
১৬
সন্ধায় অফিস থেকে বাড়ি ফিরছিল ইয়েসমীন। দু:সম্পর্কের সেই মামা পিসিকালচার রোড়ে চারতলা তুলেছে। তিন তলায় উঠেছে ইয়েসমীন। একটু ভিতরে বলে এই এলাকায় ভাড়া সহনযোগ্য। আত্মীয়ের বাসা বলে নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে হয় না।নিচের গেটে বেল দিয়ে অপেক্ষা করার সময় একটা ফোন আসে তার মোবাইলে।
-হ্যালো, আমি শাহেদ
-শাহেদ! এতদিন পরে কোথা থেকে?
-আমি অস্ট্রেলিয়া থেকেই
-ভালই আছ?
-ভাল নেই, মনে হচ্ছে রিনার সঙ্গে ডিভোর্স হয়ে যাবে। পত্রিকায় তোমার সঙ্গে ঘটনাগুলো জানার পর সে সন্দেহের ডিব্বা হয়ে গেছে। আমি ইচ্ছে করে আর তোমার সঙ্গে কথা বলিনি। ভাবলাম দুরে গেলে ঠিক হবে। দিন দিন কেমন স্কিজোফ্রেনিক হয়ে যাচ্ছে সে। কখনো খুব ভাল, কখনো কাঁদে কেন তাকে বিয়ে করলাম।
-একটা কথা বলি, শাহেদ?
-বল
-তোমরা একটা বাচ্চা নাও। অনেক তো হলো..এসব
-ইসমি, সম্ভব হলে সেই কবেই নিতাম। কিন্তু উপায় নেই
-কেন? অস্ট্রেলিয়ায় যেহেতু আছ, টেস্টটিউব বেবী নিতে পার।
-সমস্যাটা রিনার না, আমার। ডাক্তার বলে দিয়েছে আমার স্পার্মকাউন্ট জিরো। আমি কখনোই বাবা হতে পারবো না।
-কি বল?
-এজন্য রিনাকে ডিভোর্স নিতে বলেছি। ও বাড়ি ফিরে যাক। ওর বয়স কম, দেখতে ভাল, সময় থাকতে বিয়ে হবে অন্যত্র। আরেকটা কারণে ফোন করছি
-কি? আমি ঢাকায় আসছি সামনের সপ্তাহে। ইসমি, আমি আর সেই শাহেদ নেই। উইল ইউ লেন্ড মি যাস্ট কাপল অব হাওয়ার্স?
-এভাবে বলার কি আছে। দেখা হবে।
-থ্যাঙ্ক ইউ। রাখি
ইয়েসমীনের ভাবনাতে শাহেদ প্রায় বিস্মৃত । অথচ যে স্বামীর বিরুদ্ধে এত অভিযোগ, আজ তার জন্যই সে জেগে থাকে। কতদিন তাকে একা ছুঁড়ে ফেলে এমদাদ তার ব্যবসার পিছনে দৌড়েছে, একঘন্টার জন্য ইয়েসমীনকে একসপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয়েছে। আজ সে সেই স্বামীকে আঁকড়ে ধরে বেচে থাকতে চায়। দাম্পত্যের রোমন্থনযোগ্য সুখস্মৃতি খুঁজতে চায়। অনেক খুঁজেও পায় না।
মনে পড়ে স্বামী বেঁচে থাকতে অর্থের খাঁচা থেকে মুক্তির জন্য ছটফট করেছে। ভাগ্যমুদ্রা উল্টে গিয়ে সে সম্পুর্ণ মুক্ত নারী। বেছে নিতে পারে অন্য কোন জীবন সঙ্গী। কিন্তু সে মুক্তি পেয়েও চায়না। মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত তাকে এমদাদ স্ত্রী জেনেছে। তার স্বামীর আত্মাকে সে কষ্ট দিতে পারে না।
১৭
সপ্তাহ খানেক পরের কথা। পরদিন শাহেদের ঢাকা আসার কথা। ভাড়া বৃদ্ধির দাবীতে তখন শহরজুড়ে বাস ধর্মঘট চলছে। বাস না থাকায় অফিসে আসতে ১১টা বেজে গিয়েছিল। অফিসে এসেই কেসস্টাডিতে দ্রুত চোখ বুলিয়ে ইন্টারভিউয়ের জন্য বসে। ফোন বাজে। ম্যানেজার বলে, মিসেস ইয়েসমীন, আপনাকে বলে রাখি আজকের মেয়েটা মানসিক সমস্যায় আছে। ক্রিটিক্যাল কেস। পাবনা থেকে আনা হয়েছে। এমনিতে ভাল কথা বলে মাঝে মাঝে আল্লা বলে চিত্কার করে। লাথি দিয়ে সব তচনচ করে। ভয় পাবেন না। ওর পায়ে শেকল বাঁধা আছে। ওর ফটো সেশন শেষ হয়েছে। কেসটা সাবধানে দেখবেন। ওকে?
ইয়েসমীনের বিষয়টি খুব অমানবিক মনে হলেও এমন ঘটনা নতুন না। বেঁচে থাকারা জন্য তাকে এটা করতে হবে।
১৮
একটা হুইলচেয়ারে মেয়েটাকে ইন্টারভিউ রুমে দিয়ে যায়। অনতিদুরে একজন প্রহরী দাঁড়িয়ে। মেয়েটি দেখতে বিকারগ্রস্ত মনে হয় না। চেহারাটা ভারী মিষ্টি। কাঠগোলাপের মতো গোলাপী রং। বয়স ১৬/১৭ হবে। শুধু চোখের নিচে কালির আর গালের দু'পাশে আঁচড়ের দাগ। ইয়েসমীন হিস্ট্রির সঙ্গে মিলিয়ে নিতে বললো,তোমার নাম?
মেয়েটি খুব শান্ত ভাবে বললো,
-সুরাইয়া
-তুমি এই খারাপ কাজে কিভাবে আসছো?
-আমার মায়ে কাম করতো ফ্যাক্টরিতে। সুপারভাইজান আমারে একটা কাম দিছিলো। ফ্যাক্টরীর বড় সাব ঢাকায় থাকতো। উনি ফ্যাক্টরীতে গেলে স্নেহ করছে খুব। মাঝে মইধ্য ফ্যাক্টরীতে ঘুরান দিতে আসতো। বিদেশী মিঠাই লেবেঞ্চুষ দিতো।
-তারপর?
-একদিন অনেক সাদা চামড়ার মানুষ আইছে। বড় সাবও আবার আইছে। খুজ খবর নিছে। আমার পিরানডা আছিল ছিঁড়া। সাব আমারে দেইখা মায়ের কাছে গিয়া কইলো, তোমার মেয়েকে ভাল জামাকাপড় দিতে পার না। আজ আমাদের ফ্যাক্টরীতে বিদেশের লোকজন আসবে। ড্রাইভারকে বলছি ওকে ভাল জামা কিনে দিতে। হের পরে গাড়ি দিয়া দুকানে লইয়া গেছে। আমার লগে আরও ৭/৮ জন। বেবাকে কী ফুর্তি লাগছে। আমগোরে সাদা ধবধবা পরীর লাহান পিরান কিন্যা দিসে।
-তারপর?
-আমগোর গাড়ি দিয়া একটা বাড়িত নিয়া গেছে। কি সোন্দর বাড়ি গো আফা। বাগান ভর্তি ফুল । লাল বেগুনী। আর বান্ধানী পুস্কুনী। যেন বেহেশত।
আমরা কি খুশী আছিলাম। আমারে লইয়া বইতে দিসে একটা ঘরে। ঠান্ডা বাতাস। আধাঘন্টা বইসা থাইকা ঝিম ধরছিল। এমুন সময় দরজা খুইলা এক ব্যাডা ঢুকছে। সাদা চামড়া বিদেশী ব্যাডা। আইসাই আমারে ...আল্লাগো..ও আল্লা..
মেয়েটা হাত পা কাঁপতে লাগলো। আমি ইন্টারভিউটা বন্ধ করে দিতে চাইলাম কিন্তু অজানা কৌতুহলে পারলাম না। আমার শরীরটাও যেন কাঁপছিল।
মেয়েটা পানি খেয়ে ঠিক হলে বললাম, তুমি বলো, ভয় নেই। আমি তোমার বোন।, বল সেই লোক কি করেছে?
-আফাগো, ব্যাডাটা আমারে বিছনাত ফালাইছে। আমি যেন আটার ময়দা। সাদা ধবা ধবা পরীর জামা ছিড়া তেনা তেনা কইরা ফালাইছে..সারা শইলে কামরাইছে.. আল্লাগো..
-আমি হাত ধরে বললাম, তুমি বলো
-আমি রক্তে ভিজ্যা গেছিলাম, আর কইতে পারিনা..
-এর পর তোমাকে কোথায় নিল?
-নেয় নাই। ঘরেই বন্দি রাখছে, খালি খাওনের সময় ভাত দিসে। পরের দিন বড় সাব নিজেই আইছে। চিনন যায়না। লাল লাল চোখ। আমি কইছি আফনে আমার ধর্ম বাপ..ছাইড়া দেন
হেই ব্যাডা মদের গেলাস লইয়া আরও তিনডারে ডাকলো..
...আল্লাহরে
ইয়েসমীনের গলা কেউ চেয়ে ধরে। সে ইন্টারভিউ ছোট করতে চেয়ে বললো,
-আচ্ছা, কিসের ফ্যাক্টরী ছিল সেটা?
-সিমিটের, বিজয়পুরের সিমিট ফ্যাক্টরী
ইয়েসমীন হঠাত্ তার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটা ছবি বের করে দেখালো
-এই ছবিটা চিনতে পার?
সুরাইয়া চমকে ওঠে। দড়ি ছেঁড়া ষাড়ের মতো হাত পা ছুড়ে বলে ...আল্লাগো ... বড় সাব। প্রহরী এসে নিয়ে যায় তাকে।
ইয়েসমীনের ইন্টারভিউ আর নেয়া হয়না। এমদাদের বিশ্বস্ত থাকার অহংকারে সে যুদ্ধ করে গেছে। তার মৃত স্বামী তাকে কিছুই দেয়নি। তবুও তার স্মৃতিকে নিয়ে রাতে ঘুমাতো ।সে বাথরুমে যায়। একটা ঘৃণায় বাথরুমের বেসিনে গিয়ে গল গল করে বমি করতে থাকে। তারপর সোজা ম্যানেজারের কাছে গিয়ে দু'দিনের ছুটি নিয়ে বের হয়ে আসে।
১৯
সকালে শাহেদের ফোন আসে,
-গুড মর্নিং, ইসমি। ইজ ইট টু আরলি? আমি এখন ঢাকা এয়ারপোর্টে
-একা?
-হ্যা, রিনা উইল কাম নেক্স্ট উইক। ডিভোর্সের পেপার অলরেডি প্রসেস শুরু হয়ে গেছে
-তার মানে ছাড়াছাড়ি কনফার্ম
-হ্যা
-একা থাকতে খারাপ লাগবে না?
-লাগবে, হোনেস্টলি স্পিকিং আই উইল মিস হার!
-কখন দেখা করতে চাও বোলো। আমি আজ কাল অফিস যাবো না।
(শেষ)
সর্বশেষ আপডেট:
পুলিশের তদন্ত রিপোর্টে এমদাদ হত্যাকাণ্ডের রহস্য নতুন মোড় নিয়েছে। সরকারী কাজ পাওয়ায় স্বার্থে অর্থ ও নারী ব্যবহারের অভিযোগে বিজয়পুরের সিমেন্ট কোম্পানীর একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা হয়েছে। এদিকে মেলবোর্ণে ইয়েসমীন শাহেদের সঙ্গে নতুন সংসার সাজাচ্ছে। শাহেদ অনেকবার তার অক্ষমতার কথা বোঝালেও ইয়েসমীন জানে আধখানি সুখ পেলেই তার পূর্ণ সুখ পাওয়া হবে।
-------
গল্প অন্য উত্তাপ - ১
গল্প: অন্য উত্তাপ - ২
গল্প: অন্য উত্তাপ - ৩
গল্প: অন্য উত্তাপ - ৪(শেষ)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

