
৫
বিয়ের পর গুলশানের যে বাড়িতে উঠেছিল তা বিশাল। ৩০০০ বর্গফুটের ফ্লোর। ঝকঝকে ইটালিয়ান টাইলসের মেঝে। ঝাড় বাতি। গান শোনার দামী স্টেরিও। গ্যারেজে নতুন গাড়ি। পয়সা যদি সুখ হয়, বিলাসপ্রেমী মানুষের জন্য তা ছোট খাটো বেহেশত।
ইয়েসমীনের মনটা যদি কেউ দেখতে পেত, সে জানতো বিয়েটা সে চায়নি। সে গড়পড়তা মেয়ের চেয়ে রূপবতী। বেড়াতে গেলে, পারিবারিক প্রোগ্রামে তার মাকে বিয়ের বিষয়ে জিজ্ঞেস করতো। এমনকি শাহেদের ঘনিষ্ট বন্ধুরা তাকে প্রস্তাব দিয়েছে। শাহেদ মধ্যবিত্ত, জুতোর বদলে স্যান্ডেল শু গলিয়ে হাটতো। বোতাম লাগাতে ভুল হতো। সেই জিনস আর কুঁচকানো টি শার্টের বোহেমিয়ান মানুষটিকেই তার ভাল লেগে যায়। ইয়েসমীন তার বাবার মতো উন্নতরুচির পুরুষ চেয়েছে। আর কেয়ারলেস একটা সংসার পেলেই সে সুখে থাকতো।
যখন এমদাদের প্রস্তাব আসে, সে আশা করেছিল শাহেদ আহত হবে, উদ্বিগ্ন হবে, একটা বুদ্ধি বের করবে। দু তিনবার মনে করিয়ে দিলেও শাহেদ এমন ভাবে ছিল যেন বিয়েটা পুরনো ঢাকার খোলা কলের পানি। ভেসে গেলে যাক। শাহেদ ক্লাসিক অজুহাত দিয়েছে - তার প্রতিষ্ঠা বাকি। শাহেদ কি বোঝেনি মেয়েটা প্রতিষ্ঠা চায়নি। মানুষ চেয়েছে?
এমদাদকে দেখে বোঝা যায়নি তার ভেতরে মানুষ নেই। সে শুধুই বিষয় আসয় বাড়াতে মনযোগী। ইয়েসমীনের সংগ্রহে এতগুলো কবিতার বই, উপন্যাস। এমদাদ একটা বই ভুল করে খুলেও দেখেনি। গান বাজলে নিজের পছন্দ নিয়ে কিছু শোনেনি। খবরের কাগজ দেখতো - তাও স্টক শেয়ার ইত্যাদি। রাতে দাম্পত্যের সম্পর্কে তার যতটা আগ্রহ সেখানে শরীরটাই সব। অল্প কয়দিনে তাতেও ইচ্ছে হারায়। তার বন্ধুদের সঙ্গে মিল ছিল। তারা স্ত্রীকে অলঙ্কারে সাজিয়ে ক্লাব পার্টি করতো। যেন স্ত্রী কিনে এনে ঘরে সাজিয়ে রেখে প্রতিযোগিতায় জিতে যাওয়ার নাম বিয়ে। বিষয়গুলো আপত্তিকর, কখনো অপমানজনক। তবুও ইয়েসমীন সতী নারীর মতো স্বামীকে ভালবাসার পণ করেছিল।
৬
এমদাদের অর্থলিপ্সু মনটাকে ইয়েসমীন চিনে পারে বাসর রাতেই। যে কোন মেয়েই বাসররাতটিকে সারাজীবন মনে রাখে। অচেনা পুরুষের সঙ্গে পরিচয়ের আবেগে বুক কাঁপে। এমদাদ এক দু'কথা বলার পর, লাজনম্র বধূর ঘোমটা তুলে বলেছিল,
-তাকাও, দেখ তোমার জন্য কী এসেছি! হ্যারি উইনস্টন ব্যান্ডের ডায়মন্ড রিং। জোহান্সবার্গ থেকে আনানো। পছন্দ হয়েছে?
উপহারে সে খুশী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এমদাদের গলায় অর্থের হাতুড়ির শব্দ শুনতে পায়,
-তোমরা হয়তো এত দামী রিং দেখনি। যে এনেছে সে আজিজগ্রুপের মালিক। ৫ টা কোম্পানীর মালিক। সে নিজেই অবাক হয়েছে। আমি বলেছিলাম, যা দাম লাগে লাগুক। ৮০ থাউজেন্ড ইউএস ডলার আর কতো? ব্যবসা দাড়িয়ে গেলে দেখ কত দামী গয়না দেই। মানি ইজ সেকেন্ড গড। গডেস এর জন্য সেই রকম উপহার তো দিতেই হবে, হা হা হা। এরপর স্বামীটি তাকে সত্যিকারের বিস্মিত করে বলে, শোন আজকে খুব টায়ার্ড লাগছে। ভোরে এক ফরেন ইনভেস্টরের সঙ্গে মিটিং। আগামী কাল কথা বলা যাবে। আজতে শুয়ে পড়।
ইয়েসমীন সেই রাতের কষ্টটা কাউকে বলেনি। রাত গভীর হলে বারান্দার দরজা খুলে সে একাই বসে ছিল। চুপচাপ। চোখ খোলা ছিল তার। কিন্তু শুধু একা।
৭
এমদাদের ক্ষুদ্র কাঁটায় বিঁধে ইয়েসমীনের নদীটা পুকুরের মতো চুপসে গিয়েছিল। বিয়ের নিয়ম অনুযায়ী তাকে সুখী থাকার অভিনয় করতে হতো। মাঝে মাঝে পার্টি হতো। হাসতো, কথা বলতো অন্যদের সঙ্গে - এখানেই শেষ।
বিয়ের পরে আরো ব্যস্ত হয়ে পড়ে এমদাদ। ফিরতে ফিরতে রাত হয়। ইয়েসমীনের চাকরী খোঁজা উচিত ছিল। তাহলে এতটা অসহ্য লাগতো না। এমদাদ সে কথা শুনেছে জিজ্ঞেস করেছে তার অভাবটা কোথায়? চাকরী করবে এটা যেন এমদাদ চাইতো না। বান্ধবীরা বলেছে, আরে ধুর, লক্ষীবধূ হয়ে যতটা সময়টাকে উপভোগ করা যায করে নে। পরে বাচ্চাকাচ্চা হলে আর পাবি না।
৮
এমদাদের সিমেন্ট কারখানাটা ময়মনসিংহের বিজয়পুরে। ২০০ কোটি টাকার লোন পেয়েছিল। ময়মনসিংহের বিজয়পুর অঞ্চলের চুনাপাথর সিমেন্টের জন্য ভাল। সেখানে ট্যুর হতো। কখনো ৩/৪ দিন কখনো একসপ্তাহও ওখানে থাকতো। চট্টগ্রামে যেতে হতো শিপিং এর ক্লিয়ারেন্সের জটিলতার জন্য। অনেক সময় সেখান থেকে ফোনও পেত না।
খুব একা থাকতো যখন এমদাদ বাইরে থাকতো। সাজানো ঘর ছেড়ে বাইরে তাকিয়ে ভীড় দেখতো। একাকী হওয়ার কষ্টে কেঁদে ফেলতো। বান্ধবীদের কাছে শুনেছিল ছেলেরা বদলায়, পুরো পরিবর্তনটা নির্ভর করে মেয়েদের উপর।
স্বামী বাড়িতে ফিরে এল টিভির রেকর্ড করা নাটকগুলো রেখে দিতো, নিজে হাতে পাঙ্গাস মাছ রান্না করতো। একটেবিলে খেতে খেতে সে ছল রাগ নিয়ে বলতো তোমার বিয়ে করা স্ত্রীকে একটু সময় দিলে কী হয়? এতই ব্যস্ত থাকতে হয় তোমার?
-একটু সবুর করো। সুরমা সেতুর গভর্মেন্ট কন্ট্রাক্ট টা পেয়ে নেই। দেখবে কত সময় আমাদের। ইউরোপ তো দেখোনি। সুইজারল্যান্ড হলো হেভেন। ফ্রান্সে-বেলজিয়াম-জার্মানীর একটা ট্যুরে যাবো। শপিং করার জন্য দুবাইতে থামবো, ওখানকার স্টোন অন্যরকম, গোল্ডের তুলনা হয় না। আগে কন্ট্রাক্টটা হোক।
অন্য মেয়েরা গোল্ডের প্রতিশ্রুতিতে হয়তো মজা পেত। তবে জীবনের এরকম সুন্দর সময়ে বৈষয়িক আলোচনায় ইয়েসমীনের মনে হতো এমদাদ যেন তাকে তার অফিসের একজন পার্টনার মনে করে।
তার যে অন্য অনেক চাওয়া থাকতে পারে সে কেন বোঝে না? ইয়েসমীন তৃপ্ত হতে তৃষ্ণার্ত হয়ে অপেক্ষা করেছে অনেক রাত। বিয়েতে শরীরের আতশবাজীও সময়কে মধুর করে দেয়। দীর্ঘ ট্যুরে ক্লান্ত হয়ে ফিরে - এমদাদে কাছে নাক ডাকানো বিশ্রামটাই বড়। ইয়েসমীনকে সে কখন সম্পুর্ণ গ্রহণ করেছে তা তার মনেও পড়েনা।
৯
এর চেয়ে বিকেলে লুকিয়ে রিক্সায় শাহেদের চুম্বনগুলো সে মনের ভিতর বাঁধাই করে রেখেছিল। শিশুর পুরনো খেলনার মতো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তাই দেখতো। সেই থেকে অভিমান ভুলে শাহেদকে ফোন করতে ইচ্ছে হতো। কিন্তু সে নিজেই শাহেদকে মানা করে দিয়েছিল। যা অতীত তাকে অতীতই থাকতে দেয়া ভাল। শাহেদ ফোন করতো। প্রথম একদিন তাকে ফোনে পায়, বিয়ের মাসখানেক পর। ছেলেমানুষ যখন কাঁদে তখন মেয়েদের হার মানায়। শাহেদ বলেছিল,
-ইসমি। হোয়াই ডু ইউ ক্লোজ অল দা ডোর? আল মিস ইউ সো মাচ
-হু ক্লোজড? মি? চাকরী পেয়ে ভালই কথা শিখেছ, শাহেদ।
-আই ওয়ান্ট টু মিটি ইউ। ফ্রেন্ডলীতে আছি। আসা যায় না?
-নো ওয়ে। আমি রাখি আজ
এভাবে রেখে দেয়ার কারণ ছিল ইয়েসমীন বুঝে গিয়েছিল শাহেদ কেমন। সে সুন্দর করে কথা বলে কিন্তু ক্ষণে ক্ষণে মত পাল্টায়। বিয়েতো ছেলেখেলা নয়। শাহেদ কি বুঝতো না বিয়ে মানে পর হয়ে যাওয়া? আর সেই পর হয়ে যাওয়ার পর কিছুই থাকে না।
বিয়েতে না চাইলেও ফিউশন হতে থাকে। আশ্চর্য হলেও সত্যি, ইয়েসমীন এমদাদের অভ্যাসে অভ্যস্ত হতে থাকলো। যেমন ইয়েসমীনের শীত বেশী। এমদাদের গরম। ইয়েসমীন রাতে গোসল করলে হাঁচি দিতে দিতে অবস্থা খারাপ হতো। সে কম্বল জড়িয়ে ঘুমাতো এমন কি গরমেও। সেই মেয়ে রাতে হালকা ফ্যানের বাতাসে ঘুমানো শুরু করেছিল। স্বামীর পানের অভ্যাসে, নিজেই পান খাওয়া শুরু করেছিল। আর নাক ডাকিয়ে ঘুমাতে থাকা এমদাদকেই, অসহ্য হবার বদলে আপন লাগতো।
১০
ইয়েসমীনের বিয়ের একবছর পর শাহেদ একদিন জানায় বাবা মায়ের অন্তিম ইচ্ছেতে সে তার ছোট বোনের বান্ধবীকে বিয়ে করছে। বিয়ে হয় মাসখানেক পর। তখন থেকে শাহেদের ফোনও বন্ধ হয়।
সব প্রেমই কি অভাবের? অভাব মিটে গেছে বলে শাহেদ আবারও ভুলে গেছে? ইয়াসমীন বসে থাকতো ফোনের জন্য। অথচ শাহেদ তার কে? তার কথা ভাবলেই বা কি না ভাবলেই বা কি?
বিয়ের তিন মাস পর এক রাতে ৯টার দিকে শাহেদের ফোন পায়।
- ইসমি, তুই কেমন আছিস। আজকে আর কিছু ভাললাগছে না । তোকে মনে পড়ছে খুব
-কী হয়েছো আবার? বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া?
-না, (স্ত্রীর কথাটা এড়াতে চায় এমন ভঙ্গীতে)
-তাহলে?
-এমনিতেই । মনে হচ্ছে আজকে তোরও মন খারাপ।
এমদাদ বাসায় এসেছিল আগে আগে। কোন কারনে সে ডিস্টার্বড। মুখ ফুলিয়ে অন্যরূমে তার ফাইল খুলে কী সব যোগবিয়োগ করছে। আর সেলফোনে কথা বলছে। কিন্তু শাহেদ কী করে এটা জানলো? আন্দাজে? ভালবাসায় নাকি টেলিপ্যাথি থাকে। হয়তো নিছক কুসংস্কার।
শাহেদ অল্প ভলিউমে কথা বলে। যেন সেই মূহুর্তে ইয়েসমীন ছাড়া সে সম্পুর্ণ অচল। ঠিক সেই সময় হঠাৎ ঠাস করে ফোন কেটে যায়। শাহেদ নিশ্চয়ই তার স্ত্রীকে না জানিয়ে ফোন করছে। লুকাতে গিয়ে ফোন কেটেছে। রাত ১০ টা বাজে। হয়তো শাহেদ মিথ্যে ঢাকতে অনেক ভালবাসার কথা বলবে । দুজন ঘনিষ্ট হবে। ঘনিষ্ট হতেই তো সব আয়োজন। এসব ভেবে নিজের দিকে একটা তীব্র ঘৃণা কাজ করে।
আবার গাছের ও তলার দুটোই না খেলে শাহেদদের চলবে কী করে। তার চেয়ে এমদাদের বৈষয়িক মানুষটা সহজ সরল মনে হয়। সে এমদাদকেই যেন আবারও মন দেয়।
এমদাদ বৈষয়িক হলেও সত্ মানুষ ছিল। শাহেদের সঙ্গে তার তুলনা করতো সে প্রথম দিকে। অথচ মানুষটা আজ বহুদুরে।
(চলবে..)
----
অন্য উত্তাপ - ১
অন্য উত্তাপ - ২
অন্য উত্তাপ - ৩
অন্য উত্তাপ - ৪(শেষ)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

