এই উত্তাপ হীন জীবনে দখিনা বাতাস হয়ে এলো গ্রাম সম্পর্কের এক জ্ঞাতি ভাই। এই ভাই বছর চারেক আগে হঠাৎ করে উধাও হয়ে গেছিলো। উদয় হল এই সেদিন। সবাই ভেবেছিলো মারা-ই গেছে বুঝি। সে যেদিন ফিরল, তার বাড়িতে যেন মেলা বসলো। সকলের চোখে হাজারো প্রশ্ন। সে একে একে বয়ান করে সকল উত্তর। সে এখন থাকে ঢাকা। রাজধানী। দেশের প্রধান নগর। অদ্ভুত সে নগর। কোটি লোকের বাস। নগর জোড়া রাস্তা, তাতে চলে হাজার রকমের মটরগাড়ি। সেইখানে দিন-রাত সমান। বেশুমার আলোর ঝলকানি। মানুষ গুলো কি সুন্দর। সবারই ভালো স্বাস্থ্য। খাওয়া পড়ার কোন অভাব নাই। তারা অনেক সুখী। সেখানে খালি টাকা আর টাকা।
আমাদের নায়ক স্বপ্নালু চোখে নগরের বয়ান শুনে। সে কল্পনায় সেই স্বপ্নের নগরে পথে-ঘাটে ঘুরে বেড়ায়। আহ্...কি শান্তি...কি সুখ...। সে ফিরে আসে বাস্তবতায়। এই যে জ্ঞাতি ভাই, সকলের কেন্দ্রে বসে আছে, কেমন ভাল তার স্বাস্থ্য, কি সুন্দর রঙ্গিন জামা তার পরনে, হাতে কি ঝকমকে একটা ঘড়ি। পায়ে কি সুন্দর জুতা। তার শরীর থেকে কি সুন্দর সুগন্ধি সুবাস বের হয়। সব কিছু সেই নগর তাকে দিয়েছে। জ্ঞাতি ভাইয়ের বাবা সকলকে আসর ভাঙার তাগাদা দেয়। তার ছেলেকে এতো দিন ফিরে পেয়েছে, তার প্রতি তার পরিবারের হক সবার আগে। সবাই বিস্ময় নিয়ে আসর ভাঙ্গে। নগরের কথা সবার মুখে। অদ্ভুত সে নগর। এই নগরই এই জ্ঞাতি ভাইকে স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিয়েছে, সে যখন এসেছে নিশ্চয় এই পরিবারেরও দিন ফিরল। এ এক দিন বদলের নগর।
আমাদের নায়ক সুযোগ খুঁজে সেই জ্ঞাতি ভাইয়ের সাথে বসে দু’চার কথা বলার। সময় করে তা পেয়েও যায়। জানতে পারে সে জ্ঞাতি ভাই কিছুদিনের মধ্যে আবারো ফিরে যাবে সেই শহরে। এখন তার আশা-যাওয়া থাকবে এই গণ্ডগ্রামের সাথে।
আমাদের নায়ক ফিরে যায় ঘরে। প্রতিদিনের কাজ-কর্মের ফাঁকে ফাঁকে তার মন পড়ে থাকে তার নগরে। কি আছে এই গণ্ডগ্রামে? খাদ্যাভাব, রোগ-শোক, অশান্তি, অনিয়ম, অব্যবস্থা, ঝগড়া-কাজিয়া...একদম বাসের অযোগ্য। চোখ বুজলেই স্বপনে নগরের সুখী ছবি তার মনে ভেসে উঠে। সে মনস্থির করে। সেই নগরে সে যাবে। জীবনের গল্প তাকে বদলাতেই হবে।
জ্ঞাতি ভাইয়ের সাথে সমঝোতা অনুযায়ী সে একদিন রওনা হয় যোজন দুরের সেই নগরে...তার স্বপনের নগর। সন্ধ্যায় যখন ইস্টিমার এসে থামল তখন দিন না রাত বোঝা দায়। নদীর পাড় মুক্তার মত ঝলমল করছে আলোয়। চারদিকে হাজার কোলাহল। নানা রকমের, নানা জীবিকার মানুষ। ভিন্ন ভিন্ন তাদের বচন ভঙ্গী। আমাদের নায়ক শহরের এই পাঁচমিশালী আয়োজনে তালকানা হয়ে যায়। ইস্টিমার থেকে মাটিতে নামে সে, ঠিকানা খোঁজার প্রচেষ্টায়। চলমান নাগরিকদের মাঝে কেউ একজন স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে এগিয়ে আসে সাহায্যের জন্য। তার কাছ থেকে আমাদের নায়ক জানতে পারে জ্ঞাতি ভাইয়ের বাসস্থান সেখান থেকে অনেক দূরে। এই রাতে সেখানে যাওয়ার থেকে রাতটা সে এই সুহৃদ নাগরিকের ঘরে আতিথেয়তা গ্রহণ করতে পারে। আমাদের নায়কের মন কৃতঙ্গতায় ভরে ওঠে। এই নগর এতো প্রাণ চাঞ্চল্যে ভরপুর হবে না কেন? যে শহরে এতো সুহৃদের বসবাস...সেখানে প্রাণ প্রাচুর্য থাকতেই হবে।
পরদিন আমাদের নায়ক নিজেকে আবিষ্কার করে এক সরু গলির ভেতরে ধরাশায়ী অবস্থায়। সে কিছুই বুঝতে পারে না প্রথমে। কিছুটা ধাতস্থ হলে বুঝতে পারে তার সাথে পুটলি টা নেই। সেখানে নিজস্ব কাপড়ের সাথে আড়াই’শ টাকা ছিল। সেই সুহৃদ ব্যক্তির সাথে এক ছাপরা দোকানে রঙ চা খাবার পর আর কিছু মনে নাই। রাস্তার দুই ইঁচড়েপাকা গলির ফাঁকে তাকে আবিষ্কার করে হাসিতে ভেঙ্গে পড়ে। এই দুই খুদে নাগরিকের কাছ থেকে সে জানতে পারে তার না জানা সম্ভাব্য গল্প টা।
কিছুদিন পর ইস্টিমার ঘাটে আমাদের নায়ক কে দাঁড়িয়ে নগরে নবাগতদের পর্যবেক্ষণ করতে দেখা যায়। এক নবাগতকে দাড় করিয়ে কিছু কথা বলে সে। কিছুক্ষণের মধ্যে সেই নবাগত কে নিয়ে দূরে এক ছাপরা চা-এর দোকান পানে হেটে যেতে দেখা যায় আমাদের নায়ক, নব্য নাগরিক কে।
আগের কিছু লেখা...
এ্যাকাউন্টসঃ অণু গল্প
ডুবঃ অণু গল্প
ফেরাঃ অণু গল্প
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই অক্টোবর, ২০১০ দুপুর ১:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



