ভোর চারটায় দলের নেতা নৌকা তীরের দিকে বেয়ে চলার নির্দেশ দিলো। নৌকার দাঁড় গুলো খুব সাবধানে পানিতে নামিয়ে ধীরে ধীরে বাইতে শুরু করলো চার জন। চারজন খুব খুশি মনেই টানতে শুরু করলো। কারণ পরিশ্রমে শরীরটা গরম হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। রাতে কালো পানি ভেঙে তীরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে নৌকা দুটো। পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছে সব। নতুন কোন সংবাদ ওদের হাতে নেই। তাই সর্বশেষ সংবাদের ভিত্তিতেই এগোতে হচ্ছে।
নৌকা তীরে এসে খুব সাবধানে ঘ্যাঁচ করে মাটিতে লাগলো। সামান্য শব্দ। তিরে একটা উল্টানো নোকার নিচে একটা কুকুর ঘুমিয়ে ছিল। তীরে ভিড়ার শব্দে চমকে মাথা তুলে তাকাল। হালকা শব্দে গর গর করতে লাগলো। নৌকার দাঁড়ি চারজন কুকুরটাকে দেখতে পেয়েছে। তারা আস্তে করে নৌকার ছই-এর ভিতর ঢুকে গেল। কুকুরটার কৌতূহল বাড়ছে। সে উঠে নৌকার কাছে এসে দুই/তিন বার ঘেউ-ঘেউ করলো। শুন-শান পরিবেশে সেই শব্দ যেন কামান দাগল। ছই এর ভিতরের মানুষ গুলো যেন জমে গেছে। ছই এর মুখটা তে শাড়ি দিয়ে পর্দা করা। কুকুরটা অনুমান করার চেষ্টা করছে নৌকায় কি আছে। কারণ দীর্ঘ দিন এই ঘাটে নৌকা থামে না। দলনেতা চোখে চোখে নির্দেশ দিলো একজনকে। সে গায়ের চাদরটা গায়ে ভালো করে পেঁচিয়ে নৌকা থেকে নামলো। কুকুরটা আরও দু/তিন বার ডেকে উঠেছে এর মধ্যে।
এখন চারদিক অবার নীরব। শুন-শান। তীর থেকে দুবার চাপা কাশির শব্দ হল। কুকুরটার একটা ব্যবস্থা হয়ে গেছে। দলনেতার নির্দেশে সবাই নৌকার পিছন দিক দিয়ে নিঃশব্দে পানিতে নামতে লাগলো। যেন মনে হয় নৌকার যাত্রীরা নৌকাতেই আছে। ঠাণ্ডা পানি যেন অবশ করে দিতে চাইছে। বার জন নেমে আসলো একে-একে। আড়াল রেখে রেখে দলটি পৌঁছে গেল শহরে ঢুকার একটি গলিতে। এইটা প্রধান গলি নয়। ছয় জন করে দু’টি দলে বিভক্ত হয়ে দুটি গলিপথে এগোতে লাগলো। পুরানো ঢাকার আড়ত এলাকা। বিভিন্ন গোডাউন নদীর তীর ঘেঁষে। আবাসিক এলাকাটা আর একটু দূরে। আড়ত আর গোডাউন গুলোতে মাল নেই দীর্ঘ দিন। থম-থম করছে চারদিক। অভিযানকারীরা খুব ধীরে দেয়াল ঘেঁষে এগিয়ে চলছে। সে কোন সময় কিছু একটা ঘটে যেতে পারে। সকলের স্নায়ু টান-টান। মুখের পেশি গুলও শক্ত হয়ে উঠেছে।
এক সময় তারা আবাসিক এলাকাটার মুখে চলে এলো। অনেক পুরন সব বাড়ী। ব্রিটিশ আমলের তৈরি। বেশির ভাগ হিন্দু ধর্মীদের আবাস। এখন ফাঁকাই বলা যেতে পারে। দিনের আলো ফুটে উঠছে। ঘন কুয়াশা। তা ভেদ করে আলো ছড়িয়ে পড়ছে। দলটা এগোতে থাকে। হঠাৎ দোতালার একটা জানালা খোলার হালকা শব্দ হয়। জানালাটা পুরোটা খোলেনি। একটা কোমল মুখ। চরম বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে দলটির দিকে। সে পিছন ঘুরে কাউকে চাপা গলায় কিছু বলল। কিছুক্ষন পরেই তার পিছনে আরেকজন মহিলা কে দেখা গেল। জানালাটা খুলে যাচ্ছে। অভিযাত্রীরা সাবধান হয়ে উঠে। আরও দু/তিনটে উৎসুক নারী-পুরুষের মুখ। কে যেন ফিস ফিস করে বলল, “মুক্তি”। আশে-পাশের বাড়ি ঘরের জানালা দরজা গুলো ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে। উৎসুক নারী-পুরুষ অবাক বিস্ময়ে তাদের দেখছে আর নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছে “মুক্তি”। গুঞ্জন টা ধীরে ধীরে বাড়ছে। এতো গুঞ্জনেও শব্দটা পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে। শব্দ টা যেন প্রতি পলে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। আরও মজবুত হয়ে উঠছে।
কুয়াশা কেটে যাচ্ছে। সকালের তির্যক আলো অভিযাত্রীদের শরীর আর অস্ত্র ছুঁয়ে গলিপথে দীর্ঘ ছায়া ফেলছে। অভিযাত্রীরা এগিয়ে চলেছে।
আজ ডিসেম্বর ১৬, ১৯৭১।
আগের কিছু লেখা...
হিসাব : অণু গল্প
বনসাই : অণু গল্প
নাগরিকঃ অণু গল্প
এ্যাকাউন্টসঃ অণু গল্প
ডুবঃ অণু গল্প
ফেরাঃ অণু গল্প
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই অক্টোবর, ২০১০ সকাল ১০:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


