somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ফেলে আসা দিন, বানরের কামড় এবং এক টুকরো প্রেম: আমার শৈশবের ‘শিশু পার্ক’

১৮ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ১০:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিগুলো বড় অদ্ভুত। মনের কোনো এক কোণে ধুলোবালি জমে থাকে, অথচ হুট করে এক-একটা বিশেষ দিনে সেই ধুলো সরে গিয়ে স্মৃতির আয়নাটা ঝকঝকে হয়ে ওঠে। আজ তেমনই এক ফ্লাশব্যাগে হারিয়ে গেলাম—সময়টা ২০০৩ সালের ১৪ই এপ্রিল, সোমবার। শুভ পহেলা বৈশাখ!

সেদিন আমি আর আমার ফুফাতো ভাই সরোয়ার খান মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম রূপাতলী থেকে বিআরটিসি দোতলা বাসে চড়ে 'বরিশাল শিশু পার্ক' (বর্তমানে প্ল্যান্ট ওয়ার্ড শিশু পার্ক)-এ যাবো। তখন ছাত্রদের জন্য বিআরটিসি দোতলা বাস (ডাবল ডেকার) সার্ভিসে যাতায়াত ছিল ফ্রি। তবে সরোয়ার ভাই আবার খান বাড়ির ছেলে, মোল্লা বাড়ির নাতি—এলাকার চেনা মুখ এবং একটু নেতা টাইপের ছিল। আমি বয়সে বেশ ছোট হলেও তার সাগরেদ হয়ে সাথে চললাম। বাসের ভাড়া সম্ভবত তখন ছিল মাত্র ৫ টাকা করে। কিন্তু আমরা তো স্টুডেন্ট, তাই বুক ফুলিয়ে ভাড়া না দিয়েই নেমে গেলাম!

ছোটবেলা থেকেই পহেলা বৈশাখে পাঞ্জাবি পরা আমার ভীষণ পছন্দ ছিল, কারণ পহেলা বৈশাখ উৎসবটা আমার কাছে খুব ভালো লাগতো। সেদিনও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে বৈশাখ হলেও আবহাওয়াতে কেমন যেন একটা শীতের আমেজ ছিল, তাই পাঞ্জাবির ওপর একটা জ্যাকেটও চড়িয়ে নিয়েছিলাম।

শিশু পার্কে তখন উপচে পড়া ভিড়। বর্তমান ব্লেস পার্ক সংলগ্ন অফিসার্স ক্লাবের যে টেবিল টেনিস মাঠ, সেখানে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে জমজমাট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছে। লাল-নীল-সবুজ শাড়ি পরে শিল্পীরা রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত গাইছেন। আহা, কী দারুণ সেই আনন্দ! বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র(২০০৮- ২০১৩) প্রয়াত শওকত হোসেন হিরণ ভাইয়ের তৎকালীন পার্ক ইজারা নেয়া আমলের সেই রূপালী দিনগুলো আজো চোখে ভাসে। এখনকার মতো তখন বিনোদনের জন্য ব্লেস পার্ক, ৩০ গোডাউন , চাঁদমারি বা খেয়াঘাট এত জনপ্রিয় ছিল না; সবার বিনোদনের একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই শিশু পার্ক। এবং মানুষের প্রচণ্ড ভিড় থাকতো সেখানে।

পার্কের ভেতরে কয়েকটি খাঁচায় তখন বানর থাকতো। সবাই যেভাবে বাদাম খাইয়ে বানরের সাথে দুষ্টুমি করে, আমিও খাঁচার একদম কাছে গিয়ে তেমনই একটু খ্যাপাতে গেলাম। কিন্তু কে জানতো কপালে কী আছে! আমি বুঝতেই পারিনি যে খাঁচার বানর এভাবে আক্রমণ করতে পারে। হুট করে একটা বানর এসে থাবা দিয়ে আমার জ্যাকেটটা কামড়ে ধরলো। মানে আমাকে একটা কামড় দিল, আমার জ্যাকেট কামড় দিয়ে ধরেছে। ধরার পরে কোনোভাবেই ছাড়ছে না। শেষে উপায় না দেখে মনে মনে বানর মামার কাছে হাতজোড় করে "ক্ষমা" চাইলাম। অদ্ভুত ব্যাপার, ক্ষমা চাওয়ার পর পরই বানরটা জ্যাকেট ছেড়ে দিল! আজো ভাবলে হাসি পায়, সেদিন জ্যাকেটটা না থাকলে নির্ঘাত একটা ভ্যাকসিনের ডোজ কপালে জুটতো। এ হচ্ছে বিষয়।

পহেলা বৈশাখ ছাড়াও ঈদ, কোরবানি বা যেকোনো বিশেষ দিনে আমরা সব বন্ধু-বান্ধবরা মিলে দল বেঁধে এই শিশু পার্কে চলে আসতাম। তখনকার দিনে আলাদা আলাদা ভাবে শিল্পীদের নিয়ে বড় কনসার্টের আয়োজন হতো পার্কের ভেতরেই। আসিফ, মমতাজ কিংবা শাহীন কৌতুকের মতো বড় বড় তারকারা আসতেন, তাঁদের নিয়ে দারুণ আয়োজন থাকতো। ভেতরের সেই বোট বা নৌকা রাইড, ট্রেন আর রঙিন রাইডগুলো যেন আমাদের আনন্দের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিত, আর পহেলা বৈশাখে তো এই ভিড় দ্বিগুণ হয়ে জমতো। এরকমের স্মৃতি আসলে যা ভোলার নয়।

তবে এই শিশু পার্কের সাথে আমার জীবনের সবচেয়ে মধুর এবং রোমান্টিক স্মৃতিটা জড়িয়ে আছে। সময়টা তখন ২০০৯ সাল। আমার র্স্ত্রী ফাহমিদা আক্তার আশার সাথে তখন কেবল সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। প্রথম দেখার সেই রোমাঞ্চকর দিনটি ছিল এই শিশু পার্কে! অবশ্য সন্ধ্যার পরে ও ওর ফুফির সাথে আসে, আর আমি সাথে নিয়ে গিয়েছিলাম আমার এক বড় ভাই সাইদুল ভাইকে। একসময় সাইদুল ভাই আর আমি একসাথে খুব চলতাম। কাকতালীয়ভাবে সাইদুল ভাই আর আমার ফুফু শাশুড়ি আবার একে অপরের ক্লাসমেট ছিলেন! পার্কের একপাশে ওনারা পুরোনো দিনের গল্পে মশগুল হলেন, আর অন্যপাশে আমরা দুজনে শুরু করলাম আমাদের জীবনের এক নতুন গল্পের সূচনা। কী ভীষণ রোমান্টিক আর মায়াবী একটা মুহূর্ত ছিল সেটি!

আজকের যান্ত্রিক জীবনে দাঁড়িয়ে পেছনের দিকে তাকালে এই স্মৃতিগুলো বুকের ভেতর এক অদ্ভুত দোলা দিয়ে যায়। মাঝে মাঝে ফ্লাশব্যাগে চলে গেলে এই স্মৃতিগুলো খুব মনে পড়ে। শিশু পার্কের সেই ট্রেন, নৌকা, বানরের খাঁচা আর প্রথম প্রেমের সেই মিষ্টি সন্ধ্যা—এসব আসলে কখনো ভোলার নয়।

---
ব্লগের বন্ধুদের কি এমন কোনো চেনা পার্কের নস্টালজিক স্মৃতি আছে? কমেন্টে জানাতে পারেন!
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:০৬
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

১৯৭১-এ ৩ লক্ষ না ৩ মিলিয়ন নিহত হয়েছিলেন?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৫

১৯৭১-এ ৩ লক্ষ না ৩ মিলিয়ন নিহত হয়েছিলেন, তা নিয়ে অনেক অপরাজনীতি হয়েছে। সরকার এই অপরাজনীতি খুব সহজে বন্ধ করতে পারেন। যদি ১৯৭১-এ নিহতদের একটি ডাটাবেইজ তৈরী করা যায় তাহলেই,... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাথর ছুঁড়ে হত্যা করার কথা!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:১৯


সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের পর তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাঁর এমপি... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট গল্পঃ অপ্রত্যাশিত উপহার

লিখেছেন সামিয়া, ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৪০




সৌদি আরবের রিয়াদের একটা পাঁচ তারকা হোটেলে আমার চাকরি। চাকরিটা খুব কঠিন কিছু না। প্রতিদিন একটা ভ্যাকুয়াম ক্লিনার হাতে নিয়ে হোটেলের কার্পেট পরিষ্কার করি। লবি, করিডোর, হলরুম, অতিথিদের বসার... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগার নিমো'র আসল নাম নিমচাঁদ না?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



সামুর আগের মডূ জাদীদ ভাই আমাকে একবার বলেছিলেন ব্লগার নিমো'র আসল নাম নিমচাঁদ, তাঁর খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তারা মাঝে মাঝে পদ্মার পাড়ে ইলিশ খেতে যান। আর, গরুর... ...বাকিটুকু পড়ুন

মরিয়ম খাতুন জীবন থেকে ছুটি নিয়েছে

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:১৮



মরিয়ম খাতুন। মাত্র ১৯ বছরের একটি মেয়ে। ৭৫ বছরের বুইড়া পাঁঠা গাজী নজরুলের লালসার শিকার হয়ে জীবন থেকে ছুটি নিয়েছে। শুধুমাত্র একটি ছোটখাটো চাকুরী সুপারিশের জন্য গিয়েছিল। তখনই ১৯... ...বাকিটুকু পড়ুন

×