somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ঝড়ের তান্ডব

২৫ শে এপ্রিল, ২০১৫ রাত ১২:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

রুটি চিবোতে চিবোতে ভাবতে বসল কি যেন একটা নাম ছিল ওর। হ্যাঁ তাই ত, ওর মা ওর একটা নাম রেখেছিল কিন্তু সেই নামে ওকে কেউ ডাকে না তাই সেই নাম নিজেই প্রায় ভুলতে বসেছে, কি নাম... কি নাম? বিশ্বজিৎ মন্ডল, কিন্তু ওই নামে কেউ ওকে চেনে না, বস্তির সবাই ওকে দানা বলে ডাকে।

সেই বিকেল থেকে ঝমঝম করে যে বৃষ্টি শুরু হয়েছে তার আর থামার নাম নেই। ঘন ঘন মেঘের ডাক আর বিদ্যুতের ঝলকানি দিয়ে আকাশ এক মরণ তান্ডব শুরু করেছে। ঝড় শুরু হতেই কেন যে লাইট অয়ালারা লাইট কেটে দেয় সেটা আজও তার অজানা। হ্যারিকেনে তেল নেই, তেল কেনার পয়সা ছিল পকেটে কিন্তু ততক্ষণে মানসের মুদির দোকান বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অন্ধকারে এদিক অদিক হাতড়ে একটা মোমবাতি খুঁজে পেল আর সেটাই জ্বালিয়ে নিল। মোমবাতির অল্প আলোতে ঠিক ভাবে ঠাহর পাওয়া যায় না, কিছু পরে চোখ আন্ধকারের সাথে মানিয়ে যেতেই দেখতে পেল যে বিছানাটা ভিজে গেছে। বিছানা বলতে একটা ভাঙ্গা তক্তপোষের ওপরে মাদুর একটা কাঁথা আর একটা শত ছিন্ন মশারি, বালিশ নেই আর মশারিটা মশা থেকে ওকে আর বাঁচাতে পারে না তাই অটাকে দলা পাকিয়ে মাথার নিচে দিয়ে বালিশ বানিয়ে নেয়। ভাঙ্গা টালির চাল থেকে এদিক অদিক থেকে টপ টপ করে জল পড়ছে। গত বছর একটা প্লাস্টিক কিনেছিল কিন্তু সেটার অনেক জায়গায় ফুটো হয়ে গেছে, বর্ষার জলের বাঁধ আর তাতে আটকায় না। বাড়ি ফেরার সময়ে গলির মুখের দোকান থেকে রুটি তরকারি কিনে এনেছিল সেটাই চিবোতে বসে গেল। ধুস শাআআআলা, রুমা আবার ওকে পোড়া রুটি ধরিয়েছে, মাগিটাকে কাল আচ্ছা করে রদ্দা না দিলে হচ্ছে না। বিকেলে এক প্যাকেট ঝাল মুড়ি কিনেছিল আর প্লাস্টিকে বাঁধা চোলাই। ভেবেছিল রুটি খাবার আগে বেশ আয়েশ করে চোলাই গিলে তবে রুটি মারবে, কিন্তু রাত বাড়তে না বাড়তেই যে ভাবে ঝড়ের তান্ডব শুরু হয়েছে আর ঘরের যা অবস্থা হয়েছে তাতে মদ খাবার মানসিকতাটা উবে গেল।

ছোটবেলা থেকে দানবের মতন চেহারা, তামাটে গায়ের রঙ, টেরি কেটে আঁচড়ানো চুল, মাথায় প্রায় ছয় ফুটের মতন, বলিষ্ঠ দুই বাহু সব মিলিয়ে যেন কষ্টি পাথরে খোদা মূর্তি। না ওই মূর্তি নিয়ে কিছু করতে পারল না। বাবা কোন কালে ওদের ছেড়ে চলে গেছিল জানে না, তবে বস্তির লোকের মুখে পরে শুনেছে যে ওর বাবা কালী ঘাটের কোন বেশ্যা মেয়ের প্রেমে পরে ওর মাকে ছেড়ে চলে গেছে। ওর মা এর বাড়ি ওর বাড়ি বাসন মেজে ঘর ঝাড় দিয়ে কোন রকমে ওকে পড়াতে চেষ্টা করেছিল, পড়াশুনাতে বেশ মন ছিল। খুব কষ্টে এরতার বই ধার করে, বারো ক্লাস পর্যন্ত পড়েছিল, কিন্তু মা মারা যাওয়াতেই সব ভুন্ডুল হয়ে যায় ওর জীবনের অঙ্ক। বস্তিতে থাকা বারো ক্লাস পাশ করলে হবে কি, কেউ যে কাজ দেয় না তাই পেটের তাগিদে প্রথমে চিতপুরে, খিদিরপুর, হাওড়া, বড় বাজারে গিয়ে কুলি গিরি করল, এই ভাবে জীবনের শুরুর দিক বেশ কিছুটা কাটে।

এই বস্তির মনসা মাসি ওকে রাতে খেতে দিত আর এই পায়রার খুপরির মতন ঘরেই রাত কাটাত। মনসা মাসির বর ওকে ট্যাক্সি লাইনে আনে, সেই থেকে ট্যাক্সি চালায়। মনসা মাসি টিবি হয়ে মারা গেল আর সেই ঘরে বিষ্টু আর ময়না ঘর বাঁধল। ছোটবেলা থেকে পড়াশুনার বড় শখ ছিল, বারো ক্লাস পর্যন্ত পড়েছিল তাই ইংরাজিটা পড়তে পারত। মাঝে মাঝেই ডেবোনেয়ার, ফ্যান্টাসি, চ্যাসটিটি ইত্যাদি ইংরাজি পরনোগ্রাফির বই কিনে আনত, তাতে ওর দুটো কাজ একসাথে হয়ে যেত, এক ইংরাজি পড়া আর দ্বিতীয় ওই নগ্ন মেয়েদের ছবি দেখে আত্মরতি করা। ট্যাক্সি চালানোর পরে একটা সেকেন্ড হ্যান্ড টিভি কেনে, বেশির ভাগ সময়ে ইংরাজি সিনেমা দেখে কাটায়, মন দিয়ে ওদের কথোপকথন শোনে আর মাঝে মাঝে মনে মনে আউরায়। ইংরেজি সিনেমার নায়িকা গুলো সবাই বেশ রসে ভরা, কম জামাকাপড় পরে সমুদ্র সৈকতে শুধু মাত্র বিকিনি পরে ঘুরে বেড়ায়।

এই কালীপাড়ার বস্তির কার দেয়াল কোথায় শুরু আর কোথায় শেষ সেটা বলা মুশকিল। দরমার বেড়ার অপাশে বিষ্টুর ঘর। পুরুলিয়ার কোন এক নাম না জানা গ্রাম থেকে বিষ্টু আর ময়না পালিয়ে এসেছে এই মহানগরের আলেয়ার হাতছানির ডাকে। পাশা পাশি ঘর বলে বিষ্টু ময়নার সাথে দানার তুই তোকারির সম্পর্ক। বিষ্টু হাওড়া লাইনে বাস চালায় আর ময়না লোকের বাড়িতে কাজ করে। ময়নার কথা মনে পরলেই দানার বুকের রক্ত চঞ্চল হয়ে ওঠে।
রোজ দিন সকালে ওই কচি শরীরে শাড়ি জড়িয়ে কাজে বের হয়ে যায় ময়না। গায়ের রঙ কালো হলে কি হবে দেখতে বেশ ডাগর, কচি বয়স, ঠোঁট দুটো পুরু, নাক একটু বোঁচা কিন্তু চোখ দুটো বেশ বড় বড় আর কাজল কালো। ব্লাউসটা যেন ইচ্ছে করেই ছোট করে বানিয়েছে না ওর চোখের ভুল। শাড়ির গিঁট নাভির এক মাইল নিচে। পেটে কোমরে ঠিক অতটাই মেদ যতটা দলাই মালাই করে চটকাতে ভালো লাগে। সকাল সকাল কাজে বের হলে দানা উঁকি মেরে একবার ময়নাকে দেখে। ওর যাওয়ার পথের দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে থাকে দানা, পিঠের ওপরে দুলতে থাকে কালো সাপের মতন লম্বা বেনুনি।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

অভিনব প্রতারনা - ডিজিটাল প্রতারক

লিখেছেন শোভন শামস, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:১৮



একটি সাম্প্রতিক সত্য ঘটনা।
মোবাইল ফোনে কল আসল, একটা গোয়েন্দা সংস্থার ছবি এবং পদবী সহ। এই নাম্বার সেভ করা না, আননোন নাম্বার। ফোন ধরলাম। বলল আপনার এই নাম্বার ব্যবহার করে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আগে নিজেকে বদলে দিন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:৪১



"আমার স্বামী সংসারের কুটোটাও নাড়ান না। যেখানকার জিনিস সেখানে রাখেন না। মুজা খুলে ছুঁড়ে যেখানে সেখানে ফেলে দেন। নিজেকে পরিষ্কার রাখতে বারবার ভুল করেন! এতো বছর বিবাহিত জীবন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×