somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জর্জ হ্যারিসনকে বিলম্বিত অভিবাদন - পর্ব 1

২৫ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ সকাল ১১:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

[25 ফেব্রুয়ারি জর্জ হ্যারিসনের জন্মদিন। জীবিত থাকলে এই দিনে তাঁর বয়স হতো 64। বীটলস-এর একটি গানের শিরোনাম ছিলো 'হোয়েন আই অ্যাম সিক্সটি ফোর'। চার বীটলস-এর দু'জন পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন 'সিক্সটি ফোর' হওয়ার আগেই। জন লেনন 40-এ, জর্জ হ্যারিসন 58 বছর বয়সে। পল ম্যাকার্টনি ও রিংগো স্টার অবশ্য কিছুকাল আগে 'সিক্সটি ফোর' হয়েছেন।]

এক.
নভেম্বর 30, 2001। প্রতিদিনের অভ্যাসমতো সকালে কর্মক্ষেত্রে রওনা হওয়ার আগে এক কাপ কফি নিয়ে টিভির সামনে বসেছি। সংবাদ শিরোনামের সুন্দরী সংবাদ পাঠিকাকে গম্ভীর মুখ করে বলতে শুনলাম, 58 বছর বয়সী জর্জ হ্যারিসন লোকান্তরিত হয়েছেন আগের দিন দুপুর দেড়টায়।

শুনে স্তব্ধ হয়ে খানিকক্ষণ বসে থাকি। অফিসে যাওয়ার ইচ্ছে মুহূর্তে অন্তর্হিত _ খুব নিকটজনের মৃতু্যতে যেরকম হয়। পরিচয় দূরের কথা, জর্জ হ্যারিসনকে স্বচক্ষে দেখার কোনো সম্ভাবনাও তৈরি হয়নি কখনো। কিন্তু আত্মার পরম আত্মীয়ই ছিলেন তিনি, অনেক বছর ধরে। আমার মতো আরো লক্ষ লক্ষ মানুষ বীটলস-এর জন লেনন, পল ম্যাকার্টনি, জর্জ হ্যারিসন ও রিংগো স্টারকে সহযাত্রী ও একান্ত আপন মানুষ ভাবতে আজও পছন্দ করেন।

ষাটের দশকের মাঝামাঝি বীটলস গ্রুপটি খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে যায়। ইংল্যান্ডের লিভারপুলের এই চার যুবকের সম্মিলন পাশ্চাত্যের রক ও পপ সঙ্গীতের ইতিহাস-ভূগোল সব পাল্টে দিয়েছিলো। সঙ্গীত যে মানুষের চিন্তা-চেতনা ও জীবনযাত্রাকে, সমাজ ও রাজনীতিকে নতুন ধারায় প্রবাহিত করে দিতে পারে, তা দেখা গিয়েছিলো এই সময় থেকে। প্রথা ও প্রতিষ্ঠান বিরোধী সঙ্গীত রক অ্যান্ড রোল, বীটলস তাতে যোগ করে এক নতুন মাত্রা। পাশের বাড়ির ছেলেটির মতো প্রিয়দর্শন এই চার যুবক মনোহর ও বিচিত্র সঙ্গীত সৃষ্টির পাশাপাশি তাদের দুর্দান্ত রসবোধ এবং বুদ্ধিদীপ্ত ও প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা সহজ ব্যক্তিত্ব দিয়ে সারা পৃথিবীর হৃদয় হরণ করতে সক্ষম হন।

বীটলস নামের গ্রুপটির যাত্রা শুরু 1960-এ, মারমার-কাটকাট জনপ্রিয়তা 1962 থেকে। শুরুতে তা ছিলো ইংল্যান্ডকেন্দ্রিক। 64-তে প্রথমবারের মতো আমেরিকা যাত্রা ও বিজয়, ক্রমে সারা পৃথিবী। 1970-এ গ্রুপ ভেঙে যায় লক্ষ লক্ষ ভক্ত-শ্রোতা ও সঙ্গীতপিয়াসীদের হৃদয় ভেঙে দিয়ে। দলনেতা লেনন 1980-এর 8ই ডিসেম্বরে নিউ ইয়র্কে এক উন্মাদ যুবকের গুলিতে নিহত হওয়ার পরও বহু বছর বীটলস-এর আবার একত্রিত হওয়ার আশা ভক্তদের মধ্যে জাগরূক ছিলো। বীটলস-এর তিন জীবিত সদস্য বরাবর সে সম্ভাবনা অস্বীকার করেছেন। 1988-এ জর্জ হ্যারিসন স্পষ্ট করে বলেছিলেন, "জন লেনন যতোদিন পর্যন্ত মৃত থেকে যাবেন, ততোদিন বীটলস-এর পুনর্জন্মের কোনো সম্ভাবনা নেই।" তবুও ভক্তদের আশা মরে না, জল্পনা চলতে থাকে। জর্জের তিরোধানের পরে সে অবকাশও আর থাকে না।

দুই.
নিভৃতচারী জর্জ প্রথম থেকেই 'কোয়ায়েট বীটল' নামে পরিচিতি পেয়েছিলেন। 1988 সালে রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেম-এ বীটলস-এর অন্তর্ভুক্তির অনুষ্ঠানে রসিকতা করে বলেছিলেন, "আমি আর কী বলবো, আমি তো কোয়ায়েট বীটল!"

1998-এ জানানো হলো, এককালের প্রচণ্ড ধূমপায়ী জর্জ হ্যারিসন গলায় ক্যানসারের চিকিৎসা নিচ্ছেন। 97-এ অস্ত্রোপচার করে ফুসফুসের খানিকটা কেটে বাদ দিতে হয়েছিলো। গলার ক্যানসার সেরে গেলেও 1999 সালে ইংল্যান্ডে নিজের বাড়িতে মানসিক রোগী এক উদভ্রান্ত মানুষের ছুরিতে আহত হলেন, স্ত্রী অলিভিয়া দ্রুত তৎপরতায় আক্রমণকারীকে আঘাত করলে জর্জের প্রাণ রক্ষা পায়। ছুরির আঘাত তাঁর ফুসফুসে পৌঁছে গিয়েছিলো। সুস্থ হয়ে উঠলেও 2001-এ গোড়ার দিকে ক্যানসারের প্রত্যাবর্তন _ এবার ফুসফুসে, সঙ্গে ব্রেন টিউমার। জর্জ এবার পরাজিত হলেন। মৃতু্যই শেষ সত্য, রক অ্যান্ড রোল সঙ্গীতের বিশ্বজয়ী তারকাকেও সে রেহাই দেয় না।

বীটলস-এর কনিষ্ঠতম সদস্য জর্জ হ্যারিসনের জন্ম 1943-এর 25 ফেব্রুয়ারি। বাবা ছিলেন বাস ড্রাইভার। লিভারপুলের ডাভডেল প্রাইমারি স্কুলে ছিলেন জন লেননের দুই ক্লাস নিচে এবং পরে লিভারপুল ইনসটিটিউটে পল ম্যাকার্টনির এক ক্লাস নিচে। জর্জের সাত বছর বয়সে মা কিনে দিয়েছিলেন একটি গীটার। পল ম্যাকার্টনির সঙ্গে একই বাসের যাত্রী হিসেবে পরিচয়, তখন জর্জের বয়স তেরো। বন্ধুত্ব হতে সময় লাগেনি, দু'জনেই যে একটি করে গীটারের মালিক। পল ইতোমধ্যেই জন লেননের সঙ্গে কোয়্যারিম্যান নামে একটি গানের গ্রুপের সদস্য, জর্জকে নিয়ে গেলেন তিনি জনের কাছে। গীটারে দক্ষতার সুবাদে অবিলম্বে জর্জও গ্রুপে অন্তর্ভুক্ত হলেন। এই গ্রুপটিই 1960 সালে বীটলস নাম ধারণ করে। তার পরের কয়েক বছরের ইতিহাস সঙ্গীতে ক্রমাগত সাফল্য ও জনপ্রিয়তার নতুন নতুন শীর্ষে আরোহন।

শেষ পর্যন্ত কাল হলো অভূতপূর্ব এই জনপ্রিয়তাই _ ব্যক্তিগত জীবন বলতে আর কিছু থাকলো না, ভক্তরা পারলে তাঁদের টুকরো টুকরো করে ভাগাভাগি করে নেয়। এঁদের জীবনের তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনাও সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় এবং ভক্তরা তা গোগ্রাসে খায়। দূর থেকে এক নজর দেখতে পেলেই কারো জন্ম সার্থক হয়ে যায়, উন্ম্ত্ত আবেগে কেউ জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। এই অভাবিত জনপ্রিয়তা এর আগে কেউ কখনো দেখেনি। একসময় এমন হয় যে, উন্মুক্ত কনসার্টে ভক্তদের সোল্লাস চিৎকারে গান চাপা পড়ে যেতে থাকে _ কি গাইছেন, তা-ও নিজের কানে তাঁরা শুনতে পান না। এভাবে আর যা-ই হোক, গান গাওয়া চলে না।

1966-তে তাঁরা প্রকাশ্য কনসার্ট বন্ধ করতে বাধ্য হলেন, এরপর তাঁদের যাবতীয় গান অ্যালবাম আকারে বাজারে আসতে থাকে। একত্রে এই চারজনকে আর কোনোদিন মঞ্চে দেখা যায়নি। দিনরাত্রি এই নিরাপত্তার ঘেরাটোপের মধ্যে হাঁপিয়ে ওঠেন চার যুবক, নিজেদেরই অজান্তে তৈরি করা গণ-উন্মাদনার শিকার তাঁরা। বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেদের নিয়ে থাকতে থাকতে তাঁরা ক্লান্ত হয়ে উঠলেন একসময় _ ব্যক্তিত্বের সংঘাত, রেষারেষির শুরু হয়। 1970-এ বীটলস ভেঙে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় ভক্তদের হৃদয় বিদীর্ণ হয়। পরবর্তীকালে চারজনই একক সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে বিপুল সাফল্য পেয়েছিলেন।

বীটলস ভেঙে যাওয়ার পর পুরো সত্তর দশকটি একক সঙ্গীতকার হিসেবে জর্জ হ্যারিসনের সাফল্যের কাল। একের পর এক সফল অ্যালবাম করেছেন _ তিনটি প্ল্যাটিনাম (দশ লক্ষাধিক বিক্রিত কপি) এবং আটটি গোল্ড (পাঁচ লক্ষাধিক বিক্রিত কপি)। প্রথমটি ছিলো বীটলস যুগে রচিত ও অব্যবহৃত গানগুলি নিয়ে তিনটি ডিস্ক-সম্বলিত 'অল থিংস মাস্ট পাস' যা জর্জকে একক শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়। জন লেননের মৃতু্যর পর তাঁকে নিবেদন করলেন একটি অ্যালবাম 'অল দোজ ইয়ারস অ্যাগো'। তারপর কিছুটা নিষ্ক্রিয়, 87-তে আবার একটি সফল অ্যালবাম _ 'ক্লাউড নাইন'। 89-তে বব ডিলান, টম পেটি, রয় অরবিসন, জেফ লিন ও জর্জ হ্যারিসন একত্রিত হয়ে 'ট্র্যাভেলিং উইলবেরি' নামে এক গ্রুপ তৈরি করেন। এই গ্রুপের অ্যালবাম বিপুল সাফল্য পায়। অতঃপর আবার আড়ালে চলে যান জর্জ। মৃতু্যর আগে একটি অ্যালবাম তৈরি করছিলেন, অসমাপ্ত রেখেই চলে যেতে হলো তাঁকে।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ সকাল ১১:৪৮
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আওয়ামীলীগ ও তার রাজনীতির চারটি ভিত্তি, অচিরে পঞ্চম ভিত্তি তৈরি হবে।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ০১ লা মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৩


বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতি মূলত চারটি বিষয়ের উপর মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পায়।
প্রথমত, মানুষ মনে করে এ দলটি ক্ষমতায় থাকলে স্বাধীনতার সার্বভৌমত্ব রক্ষা পায়। এটা খুবই সত্য যে ১৯৭১ সালে আমাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ১৯০

লিখেছেন রাজীব নুর, ০১ লা মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৯



আমাদের ছোট্র বাংলাদেশে অনেক কিছু ঘটে।
সেই বিষয় গুলো পত্রিকায় আসে না। ফেসবুকেও আসে না। অতি তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মানুষ মাতামাতি করে না। কিন্তু তুচ্ছ বিষয় গুলো আমার ভালো... ...বাকিটুকু পড়ুন

সনদ জালিয়াতি

লিখেছেন ঢাকার লোক, ০১ লা মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫২


গতকাল দুটো সংবাদ চোখে পড়লো যার মূল কথা সনদ জালিয়াতি ! একটা খবরে জানা যায় ৪ জন ইউনিয়ন চেয়ারম্যানকে বরখাস্ত করা হয়েছে জাল জন্ম মৃত্যু সনদ দেয়ার জন্য, আরেকটি খবরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেষ বিকেলের বৃষ্টি

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০১ লা মে, ২০২৬ রাত ১০:৩৭


বিকেলের শেষে হঠাৎ বৃষ্টি নামলে
জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ছিলে চুপ,
তোমার ওমন ঘন মেঘের মতো চুলে
জমে ছিল আকাশের গন্ধ,
কদমফুলের মতো বিষণ্ন তার রূপ।

আমি তখন পথহারা এক নগর বাউল,
বুকের ভেতর কেবল ধোঁয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

মরহুম ওসমান হাদীর কারণে কবি নজরুলের জনপ্রিয়তা বেড়েছে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা মে, ২০২৬ দুপুর ২:৫৯


ইনকিলাব মঞ্চের জাবের সাহেব মাইকের সামনে দাড়িয়ে যখন বললেন , শহীদ ওসমান হাদীর শাহাদাতের উসিলায় নাকি এদেশের মানুষ আজ কবি নজরুলের মাজার চিনতে পারছে, তখন মনে হলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×