রাজ্জাক সাহেব আবার শুরু থেকে হিসেব করা শুরু করলেন। এই হিসাব গুলো চাইলেই শুরু থেকে শুরু করা যায়। গড়মিল হলে মিসিলিনিয়াস হিসাব দেখিয়ে আয়-দায় দুই পক্ষকে মিলিয়েও দেয়া যায়। সহজ হিসাব। সহজ এবং মনগড়া। কিন্তু এই সহজ হিসাব টাই মিলছেনা। মানুষিক ভাবে চাপ বোধ করছেন।
আচ্ছা...অনেক দিনের হিসাব যদি একবারে মিলিয়ে দিতে বলে...কোন তুখোড় এ্যাকাউনটেন্ট কি পারবে একদিনে মিলাতে? রাজ্জাক সাহেব তো নেহাতই সিনিয়র অফিসার, হিসাব শাস্ত্রের উপর তার যা দখল তা এই অফিসে কর্মসূত্রে। তাই তিনি আজ বড় অসহায় বোধ করছেন। মিলে যাই যাই করেও হিসাব মিলছে না।
রাজ্জাক সাহেব একটু পিছনে সরে চোখের চশমা টা খুলে টেবিলে রেখে চেয়ারে হেলান দিলেন। মনের চাপটা বেড়েই চলেছে। একটু হালকা হওয়া দরকার। তিনি লম্বা করে শ্বাস নিলেন। লম্বা শ্বাসে ফুসফুসে বেশি অক্সিজেন ঢুকে, এই অক্সিজেন রক্তের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছে মগজকে শান্ত করতে সহায়তা করে। কোথায় পড়েছিলেন তা জানা নেই। তবে মাঝে মাঝে কাজে দেয় বলে মনে হয়।
রাজ্জাক সাহেবের স্ত্রী তার থেকে বার বছরের ছোট ছিলেন। হ্যাঁ... ছিলেন। তার ছিল লেট ম্যারেজ। হুট করে বলা-কওয়া নাই এ্যাপেন্ডিক্স ফেটে মারা গেলেন। তাও আজ থেকে বছর পনেরো আগে। একটা মেয়ে আর একটা ছেলে আছে। মেয়েটা অটিস্টিক। একটু পিছিয়ে পড়া বুদ্ধি সম্পন্ন। ছেলে টা কলেজ পাশ করেছে মাত্র। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অথবা কলেজ গুলোই ভরসা। তার কেরানী জীবনে এমন কোন আর্থিক সচ্ছলতা আসে নাই যা দিয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবেন। মেয়েটাকে নিয়েই যত চিন্তা। এর তো কোন ব্যবস্থা হবে না। এতো আর নাটক-সিনেমা নয়, যে কোন সুপুত্র এসে বলবে, আপনার মেয়ের সকল দায়িত্ব আজ থেকে আমার...ইত্যাদি...ইত্যাদি।
রাজ্জাক সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার হিসেবের খাতাটা টেনে নেন। এইবার না মিললে গড়মিল হিসাব দেখিয়ে একটা নোট দিয়ে দেবেন। ম্যানেজার সাহেব আশাকরি বিরক্ত হবেন না। অন্তত পক্ষে আজকের দিনটায়। রাজ্জাক সাহেব প্রথম থেকে শুরু করেন।
ইব্রাহীম, সেও সিনিয়র অফিসার, যদিও ক্যারিয়ার মাত্র শুরু করেছে, পাশ থেকে উঠে এলো, “রাজ্জাক ভাই, সকাল থেকে খুব চিন্তিত মনে হচ্ছে? কোন সমস্যা?
“হ্যাঁ...দেখো না, জেনারেল ইয়ার্ন লিমিটেডের এই হিসাবটা কেন জানি কিছুতেই মিলছে না, ভুলটা খুঁজে বের করতেই পারছি না”
“দিন, দেখি তো...আমি খুঁজে বের করতে পারি কিনা... ...রাজ্জাক ভাই, কোন সমস্যা তো দেখছি না...আপনি তো এক পাশের যোগ ফল লিখেছে অন্য পাশে লিখেন নাই...অন্যপাশের যোগফল কিন্তু ঠিকই আছে! শুধু তুলেন নাই এই যা।"
“মানে? দেখি তো? ওহ্ হো...আমি কি তাহলে প্রতিবারই একি ভুল করছি! সেই সকাল থেকে...তাই তো দেখছি!!!...কখনও তো এমন হয়না!!!”
ইব্রাহীম রাজ্জাক সাহেবের পিঠে হাত রেখে বলল, “মন খারাপ করেন না রাজ্জাক ভাই, সবাইকে তো একদিন রিটায়ার করতেই হবে...ভাবুন তো, কাল থেকে আপনার অখণ্ড অবসর, এখন পরিবারকে বেশি সময় দিতে পারবেন, মেয়েটাকে নিজে দেখাশোনা করতে পারবেন”।
রাজ্জাক সাহেব দু’হাতে মুখ ঢাকেন, কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠেন, “ওটা গড়মিলের হিসাব ইব্রাহীম...সব অনাদায়ী...ব্যাড ডেব্টস...আমার হিসেবের খাতা মিলিয়ে যেতে পারলাম না...”
ছয়’টা বাজে। নিকট সহকর্মীদের সাথে অফিস থেকে বের হয়ে আসেন রাজ্জাক সাহেব, এ্যাকাউনটেন্ট ...... রিটায়ার্ড।
আগের কিছু লেখা...
ডুবঃ অণু গল্প
ফেরাঃ অণু গল্প
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই অক্টোবর, ২০১০ দুপুর ১:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




