পাঠকদের অনেকের অনুরোধের ঢেঁকি গিলে এই লেখাটা শুরু করলাম। কারণ, এখানে অনেকেই জানতে চেয়েছেন, আড্ডার লেখার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যটা কি? কারণ, বাংলাদেশে উদ্দেশ্যবিহীন কিছুই হয় না। সবাই এখানে ধান্ধার পেছনে ঘুরে!!! দোষ দেই না, আমি আমাদের পাঠক-নাগরিক সমাজকে। আমরা অন্ধের মতো রাজনৈতিক দলগুলোর পেছনে ঘুরি, ভাবি তারা এবার মুক্তি দিবে, তারপর আমরা প্রতারিত হই। সুন্দর কথা বলে আমরা সবাইকে মুগ্ধ করে রাখি, তারপর ভুলে যাই আমাদের মানুষগুলোকে। কারণ, ক্ষমতার সোনার হরিণ পাওয়া মাএই অধিকাংশ রাজনীতিবিদরা ভুলে যান রাজপথের মানুষগুলোর রক্তাত্ব ত্যাগের কথা।
ইদানীং বাংলাদেশে রাজনীতির মাঠ আবার উওপ্ত হয়ে উঠছে। আন্দোলন, পুলিশী প্রতিরোধ, নির্যাতন, অবরোধ ক্রমশ: বাড়ছে। সবগুলো দল নড়ে চড়ে রাজনীতির হিসেব-নিকেশ শুরু করেছে আবার জোরে শোরে। রাজপথ আবার হয়ে উঠছে রক্তাত্ব। সবাই চারপাশকে সাদা-কালো-ডান-বামে বিভক্ত করতে উঠ পড়ে লেগে গেছে। সংগতকারণেই, মৌলবাদ বিরোধী ভাবনা মোটামুটি একটা আলাদা গতি পাচ্ছে। কিন্তু, মৌলবাদী রাজাকার-জামাত বিরোধী কথা বলা মাএই আওয়ামী লীগের সীল এসে আপনার কপালে লাগবে। হয়ে গেলেন আপনি আওয়ামী লীগার। খোদ আওয়ামী লীগও জানে না, তাদের দলে সদস্যপদ লাভের স্বয়ংক্রিয় এই ব্যবস্থাপএ।
বাংলাদেশের প্রধান দু'টি দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের এই মেরুকরণের মাঝখানে আমাদের অনেকে নিতান্ত অসহায়ভাবে গন্তব্যহীন ভাবনায় বিভোর হয়ে আছেন। ক'দিন আগের একটা ঘটনা বলি। আমাদের গ্রামের এক মাত্বর চাচা বাসায় এসেছেন বেড়াতে। মাতবর চাচা জামাত না করলেও বিএনপি'র ভাল ভক্ত। বাসার টিভিতে চলছে রাতের খবর। প্রথমে প্রধান মন্ত্রী ম্যাচিং পোশাকে ও সজ্জায় এসে বক্তৃতা দিচ্ছেন, তারপরে খবরে আইটেমে আসলেন সাধাসিধে পোশাকের বিরোধী দলীয় নেএী। মাতবর চাচাকে জিগ্যেস করি, "চাচা, চেহারা আর সাজ-সজ্জা দেখলেও তো বিরোধী দলের নেএীকে অনেক পরহেজগার আর শালীন মনে হয়, তো আপনারা আমাদের বুবুরে বাদ দিয়া ভাবীর জন্য এতো পেরেশান থাকেন কেন"? মাতবর চাচা আমার কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠে বলেন, "তা ঠিকই কইছ, আমগো প্রধান মন্ত্রী এখনো এতো ঢং-ঢাং নিয়া থাকে কেন জানি না, তবে চাইল-ডাইলের ব্যবস্থা না হইলে এই সব ঢং-ঢাং-এ কাজ অইবো না"। কথাটা একটু তামাশার মনে হলেও এর মাঝে গ্রামের মানুষের জীবণের কঠিন বাস্তবতা ফুটে উঠেছে।
শহুরে শিক্ষিত মানুষরা মৌলবাদ-স্বাধীনতার অপশক্তি নিয়ে যতো সচেতন, গ্রামের মানুষরা তার চেয়ে অনেক বেশী সচেতন তাদের জীবণ-সংগ্রামের বাস্তবতা নিয়ে। আগামী নির্বাচনে সাধারণ মানুষ দেখতে চাইবে তাদের জীবণ ধারায় কি ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে? বাঙ্গালীরা খুব আবেগপ্রবণ জাতি। কিন্তু কেবল আবেগ বিক্রি করে জিয়ার সৈনিকরা বা মুজিব সেনারা খুব একটা সুবিধে করতে পারবে না। পরিবর্তনের হাওয়াটা এখানেই এসে লাগছে। কানসাটে জনপ্রিয় তৃণমূল আন্দোলন তা আবার প্রমাণ করে দিল, দেশের মানুষ অনেক বেশী শক্তিশালী যার সামনে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক শক্তি অত্যন্ত তুচ্ছ। আড্ডার পাতায় তাই আমি দেখতে চাই, সমাজ সচেতন মানুষদের যূথবদ্ধতা যারা আবেগ দিয়ে রাজনীতির পালা বদল করবে না, বরং যুক্তি আর বাস্তবতার আলো দিয়ে তারা সমাজ আর রাজনীতির চলমান রুগ্ন ধারা পরিবর্তন করবে।
তাই, আমার আড্ডার পাতায় আওয়ামী লীগ বা বিএনপি'র সপক্ষে লেখা বা কথা আশা করেন, তাহলে আপনাদেরকে খুব হতাশ হতে হবে। চোখ বন্ধ করে সমর্থন নয়, চোখ খুলে সমর্থন করুন আর এগিয়ে আসুন। আওয়ামী লীগের ব্যর্থতা ও দোষ দিয়ে যদি মৌলবাদ ও রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ নির্মাণ করা যায়, তাহলে আওয়ামী লীগের দোষ ও ব্যর্থতার ডাটাবেজ তৈরী করতে অসুবিধা কি? কিন্তু মৌলবাদে রাহুগ্রস্ত বাংলাদেশকে স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি থেকে মুক্ত করতে আওয়ামী লীগের ব্যর্থতার অনুসন্ধান আসলে পরগাছা রাজাকার-জামাতী চক্রকে প্রচ্ছন্নভাবে ম্যান্ডেট দিবে। আবেগপ্রবণ নির্বুদ্ধিতার চেয়ে আবেগশুণ্য বুদ্ধিমওার প্রয়োজন অনেক বেশী দরকার আজকের এই ক্রান্তিকালে।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে এপ্রিল, ২০০৬ রাত ৮:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



