটমূল, ময়মনসিংহের সিনেমা হলের মতো বেশ কিছু ঘটনা আমাদের প্রতিবছরই জানান দিয়ে যায়, বিনোদনের বিকাশ যে কত কঠিন স্বাধীন দেশে। তাছাড়া অপ-সংষ্কৃতির নামে সারাদেশে চলছে বেলাল্লাপনা। কথাগুলো জেনেছি আমি ওই কলম সৈনিক ভাইদের কাছেই। সারাদেশে বিভিন্ন ক্লাবের নামে বানানো হয়েছে নাকি যুব সমাজের অবক্ষয়ের আখড়া। নারী-পুরুষ সকলেই সেসব জায়গায় সমানে টানেন সিসা, ইয়াবা ছাড়াও যাবতীয় সব নেশা। জেনেছি জুয়া খেলাও সেখানে বৈধ। এছাড়াও অশ্লীলতার চাদরে মোড়া আমাদের প্রায় সিনেমা জগৎ। সুতোয় সুতোয় নকলে ভরে গেছে বিনোদনের কলকাঠি। সুস্থ ধারার শিল্পীরা তাই একপ্রকার বাধ্য হয়েই চালাচ্ছেন তাদের পেশা। অবহেলিত হয়ে তিলে তিলে ধ্বংস হয়ে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন প্রান প্রিয় মুক্তিযোদ্ধা ব্যান্ডগুরু আজম খান। তার মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে সে কি হৈচৈ। কিন্তু দেশীয় সাংস্কৃতিক জগতের বটবৃক্ষ আব্দুর রহমান বয়াতি আজ টাকার অভাবে চলে যেতে বসেছেন নিরবে নিভৃতে। কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে তাকে অসুখ। সেদিকে খেয়াল কি আছে কারো। এভাবেই দিন দিন অবমূল্যায়ীত হচ্ছে যেন এ দেশের প্রতিভা সকল।
চাকরীর বাজারে নাকি আগুন লেগেছে। ঘুষ হিসেবে চাকরিদাতাদের কাছে হাজার নাকি এখন কোন টাকাই না । লেখাপড়া শিখে পূর্ণযোগ্যতা থাকা সত্বেও লাখলাখ টাকার দরদাম ফুরিয়ে চাকরি নিতে হয় মেধাবীদের। আবার কখনো কখনো টাকার জোরে মেধাবীকে ডিঙ্গিয়ে চাকরির সোনার হরিণটি পেয়ে যান মেধাশুন্যরা। ফলে দিন দিন বাড়ছে বেকারদের সংখ্যা। এদের কাতারে রয়েছে মেধাবী গরীব ছাত্ররা। বাবা বলেছিলেন, স্বাধীনতার আগে পাকিস্থানীরা বাঙ্গালীদের চাকরি দিতে কুন্ঠাবোধ করতো। তবে তখন ঘুষতো দুরের কথা, মেধাবীদের মুল্যায়ন করা হতো মেধাবী হিসেবে। আমার বাবা বিনে পয়সায় তখন তার চাকরিটা পেয়েছিলেন খাদ্য অধিদপ্তরে। কিন্তু স্বাধীন এ দেশে সনদের বোঝা নিয়ে, মেধাবীরা এ অফিস থেকে সে অফিসে দৌড়ঝাপ দিতে দিতে এক সময় ছুরে ফেলেন তাদের সনদ। কেউ ধরেন রিক্স্রার হেন্ডেল, কেউ হয়ে যান শিক্ষিত সন্ত্রাসী। সবই এই স্বাধীন দেশের কারিশমা। সন্ত্রাসী বলে আমরা তাদের গালি দিলেও একবার কি ভেবে দেখেছি আমরা এদের এই পরিনতির জন্য দায়ী কে ?
ব্যাবসায়ীক বাজারের কথাতো বলাই বাহুল্য। এই অধ্যায়টি এখন দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছেন দেশের মধ্যসত্বভোগীরা। নবাগত ব্যবসায়ীরা ঘটি-বাটি, সহায় সম্বল বিক্রি করে ব্যবসায় মার খেয়ে আত্মহত্যা করলেও, লুটেরা-রা ডিজিটাল কারচুপির মাধ্যমে হাজার কোটি টাকা বাগিয়ে নিয়ে টাকার পাহাড় গড়ছে ভিন দেশে। কিন্তু এই দূর্নীতির বিচার আমাদের স্বাধীনদেশে দেখতে পাওয়া যেন বড়ই দুরহ ব্যাপার। সার, তেল, চিনি, গম, কোন খাতে আমাদের লাগেনি কলঙ্কের ছোয়া। বেকার যুবকরা খামার, ছোট ব্যবসার জন্য ঋন চাইতে গেলে কর্তা ব্যাক্তিরা তাদের দেখান হাইকোর্ট-সুপ্রিমকোর্ট। খারাপ লোকেরা নামে-বেনামে ভ’য়া সম্পত্তি দেখিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋন পেলেও লাখ টাকা ঋনের জন্য কাগজ গোছাতে গোছাতে তাদের খরচ হয়ে যায় ঋনের চার ভাগের এক ভাগ টাকা। ঋনদাতাদের ঘুষ দিয়ে থাকে অর্ধেক। অবশিষ্ট টাকায় ব্যবসা শুরুর পর এই চাঁদা সেই চাঁদা দিয়ে তারা ঋনের আসল টাকাতো দুরে থাক সূদের টাকাই যোগাতে যোগাতে হয়ে পড়েন বে-শামাল। ছেলের ঋনের দায়ে বয়োবৃদ্ধ শিক্ষক পিতাকে দড়ি দিয়ে হাত বেধে ঘুরানো হয় গ্রাম জুরে। ব্যবসায়ীরা শষ্য ক্ষেতে তাদের উৎপাদিত পণ্যের দাম না পেলেও, মধ্যসত্বভোগীদের জাতাকলে সাধারণ ভোক্তাদের মাসিক বেতনের প্রায় পুরোটাই খরচ হয়ে যায় মাঝ মাসে। বাবা এও বলেছিলেন, স্বাধীনতার আগে যে যাই উৎপাদন করুক তা জমা দিতে হতো সরকারের কোষাগারে। সেখান থেকে চাহিদামতো সরবরাহ করা হতো জনসাধারণের মাঝে। মুক্তবাজার বানিজ্যের সুযোগ পেয়ে এদেশে ধনীরা দিনকে দিন হচ্ছেন টাকার কুমীর, আর গরীবরা কপাল চাপড়ে দিন দিন চলে যাচ্ছেন রসাতলে। একথা অবশ্য বাবা বলেননি। পড়েছি ওই সাংবাদিক ভাইদেরই লেখা কাগজে।
দীর্ঘ ৪১ বছরে আমাদের প্রাপ্তি যে নেই তা কিন্তু কেউই বলেননি। তবে প্রাপ্তির তুলনায় অপ্রাপ্তির হারটাই বেশি বলে জেনেছি আমি। এ জন্যই যা দেখার কথা ছিল তা দেখতে না পেয়ে, যা শোনার কথা ছিল তা না শুনতে পেরে জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী হায়দার আলী সহ যারা দেশকে মনে প্রানে ভালোবাসেন তারা গানের ভাষায়, কবিতাতে, লেখনির মধ্যদিয়ে এখনো খুঁজছেন প্রকৃত স্বাধীনতাকে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




