somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বর্ষা এবং জলের গল্প

২২ শে জুলাই, ২০১১ রাত ১:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আজ সকাল থেকে বর্ষার মনটা খুব খারাপ। কারন বৃষ্টি। নাম বর্ষা হলেও বর্ষাকাল ওর একদম পছন্দ নয়। গত রাত থেকে ইলশে গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। এখন বিকেল সাড়ে পাঁচটা বাজে, একটু পরেই সন্ধ্যা নামবে। এখনও বৃষ্টি থামার কোন লক্ষন নেই। নীজের রুমে সুন্দর করে সেজে গুজে বসে আছে বর্ষা। প্রইভেট পড়তে যাওয়ার জন্য রেডি হয়েছিল কিন্তু মায়ের ঝাড়ি খেয়ে গোমড়া মুখে বসে মনে মনে বৃষ্টির ছোদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করছে বর্ষা।

অদিত্য কিন্তু আজ বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছে। আজ সে নীজের রুম থেকে বেরুচ্ছে না। কারন বর্ষা। বর্ষা কাল ওর কেমন লাগে সেটা কখনও ভেবে না দেখলেও বর্ষা কে কিন্তু ওর দারুন লাগে। বর্ষা আর অদিত্য পাশাপাশি বাসায় থাকে। ওর জনালা দিয়ে তাকালে বর্ষার রুম স্পষ্টভাবে দেখা যায়। বর্ষার রুমের দক্ষিন পাশের জানালা খোলা থাকলেতো কোন কথাই নেই। অদিত্যর এই রুমে আগে ওর বড় ভাই থাকত। ভাইয়া পড়াশুনার জন্য ঢাকা চলে যাওয়ার পর ও এখানে এসেছে। পড়াশুনা খুব একটা না হলেও লুকিয়ে লুকিয়ে বর্ষাকে দেখে সময় কিন্তু বেশ ভালই কাটছে।

ছোট বেলা থেকে ওরা এক সাথে বেড়ে উঠেছে। এখন ইন্টারমিডিয়েডে একই কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে প্রথম বর্ষে পড়ছে। ওরা খুব ভাল বন্ধু। কিন্তু অদিত্য মনে মনে বর্ষাকে প্রচন্ড ভাবে ভালবাসে। একসাথে কলেজে, স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়তে গেলেও বর্ষাকে কখনও বলা হয়নি ভালবাসার কথা। কারন বর্ষা পড়াশুনার ব্যাপারে বেশ সিরিয়াস। পাড়ায় সুন্দরী মেয়ে হিসেবে বর্ষার বেশ পরিচিতি থাকার কারনে অনেক ছেলেই ওর পিছনে লাইন দিয়ে আছে। সেদিকে নজর দেয়ার সময় নেই। কারন ওর স্বপ্ন ভাল ভাবে পড়াশুনা করে ডাক্তার হওয়া। এস এস সিতে বর্ষা গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছে। অদিত্য এক সাবজেক্টের জন্য গোল্ডেন না পেলেও এ প্লাস পেয়েছে। অদিত্যকে ইন্টারে যেভাবেই হোক ভাল রেজাল্ট করতেই হবে। কারন বর্ষাকে অপন করে পেতে হলে পড়াশুনা করা ছাড়া কোন গতি নেই। কিন্তু পড়ায় যে একদম মনই বসছে না।

“এই বর্ষা শুনেছিস জয় ভাইয়া নাকি রাড়ি ফিরেছে।” কলেজের বাড়ান্দায় আনমনে দাড়িঁয়ে থাকা বর্ষাকে পিছন থেকে ডাক দিয়ে ওর বান্ধবী সিন্ধা বলল।
“কোন জয় ভাইয়?” বর্ষা বলল।
“আরে শ্যামল কাকার ছেলে।” সিগ্ধা বেশ উৎসহ নিয়ে বলল।
“এতে এত খুশি হওয়ার কি আছে?” বর্ষা কৈতুহল মাখা চোখে জানতে চাইল।
“জয় ভাইয়া কেমিষ্টিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে মাষ্টার্স করে এসেছে। আমাদের আতিয়ার স্যারতো বদলি হয়ে চলে গেছেন। চল তার কাছে গিয়ে দেখি প্রাইভেট পড়া যায় কিনা।” সিন্ধা এক নিঃশ্বাসে কথা গুলো বলল।
“বেশ বলেছিসতো ! চল অন্যদের সাথে কথা বলে জয় ভাইয়ার সাথে দেয়া করতে যাই।” বলে সিগ্ধাকে নিয়ে অন্য বান্দবীদের সাথে কথা বলার জন্য ক্লাসের দিকে পা বাড়ায় বর্ষা।

স্টুডেন্ট লাইফে জয় টিউশনি আর কোচিং সেন্টারে পড়িয়ে আনেকটা সাময় পর করেছে। বাড়ী এসে নতুন করে এ কাজ কারার কোন ইচ্ছাই ওর ছিল না। কিন্তু কলেজের ছেলে মেয়েরা এত করে বলল যে আর না করতে পারেনি। তাছাড়া কোন চাকরিতে জয়েন্ট করার আগে সময়টা অলস ভাবে কাটিয়ে লাভ কি? তাই আবার ও নতুন করে পুরোনো পেশায় মনযোগ দিয়েছে জয়। প্রতিদিন সকাল বিকেল দু’বেলা ছাত্র ছাত্রী এসে পড়ে যায়। পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকার কারনে খুব অল্প সময়ে মফস্বল এই শহরে বেশ পরিচিত হয়ে যায় জয়।

আজ অদিত্য আর বর্ষা এক সাথে বের হয়েছে। উদ্দেশ্য জয় স্যারের কাছে পড়তে যাওয়া। প্রয়ই ওরা একসাথে যায়। কিন্তু প্রতিদিনের মত আজ অদিত্য ভাল মুডে নেই। কারন কাল থেকে স্যার বলেছে ছেলে মেয়েদের ব্যাজ আলাদা করে দিবে। বর্ষার সাথে আর যাওয়া হবে না।
“কিরে চুপ করে আছিস কেন?” অদিত্যের নীরবতা দেখে বর্ষা বলে।
“কিছুনা এমনিতেই” জয়ের সংক্ষিপ্ত জবাব।
“এতদিন তোর সাথে একসাথে আসা যাওয়া করতাম। এখন আলাদা হতে হবে বলে মন খারাপ?” বর্ষা মিষ্টি হাসি দিয়ে দুষ্ট চেখে তাকিয়ে বলল।
“না.. মানে...” অদিত্য ইতস্থত করে বলতেই মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বর্ষা বলল:
“দেখ তুই কিন্তু ইদানিং পড়াশুনায় বেশ ফাকি দিচ্ছিস। এটা কিন্তু মোটেই ভাল না।”
“তোর কাছে আসলেই শুধূ পড়াশুনার গল্গ!! আর কোন কথা নেই” অদিত্য বিরক্ত হয়ে বলল।
“না নেই। দেরি হয়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি চল।” বলে দ্রুত পায়ে হাটা ধরল বর্ষা। অদিত্যও ছুটল ওর পিছুপিছূ।

কোচিং এর সব ছাত্র ছাত্রীদের মুখে জয় স্যারে প্রশংসা। স্যারে ব্যাক্তিত্ব সম্পন্ন চেহারা, পড়ানোর ধরন, ব্যাবহার সবকিছূ যেন মোহের মত আবিষ্ট করে রাখে সব ছাত্র ছাত্রীদের। বিশেষ করে ছাত্রীরাতো স্যারের প্রচন্ড রকম ভক্ত। অনেকে আবার স্যারের সাথে প্রেম করার জন্য বেশ ভাল ভাবেই চেষ্টা করছে। কিন্তু স্যারের কাছ থেকে সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। মেয়েদের ব্যাজ বিকেলে। পড়া শেষে বর্ষা ওর কয়েক জন বান্ধবীদের সাথে বাড়ী ফিরছে। অদিত্যর ব্যাজ আলাদা হওয়ার পর ও এভাবেই ফিরে। উচ্ছাস তরুণীদের চলতি পথের আলোচনার বিষয় হচ্ছে জয় স্যার।
“জয় স্যারের মত একটা হ্যান্ডস্যাম ছেলের সাথে যদি প্রেম করতে পারতাম!!” স্নিগ্ধা বেশ মজা করে বলল।
“তোমার এই চেহায় কাজ হবে না।” রুনু তাচ্ছিল্যের সুরে বলল।
“হ.. তুমিতো মালেকা বানু। তোমার প্রেমে হাবুডুবু খাবে।” স্নিগ্ধার বিরক্তি মাখা জবাব।
“এই অযথা তোরা ঝগড়া করছিস কেন? স্যার আমাদের কার প্রেমেই পড়বে না। দেখিস না পড়ানো ছাড়া আমাদের দিকে ফিরেই তাকায় না।” সালমা বলল।
“আমার মনে হয় বর্ষা একটু চেষ্টা করলে হবে।” স্নিগ্ধা মিষ্টি হেসে বলল।
“ওতো আবার প্রেম টেম পছন্দ করে না।” সালমা বলল।
“রাস্তায় যেভাবে প্রেম নিয়ে বিতর্ক করছিস, যদি কেউ শুনে তবে সবার কোচিং করা বন্ধ হবে। তাড়াতাড়ি বাড়ী চল।”এক নিঃশ্বাসে কথা গুলো বলে দ্রুত পায়ে হাটা শুরু করে বর্ষা। চঞ্চল তরুনীর দলও উচ্ছাসে হেসে উঠে বর্ষার পিছু নেয়।

বর্ষার আব্বু আজ ওকে কোচিং সেন্টারে দিয়ে গেছেন। বাইরে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। ওর অন্য বান্ধবীরা এখন ও আসেনি। বার্ষা মনে মনে গত কালের আড্ডার কথা গুলো ভাবছে আর আনমনে বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছে। সবাই কেমন জয় স্যারের ভালবাসা পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতায় নেমেছে। ভাবতেই প্রচন্ড হাসি পায় বর্ষার। জয়কে ওর ও বেশ ভালই লাগে। ইদানিং বান্ধবীদের কাছে সাব সময় স্যারের প্রসংশা শুনতে শুনতে প্রায়ই ওর চোখের সামনে স্যারের মুখ ঘোরাফেরা করে। এখন ও চোখ বন্ধ করে জয়কে দেখতে পাচ্ছে।
“বর্ষা তুমি আজকে এত আগে আসলে! তোমার বান্ধবীরা কোথায়?” চেয়ার টেনে নিয়ে বসতে বসতে জয় বলল।
“না.. মানে.. আব্বু দিয়ে গেছে।” হঠাৎ ডাকে হতচকিত বর্ষা ইতস্থত করে বলে।
“তোমাকে তো আজ বেশ সুন্দর লাগছে!!” বর্ষার দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে জয় বলে।
বর্ষা মিষ্টি হাসি দিয়ে লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলে। স্নিগ্ধা রুমা সহ কয়েকজন মেয়েরা রুমে প্রবেশ করে। স্যার ব্যাস্ত হয়ে যায় পড়া নিয়ে। বর্ষার কানে বার বার বাজছে জয়ের শেষ কথাটা।

ইদানিং প্রায়ই বর্ষার আব্বু ওকে কোচিং এ দিয়ে যায়। সবাই আসার আগে আসে বর্ষা। স্যারের সাথে মিষ্টি হাসি বিনিময় হয়। মাঝে মাঝে কথাও হয়। এভাবে কখন যেন ওরা দু’জন খুব কাছাকাছি চলে আসে। জয়ের প্রতি বর্ষার ভাল লাগা ভালবাসায় পরিনত হতে থাকে। বর্ষার হৃদয়ের মাঝে আস্তে আস্তে জয়ের হাসি মুখের একটি ছবি তৈরি হয়। ও দু’চোখ বন্ধ করলে সে ছবি দেখতে পায়, আর মনে মনে পুলকিত হয়। একদিন বৃষ্টি ভেজা অলস বিকেলে বর্ষা বসে আছে জয়ের সামনে। রুমে ওরা দু’জন ছাড়া আর কোন প্রানীর অস্তিত্ব নেই। জয় বর্ষার দিকে এগিয়ে এসে হাতে হাত রাখে। বর্ষা উঠে দাড়ায়। ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে জয় বলে “আমি তোমাকে ভালবাসি...”। বর্ষা কিছুই বলতে পারেনি। জয়ের মুখের দিকে এক নজরে চেয়ে থেকে মিষ্টি হাসি দিয়ে ওর লমশ বুকে মাথা লুকায়।

নদী কলকল শব্দে বয়ে চললেও নিঃশব্দে চলে যায় দিন-মাস-বছর। জয় ও বর্ষার ভালবাসা কোন এক দুর্বল মুহুর্তে দৈহিক সম্পর্কে পরিনত হয়। বর্ষা বাধা দিতে পারেনি বরং বার বার জয়ের বাহুডোরে ধরা দিয়েছে। যার ফলে ওর গর্ভে সন্তানের বীজ বপন হয়। জয়কে সব বললে সামনে ইন্টার পরীক্ষার দোহাই দিয়ে এবোশন করতে বলে। ওর এক বন্ধুর বাসায় নিয়ে মুসলমান হয়ে বর্ষাকে বিয়ে করবে বলে প্রতিশ্র“তি দেয়। বর্ষা কোন উপায় না দেখে রাজি হয়ে মফস্বলের কোন এক ক্লিনিকে গিয়ে জীবনের আগেই মৃত্যু উপহার দিয়ে আসে অনাগত অতিথীকে।

ইন্টার পরীক্ষা শেষ হয়েছে। সবাই রেজাল্টে জন্য অপেক্ষা করছে আর বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কিংবা বুয়েটের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। জয় নতুন চাকরি নিয়ে ঢাকা চলে গেছে। ইদনিং বর্ষার সাথে খুব একটা যোগাযোগ করে না। বর্ষা ফোন দিলে বিভিন্ন কথা বলে এড়িয়ে যায়। বর্ষা এখন আর আগের মত চঞ্চল হরিনীর ন্যায় ছুটে বেড়ায় না। আগের মত রুপ লাবণ্যও আর নেই। নানা রকম অসুখ বিসুখের কারনে খুব ভাল পরীক্ষা দিতে পারেনি। তাই ভর্ত্তির জন্য কোথাও কোচিং করছেনা। এদিকে অদিত্যর পরীক্ষা খুব ভাল হয়েছে। ও ঢাকা চলে গেছে বড় ভাইয়ের কাছে থেকে মেডিকেলের জন্য কোচিং করতে।

কিছুদিন পরে ইন্টার পরীক্ষার রেজাল্ট বের হয়। অদিত্য এবার গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছে। আর বর্ষা পেয়েছে এ গ্রেড। অদিত্য ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্ত্তি হয় আর বর্ষা মফস্বলের কলেজে। জয়ের সাথে বর্ষার কোন যোগযোগই নেই। আগের মোবাইল নম্বরটা বন্ধ করে দিয়েছে। অনেক দিন হল বাড়ীও আসে না। বর্ষা অনেক চেষ্টা করে জানতে পেরেছে, ঢাকা থেকেও ওকে নাকি বদলী করে দিয়েছে। ও বুঝতে পারে জয় ওকে মন থেকে ভালবাসে নি। ভালবেসেছে ওর রুপ লাবল্য আর যৌবনকে। এখন বর্ষার চোখে র্নিঘুম রাত আর দু’চোখের জল ছাড়া আর কিছূই দেখা যায়না।

বর্ষার পরিবার বিয়ের জন্য পাত্র দেখে। ওর বাবার বন্ধুর ছেলে সেলিমের সথে বিয়ে ঠিক হয়। সেলিম একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে ভাল বেতনে চাকরি করে। ছেলে পক্ষ আংটি পড়িয়ে গেছে বর্ষাকে। কিছুদিন পরেই বিয়ে। কিন্তু ইদানিং প্রায় রাতে একটি দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙ্গে যায় বর্ষার। দেখে ওর নষ্ট করা সন্তান ওর পিছুপিছু হাটে আর কেঁদে কেঁদে বলে “ মা!!! আমাকে তুমি মেরে ফেললে?”। বর্ষা চিৎকার করে কেঁদে উঠে বসে। পাশের রুম থেকে বর্ষার মা ছুটে আসে। মাকে জড়িয়ে ধরে কান্নার সগরে ভেসে যায় বর্ষা। মা মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে, জানতে চায় দুঃস্বপ্নের কথা। কিন্তু বর্ষা জয়ের সাথে ওর গোপন প্রেমের কথা কাউকে বলেনি। বলতে পারে না কখনও।

আগামী পরশু সেলিমের সাথে বর্ষার বিয়ে। বাড়ীতে ব্যাপক ভাবে আয়োজন চলছে। একমাত্র মেয়ে বলে কথা। বর্ষার অন্তর পুড়ছে নরকের অনলে, কিন্তু কাউকে বলতে কিংবা দেখাতে পারছে না ওর যন্ত্রনা। পুকুর পাড়ে বসে স্মৃতির পাতা উল্টে হিসেব করছে হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো। হঠাৎ মোবাইল ফোনের শব্দে ভাবনার আকাশে ছেদ পরে। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখে স্নিগ্ধার নম্বর হতে কল এসছে। রিসিভ করে কানের কাছে আনতেই স্নিগ্ধার ব্যাস্ত কন্ঠে ভেসে আসে-
“এই বর্ষা শুনেছিস!! জয় স্যার নাকি আজ সকালে বাড়ী এসেছ। তোর বিয়ের দাওয়াত দিবি না??”
বর্ষা স্তব্ধ হয়ে যায়। মোবাইল ফোনটা হাত থেকে পরে গেছে । স্পিকার থেকে ভেসে আসছে স্নিগ্ধার “হ্যালো! হ্যালো!!” শব্দ। বর্ষা যেন পাথর হয়ে আছে, মুখ থেকে কোন কথা বের হচ্ছে না। মনে হচ্ছে যেন সমস্ত পৃথীবি ওর মাথার উপর চক্রাকারে ঘুড়ছে। সম্ভিত ফিরে পেলে বর্ষা দ্রুত পায়ে বের হয়ে যায় জয়ের বাসার উদ্দেশ্যে।

বর্ষা নিজের রুমের ভিতর থেকে বন্ধ কারে বসে আছে। সন্ধ্যা থেকে এভাবে নিজেকে বন্ধী করে রেখেছে ও। জয়ের কাছ থেকে আসার পর থেকে। ওদের সব সম্পর্কের কথা অস্বীকার করেছে জয়। এমন ভাব করেছে যেন বর্ষাকে সে চিনেই না। এখন বাজে রাত ১১ টা। বর্ষার মা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ডাকা ডাকি করছে। আগেও কয়েক বার ডেকে গিয়েছে কিন্তু কোন কাজ হয়নি। এবার অনেক সময় ধরে ডাকছেন। দরজা না খোলা পর্যন্ত থামবেন না এ প্রতিজ্ঞা তার চোখে মুখে। অবশেষে কান্না ভেজা চোখে দরজা খুলে মায়ের বুকে আচড়ে পরে বর্ষা, ওর দু’চোখ তখন বাঁধ ভাঙ্গা নদী। ঘটনার আকস্বিকতায় হচকিত বর্ষার মা মেয়েকে নিয়ে বিছানায় বসিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন-
“কি হয়েছে মা? তুই এ বিয়েতে রাজি না? তোর মত না থাকলে বিয়ে হবে না। কি হয়েছে খুলে বল। তুই আমাদের একমাত্র মেয়ে তোর মতের বাইরে আমরা কিছু করব না...।”
বর্ষা ওর মাকে জয়ের সাথে ঘটে যাওয়া সব ঘনটা খুলে বলল। রতে ঘুম ভাঙ্গা সেই দঃস্বপ্নের কথাও বলে। সব শুনে বর্ষার মা পাথর হয়ে বসে আছেন। একমাত্র মেয়ের এত দিনের পুশে রাখা কষ্টের শান্তনা দেয়ার কোন ভাষাই তার মুখে আসছে না। শুধু দু’চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে নোনা জল।

অদিত্য আজ ছুটিতে বাড়ী এসছে। সন্ধ্যার একটু আগে এসে পৌছেছে। মেডিকেলে পড়া শুনার চাপের জন্য বাড়ীতে আসার খুব একটা সুযোগ হয় না। অথচ সব সময় এই মফস্বল শহরে ছুটে আসার জন্য মন কাদেঁ। সবাই কে ও খুব মিস করে। স্কুল কলেজের বন্ধু, মহল্লার ক্রিকেট ক্লাবের টিমমেট-বড় ভাই, আত্বীয় স্বজন আর বর্ষা। যে ওর হৃদয়ে বসবাস করে। যাকে পাওয়ার জন্য ওর এই পথ চলা। সাবার সাথে দেখা করে অদিত্য নিজের রুমে এসেছে বর্ষাকে দেখার জন্য। অনেক দিন পর আবার সেই জনালার পাশে বসে বর্ষা দেখে পুলকিত হতে গিয়ে শিহরিত হল অদিত্য। বর্ষার চোখে জল। শুধু জল আর জল। ভালবাসার নদীতে নৌকা ভাসিয়ে বর্ষা কখন যে সাগরে এসে পরেছে তা টের পায়নি। হঠাৎ এক প্রলংকারী ঝড় ভালবাসার নৌকা তছনছ করে উত্যাল ডেউয়ের মাঝে বর্ষাকে ছুড়ে ফেলেছে। বর্ষা ডুবে যাচ্ছে। ডেউয়ের আঘাতে এদিক ওদিক আচড়ে পড়ছে। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। বাচাঁর জন্য আপ্রান চেষ্টা করছে। অদিত্য চেয়ে চেয়ে দেখছে ভালবাসার মানুষের নিঃশেষ হয়ে যাওয়া। কষ্টে, দুঃখে পুড়ে যাচ্ছে হৃদয়। কিন্তু কিছুই করতে পারছে না।

ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে কেটে গেছে আরও দু,টি বছর। বর্ষা নীজের রুমে এক রকম সেচ্ছায় বরন করা বন্ধী জীবন কাটিয়েছে। নীজের পোশা কষ্টের ভাগিদার করতে গিয়ে মা কে হারিয়েছে। কোন আত্বিয় স্বজন বন্ধু-বান্ধব কার সাথে দেখা করেনি, কথা বলেনি। যেন একটি বোবা পুতুলে পরিনত হয়েছিল বর্ষা। অদিত্য সেই ক্লিনিকের পুরানো কাগজ পত্র ঘেটে বর্ষা ও জয়ের সম্পর্কের দলিল খুজে বের করেছিল। এ ঘটনায় পাড়ায় হিন্দু- মুসলমানদের মাঝে সম্পর্কের বেশ টান-পোড়ন সৃষ্টি হয়। এমনকি মামলা, কোট-কাচারি পর্যন্ত যাবার উপক্রম হয়েছিল। কিন্তু বর্ষার র্নিলুপ্ততায় তা হয়নি। কারন জোর করে ভালবাসা আদায় করার কোন প্রমান পৃথীবির ইতিহাসে নেই। তাই সে পথে ও হাটেনি। এদিকে সেলিম ও অন্য কোথাও বিয়ে করেনি। বর্ষার অসহায়ত্ব ওকে সবসময় তাড়া করে বেড়িয়েছে। অনেক বার ইচ্ছে করেছে কাছে গিয়ে মাথায় মমতার হাত বুলিয়ে বলতে “বর্ষা!! পৃথীবির সব পুরুষ প্রতারক নয়। তোমার দুঃসময়ে আমার জমানো ভালবাসা একটুও কমেনি।” কিন্তু পারেনি। কারন বর্ষা সেচ্ছায় বন্ধী নিজের ঘরের চার দেওয়ালের মাঝে।

দুই বছর সাত দিন পর নিজের রুম থেকে বেড়িয়ে অলস এক বিকেলে বাগানের কোনায় গিয়ে বসে বর্ষা। সেলিম ও পথ দিয়েই যাচ্ছিল। বর্ষাকে দেখে পুলকিত হয়ে কাছে এগিয়ে যায়। বর্ষা বিব্রত হয়। সেলিম কোন রাখ ঢাক না পিটিয়ে বর্ষাকে কাছে পেয়ে নিজের মনের মাঝে জোমানো কথা গুলো বলে দেয়। গভীর সাগরে জীবনের সন্ধানে ভাসতে থাকা বর্ষাকে ভালবাসার হাত বাড়িয়ে আবার বিয়ের প্রস্তাব দেয় সেলিম। এজন্য কোন ভাবেই প্রস্তুত ছিল না বর্ষা। তাই এক দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে কথা গুলো শেনার পর মলিন হাসি ছাড়া আর কোন জবাব ছিল না বর্ষার।

অথৈয় সাগরে ভাসমান মানুষ যেমন খড় কুটো পেলেও বাচাঁর আসায় তা আকড়ে ধরে তেমনি সেলিমের বাড়ানো ভালবাসার হাতও অগ্রাহ্য করতে পারেনি বর্ষা। দুই পরিবারের কাররই ব্যাপারটিকে স্বাভাবিক ভাবে মেনে নেয়ার কথা নায়। অন্তত পক্ষে সেলিমের পরিবারতো নয়ই। তাই ওরা সবার অমতে বিয়ে কারে। বর্ষাকে নিয়ে সেলিম ওর চাকরি স্থল ঢাকা চলে যায়। সেলিমের চোখে চোখ রেখে, বুকে মাথা গুজে, বেশ ভাল ভাবেই কেটে যায় বর্ষার সংসার। সময়ের বাউ কুড়ানির ঘূর্ণিপাকে বর্ষা এক সময় সন্তান সম্ভবা হয়। নতুন অতিথির আগমনকে কেন্দ্র করে দু’পরিবারের মাঝে সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে। সবাই বুক বাধে নতুন আশা ও স্বপ্ন নিয়ে। সন্তান প্রসবের সময় ঘনিয়ে আসতেই বর্ষা আবার সেই পুরোনো দুঃস্বপ্ন দেখতে শুরু করে। দেখে ওর নষ্ট করা সন্তান ওর পিছুপিছু হাটে আর কেঁদে কেঁদে বলে “মা!!! আমাকে তুমি মেরে ফেললে?”। বর্ষা চিৎকার করে কেঁদে উঠে। সেলিম মমতার হাত বুলায়, সাহস যোগায়। কিন্তু বর্ষা অজানা আতঙ্কে দিন কাটায়। নির্ধারিত সময়ে বর্ষা মরা সন্তান প্রসব করে।

এদিকে জয় সংসার জীবনের পঞ্চম বর্ষে পদার্পন করেছে। এই সময়ের মাঝে ও বাবা হতে পারেনি। একটা সন্তানের জন্য ওর সংসার জীবন নরকে পরিনত হবার দ্বার প্রান্তে। স্বামী স্ত্রীর মাঝে সব সময় কলোহ বিভেদ লেগে থাকে। জয় ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল। ডক্তার বলেছে কোন এক রোগের কারনে ওর বাবা হওয়ার সম্ভাবনা দিন দিন কমে যাচ্ছে। জয় যন্ত্রনার আগুনে পুড়তে থাকে। মনে মনে ভাবে এটা হয়ত বর্ষার সাথে করা ওর অন্যায়ের প্রয়শ্চিত্ব। সৃষ্টিকর্তা আমাদের উপর অনেক সহনশীল। তাই আমরা অনেক অন্যায় করা স্বত্বেও তিনি তা গোপন রাখেন। নাহলে এই সমাজে অনেক মানুষ আছে যাদের পাপ প্রকাশিত হলে সমাজে বাস করতে পারতনা। মানুষ তাদের থু থু ছিটিয়ে দুর দুর করে সভ্য সমাজ থেকে বের করে দিত। জয় তাদেরই একজন। শুধু বর্ষা না, অনেক মেয়ের নারী জীবনের স্বপ্ন ও নষ্ট করেছে। তাইতো জীবনের এ বেলায় এসে পাপ পূণ্যের হিসেব আর প্রায়শ্চিত্ব করে দিন কাটছে।

বর্ষা এখন অদিত্যর হাসপাতালে আছে। একা একা দু’সন্তানের সাথে কথা বলে, খেলে, আদর করে ব্যাস্ত সময় কাটায়। সেলিমের ভালবাসার হাত এখনও বর্ষার হাত খোঁজে। কখনও পায় আবার পায় না। আর অদিত্য একজন দায়িত্ববান হিসেবে ডাক্তার রোগীর সেবায় ব্যাস্ত। সব রোগীর কষ্টেই ওর মন কাঁেদ কিন্তু বর্ষার রুমে আসলে কেন যেন দু,চোখ স্বজল হয়ে ওঠে। অথচ ডাক্তারদের কাঁদতে নেই।
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাঙালিয়ানা ভোজ ও রুপালি ইলিশের স্বাদ

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৫৫

বন্ধু মারফত খবর পেলাম দেশের বাজার নাকি ভারতীয় ইলিশে সয়লাব। পদ্মার ইলিশের দাম কম, তাই নিম্নচাপ উপেক্ষা করে চলে গেলাম ইলিশের বাড়ি চাঁদপুরে। ঘাটে এসে দেখলাম পুরা বাজার... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম: দাদীর মুষ্টি চালের গন্ধমাখা একটি হারিয়ে যাওয়া শৈশব

লিখেছেন চারাগাছ, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৩:৪৮



ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম: দাদীর মুষ্টি চালের গন্ধমাখা একটি হারিয়ে যাওয়া শৈশব

​ক্যালেন্ডারে নামটা দেখেছেন হয়তো— ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম।
​ছোটবেলায় স্কুলে পড়েছেন যারা, তাদের অনেকের কাছেই নামটা পরিচিত। কারণ, এই নামটার সঙ্গে জড়িয়ে আছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রজ্ঞার জয়ধ্বনি বিজ্ঞান ও যুক্তির মহাকাব্য

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৩৯


ভূমিকা
সকল নবি ও রাসুল প্রতি সালাম ও দুরুদ পর
দাউদের সুরে, মূসার পথে, ঈসার প্রেমের বাণী
মুহাম্মদের মরু পেরিয়ে শুনেছি যুগের ধ্বনি
কৃষ্ণের বাঁশি, বুদ্ধের ধ্যান, সুফির অন্তর সন্ধান
যোগীর তপে, মরমীর গানে খুঁজেছি... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওমীলীগকে সম্পর্কে কি আপনার মনে এখন কোনো পজিটিভ চিন্তা উঁকি দেয়?

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:০৬


বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতি মূলত চারটি বিষয়ের উপর মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পায়।
প্রথমত, মানুষ মনে করে এ দলটি ক্ষমতায় থাকলে স্বাধীনতার সার্বভৌমত্ব রক্ষা পায়। এটা খুবই সত্য যে ১৯৭১ সালে আমাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিরোনামহীন কবিতা-০৭

লিখেছেন কাজী আবু ইউসুফ (রিফাত), ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৪

তোমাকে নিয়ে কক্সবাজারে
সমুদ্রের গান শোনা,
অথবা বান্দরবানের কোনো পাহাড়ের চূড়ায় উঠে
মেঘের ভেলায় হারিয়ে যাওয়ার
কত যে ইচ্ছে—স্ব-যত্নে পুষে রেখেছিলাম
মনের গহীনতম কোণে!

কোনো এক ঈদের পড়ন্ত বিকেলে—
অকারণ কাঁপা আঙুলে
একটি খুদে বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলাম
তোমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×