somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সারদামঙ্গল কাব্যের পাশ্চাত্য প্রভাব

০৩ রা মার্চ, ২০১৯ রাত ৯:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিক কাব্য আন্দোলন শুরু একাশো বছর পর ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দে বিহারীলালের রোমান্টিক গীতিকাব্য 'সারদামঙ্গল' প্রকাশিত হয়। বিহারীলালের বন্ধু কৃষ্ণ কমল ভট্টাচার্যের বক্তব্য থেকে জানা যায় যে বিহারীলাল গভীর অভিনিবেশে সঙ্গে ইংরেজি সাহিত্য এবং রোমান্টিক কাব্য পাঠ করেছিলেন। এই রোমান্টিক কাব্য পাঠ এর অনুভূতি জারিত আস্বাদ তাঁর সমগ্র সৃষ্টিকে কাব্য সৃষ্টিতে ছড়িয়ে আছে, তার মধ্যে সারদামঙ্গল প্রধান।

বিহারীলালের কাব্য ভাবনা ও কাব্য দর্শন গঠনে তথা ভাবে অবয়ব নির্মাণে পি. বি. শেলীর অনিবার্য প্রভাব রয়েছে। প্রকৃতির দৈত্য সৌন্দর্যলোকের সুচারু চিত্রণের দিক থেকে শেলী ও বিহারীলালের কাব্যভাবনা সমান্তরাল। শেলীও বিশ্ব সৃষ্টির মূলে সৌন্দর্য ও অন্তর্নিহিত শক্তিকে অনুভব করেছেন সৌন্দর্যের দেবী রূপে, প্রেমের দেবী রূপে। এই দেবীকে লাভ করবার জন্য কবির হৃদয় অত্যন্ত ব্যাকুল। সারদামঙ্গলের কবি ও সারদার সাক্ষাৎ লাভের উদ্দেশ্যে অভিসারী। শেলী যে বিশ্বব্যাপী সৌন্দর্যলক্ষীকে সম্বোধন করে বলেন-

"Spirit of Beauty that dost consecrate"

বিহারীলাল তাঁকেই সরস্বতীরূপে বন্দনা করেছেন। শেলীর মত বিহারীলাল ও সৌন্দর্য প্রেম- জ্ঞানের সমন্বয়ে আপন ধ্যান ও সাধনার কেন্দ্রগত মূর্তি নির্মাণ করেছেন।

শেলীর 'Hymn to Intellectual Beauty'-র প্রভাব বিহারীলালের সারদামঙ্গল আছে। কখনো কখনো বিহারীলালের প্রেম কবিতায় শেলীর প্রেমের আদর্শটি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। সারদামঙ্গলে তিনি শেলির মতোই অনুভব করেছেন যে, এই বিশ্বের সর্বত্র বিরাজিত রয়েছে প্রেমের সত্তা এবং কাব্যে সেই প্রেমেরি মাধুর্যকে বিচিত্রভাবে রূপায়িত করেছেন। বিহারীলালের প্রেম কোন মর্ত্য মানবীর প্রতি নিবেদিত নয়। মর্ত্যলোকে ও মর্ত্যোত্তর অন্তলোকে অধিষ্ঠাত্রী পরম সৌন্দর্যের কল্পনালব্ধ দেবীই কবির প্রেম কবিতার একমাত্র নায়িকা। আমাদের মনে হয় সেই প্রেম কবিতায় নায়িকা উঠতেই অধরা সৌন্দর্যলক্ষ্মী। বিহারীলাল তার মান সৌন্দর্যের নারী সম্পর্কে বলেছেন :

"তুমি মনে তৃপ্তি
তুমি নয়নের দীপ্তি
তোমা হারা হ'লে আমি প্রাণহারা হই ;
করুন-কটাক্ষে তব
পাই প্রাণ অভিনব
অভিনব শান্তির সে মগ্ন হ'য়ে রই'।"

শেলির 'intellectual beauty' কবিতায় সৌন্দর্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী বর্ণনা করে দেখিয়েছেন এই অদৃশ্য শক্তি সকল সৌন্দর্যের ও রহস্যের মূল-

"The awful shadows of some unseen power"

বিহারীলাল সারদার সৌন্দর্য মূর্তির প্রকাশ করতে গিয়ে বলেছেন-

"ষোড়শী রূপসী বামা পূর্ণিমাযামিনী।
কোটি শশী উপহাসি
উথলে লাবণ্যরাশি,"

এর সঙ্গে আবার শেলীর 'Hymn to Asia' কবিতার প্রেম প্রতিমা নির্মাণের তুলনা করা যায়-

"Life of Life ! thy lips enkindle
With their love the breath between them"

-নিকটে বাস্তবে সৌন্দর্য দেখা যায় বটে কিন্তু তাকে আয়ত্ত করা যায়না।

বিহারীলালের কবিতায় পাশ্চাত্য রোমান্টিক গীতিকবিতার প্রভাব প্রসঙ্গে ডঃ বিমল কুমার মুখোপাধ্যায় সিদ্ধান্তের সঙ্গে আমরা একমত হতে পারি তিনি বলেছেন লাইন

"কিন্তু শেলী, কীটস বা বায়রণ নয় অথবা গ্রেও নয়, সৃজনধর্মে যাঁর সঙ্গে বিহারীলালের গভীর সহমর্মিতা তিনি হচ্ছেন উইলিয়াম ব্লেক।"

ব্লেক-এর কবিতায় শৈশবে সরলতা, বিস্ময় এবং উল্লাস যেমন পরিণত কল্পনা শক্তির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল, 'বোধের প্রত্যুষে যেথা বুদ্ধির প্রদীপ জ্বলে' সেই প্রদেশের সংকেত ফুটে উঠেছিল, বিহারীলালের কবিতাতেও সেই বিস্ময়, সরলতা, উল্লাস ও কল্পনার অপূর্ব সংমিশ্রণ চোখে পড়ে।

রোমান্টিক কবি হিসাবে বিহারীলালের সাফল্য ও ব্যর্থতার পরিমাপ করতে গিয়ে আমরা দেখি তার সারদামঙ্গল ব্লেকের সীমাবদ্ধতা গুলি ধরা পড়েছে। বিহারীলাল সম্পর্কের সর্বজন প্রচলিত মত এই যে,-

' তিনি যে পরিমাণে ভাবুক ছিলেন সেই পরিমাণে শিল্পী ছিলেন না'

- তার সীমাবদ্ধতা ও সিদ্ধিতে ব্লেকের কথাই স্মরণে আসে এই কারণে যে, ব্লেকর মত বিহারীলালও ছিলেন enspired poet এবং এর মতই-'imagination overpower techniques as individual'

বিহারীলালের সারদামঙ্গল কাব্য পাশ্চাত্য অনুষঙ্গের প্রসঙ্গে অধ্যাপক ড. বিমল কুমার মুখোপাধ্যায় আরো কিছু মূল্যবান ইঙ্গিত দিয়েছেন। যেমন: ফরাসি কবি বোদলেয়ারের সঙ্গে সারদামঙ্গল এর ভাবনা গত মিল দেখিয়েছেন তিনি। 'বেদের সরস্বতী' পাশ্চাত্যের 'মিউজ' বা যাবতীয় শিল্পকলার আদি উৎস নন শুধু বিহারীলালের 'সারদা' তিনি সৌন্দর্যের উৎস এবং মূর্তিমতী সৌন্দর্যও।

সবশেষে তাই বলতে পারি- বিহারীলাল চক্রবর্তী 'সম্ভবত' পাশ্চাত্য কবিদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এবং তাদের আত্মস্থ করেই সারদামঙ্গল কাব্য রচনা করেছিলেন।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশে ইসলামপন্থা বনাম গণতন্ত্র: মানুষ যখন নাগরিক থেকে অনুসারী হয়ে উঠছে!

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৪৩


কিছুদিন আগেও আমরা বলতাম, "দয়া করে ধর্মকে রাজনীতির সঙ্গে মেশাবেন না"। সরল এই কথাটির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বোধ ছিল - ধর্মীয় বিশ্বাস আর রাজনীতি এক জিনিস নয়। গত দুই... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো প্রয়োজন নেই! আপনি কি মনে করেন?

লিখেছেন কাজী আবু ইউসুফ (রিফাত), ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৪



বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে শিক্ষাগত যোগ্যতাবিহীন বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবঞ্চিত কোনো ব্যক্তির পক্ষে এককভাবে স্থানীয় সরকারকে প্রযুক্তিনির্ভর এবং 'স্মার্ট বাংলাদেশ' বা 'ডিজিটাল বাংলাদেশ'-এর লক্ষ্য অনুযায়ী আধুনিকায়নের দিকে এগিয়ে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

"টোকাই থেকে হিরো"

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:১৬



টোকাই থেকে হিরো! বাংলা ছবির  অশ্লীল যুগে মুক্তি পাওয়া এক ঢাকাইয়া চলচ্চিত্র। ছবিতে প্রেক্ষাপটে অনেকটা এইরকম - বস্তিতে বেড়ে উঠা; মানুষের লাথি- উষ্টা খেয়ে বড় হওয়া এক টোকাই (ছবির... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুখরিত জীবনের চলার পথে, ব্লগের মুখরিত দিন

লিখেছেন মেহবুবা, ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:১৪


ব্লগ স্কুল, মজারু
ছোটন চলে স্কুলেতে বই শ্লেট হাতে ,
বদরুল ভাই কাঁদছে ভীষন যাবে সাথে সাথে,
চান্কু হল লক্ষ্মীছাড়া পান্কু হয়ে ঘোরে ,
চিটি যাবে সবার আগে উঠল... ...বাকিটুকু পড়ুন

Ripe Age দুই প্রান্তের দুই মানুষঃ সামু শব্দের সেতু প্রজন্মের বন্ধন

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:২৪


একজন দাঁড়িয়ে জীবনের শুরুতে
চোখে তার অগণিত স্বপ্ন
আগামীর পথে কত প্রশ্ন
কত না-জানা, কত বিস্ময়
কত দূরের নীল আকাশ
ডাকে তাকে প্রতিদিন।

অন্যজন বসে জীবনের শেষে নয়
বরং দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসা এক প্রান্তে
প্রায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×