somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শ্রেষ্ঠ দৃশ্য (ছোট গল্প)

২১ শে অক্টোবর, ২০১৫ দুপুর ১:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বেলা বাড়ার সাথে সাথে শিরিন বেগমের মেজাজও চিড়বিড় করে বাড়ছে। তিনি বার বার ঘড়ি দেখছেন। অফিসের সময় হয়ে যাচ্ছে কিন্তু কাজের বুয়াটা এখনও আসছে না। তিনি সোফায় অস্থিরভাবে বসলেন।
কেন যে কাল রাতে এতগুলো কাপড়-চোপড় ভিজালেন? এখন যদি বুয়া না আসে? অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে তার বেলা হয়ে যাবে। এতক্ষণ পড়ে থাকলে কাপড়গুলো পঁচবে। তিনি সাফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তার পাঁচ বছরের ছেলে মিঠু এসে আঁচল চেপে ধরল।
মা আইসক্রীম খাবো। মা আইসক্রীম.....
এত সকালে তোমার আইসক্রীম খাওয়ার সখ হল? এখন যাও, বিরক্ত করো না।
শিরিন বেগম বারান্দা থেকে কাপড়ভরতি বালতিটা নিয়ে দুমদাম করে কলতলায় এলেন। পিছনে পিছনে মিঠু এল। শিরিন বালতি থেকে এক একটা কাপড় নামিয়ে কাঁচতে শুরু করলেন। রাগে তার তালু জ্বলছে।
এই হা-ভাতেগুলো কাজ চাওয়ার সময় কি মিষ্টি মিষ্টি কথা! কাজ পেয়ে লাট-সাহেব।
‘মা’, মিঠু ডাকলো।
একটা টাকা দাও না। আইসক্রীম খাবো।
শিরিন মুখ না তুলেই বললেন, সকাল বেলাই তুই এমন আইসক্রীম আইসক্রীম করছিস কেন? যা এখান থেকে।
মিঠু গেল না। অভিমানী চোখে মা’র দিকে তাকিয়ে রইল।
শিরিন কাপড় কাঁচছেন আর গজগজ করছেন- আমার হয়েছে জ্বালা। সবদিক আমাকে সামলাতে হবে। যেন সংসার আমার একার!
মিঠু কাঁদো কাঁদো গলায় আবার বলল, মা, আইসক্রীম খাবো। একটা টাকা দাও না!
তোকে না এখান থেকে যেতে বললাম। আমি কি টাকা নিয়ে বসে আছি?
মা----
হঠৎ তার ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেল।
যা এখান থেকে-----
বলেই তিনি মিঠুকে একটু ধাক্কা দিলেন। কলতলাটা ছিল পিচ্ছিল। মিঠু ছিটকে কলের উপর গিয়ে পড়ল।
সঙ্গে সঙ্গে কলের হ্যান্ডেল লেগে তার থুঁতনি কেটে গেল। গলগল করে রক্ত বের হচ্ছে। শিরিন বেগম চিৎকার দিয়ে উঠে মিঠুকে ধরলেন।
আমার বাবুর কি হল! আমার বাবু------
তিনি মিঠুকে বুকে চেপে ধরলেন। মিঠু তার চোখ ঝাপসা হতে হতে দেখল, মা জলভরা চোখে চিৎকার করছেন। সেই চিৎকার ক্ষীণ হতে হতে স্তব্ধ হয়ে গেল। সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে।
শিরিন বেগম পাগলের মতো চিৎকার করে উঠলেন, আমার বাবুকে আমি মেরে ফেলেছি! আল্লাহ, আমার বাবুকে আমি মেরে ফেলেছি!
তার বুক ফাটা আর্তনাদে প্রতিবেশীরা ছুটে এল। তারা এসে পানির ঝাপটা দিতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর মিঠুর জ্ঞান ফিরল।
শিরিন জলভরা চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে আছেন। তার চোখে একরাশ অপরাধবোধ আর উদ্বেগ। মিঠু চোখ খুলতেই তার মুখে হাসি ফুটল।
তারপর....., দেখতে দেখতে বিশ বছর পার হয়ে গেছে।
মিঠু এখন পঁচিশ বছরের টগবগে যুবক। আমেরিকায় ফটোগ্রাফির উপর পড়াশোনা করছে। একজন নামকরা ফটোগ্রাফার হিসেবে ইতিমধ্যে আমেরিকার মতো দেশে বেশ সুনাম কুড়িয়েছে। তার তোলা ছবি দিয়ে ফটোগ্রাফির উপর দুটো বইও প্রকাশিত হয়েছে। নাম ‘ইনোসেন্ট আর্থ’ এবং ‘ওয়াইল্ড বিউটি’।
তার ছবিতে কি নেই? নারীর সৌন্দর্য্য, ফুলের সৌন্দর্য্য, শিশুর হাসির সৌন্দর্য্য, উড়ন্ত পাখির সৌন্দর্য্য, সমুদ্রের ঢেউ ভেঙ্গে পড়ার সৌন্দর্য্য। সৌন্দর্য্যের একটু আভাস পেলে সে ক্যামেরা হাতে ছুটে যায়- প্রকৃতির আনাচে-কানাচে, পাহাড়ে-জঙ্গলে, সমুদ্রে, মরুভূমিতে। সীমাহীন মমতা দিয়ে একের পর এক ছবি তুলে।
‘ইন্টারন্যাশনাল ফটোগ্রাফ এক্সিবিউশনে’ প্রতিবছর তার ছবি স্থান পায়। বেশ কয়েকবার তার ছবি বছরের ‘শ্রেষ্ঠ ছবি’ হিসেবে পুরস্কৃতও হয়েছে। পুরস্কার ঘোষণার পর সাংবাদিকরা তাকে প্রশ্ন করেছেন-
আপনার তেলা ছবির মধ্যে আপনার প্রিয় কোনটি?
মিঠু রহস্যময় ভঙ্গিতে হেসে উত্তর দিয়েছে, আমার প্রিয় ছবি আমি এখনও তুলিনি। আমি জানি এই ছবি আমি আমার জীবনে কখনও তুলতে পারবো না এবং তোলার চেষ্টাও করবো না।
সাংবাদিকরা তার এই বক্তব্যকে সেলিবেট্রিদের হেয়ালী ধরনের কথা বলেই ধরে নিয়েছেন। মানুষ সেলিব্রেটি হয়ে গেলে অনেক রকম হেয়ালী টাইপ কথাবার্তা বলে। এসব বলে নিজের প্রতি আকর্ষণ বাড়ায়।
কিন্তু মিঠু জানে- সে কোন হেয়ালী ধরনের কথা বলেনি। সিয়াটলে নিজ রুমে বসে সে যখন জানালা দিয়ে তুষারপাত দেখে কিংবা ছবি তুলতে তুলতে সে যখন ক্লান্ত হয়ে ঘাসের উপর শুয়ে পড়ে, আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ছোটকালের একটি দৃশ্যের কথা মনে পড়ে।
“অসম্ভব মায়াবী একটি মুখ জলভরা চোখে তার দিকে ঝুঁকে আছে! একই মুখে কান্না আর হাসি। রোদ আর বৃষ্টি যেন! পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ একটি দৃশ্য!!”

সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ রাত ৯:৪৮
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চা এর আড্ডা।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:১৬



শনিবার
৭ নভেম্বর ২০২৬
২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৬ জমাদিউল আ. ১৪৪৮ হিজরি

কিছু মুহূর্ত কখনো হারিয়ে যায় না, সময়ের স্রোতে শুধু স্মৃতি হয়ে মনের গভীরে জমা থাকে।

২০১১ সাল। তখন আমি ইন্টারে পড়ি। নানীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

২৪'র ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশে ডানপন্থা ও মৌলবাদী চেতনা-রাজনীতির চরম উত্থান

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২৩



২৪-এর ৫ আগস্টের পর দেশ দীর্ঘদিনের স্বৈ/রাচারী শাসন থেকে মুক্ত হয়েছিল ঠিকই; কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশ চলে গিয়েছিল বিপুল সংখ্যক ডা*নপন্থী বা মৌ*লবাদী চেতনা বা রাজনীতির ধারক-বাহক-সমর্থকদের কবলে।
হ্যাঁ, হাসিনার পতনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

৭ নভেম্বরঃ যা ঘটেছিল এবং ভাবুন- না ঘটলে কী হতো?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:০৭

৭ নভেম্বরঃ
যা ঘটেছিল এবং ভাবুন- না ঘটলে কী হতো?

১৯৭৫ থেকে ২০২৬, মাঝখানে পেরিয়ে গেছে অর্ধশত বছর! এই সময়ের মধ্যে ঘুরেফিরে সরকার পরিচালনা করেছে- বিএনপি, জাতীয় পার্টি এবং আওয়ামী লীগ... ...বাকিটুকু পড়ুন

পদ্মা সেতু চালুই কি বিআইডব্লিউটিসির লোকসানের একমাত্র কারণ? নাকি প্রশাসনিক স্থবিরতার মাশুল?

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:০১

টানা পাঁচ বছর ধরে ধারাবাহিক লোকসান গুনছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থা (বিআইডব্লিউটিসি)। সম্প্রতি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সংস্থার নিজস্ব মূল্যায়নে সোজাসাপ্টা বলে দেওয়া হলো—পদ্মা সেতু চালু হওয়ার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পুরানো সেই দিনের কথা ....

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৫৭


নওগাঁর বদলগাছীতে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ১৫ জন শিক্ষার্থীর মাথার চুল কাঁচি দিয়ে এলোমেলোভাবে কেটে দিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, শিশুদের চুল বড় হয়ে চোখের ওপর পড়ছিল, দেখতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×