বেশ অনেক বছর আগে, দেশের বাইরে পশ্চিমের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সেমিনারে যোগ দিয়েছি। সেখানে এক অপরাহ্নে মুখোমুখি হলাম পাকিস্তানী এই ভদ্রলোকের সাথে। তিনিও আমার মতো এখানে আগন্তুক। যারা দেশের বাইরে যান বা থাকেন তারা ভালভাবেই বলতে পারেন যে শ্বেতাঙ্গদের মাঝে বাদামী চামড়ার কাওকে পেলে খুব কাছের মানুষ মনে হয়। ভদ্রলোক আমাকে দেখামাএ উদর্ুতে জিজ্ঞেস করলেন আমার নাম এবং পরিচয়। ধরেই নিলেন আমি স্বজাতির একজন। আমি ইংরেজীতে আমার নাম ও পরিচয় দেওয়াতে ভদ্রলোক খুব একটা খুশী হতে পারলেন না। কথা চলতে লাগল। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, "আমি উদর্ু জানি না কেন? কারণ আমরাতো এক দেশেরই বাসিন্দা ছিলাম"। ভদ্রলোককে আমি সরাসরি প্রশ্ন করলাম, "তিনি সেই সাবেক অখন্ড পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা বাংলা জানেন না কেন"? ভুত দেখার মতো চমকে উঠলেন আমার প্রশ্নে। আমি বললাম, "তোমার মতো পাকিস্তানীরা যদি বাংলা শেখার মতো উদারতা দেখাত তাহলে হয়তো পাকিস্তান আজও অখন্ডই থাকত"।
ভদ্রলোক করাচী থেকে এসেছেন। বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাগত বিহারীরা করাচীতেই এসে বসত্ স্থাপন করেছেন। তাই, বিহারীদের সম্পর্কে ভদ্রলোকের মনোভাব কেন জানি বেশ নেতিবাচক ছিল? আমি জন্মেছি ঢাকার মোহাম্মদপুরে, সেখানেই আমি বড়ো হয়েছি। আমার চারপাশে ছিল অবাঙ্গালীরা (বিহারীরা)। তারাই ছিল প্রতিবেশী, তাই তাদের সম্পর্কে ভালভাবেই জানি। পাকিস্তানী ভদ্রলোক বেশ খোশ আলাপী ছিলেন। আমরা খাবার টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলাম। চলতে লাগল আমাদের গল্প। কথার এক পর্যায়ে তিনি অনুযোগের স্বরে বললেন, কি ভালই না হতো আমরা মুসলমানরা যদি একএিত থাকতে পারতাম। আমার উওর ছিল সাদামাটা। বললাম, পাকিস্তানীরা যদি মার্চে গনহত্যা শুরু না করে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিজয়ী দল আওয়ামী লীগের দাবী মেনে নিত, সম্ভবত আমরা এখনো অখন্ড পাকিস্তানের নাগরিক থাকতাম।
তাকে বললাম, দু:খের বিষয়টা হচ্ছে যে ইসলামের নাম করে পাকিস্তানী আর্মি আর তার সহযোগীরা যেভাবে মানুষ হত্যা করেছে, তারপর পাকিস্তান অখন্ড থাকে কিভাবে? আরও বেশী দু:খের বিষয় হচ্ছে যে, আমরা তো স্বাধীন হয়ে দু'ই নেএীর মারামারির মাঝে গণতন্ত্রের চর্চা খুঁজি, তোমরা তো এখনও সেই একই আর্মির যাঁতাকলের নীচে জীবন-যাপন করছ। আমাদের গণতন্ত্র বিকলাঙ্গ হতে পারে, তারপরেও কিছু একটা পেয়েছি। তোমাদের উপায় কি? গণতন্ত্রতো তোমাদের জন্য সোনার হরিণের মতই রয়ে গেল। লেখাপড়া করা মানুষ আর নিজের জাতীয় স্বওা নিয়ে সচেতন। তারপরেও ফুটে উঠল তার মাঝে হতাশা ও বেদনার দীর্ঘশ্বাস। মেনে নিলেন, কথাটা অমোঘ সত্য। বিষোদগার করলেন সামরিক নেতাদের বিরুদ্ধে। তারপর অসহায়ের মতো তাকিয়ে রইলেন। আমার সেই পাকিস্তানী বন্ধু বুঝতে পারে বাংলাদেশের পটভূমিটি, বুঝতে পারেনা এদেশে অথর্ব রাজাকার-জামাতীরা। তাদের গোয়াতর্ুমির কোন অন্ত নেই। মূর্খ আর কাকে বলে?
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




