somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যাদের মৃত্যু ফোটায় আলো

০৯ ই জুলাই, ২০২০ রাত ৮:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



২৯ মার্চ ১৯৮৪ সালে তিউনিসিয়ার কোনো এক অঞ্চলে মুহাম্মদ বুআজিজির জন্ম। ৩ বছর বয়সে বাবা মারা যান। ১০ বছর বয়সে বালক অবস্থায় তিনি ফুটপাতে ফলমূল ও শাক-সবজি বিক্রি করতেন। বাকি দশ জন যুবকের মত তারও স্বপ্ন ছিল সামান্য চাকরি, রুটিরুজির ন্যূনতম অবলম্বন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র‍্যাজুয়েশন শেষ করে চাকরির আশায় ঘুরে বেড়িয়েছেন দ্বারে দ্বারে। ঘুষ দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় মাস ও বছর পেরিয়ে দেখা পাননি চাকরি নামের সোনার হরিণের। শেষপর্যন্ত তিনি আবার পথে নামেন। সামান্য পুঁজি ধার করে স্থানীয় বাজারে ও অলিতে-গলিতে কখনো সবজি আবার কখনো ফল বিক্রি করতেন। এতে যৎসামান্য উপার্জন হতো, বৃদ্ধা মায়ের মুখে তুলে দিতে পারতেন দু'মুঠো আহার। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্র সেখানেও বাধা হয়ে দাঁড়ালো। তিউনিসিয়ায় ফুটপাত হোক বা কর্পোরেট— সব ব্যবসায় সরকারের অনুমোদন লাগে। বুআজিজির এ ধরনের কোনো অনুমোদন বা ট্রেড লাইসেন্স ছিল না। সরকারি দফতরে ঘুষ দিয়ে লাইসেন্স তৈরির সামর্থ্যও ছিল না।


১৭ ই ডিসেম্বর ২০১০ সালে বুআজিজি তিউনিসিয়ার সিদি বুজিদ শহরে ফল বিক্রি করছিলেন। এমন সময় ঘুষের জন্য পৌরসভার নারী পুলিশ ইন্সপেক্টর ফাইদা হামদি সাথে কথা কাটাকাটি বেধে যায়। একপর্যায়ে ইন্সপেক্টর বুআজিজির সকল পণ্যসহ ঠেলাগাড়িটি আটক করে নিয়ে যায়। বুআজিজি তার পণ্যসহ গাড়িটি ফিরে পেতে অনেক অনুনয় বিনয় করে। কিন্তু তাতেও মন গলে না নগর কর্তৃপক্ষের। ঋণ করে যা যোগার করেছিলেন পুলিশ তার সবটুকুই কেড়ে নিল। বেঁচে থাকার সবকটি পথ তারা বন্ধ করে দিল।

নানা লাঞ্ছনা বয়ে নিয়ে গ্র‍্যাজুয়েশন করা ২৬ বছর বয়সী বুআজিজি বেছে নিলেন আত্মহননের পথ। বাজার থেকে পেট্রোল এনে নিজেকে জ্বালিয়ে দেন সরকারি ভবনের সামনে। নিপীড়নের বিরুদ্ধে এরচে জোরালো প্রতিবাদের ভাষা আর তার জানা ছিল না বুঝি! সিদি বুজিদের এই আগুন শুধু আজিজির দেহই পুড়িয়ে দেয় নি। তার শরীরের সেই আগুনের খবর দাবাগ্নির মতো ছড়িয়ে পড়েছে দেশ থেকে দেশান্তরে। উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে সেই আগুনের আঁচ লাগে সবার আগে। এরপর তা ছড়িয়ে পড়ে আরব বিশ্বসহ সমগ্র বিশ্বে। ইতিহাসের পাতায় এই দাবানলের নাম হয়ে দাঁড়ালো 'আরব বসন্ত'। তিউনিস জনতার হৃদয়েও দাউ দাউ করে জ্বলে উঠছিল মুহুর্তে। চাপা ক্ষোভ-ক্রোধ আর পুঞ্জিভূত ঘৃণার দাবানল সহসা জাগিয়ে তুলছিল তিউনিসবাসীকে। ইতিহাসের নতুন যাত্রার সেই শুরু মানুষের পৃথিবীকে এক নতুন গন্তব্যের ঠিকানা চিনিয়ে দিলেন একদিন আগেও অপরিচিত একজন আজিজি।


এখানে আজিজি গায়ে আগুন লাগিয়েছিলেন

আজিজির মত একই শহরের অন্য এক যুবক বৈদ্যুতিক তার গায়ে পেঁচিয়ে আত্মাহুতি দেওয়ার পর পুরো তিউনিসিয়া আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠে। বাঁচা-মরা কবুল করে স্বৈরাচারী নিপীড়কের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে জনগণ। ২০১০ সালের ১৭ ই ডিসেম্বর গায়ে আগুন দেন আজিজি। আগুনে ঝলসে গেলেও তাৎক্ষণিক মারা যাননি তিনি। ১৮ দিন মৃত্যুর সাথে লড়াই করে ৪ জানুয়ারি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন আজিজি। এর দশ দিনের মাথায় তিউনিসিয়া ছেড়ে পালিয়ে যায় নিপীড়ক-শাসক বিন আলি।

আরব বিশ্বকে জাগিয়ে তোলার মহানায়ক বুআজিজিকে হারিয়ে কাতর নন তার মা মানুবিয়া আজিজি। তিনি মনে করেন তার ছেলে তাবৎ বিশ্বের সন্তান। আজিজির এই আত্মহনন শুধু আরব নয়; বরং সারাবিশ্বে ধাক্কা লাগে। তিউনিসিয়ার বিপ্লবের রেশ ছড়িয়ে পড়ে মিশরে। গনআন্দোলের তীব্র প্রবাহ আঘাত হানে লিবিয়া ও ইয়েমেনে।বর্তমানে মুক্তিকামী মানুষের সংগ্রাম চলছে সিরিয়ায়। আজিজির মা 'দ্যা সান' পত্রিকায় সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ছেলের জন্যে আমি গর্বিত, এখন আরও বেশি গর্ব অনুভব করছি। মুহাম্মদ বুআজিজি নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে গোটা আরববিশ্বে স্বাধীনতার স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে দিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আজিজি আমাদের জাতি ও গোটা বিশ্বকে জাগিয়ে তুলেছে। সে আমার একার সন্তান নয়; গোটা বিশ্বের সন্তান।’

পৈতৃক সিভি সালার মাটিতে চিরশয্যায় শায়িত আছেন আজিজি। এই মহানায়কের কবরের পাশে উড়ছে তিউনিসিয়ার লাল পতাকা।


তথ্যসূত্র:

–সাঈদ মুহাম্মদ আবরার, শ্বেত সন্ত্রাসের এই সময়

–https://www.britannica.com › Moha...
Mohamed Bouazizi | Tunisian street vendor and protester | Britannica

–www.middleeastmonitor.com
Remembering Mohamed Bouazizi and the start of the Arab Spring

–www.middleeasteye.net
'He achieved nothing': Bitter legacy of Tunisian vendor who sparked uprising

সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই জুলাই, ২০২০ রাত ৮:০২
৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকের ব্লগার ভাবনা: ব্লগ জমছেনা কেন? এর পেছনে কারণ গুলো কি কি? ব্লগাররা কি ভাবছেন।

লিখেছেন লেখার খাতা, ১৩ ই জুন, ২০২৪ রাত ৮:৩৫


সুপ্রিয় ব্লগারবৃন্দ,
আম পাকা বৈশাখে বৈশাখী শুভেচ্ছা জানিয়ে শুরু করছি। কাঠফাটা রোদ্দুরে তপ্ত বাতাস যেমন জনপ্রাণে একটু স্বস্তির সঞ্চার করে, ঠিক তেমনি প্রাণহীন ব্লগ জমে উঠলে অপার আনন্দ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঢাকার ২৭ নম্বর সমুদ্রবন্দর থেকে

লিখেছেন অপু তানভীর, ১৩ ই জুন, ২০২৪ রাত ১১:০০

চারটার দিকে বাসায় ফেরার কথা ছিল । তবে বৃষ্টির কারণে ঘন্টা খানেক পরেই রওয়ানা দিতে হল । যদিও তখনও বৃষ্টি বেশ ভালই পড়ছিল । আমি অন্য দিন ব্যাগে করে রেইনকোন... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুক্তিযুদ্ধা কোটা ব্যাবস্থা কাউকে বঞ্চিত করছে না।

লিখেছেন হাসান কালবৈশাখী, ১৪ ই জুন, ২০২৪ রাত ৩:৩২

কোটা ব্যাবস্থা কাউকে বঞ্চিত করছে না।
সকল যোগ্যতা জিপিএ-্র প্রমান দিয়ে, এরপর প্রিলিমিনারি পরীক্ষা, সেকেন্ডারি।
এরপর ভাইবা দিয়ে ৬ লাখ চাকুরি প্রার্থি থেকে বাছাই হয়ে ১০০ জন প্রাথমিক নির্বাচিত।

ধরুন ১০০... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিউ জার্সিতে নেমন্তন্ন খেতে গিয়ে পেয়ে গেলাম একজন পুরনো ব্লগারের বই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১৪ ই জুন, ২০২৪ দুপুর ১২:৩৭

জাকিউল ইসলাম ফারূকী (Zakiul Faruque) ওরফে সাকী আমার দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু; ডাঃ আনিসুর রহমান, এনডক্রিনোলজিস্ট আর ডাঃ শরীফ হাসান, প্লাস্টিক সার্জন এর। ওরা তিনজনই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের একই... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেনজীর তার মেয়েদের চোখে কীভাবে চোখ রাখে?

লিখেছেন বিচার মানি তালগাছ আমার, ১৪ ই জুন, ২০২৪ বিকাল ৩:০৬


১. আমি সবসময় ভাবি দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর যারা মিডিয়ায় আসার আগ পর্যন্ত পরিবারের কাছে সৎ ব্যক্তি হিসেবে থাকে, কিন্তু যখন সবার কাছে জানাজানি হয়ে যায় তখন তারা কীভাবে তাদের স্ত্রী,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×