
শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিগুলো বড় অদ্ভুত। মনের কোনো এক কোণে ধুলোবালি জমে থাকে, অথচ হুট করে এক-একটা বিশেষ দিনে সেই ধুলো সরে গিয়ে স্মৃতির আয়নাটা ঝকঝকে হয়ে ওঠে। আজ তেমনই এক ফ্লাশব্যাগে হারিয়ে গেলাম—সময়টা ২০০৩ সালের ১৪ই এপ্রিল, সোমবার। শুভ পহেলা বৈশাখ!
সেদিন আমি আর আমার ফুফাতো ভাই সরোয়ার খান মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম রূপাতলী থেকে বিআরটিসি দোতলা বাসে চড়ে 'বরিশাল শিশু পার্ক' (বর্তমানে প্ল্যান্ট ওয়ার্ড শিশু পার্ক)-এ যাবো। তখন ছাত্রদের জন্য বিআরটিসি দোতলা বাস (ডাবল ডেকার) সার্ভিসে যাতায়াত ছিল ফ্রি। তবে সরোয়ার ভাই আবার খান বাড়ির ছেলে, মোল্লা বাড়ির নাতি—এলাকার চেনা মুখ এবং একটু নেতা টাইপের ছিল। আমি বয়সে বেশ ছোট হলেও তার সাগরেদ হয়ে সাথে চললাম। বাসের ভাড়া সম্ভবত তখন ছিল মাত্র ৫ টাকা করে। কিন্তু আমরা তো স্টুডেন্ট, তাই বুক ফুলিয়ে ভাড়া না দিয়েই নেমে গেলাম!
ছোটবেলা থেকেই পহেলা বৈশাখে পাঞ্জাবি পরা আমার ভীষণ পছন্দ ছিল, কারণ পহেলা বৈশাখ উৎসবটা আমার কাছে খুব ভালো লাগতো। সেদিনও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে বৈশাখ হলেও আবহাওয়াতে কেমন যেন একটা শীতের আমেজ ছিল, তাই পাঞ্জাবির ওপর একটা জ্যাকেটও চড়িয়ে নিয়েছিলাম।
শিশু পার্কে তখন উপচে পড়া ভিড়। বর্তমান ব্লেস পার্ক সংলগ্ন অফিসার্স ক্লাবের যে টেবিল টেনিস মাঠ, সেখানে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে জমজমাট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছে। লাল-নীল-সবুজ শাড়ি পরে শিল্পীরা রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত গাইছেন। আহা, কী দারুণ সেই আনন্দ! বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র(২০০৮- ২০১৩) প্রয়াত শওকত হোসেন হিরণ ভাইয়ের তৎকালীন পার্ক ইজারা নেয়া আমলের সেই রূপালী দিনগুলো আজো চোখে ভাসে। এখনকার মতো তখন বিনোদনের জন্য ব্লেস পার্ক, ৩০ গোডাউন , চাঁদমারি বা খেয়াঘাট এত জনপ্রিয় ছিল না; সবার বিনোদনের একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই শিশু পার্ক। এবং মানুষের প্রচণ্ড ভিড় থাকতো সেখানে।
পার্কের ভেতরে কয়েকটি খাঁচায় তখন বানর থাকতো। সবাই যেভাবে বাদাম খাইয়ে বানরের সাথে দুষ্টুমি করে, আমিও খাঁচার একদম কাছে গিয়ে তেমনই একটু খ্যাপাতে গেলাম। কিন্তু কে জানতো কপালে কী আছে! আমি বুঝতেই পারিনি যে খাঁচার বানর এভাবে আক্রমণ করতে পারে। হুট করে একটা বানর এসে থাবা দিয়ে আমার জ্যাকেটটা কামড়ে ধরলো। মানে আমাকে একটা কামড় দিল, আমার জ্যাকেট কামড় দিয়ে ধরেছে। ধরার পরে কোনোভাবেই ছাড়ছে না। শেষে উপায় না দেখে মনে মনে বানর মামার কাছে হাতজোড় করে "ক্ষমা" চাইলাম। অদ্ভুত ব্যাপার, ক্ষমা চাওয়ার পর পরই বানরটা জ্যাকেট ছেড়ে দিল! আজো ভাবলে হাসি পায়, সেদিন জ্যাকেটটা না থাকলে নির্ঘাত একটা ভ্যাকসিনের ডোজ কপালে জুটতো। এ হচ্ছে বিষয়।
পহেলা বৈশাখ ছাড়াও ঈদ, কোরবানি বা যেকোনো বিশেষ দিনে আমরা সব বন্ধু-বান্ধবরা মিলে দল বেঁধে এই শিশু পার্কে চলে আসতাম। তখনকার দিনে আলাদা আলাদা ভাবে শিল্পীদের নিয়ে বড় কনসার্টের আয়োজন হতো পার্কের ভেতরেই। আসিফ, মমতাজ কিংবা শাহীন কৌতুকের মতো বড় বড় তারকারা আসতেন, তাঁদের নিয়ে দারুণ আয়োজন থাকতো। ভেতরের সেই বোট বা নৌকা রাইড, ট্রেন আর রঙিন রাইডগুলো যেন আমাদের আনন্দের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিত, আর পহেলা বৈশাখে তো এই ভিড় দ্বিগুণ হয়ে জমতো। এরকমের স্মৃতি আসলে যা ভোলার নয়।
তবে এই শিশু পার্কের সাথে আমার জীবনের সবচেয়ে মধুর এবং রোমান্টিক স্মৃতিটা জড়িয়ে আছে। সময়টা তখন ২০০৯ সাল। আমার র্স্ত্রী ফাহমিদা আক্তার আশার সাথে তখন কেবল সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। প্রথম দেখার সেই রোমাঞ্চকর দিনটি ছিল এই শিশু পার্কে! অবশ্য সন্ধ্যার পরে ও ওর ফুফির সাথে আসে, আর আমি সাথে নিয়ে গিয়েছিলাম আমার এক বড় ভাই সাইদুল ভাইকে। একসময় সাইদুল ভাই আর আমি একসাথে খুব চলতাম। কাকতালীয়ভাবে সাইদুল ভাই আর আমার ফুফু শাশুড়ি আবার একে অপরের ক্লাসমেট ছিলেন! পার্কের একপাশে ওনারা পুরোনো দিনের গল্পে মশগুল হলেন, আর অন্যপাশে আমরা দুজনে শুরু করলাম আমাদের জীবনের এক নতুন গল্পের সূচনা। কী ভীষণ রোমান্টিক আর মায়াবী একটা মুহূর্ত ছিল সেটি!
আজকের যান্ত্রিক জীবনে দাঁড়িয়ে পেছনের দিকে তাকালে এই স্মৃতিগুলো বুকের ভেতর এক অদ্ভুত দোলা দিয়ে যায়। মাঝে মাঝে ফ্লাশব্যাগে চলে গেলে এই স্মৃতিগুলো খুব মনে পড়ে। শিশু পার্কের সেই ট্রেন, নৌকা, বানরের খাঁচা আর প্রথম প্রেমের সেই মিষ্টি সন্ধ্যা—এসব আসলে কখনো ভোলার নয়।
---
ব্লগের বন্ধুদের কি এমন কোনো চেনা পার্কের নস্টালজিক স্মৃতি আছে? কমেন্টে জানাতে পারেন!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


