সে মনে করতে পারে...বাচ্চা কালে...যখন বয়স পাঁচ কি ছয়...তখন...ওদের গ্রামের পাশ দিয়া ছাপায় চলা যে গাং, তাতে সাঁতার দিবার কালে একবার ডুবতে ধরছিল। শরাফত চাচার পোলা নান্দু...তার থেকে আট/নয় বছরের বড়, ঝাপ দিয়া তারে তুইলা নিয়া আসছিল। ডুবনের মুহূর্তে যেমন মনে হইতেছিল...এখন সেরমই লাগতেছে।
নান্দু যখন তারে লইয়া উঠায় নিয়া আসে তখন মরিয়মের ঞ্জান নাই। পরে যখন ঞ্জান আইলো...হায়রে বাপের গাইল...মা সেদিন আড়াল না দিলে মনে হয় গাইল খাইয়াই মইরা যাইত। এর পর থেই ক্যা নান্দুর সামনে যাইতে মরিয়মের লজ্জা লাগতো। এক সময় মরিয়ম বড় হইলো। বড় হইলে সে বুঝলো মানুষটারে তার মনে ধরছে সেই বাচ্চা কালেই। আহ্...হায়রে স্বপন। মরিয়ম আবার ডুবতে থাকে।
মরিয়মের চোখের সাদা আলোটা উজ্জ্বলতা হারাইতেছে প্রতি মুহূর্তে। মরিয়ম কিছু চিন্তা করবার পারে না। তার পায়ে কেউ যেন চল্লিশ মইন্যা কলসি বাইন্ধ্যা দিছে। মরিয়ম যেন ডুইবা যাইতাছে...
মরিয়ম চোখের কাছে ছায়া টের পায়। কিন্তু মাইনসের চেহারা তো মনে হয় না! কুত্তা নাকি? মরিয়মের চউখের পাতা কাইপা উঠে। শেষ পর্যন্ত কুত্তা আইসা মুখ সুক্তাসে! এক কুত্তারে তো এই জীবনে সামাল দিতে পারলো না...
“এ্যাই যাহ্...যাহ্...কুত্তার বাচ্চা...কুত্তা...” একটা আধলা ইট তুইল্যা কুত্তার দিকে ছুঁইরা মারে মরিয়মের বাপ। মরিয়মের মা একটা ওয়ার্ডের দরজার পাশে আঁচলে মুখ ঢাইকা কাইপা কাইপা নিঃশব্দে কাইন্দা উঠে।
“বিষ খাইসে কখন?” হাসপাতালের এক চ্যাংড়া ডাক্তার প্রশ্ন করে মরিয়মের বাপকে।
“আইজ ভোরে, ছার”
“ভোরে!?! মিয়া, ভোরে বিষ খাইসে আর তুমি এরে লইয়া আইসো এখন... দুপুর দেড়টার সময়?...যত্তসব... বিষ খাইসে ক্যান?”
ময়নার বাপ ডুকরাইয়া কাইন্দা উঠে... “ওর বিয়ার সময় পঞ্চাশ হাজার ট্যাকা দিবার কথা ছিল জামাই হারামজাদারে...পারিনাই গো ছার...পারি নাই...মাইয়্যা আইজ আমারে সমাধান দিছে...আহ্হা রে খোদা...”
“সময় গেলে বুঝ হইয়া লাভ আছে?...যাগ্গে...এইটা তো পুলিশ কেস...এতো দেরিতে নিয়া আসছ...মুখ দিয়া তো ফেনা ভাঙতাসে...বাঁচাইতে পারবো কিনা জানিনা...চেষ্টা করতেছি...দেখি...”
মরিয়মের মাথা কিছুটা পরিষ্কার হইসে। সে বুঝে কোন কারণে কুত্তা টা তার কাছ থেই ক্যা পালাইসে। তার চোখের আলোটা আবারো ছায়ায় ঢাইকা যায়। কাছে আসলে বুঝে এইটা একটা বাচ্চা। হামাগুড়ি দিয়া তার মুখের কাছে আইসে। মরিয়মের পোলা। আট মাস বয়স। মরিয়মের দিকে চাইয়া মিট মিটাইয়া হাসি দেয়। পোলাটার এই এক অভ্যাস...ক্ষণে ক্ষণে হাসি দেয়। মরিয়ম পোলারে চিনবার পারে। পোলাটার জন্য মন মায়ায় ভইরা যায়। মরিয়ম পোলাটারে ছুঁইতে চায় কিন্তু হাতখান নড়াইতেই পারে না। কষ্টে মরিয়মের চোখ বাইযা পানি গড়ায় পড়ে। এই পোলাটারে ফেলাইয়া সে কেমনে ডুব দিব? পোলাটার হাসি দেইখাই তো সে সারা জীবন পার কইরা দিতে পারবো। মরিয়ম অসহায় হইয়া পড়ে। সে চউখ দুইখান জোর কইরা খুইলা রাখে। বেহেস্তি নূর তার চউখে জ্বালায় রাখতেই হইব। সে ডুব দিবো না। মইরা গেলেও না।
মরিয়মের পোলা হাসে। পোলাটার এই এক অভ্যাস...ক্ষণে ক্ষণে হাসি দেয়।
আগের কিছু লেখা...
ফেরাঃ অণু গল্প
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই অক্টোবর, ২০১০ দুপুর ২:০৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



