
১
টিনের বাসকাউন্টারের জানালা একটাই। বায়োস্কোপের চেয়ে সামান্য বড় । ভিতরের মেয়েটা যন্ত্রের মতো দ্রুত টিকেট এগিয়ে দিচ্ছে। ভাংতি মিলিয়ে টাকা দিতে দেরী হলে পিছন থেকে কেউ বললো, দেখছেননি হারামী বাস কোম্পানীটা কী করছে। আনাড়ি মেয়েছেলে বসাইছে খরচা কমানোর জন্য। মাইয়া মানুষরে দিয়ে এই ভেজাল কাম হয়?
ইয়েসমীন কিউতে ছিল। তার পালা এলে বাসকাউন্টারের মেয়েটাকে এক নজর দেখে নেয়। মেয়েটা রোদে পোড়া, বয়স বেশী নয়। ২০/২২ হবে। মায়া হয়। এত ছোট খুপড়ীতে সে বসে থাকে। বৃষ্টির পানি ঢুকে যাওয়ার কথা। ঝড়ে উড়িয়ে নিতে পারে। ঝাড় এলে মেয়েটাকে দৌড়াতে হবে। কাছেই লন্ড্রী বা কনফেকশনারী দোকানে আশ্রয় নিতে হবে। এভাবেই হয়তো চলতে হয়, সারাদিক যন্ত্রের মতো কাজ করতে হয়, দেরী করে ফিরতে হয় বাড়িতে। ইয়েসমীনের চেয়ে কঠিন মেয়েটার জীবনসংগ্রাম।
কাউন্টারের লোকগুলোর বিরক্ত হয়ে সিটি বাস কোম্পানীর বদলে মেয়েটির চরিত্র নিয়ে খারাপ মন্তব্য করছে। শুরু করেছে একজন। বাকি সবাই মজা করছে, দেখছেন নি মাতারীর ভাব। কয় খুচরা পয়সা নাই। প্রতিবাদ করা দরকার । করলে দি বার্ড ছবির পাখীর ঝাঁকের মতো পুরুষগুলো একজোটে ঝাপিয়ে পড়বে। একজন মানুষের বিপক্ষে এই জোটবদ্ধ হওয়া যে কাপুরুষত্ব - তা তারা কখনই বোঝে না। বরং বীরত্ব ভাবে।
২
ইয়েসমীন নারী নির্যাতন বিষয়ক এক এনজিওর রিসার্চ অফিসার। ডাক্তারের ফোঁড়া ঘাটার মতো, সমাজের পরিত্যক্ত নারীদের ইন্টারভিউ নেয়া তার কাজ। বাসের টিকেট বিক্রেতা মেয়েটার কথা মনে হয়, অভাবে শরীর বিক্রি করার অজুহাত শোনা যায় অথচ নেই টিকেট বিক্রেতার মতো মেয়ে রোদে ঝড়ে পরিশ্রম করে আত্মসম্মান নষ্ট করে না।
পরদিন সকালে অফিসে পৌছে অনেকগুলো মেয়েকে অপেক্ষারত দেখতে পায়। রিসেপনের উল্টোদিকে সোফায় বসে আছে। ইন্টারভিউ নিতে হবে তাদের। পিয়ন এসে প্রথম মেয়েটার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস দিয়ে যায় তার নাম জরিনা খাতুন
-পিতার নাম: আব্দুল খালেক
-বয়স: ২৫
-আগমনের কারণ: প্রতারণা
মেয়েটাকে গ্রেফতার করা হয়েছে অভিজাত এলাকা থেকে।
যথারীতি ম্যানেজারের ফোন আসে,
-গুড মর্নিং মিস ইয়েসমীন, আপনি কি গতকাল নেয়া ৩ টি মেয়ের ইন্টারভিউয়ের রিপোর্ট শেষ করেছেন?
-না, এখন করছি স্যার
-গত রিপোর্টে লটস অব মিস্টেক ছিল। নিড টুবি কেয়ারফুল
-ওকে, স্যার, উইল ট্রাই মা বেস্ট
-নর্থবেঙ্গলের ব্রদেলে গরুর স্টেরয়েডের যে প্রভাব তা ডোনাররা ক্লিয়ার বোঝেনি। ইমেইলে রিপোর্ট টেমপ্লেট পেয়েছেন? চার্টে নির্যাতনের হার ১০% না দিয়ে ২৫% করলে মোর এফেক্টিভ
-জ্বী স্যার
ফ্যাক্সের স্তুপ দিয়ে গেছে পিয়ন। ডেটা ঢুকিয়ে জেলা অফিসগুলোতে একটা করে কপি পাঠাতে হবে। অনেক কাজ।
ইয়েসমীনের মনে হচ্ছিল চাকরীর প্রয়োজনে সে যা করছে তা দেহবিক্রির চেয়ে নোংরা। ডেটার অংকগুলো বাড়িয়ে দিতে হয়। নানান কায়দায় মেয়েগুলোর কাহিনী দিয়ে কেসস্টাডি বানাতে হয়। গবেষণার আড়ালে সবই ব্যবসা। যত মর্মস্পর্শী কাহিনী তুলে আনতে পারবে, যত করুণ কাহিনী লিখা হবে মেয়েদের নিয়ে, তত ফান্ড দেবে নেদারল্যান্ডের দাতা প্রতিষ্ঠান।
৩
যে মেয়েটির ইন্টারভিউ নিয়েছে তার বয়স ৩২। ইয়েসমীনের বয়সের কাছাকাছি। মেয়েটি বিধবা । ইয়েসমীনও স্বামী হারিয়েছে। মেয়েটির স্বামী তাকে পরিত্যাগ করে। ইয়েসমীনের ঘটনা ভিন্ন।
ইম্পেরিয়াল ক্লিঙ্কার গ্রাইন্ডিং এন্ড সিমেন্টের ডিরেক্টর এমদাদুল ইসলামের সঙ্গে ইয়েসমীনের বিয়ে হয় কয়েক বছর আগে। ইয়েসমীনের বাবা মা থাকতেন রাজশাহীতে। সেখানে তার শৈশব। পরে ঢাকায় আসেন। কলেজ শিক্ষক বাবার কাছে সে জেনেছে জীবনে অর্থের চেয়ে আত্মসম্মান বড়। অথচ বাস্তবে অর্থই সিদ্ধান্ত নেয়ায়। শিক্ষক বাবা হয়তো নিজের কম স্বচ্ছলতার কারণে সুশ্রী মেয়েকে যতদুর সম্ভব দামে বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন
এমদাদের শ্রেষ্ঠ ধনী হওয়ার উচ্চাকাঙ্খার মতো গালভর্তি ব্রনের দাগ ছিল। সিগেরেট পোড়া ঠোঁট আর চোখের নিচে সামান্য ভাঁজে আটত্রিশ বছর লুকিয়ে ত্রিশের নিচে নামানো যেত না। তার পাশে ইয়েসমীনকে বাচ্চা বাচ্চাই লাগতো। মাও সেতুং বলেছিল বেড়াল সাদা কালো বিষয় না, কয়টা ইঁদুর ধরে সেটাই বিষয়। বিয়েতে সেই অভীষ্ট ইঁদুরের নাম টাকা। এমদাদ সেই যুক্তিতে শাহেদের চেয়ে যোগ্য।
শাহেদ ইয়েসমীনের সহপাঠী। বছর খানেকের বড়। ছেলেটা দেখতে শুনতে ভাল ছিল। লম্বা ফরসা। তাদের বাসায় মাঝে মাঝে আসতো। মার্জিত ছেলে, রুচিশীল পরিবারের সন্তান। ইয়েসমীন যে ছেলেটাকে গভীর ভাবে পছন্দ করে সেটা মায়ের নজর এড়ায়নি।
ইয়েসমীন এবং শাহেদ দুজনের মধ্যে কিছু মিল ছিল। সাহিত্যে আগ্রহ হেতু, ক্লাস শেষে লাইব্রেরীতে সময় কাটাতো। শাহেদ অবশ্যকে উপলব্ধির চেয়ে সময় কাটাতে বই পড়তো। তার ভেতর একটা ছেলেমানুষী ছিল। ইয়েসমীন সেই ছেলেমানুষীকে একধরণের পছন্দই করতো। রিক্সা নিয়ে বাসায় আসার সময় ছুটে এসে থামাতো । চোখে মুখে দুষ্টুমি। সেই রেশটা থাকতে থাকতে একটা ভাঁজ করা পোস্ট-ইট স্টিকার তার হাতে গুঁজে দিয়ে শাহেদ বলতো, যা, বাসায় গিয়ে আজকের এই ফরচুন কুকি খুলবি। ইয়েসমীন সেই কুকি খুলে দেখতো সুন্দর করে লেখা চারলাইনের স্বপ্ন । যদিও সেই স্বপ্ন গুলো ফরচুনেট করেনি তাকে।
৪
স্বামীহারা হওয়ার ঘটনাটিক ইয়েসমীনের জীবনের বিশেষ পীড়াদায়ক অভিজ্ঞতা। দু:খজনকও। পুলিশ, সাংবাদিক তাকে যেভাবে অভিযুক্ত করেছে তার নিজেরও মরে যেতে ইচ্ছে হয়েছে।
ইয়েসমীন ফর্সা মেয়ে। খাটো গড়ন কিন্তু চেহারা লাবণ্যময়। সে উপলব্ধি করছে এদেশে মেয়েদের একা থাকা কঠিন। সুশ্রী মেয়েদের জন্য তা বিরক্তিকর এবং অসহ্য। বিধবা মানেই যেন সহজলভ্য। সুপ্ত ক্ষিদে মেটানোর মেটাতে ছেলেগুলো ঘুর ঘুর করে। বয়সে অনেক ছোট অফিসারেরা নানান ছুতোয় তার কাছে আসে। কথায় কথায় বলে, আপা, একটা মেয়ে দেখবেন। বিয়ে করবো। আপনার মতো একটা মেয়ে না হলে চলবে না।। বুড়োগুলোর উপদেশে মুরুব্বীর ছদ্মবেশ থাকে। উদ্দেশ্য একই। তারা বলে, শোনো, মেয়েদের একলা থাকা ঠিক না, করবো নাকি খোঁজ? তোমার মতো মেয়ে পেলে যে কোন ছেলে পাগল হয়ে যাবে।
(চলবে...)
-----
অন্য উত্তাপ - ১
অন্য উত্তাপ - ২
অন্য উত্তাপ - ৩
অন্য উত্তাপ - ৪(শেষ)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

