somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চিন্তার কারখানা - ১ ( প্রসঙ্গঃ ফ্রেডরিখ নিটশে ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা - ২০২০ সালের বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে)

২৪ শে আগস্ট, ২০২০ দুপুর ২:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

"Every one being allowed to learn to read, ruineth in the long run not only writing but also thinking. Once spirit was God, then it became man, and now it even becometh mob."
~
ফ্রেডরিখ নিটশে

ফ্রেডরিখ নিটশে সম্ভবত পৃথিবীর সবচে জনপ্রিয় 'মব ফিলোসফার' , তার মৃত্যুর প্রায় দেড়শো বছর পরেও তিনি গ্লোবাল পপ কালচারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ মন্তব্যটি করলাম তার মেধা, সময় থেকে অগ্রবর্তী তার চিন্তা - চেতনার প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখেই। নিটশে শুধু ভিন্নধাঁচের চিন্তা ধারণ করতেই তাই নয়, তার প্রকাশও করতেন সবচে ক্যাচি ফ্রেইজে, বা, চটকদার ভাষায়। সে সমস্ত চিন্তার সারমর্ম - এককথায় শিরোনাম আকারে তিনি যা দিতেন, তা খুব আই ক্যাচি বা দৃষ্টিনন্দন হলেও, আমাদের অনেকেরই সে শিরোনামের পেছনে লুকিয়ে থাকা গভীর তাত্ত্বিক আলাপে ডুব দেবার সক্ষমতা নেই। কিন্তু বিতর্কের টেবিলে প্রাসঙ্গিকতাবিহীনভাবে নিটশের চটকদার একটি কথা, এবং নিটশের নাম ছুঁড়ে দিলেই যেহেতু প্রতিপক্ষের ওপর প্রবল আধিপত্য এনে ফেলা যায়, শ্রোতাদের তরফ থেকে অর্জন করা যায় সম্ভ্রম - কাজেই আপাতত সে সমস্ত আই ক্যাচি ফ্রেইজের পেছনের তাত্ত্বিক আলাপ বিস্তারিত না বুঝেই আমাদের জীবন চলে যায় অনেক সুন্দররূপে। যদি কেউ প্রশ্ন করে - মানুষের চিন্তার যে বিগত আড়াই হাজার বছরের ইতিহাস - তার দু' একটা দয়া করে বলুন, তবে খুব চিন্তাভাবনা করে দেখবেন - মানুষ তিনটি উক্তি খুব অধিক ব্যবহার করে - এক, নো দাইসেলফ, যেটা সক্রেটিসের উক্তি হিসেবে বহুল প্রচলিত ( আসলে উক্তিটি সক্রেটিসের নয়, সক্রেটিসের জন্মেরও শত শত বৎসর পূর্বে, গ্রীক মিথলজির ঈশ্বর অ্যাপোলোর মাউথপিস / পার্থিব প্রবক্তা ডেলফির মন্দিরের দেয়ালে লেখা একটি প্রাচীন গ্রেশিয়ান প্রবচন), দুই, রেনে দেকারতের কোগিটো অ্যারগো সুম/ আই থিঙ্ক দেয়ারফর আই অ্যাম, এবং তৃতীয়ত, নিটশের - গড ইজ ডেড, অ্যান্ড উই হ্যাভ কিল হিম। এই তিনলাফে তিনহাজার বছরের চিন্তার ইতিহাস আমরা পার করে দিই। কারণ হয়তো এই যে - মানুষের চিন্তার ইতিহাসের আনুপুঙ্খিক পাঠ বলাইবাহুল্য, অত্যন্ত শ্রমসাধ্য কাজ, অথবা/এবং এই কারণে যে - মানুষের চিন্তার ইতিহাস বাদ দিয়েও আরামসে একটা জীবন পার করে দেয়া যায়, যদিও না বুঝেই বিবিধ প্রোপ্যাগান্ডার স্রোতে ভেসে ভেসে ।

আমার আজকের আলোচনার সূত্রধর সেই 'মব ফিলোসফার' নিটশে, যিনি মরালীটি বা নৈতিকতাবোধ,রিলেজিয়ন বা ধর্ম, নিহিলিজম, সুপারম্যানের আইডিয়াসহ - দর্শন চর্চার ইতিহাসের শুরু থেকে দার্শনিকদের তাড়িয়ে ফেরা অনেক নতুন, পুরাতন প্রশ্নের খুবই চমকপ্রদ এবং মৌলিক উত্তর দিয়েছেন। অপরদিকে নিটশে এবং তার অনুগামী দর্শন / তত্ত্বচর্চাকারীদের ব্যাপারে অভিযোগ আছে অ্যাডলফ হিটলারের মত ব্যক্তিত্বদের বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে তাতিয়ে তোলার, অনুপ্রেরণা জাগানোর। সার্বজনীন সত্য বলে কিছু নাই, বাস্তবতার কোন সার্বজনীন সংজ্ঞা নাই, আছে কেবল পারস্পেক্টিভ - এ সমস্ত তত্ত্ব খাড়া করে পৃথিবীকে তারা ঘোলাটে করে তুলেছেন, যার ফলশ্রুতিতে সমগ্র মানবজাতির সার্বজনীন অধিকার নিয়ে দাবীদাওয়া তুলবার জন্যে কোন স্পেসিফিক ইডিওলজিক্যাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। আর এই ঘোলাটে অবস্থায়, যখন সত্য কি, মানবাধিকার কি - এই সমস্ত প্রশ্নের কোন নির্দিষ্ট জবাব খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে, নিটশে সমাধান দেন এই বলে যে - ক্ষমতাই হচ্ছে এ অবস্থার একমাত্র সক্রিয় বস্তু। সহজ অর্থ করলে - বন্দুকের নলের ভেতর দিয়ে বেরিয়ে আসবে সমস্ত সত্য, অধিকার, নীতিনৈতিকতার গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা। উনিশ শতকের গোঁড়া থেকে, এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশে ছড়ানো নিজ নিজ ঔপনিবেশিক অঞ্চল থেকে সঞ্চিত অর্থের জোরে ইউরোপে যে শিল্পবিপ্লব, পুঁজিবাদী বিকাশ, এবং উপনিবেশবাদের পরিশীলিত রূপে বর্তমান পৃথিবীতে সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতির হেজিমনি - তার তাত্ত্বিক দিকটির ভীত নিটশে সামাল দিয়েছেন , সচেতনে বা অবচেতনে।

সে যাই হোক, শখের বসে কেনা পেঙ্গুইন ক্লাসিকস সিরিজের নিটশে রিডার বইটি আজ সকালে উল্টে পাল্টে দেখার সময় হঠাৎ নিটশের উপরোক্ত উক্তিটি চোখে পড়লো। নিটশে এখানে দাবী করছেন - সমাজে ব্যাপকভাবে লিখতে পড়তে জানার হার বৃদ্ধি শুধুমাত্র লেখকদের লেখার মান নয়, বরং সমস্ত চিন্তার জগতকেই টেনে নীচে নামিয়ে দেবে। একসময় ঈশ্বর ছিল সর্বেসর্বা, হিউম্যানিজম বা মানবতাবাদী আদর্শের চর্চা প্রবল হবার পর ঈশ্বরের জায়গা নিয়ে নিল মানুষ, আর এখন মানুষের জায়গা দখল করে নিচ্ছে মব, বা জনতার আগ্রহ, অভীক্ষা।

কাজেই, বোঝা যাচ্ছে, যদিও নিটশে 'মব ফিলোসফার' বা আমজনতার দার্শনিক, তিনি ব্যক্তিগত জীবনে মব মেন্টালিটি পছন্দ করতেন না।

আমার চিন্তার কারখানা শিরোনামের সিরিজ ব্লগের প্রথম কিস্তিতে চিন্তা করবার জন্যে দুটো প্রশ্ন আপনাদের জন্যে উপহার-

১। আপনিও কি নিটশের মত মনে করেন , শিক্ষার হার বাড়লে/পাঠকের সংখ্যা বাড়লে/ সব বিষয়ে সবার মতামত দেয়ার মত ক্ষেত্র তৈরি হলে তা সামগ্রিকভাবে মানবজাতির চিন্তার মানকে টেনে নীচে নামিয়ে আনবে?

২। নিটশের এ উক্তির সঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে কোন সাযুজ্য খুঁজে পাওয়া যায় কী?


প্রিয় পাঠক, আসুন চিন্তা করি। আপনার চিন্তার ফলাফল আমাকে জানাতেই হবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই। আপনার চিন্তার সাথে আমার চিন্তা মিলবে এমনটাও নয়। আমার চিন্তার সাথে আপনার চিন্তা মেলার কোন প্রয়োজনীয়তা আছে এমনটাও নয়। কিন্তু আপনার মতামতের প্রতি আমার শ্রদ্ধা থাকা বাঞ্ছনীয়, যাতে চিন্তার ভিন্নতা সত্যেও আমরা পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে থাকতে পারি। এবং, আসুন চেষ্টা করি, দ্রুত আমাদের চিন্তার কনক্লুশান না টানবার, এবং ভিন্ন ভিন্ন পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে প্রশ্নগুলোকে অ্যাপ্রচ করবার।

(যারা নিটশের পুরো টেক্সটটি পড়তে চান তাঁদের জন্যে -

“Of all that is written, I love only what a person hath written with his blood. Write with blood, and thou wilt find that blood is spirit.
It is no easy task to understand unfamiliar blood; I hate the reading idlers.
He who knoweth the reader, doeth nothing more for the reader. Another century of readers--and spirit itself will stink.
Every one being allowed to learn to read, ruineth in the long run not only writing but also thinking.
Once spirit was God, then it became man, and now it even becometh mob.

He that writeth in blood and proverbs doth not want to be read, but learnt by heart.
In the mountains the shortest way is from peak to peak, but for that route thou must have long legs. Proverbs should be peaks, and those spoken to should be big and tall.
The atmosphere rare and pure, danger near and the spirit full of a joyful wickedness: thus are things well matched.
I want to have goblins about me, for I am courageous. The courage which scareth away ghosts, createth for itself goblins--it wanteth to laugh.
I no longer feel as you do: this cloud which I see under me, this blackness and heaviness I laugh at - precisey this is your thundercloud.
You look up when you desire to be exalted. And I look down because I am exalted.
Who of you can at once laugh and be exalted?
He who climbs upon the highest mountains laughs at all tragedies, real or imaginary.
Courageous, untroubled, mocking, violent - that is what wisdom wants us to be: wisdom is a woman and loves only a warrior ..." ( Thus Spoke Zarathustra, A Nietzsche Reader, Penguin classics, page: 16 - 17)


সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জানুয়ারি, ২০২১ রাত ৯:৫১
১২টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দশ বছরের ব্লগিং—মিষ্টি মুখ হোক সবার

লিখেছেন কাওসার_সিদ্দিকী, ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:২৯

আজ আমার ব্লগিং যাত্রার দশ বছর দুই মাস পূর্ণ হলো। এই দীর্ঘ সময়ে পাঠকদের ভালোবাসা, মন্তব্য আর সমর্থন আমাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।

এই আনন্দ ভাগাভাগি করতে চাই আপনাদের সবার সাথে—তাই আজকের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেতন বৃদ্ধি পাওয়ায় এত উত্তেজিত হওয়ার কিছু নেই ।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:০২


নতুন পে স্কেল নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। বেতন কত বাড়বে এবং নতুন কাঠামো বাস্তবে কেমন হবে, এসব প্রশ্ন এখন সবার মুখে মুখে। নতুন বেতন কাঠামোয় ১ থেকে ১১... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্ব চিঠি দিবস ২০২৬: সম্পর্কের মাঝে আবারও চিঠির অনুভূতি।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৭:২৮



বিশ্ব চিঠি দিবস ২০২৬: সম্পর্কের মাঝে আবারও চিঠির অনুভূতি

বিশ্ব চিঠি দিবস উপলক্ষে এবার বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়স্বজনদের কয়েকজনকে নিজের হাতে চিঠি পাঠালাম। ডিজিটাল যোগাযোগের এই সময়ে একটি চিঠি যেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ অদৃশ্য পাতায় লেখা ছিল যে

লিখেছেন সামিয়া, ০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:২১



আমি একটা বায়িং হাউসে চাকরি করতাম। তখন জীবনটা খুব সাধারণ ছিল। সকালবেলা অফিস, সারাদিন কাজের চাপ, সন্ধ্যায় বাসায় ফেরা। ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশেষ কোনো পরিকল্পনা ছিল না। বিয়ে নিয়ে তো... ...বাকিটুকু পড়ুন

গ্যাস বিদ্যুৎ সংকট ও বিএনপি কি একে অপরের পরিপূরক?

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:৩৭


গ্যাস নাই ,বিদ্যুৎ নাই। নিত্যদিনের নানা সংকটে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠছে। এভাবে মানুষ বিএনপিকে কতদিন সহ্য করবে? মানুষ সহ্য করতে করতে যখন ধর্যের বাধ সহ্যের বাধ ভেঙ্গে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×