somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মুক্তি : অণু গল্প

১৫ ই জুলাই, ২০১০ সকাল ১০:৪৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

চারদিকে বেশ ঠাণ্ডা আর কুয়াশা। ভোর হতে অনেক বাকি। ওরা সংখ্যায় ১২ জন, সবাই দুটো ছই ওয়ালা নৌকায় বসে আছে। বুড়িগঙ্গার মাঝ বরাবর নৌকা গুলো নঙ্গর করা। নদীর মাঝখানে ঠাণ্ডায় জান যায় যায় অবস্থা। উপায় নেই। বসে থাকতে হচ্ছে। গায়ে গা লাগিয়ে বসে নিজেরা গরম হওয়ার চেষ্টা করছে।

ভোর চারটায় দলের নেতা নৌকা তীরের দিকে বেয়ে চলার নির্দেশ দিলো। নৌকার দাঁড় গুলো খুব সাবধানে পানিতে নামিয়ে ধীরে ধীরে বাইতে শুরু করলো চার জন। চারজন খুব খুশি মনেই টানতে শুরু করলো। কারণ পরিশ্রমে শরীরটা গরম হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। রাতে কালো পানি ভেঙে তীরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে নৌকা দুটো। পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছে সব। নতুন কোন সংবাদ ওদের হাতে নেই। তাই সর্বশেষ সংবাদের ভিত্তিতেই এগোতে হচ্ছে।

নৌকা তীরে এসে খুব সাবধানে ঘ্যাঁচ করে মাটিতে লাগলো। সামান্য শব্দ। তিরে একটা উল্টানো নোকার নিচে একটা কুকুর ঘুমিয়ে ছিল। তীরে ভিড়ার শব্দে চমকে মাথা তুলে তাকাল। হালকা শব্দে গর গর করতে লাগলো। নৌকার দাঁড়ি চারজন কুকুরটাকে দেখতে পেয়েছে। তারা আস্তে করে নৌকার ছই-এর ভিতর ঢুকে গেল। কুকুরটার কৌতূহল বাড়ছে। সে উঠে নৌকার কাছে এসে দুই/তিন বার ঘেউ-ঘেউ করলো। শুন-শান পরিবেশে সেই শব্দ যেন কামান দাগল। ছই এর ভিতরের মানুষ গুলো যেন জমে গেছে। ছই এর মুখটা তে শাড়ি দিয়ে পর্দা করা। কুকুরটা অনুমান করার চেষ্টা করছে নৌকায় কি আছে। কারণ দীর্ঘ দিন এই ঘাটে নৌকা থামে না। দলনেতা চোখে চোখে নির্দেশ দিলো একজনকে। সে গায়ের চাদরটা গায়ে ভালো করে পেঁচিয়ে নৌকা থেকে নামলো। কুকুরটা আরও দু/তিন বার ডেকে উঠেছে এর মধ্যে।

এখন চারদিক অবার নীরব। শুন-শান। তীর থেকে দুবার চাপা কাশির শব্দ হল। কুকুরটার একটা ব্যবস্থা হয়ে গেছে। দলনেতার নির্দেশে সবাই নৌকার পিছন দিক দিয়ে নিঃশব্দে পানিতে নামতে লাগলো। যেন মনে হয় নৌকার যাত্রীরা নৌকাতেই আছে। ঠাণ্ডা পানি যেন অবশ করে দিতে চাইছে। বার জন নেমে আসলো একে-একে। আড়াল রেখে রেখে দলটি পৌঁছে গেল শহরে ঢুকার একটি গলিতে। এইটা প্রধান গলি নয়। ছয় জন করে দু’টি দলে বিভক্ত হয়ে দুটি গলিপথে এগোতে লাগলো। পুরানো ঢাকার আড়ত এলাকা। বিভিন্ন গোডাউন নদীর তীর ঘেঁষে। আবাসিক এলাকাটা আর একটু দূরে। আড়ত আর গোডাউন গুলোতে মাল নেই দীর্ঘ দিন। থম-থম করছে চারদিক। অভিযানকারীরা খুব ধীরে দেয়াল ঘেঁষে এগিয়ে চলছে। সে কোন সময় কিছু একটা ঘটে যেতে পারে। সকলের স্নায়ু টান-টান। মুখের পেশি গুলও শক্ত হয়ে উঠেছে।

এক সময় তারা আবাসিক এলাকাটার মুখে চলে এলো। অনেক পুরন সব বাড়ী। ব্রিটিশ আমলের তৈরি। বেশির ভাগ হিন্দু ধর্মীদের আবাস। এখন ফাঁকাই বলা যেতে পারে। দিনের আলো ফুটে উঠছে। ঘন কুয়াশা। তা ভেদ করে আলো ছড়িয়ে পড়ছে। দলটা এগোতে থাকে। হঠাৎ দোতালার একটা জানালা খোলার হালকা শব্দ হয়। জানালাটা পুরোটা খোলেনি। একটা কোমল মুখ। চরম বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে দলটির দিকে। সে পিছন ঘুরে কাউকে চাপা গলায় কিছু বলল। কিছুক্ষন পরেই তার পিছনে আরেকজন মহিলা কে দেখা গেল। জানালাটা খুলে যাচ্ছে। অভিযাত্রীরা সাবধান হয়ে উঠে। আরও দু/তিনটে উৎসুক নারী-পুরুষের মুখ। কে যেন ফিস ফিস করে বলল, “মুক্তি”। আশে-পাশের বাড়ি ঘরের জানালা দরজা গুলো ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে। উৎসুক নারী-পুরুষ অবাক বিস্ময়ে তাদের দেখছে আর নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছে “মুক্তি”। গুঞ্জন টা ধীরে ধীরে বাড়ছে। এতো গুঞ্জনেও শব্দটা পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে। শব্দ টা যেন প্রতি পলে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। আরও মজবুত হয়ে উঠছে।

কুয়াশা কেটে যাচ্ছে। সকালের তির্যক আলো অভিযাত্রীদের শরীর আর অস্ত্র ছুঁয়ে গলিপথে দীর্ঘ ছায়া ফেলছে। অভিযাত্রীরা এগিয়ে চলেছে।

আজ ডিসেম্বর ১৬, ১৯৭১।

আগের কিছু লেখা...
হিসাব : অণু গল্প
বনসাই : অণু গল্প
নাগরিকঃ অণু গল্প
এ্যাকাউন্টসঃ অণু গল্প
ডুবঃ অণু গল্প
ফেরাঃ অণু গল্প
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই অক্টোবর, ২০১০ সকাল ১০:২২
১১টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×