আয়েশি ভঙ্গিতে বসে আছেন তিনি । চেহারায় আনন্দের সুস্পষ্ট ছাপ । তিনি মনে মনে আনন্দ ও সুখের পার্থক্য নির্ণয়ের চেষ্টা করছেন । তার ভাবনায় আনন্দ ক্ষণস্থায়ী আর সুখ দীর্ঘস্থায়ী । এই যে যেমন পুরনো বন্ধুর সাথে দেখা হলে আমরা আনন্দ পাই । তারপর আমরা ঈদের আনন্দ বলি । ঈদের সুখ বলি না কারণ ঈদ স্থায়ী নয় । দুদিন পরে এর আমেজ শেষ হয়ে যায় । কিন্তু সুখ আলাদা জিনিস । এর রেশ সতত বহমান । তাই সহজে একটা মানুষকে আমরা সুখী বলতে পারি না । এই যে এখন তিনি আনন্দিত কিন্তু সুখী নন । তার মেয়ে সাত বছর পর কানাডা থেকে এসেছে । ছেলে ঢাকা থেকে এসেছে চার বছর পর । দুদিন পর তারা চলে যাবে । তারপর আবার একা হয়ে যাবেন তিনি ।
অতীতের অনেক কথা একে একে মনে পড়ছে তার । তখন আহসানের জন্য পাত্রী দেখছিলেন । তিনি ছেলেকে বললেন , আমার প্রথম নাতিকে হাফেজ বানাব । এই কথা শুনে ছেলে তার বাড়ি থেকে উধাও । তার খালার বাসায় গেছে । খালা ফোন করল , কী দুলাভাই আহসানকে কি বলেছেন এসব । নাতিকে হাফেজ বানাবেন মানে । এই যুগে এসে এই চিন্তা কেউ করে । ও তো একটা মেয়েকে পছন্দ করে । তারপর আর কোন কথা নেই , পরের দিন একটা মেয়েকে নিয়ে হাজির । বিয়ে করে এসেছে । খালাকে নিয়ে এসেছে সমঝোতাকারী হিসেবে । ঘটনাটিকে আর বড় করেন নি তিনি । আহসানের ছেলে এখন ইংলিশ মিডিয়ামে কাস সেভেনে পড়ে । এই নাতি সারা বাড়ি সরব করে রেখেছে । বাড়ির বুয়া থেকে শুরু করে গরু ছাগল সবাইকে হাই হাই করছে । কানে একটা ইয়ার ফোন নিয়ে হাত পা নাচাচ্ছে । কখনো মোবাইলের ক্যামেরা দিয়ে গরু ছাগল , হাস মুরগির ছবি তুলছে । আর তার মেয়ের ও একটা ছেলে । এই নাতির নাম টমাস । কি বিদঘুটে নাম । তিনি ভাবছেন তাকে টমেটো বলে ডাকবেন টমাস ভাল করে বাংলা বলতে পারে না । দাদাকে সে বলছে হেই গাই ।
আগামীকাল পহেলা বৈশাখ । এমন উৎসবের আগে তার ছেলে মেয়ে এসেছে তার বেশ ভাল লাগছে । তার পৌহিত্র জেসি পাশে আসল । তার হাতে একটা কাগজ । সেখানে লেখা শুভ নববর্ষ ।
- হাই দাদু এই দেখ শুভ নববর্ষের নিচে সালটা লিখব । কালকে কত সাল পড়বে ?
শহিদুল সাহেব অবাক হলেন । কালকে বাংলা কত সাল পড়বে তা নাতি জানে না ? তারপরও তিনি হাসি ভরা মুখে বললেন , কেন দাদু তুমি এটা জান না ?
- না দাদু । এটা তো জানার প্রয়োজন পড়ে না । সবখানে তো ইংরেজি তারিখ লেখি ।
- কাল কে বাংলা কোন মাস পড়ছে এটা জান তো ?
- হুম জানি । বৈশাখ মাস ।
- বাংলা বার মাসের নাম বলতে পার দাদু ?
- এটা পারব না কেন ! তবে বাংলা তারিখ বলতে পারি না । বাদ দাও তো । কোন সাল এটা বল । আব্বু বলল তোমার কাছে জানতে ।
- আচ্ছা যাও লিখ ১৪১৭ ।
বেশ লজ্জায় পড়লেন তিনি । অবশ্য নাতিকে দোষ দিয়ে কি করবেন তিনি ? আমাদের দেশটাই তো এমন । আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয় ২১ ফেব্র“য়ারী । অথচ এটা পালিত হওয়া উচিৎ ছিল ৮ ফাল্গুন । শূধু পহেলা বৈশাখের দিনটি মনে রাখে সবাই । অন্য সময় তারিখ কেন মাসের নামটা বলতে পারে না অনেকে । অনেকেই তো সালটাই জানে না । যেমন তার নাতিই জানে না ।
গ্রামের স্কুল মাঠে বিরাট মেলা বসবে কাল থেকে । এবার সার্কাস এসেছে । কাল নাতিদের নিয়ে মেলায় যাবেন । ছোট বেলার কথা মনে পড়ল তার । বন্ধুদের কথা মনে পড়ল । নিয়াজ , ফজলু, রফিকদের কথা মনে পড়ল । তিনি জেসিকে ডাকলেন মান্না দের কফি হাউজের আড্ডা গানটা শুনবেন বলে । কিন্তু এবার আরো লজ্জায় পড়লেন । নাতি বলল , মান্না দে আবার কে ? দাদু আমি তো লিংকিং পার্ক , বোম্বে ভাইকিংস এদের গান শুনি । এবার তিনি মেয়েকে ডাকলেন । শুটকি আর ইলিশ মাছ আনা দরকার । কাল সকালে তো পান্তা খাওয়া হবে । আর কি কি লাগবে জানা দরকার । বকুলকে বাজারে পাঠাতে হবে । মেয়ে বলল , আব্বা কি বলছেন এসব টমাস তো এগুলো খাবে না । শুটকির গন্ধ পেলে ও বমি করবে । আমরা ঠিক করেছি সবাই মিলে একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে যাব । এখানে নাকি এখন বেশ কয়েকটা চাইনিজ রেস্টরেন্ট হয়েছে ।
- কেন তোরা মেলায় যাবিনা ?
- মেলায় কেন ? ওখানে তো শুধু ধুলা ধুলা আর ধুলা। তাছাড়া তোমার জামাই এসব পছন্দ করে না । এসব গ্রাম্য মেলায় গিয়ে কি করব ?
- ও আচ্ছা । ঠিক আছে তুই যা ।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন তিনি । বুকের গভীর থেকে আসা সে দীর্ঘশ্বাস বাতাসে মিলিয়ে গেল । এমনি করে সবকিছুই যেন মিলিয়ে যাচ্ছে । ক্ষণস্থায়ী আনন্দটুকু নিমিষে উবে গেল ।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১২ দুপুর ১:১৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


