somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

“কৃতজ্ঞতা সিদ্দিকা কবীরকে”

১২ ই অক্টোবর, ২০২৩ বিকাল ৩:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কুতুবদিয়া লাইট হাউস থেকে প্রায় দুই মাইল পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরে ভাসছে আমাদের জাহাজ। ডীপ এ্যাংকরে। চিটাগাং থেকে জলি বোট এসেছে। দুরত্ব প্রায় পঞ্চাশ কি.মি.(সাতাশ নটিক্যাল মাইল)। এতদুর আসতে প্রায় চার ঘন্টা লেগে যায়, বিপরীত স্রোত হলে আরো বেশী। জাহাজের ঝুলসিঁড়ি বা জ্যাকস্‌ ল্যাডার বেয়ে লারেলাপ্পা করতে করতে শিপের গা বেয়ে উঠছেন ভদ্রলোক। উনি সাপ্লাইয়ারের একজন স্টাফ, মুখ গোমড়া। ক্যাপ্টেনের আর্জেন্ট অর্ডার পেয়ে এতদুর এসেছেন মহামুল্যবান সাপ্লাই নিয়ে। গলায় ঝুলছে ব্যাগ, ওটাও লারেলাপ্পা করছে। ব্যাগে আছে সিদ্দিকা কবীরের মহামুল্যবান বই। ব্রীজের (যেখান থেকে শিপ নেভিগেট করা হয়) উইংয়ে দাঁড়িয়ে আমি তামাশা দেখছি, মুখে হাসি। ব্রীজের টেলিফোন বাজছে। আমি জানি ক্যাপ্টেন ফোন করেছে, বাজুক। ধরবো একটু পর।


রান্নার বইয়ের বিশিষ্ট লেখিকা সিদ্দিকা করীরের নাম নিশ্চই সবার মনে আছে। আমি যতদুর জানি সিদ্দিকা কবীর দেশে সর্বপ্রথম রান্না বিষয়ক বই প্রকাশ করেন। এ বইটি আমাদের দেশে রান্নাবান্নার জগতে বিপ্লব ঘটিয়েছে। এমন কোন মধ্যবিত্ত বাড়ী নেই যেখানে এই বই দেখা যায় না। তাছাড়া প্রবাসী স্টুডেন্ট বা ব্যাচেলরদের বাইবেল ছিলো সিদ্দিকা কবীরের এই বই। সিদ্দিকা কবীরের বই নিয়ে আমারও বিশেষ একটা অভিজ্ঞতা আছে। সেটা ব্যাচেলর লাইফের নয়, কর্ম জীবন। অর্থাৎ আমার সমুদ্রজীবনের যেখানে সিদ্দিকা কবীরের বই থাকার প্রশ্নই ওঠে না।

সে বছর রোযার শেষের দিকে আমাদের জাহাজ চট্টগ্রাম আউটার এ্যাংকরেজ তথা বহিঃনোঙ্গরে ছিলো। তখন আমাদের জাহাজে যে চীফ কুক ছিলো তার রান্নার হাত ভালো ছিলোনা। সেকেন্ড কুকও তথৈবচ। এখানে রান্নার হাত ভালো ছিলোনা এটা অসত্য। কারন জাহাজের কুক মানে দুনিয়ার ট্রেনিং, পড়ালেখা করে বৈশ্বিক রান্নাবান্না, হাইজিন, সেইফটি, ইত্যাদি ইত্যাদি পাশ করে তার পর তারা এই প্রফশনে আসতে পারে। এদিকে আমরা সবাই দেশী, মামুর বাড়ীর আবদারের মত কুক দের পক্ষে মায়ের হাতের রান্না'র মজা দেওয়া সম্ভব না। এদিকে ক্যাপ্টেন আবার খাওয়া-দাওয়ার মানের ব্যাপারে বেশী সিরিয়াস। তাঁর কথা হচ্ছে, কঠোর এ্যাডমিনিস্ট্রেশনের পূর্বশর্ত হচ্ছে খাওয়া দাওয়ার উচ্চমান। অফিরার, ক্রু রা মজা করে পেট পুরে খাবে আর শান্তিতে ডিউটি করবে। মায়ের হাতের রান্নার মজা দিতে পারবেনা মানে? অবশ্যই পারবে, ব্যবস্থা আছে।

এবছর আমাদের ঈদ হবে আউটার এ্যাংকারেজ থেকেও দুরে, ডীপ এ্যাংকারেজে।

শীপ চ্যান্ডলার (জাহাজে যারা খাবার/স্টোর্স ইত্যাদি সাপ্লাই করে)-কে ফোন করে বললেন ‘সিদ্দিকা কবিরের বই’ সাপ্লাই করার জন্য। (আমাদের জাহজা তখন ডীপ এ্যাংকারেজে, কুতুবদিয়ার পশ্চিমে) শীপ চ্যান্ডলারের স্টাফ বেচারা জলিবোট নিয়ে এতদুর এলো সেই বই নিয়ে।
বই পেয়ে ক্যাপ্টেন আমাকে তাঁর অফিসে ডেকে পাঠালেন। বললেন,
- ঈদের মেনু যাতে কোনোভাবে স্পয়েল না হয় সেজন্য সিদ্দিকা কবীরের এই বই আনিয়েছি, আগে কখনো এ বই দেখেছো।
- জ্বী-না, তবে নাম শুনেছি।
- হ্যাঁ, যো জিন্দেগীতে রান্না করেনি সে-ও এ বই ফলো করে পাকা রাঁধুনী হয়ে যেতে পারবে। আর এরাতো সার্টিফিকেট পাওয়া প্রফেশনাল কুক। আইটেমগুলো মার্ক করা আছে তুমি ঐ পেইজগুলো এনলার্জ ফটোকপি করে ওদের ভালোমত বুঝিয়ে দাও বলে দাও এর পরও যদি জাহাজের অফিসার আর ক্রু রা খাবার খেয়ে মজা না পায় তাহলে বাকী জীবনে আর জাহাজে জব করা লাগবেনা। সোজা বাড়ী পাঠায়া দিবো। শীপচ্যান্ডলার (সাপ্লাইয়ার) ঈদের আগের দিন বিকেল নাগাদ দুটো খাসী, তরতাজা গুরুর মাংস, ফ্রেশ ভেজিটেবলস্ আর স্যালাড আইটেম পৌঁছে দেবে। ঈদের দিনটা অন্ততঃ লোকজন খেয়ে খুশী হোক। খাসী দুটো পেছনের ডেকে তুলেছিলাম সাপ্লাই ক্রেন দিয়ে। ক্যাপ্টেনের আদেশে খৎনা করানো এই দুইটি বগুড়ার কালা ছাগল আমদানী করা হয়েছে সেই বগুড়া থেকে। ক্যাপ্টেন বলেছেন বগুড়ার কালা ছাগল স্বাদে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ। ক্রেনে করে যখন ডেকে তুলছিলাম ছাগলের কালো চামড়ার উপর রোদের আলো ঠিক্‌রে রঙধনুর সাত রং দেখে ক্যাপ্টেনের সাথে আমিও একমত, বগুড়ার কালা ছাগল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ

ঈদের দিন লাঞ্চ আইটেম ছিলো কাচ্চি বিরিয়ানী, চিকেন টিক্কা, বীফ রেজলা, বড় লবস্টার্স, পমফ্রেট ফিশ, রাশান স্যালাড, বোরহানী, সফট্ ড্রিংকস, নানান ধরনের পায়েশ, সেকেন্ড কুকের ইশ্‌পেশাল আচার ইত্যাদি। বিশেষ করে কাচ্চি বিরিয়ানী, বীফ রেজালা আর লবস্টার্স পুংখানুপুংখভাবে সিদ্দিকা কবীরের বই অনুযায়ী যাতে হয় সেটা বলে দিলেন। আমি প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠা কপি করে নীচে গ্যালিতে গেলাম (জাহাজে কিচেনকে গ্যালী বলে)। ততক্ষনে খবর হয়ে গেছে ঈদের খাবার পাকাতে হবে বই দেখে দেখে। চীফ কুক খানিকটা আহত, তবে ভাবখানা এই যে সে খুব খুশী কারন খাবার করো পছন্দ না হলে যাবতীয় দোষ সিদ্দিকা কবীরের ঘাড়ে চাপানো যাবে।

জাহাজে অফিসার/ক্রু/ভাবী/ বাচ্চা সব মিলে আমরা মোট উনত্রিশ জন। তন্মধ্যে যাদের বাসা চিটাগাং তাদের সবাইকে ক্যাপ্টেন ঈদের ছুটি দিয়েছেন। মানবিক কারনে সেটাই স্বাভাবিক। ভটভটিয়া বোটে চেপে দল বেঁধে তারা যখন আউটার এ্যাংকারেজ (পতেঙ্গা থেকে বেশ দুরে, কুতুবদিয়ার পশ্চিমে, বঙ্গোপসাগরে) থেকে পতেঙ্গার ১৫ নম্বর জেটিতে যাচ্ছিলো, মনটা কেমন জানি করছিলো। চট্টগ্রাম থেকে আমার ফেণী বাসা পর্যন্ত যেতে লাগে মাত্র দেড় ঘন্টা। সময়ের হিসেবে আমিও স্থানীয় তাই না? যাই হোক, জাহাজে এখন অফিসার/ক্রু মিলে আমরা মোট বিশজন, এবং ছয়জন সিকিউরিটি ওয়াচম্যান। সর্বমোট ছাব্বিশ জন।
এখানে একটা বিষয় উল্যেখ করা প্রয়োজন, আমাদের চট্টগ্রাম এবং মংলা পোর্ট দেশী বিদেশী কোন জাহাজের জন্য নিরাপদ নয়। চোর-ছ্যাঁচড় আর জলদস্যুর নিদারুন উৎপাত এবং সেজন্যেই সার্বক্ষনিক ওয়াচম্যান রাখা। ছাব্বিশ জনের জন্যে আইটেমগুলো প্রস্তুত করতে মাছ, মাংস, মসলাপাতি কি অনুপাতে লাগবে ইত্যাদি ইত্যাদি হিসেব চলছে। আমার সেকেন্ড কুক চিটাগোনীয়ান, এবং তিনি এম এ পাশ। প্রমিত শুদ্ধ বাংলায় কথা বলেন তবে স্ট্রং চাটগাঁইয়া এ্যাকসেন্টে। খালি চোখে পড়তে পারেন না তাই গাঢ় ফ্রেমের চশমা পরেন। তখন উনাকে দেখতে মনে হয় মহিলা কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল। আচ্ছা, মহিলা কলেজ কেন?
গুরুগম্ভীর সেকেন্ড কুক চশমা লাগিয়ে সিদ্দিকা কবীরের রান্নার বই পড়ছে আর হিক্-হিক্ করে হাসছে।
- চার (Sir), এই চিদ্দিকা কালাম্মার ভঁয়ঁস কঁত?
- কেন?
- সোঁন্দর কারবার। সবাইকে তুমি তুমি করি বইলতেছে-যে। এই দেকেন! আমি ফড়ি,
এক: মাংস দুয়ে লবন মেকে থিরিশ মিনিঠ রাকো। মাংস আঁবার দুঁয়ে ফাঁনি জরাও।
দুই: ফেঁয়াঁইজ গিঁ’য়ে (ঘি-এ) বাঁদামী করে বেঁজে থোল। টান্ডা হলে মোটা গুঁরা কর
থিইন (তিন): . . .
- ঠিক আছে, ঠিক আছে, তিনি ‘আপনি’ বললেন নাকি তুমি কিংবা তুই, তাতে কিছু এসে যায় না, আমরা মজা করে খেতে পারলেই হল। সাপ্লাইয়ারতো সব দিয়ে গেছে, খাসীগুলো মাশাল্লাহ্ দারুন স্বাস্থ্যবান দেখলাম, চামড়া নাড়ি-ভুড়ি, খুরা এসব ফেলে কতখানি মাংস থাকবে?
সেকেন্ড কুক এক দৌড়ে পুপ-ডেক(পেছনের ডেক)-এ গিয়ে জিভটা সামান্য বের করে দাঁতে চেপে একটা খাসী কোলে নিয়ে আবার নামিয়ে রাখলো।
- জবঅ করে চামরা, ওঁজলা, আঁতরি, খুরা, কল্লা, বেদরকারি আঁড্ডি-উঁড্ডি ফালাই্এ্যারে দশ কেজি তাকিবো।
- তারমানে দুটো মিলে বিশ কেজি। আমাদের অতো লাগবেনা তারপরও দুটোই জবাই করে রেডী করে ফেলেন। স্ট্যুয়ার্ডদের ডেকে নেবেন, আর ওয়াচম্যাগুলোকোও কাজে লাগাতে পারেন যারা ফ্রী আছে। বোনলেস করে নেবেন।
- ফুল বোনলেস্ করবোযে? আঁড্ডি-উঁড্ডি তাকিলে লোকজন চাবাই-চুবাই কাইতো!
- কোনো দরকার নেই, বইতে যেভাবে আছে ঠিক সেভাবে। এক চুলও এদিক ওদিক হতে পারবেনা। এমনকি টেম্পারেচারও স্ট্রিক্টলি মেইনটেইন করবেন।
- চার (sir), ওভেনের মিটারতো বেকার, ইঞ্জিনরুম তেকে একটা তার্মোমিটার আইনবো?
- আনেন!

পরদিন সকালে গোসল সেরে জাহাজের বোট ডেকে (Boat deck যেখানে লাইবোট রাখা হয়) সবাই মিলে ঈদের নামাজ পড়লাম। নামাজ শেষে কোলাকুলী, অফিসার্স সেল্যনে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের সেমাই, লুচী-হালুয়া, ফিরনী, চা, কফি ইত্যাদি খাওয়া। এর মধ্যে আমার চীফ কুক তার অগ্রগতির রিপোর্ট দিলো,
- ও স্যার, খাঁসীর গোসত যেমনে বইত লেইকছে হেমনে কাডি ধুই-ধাই রাইকছি। কাড়ারি-ভোগ চাইল বিজাই ফানি জরাই থুইছি, চিকেন টিক্কার টুকরা, ইচামাছ, বীফ, চান্দামাছ (পমফ্রেট), চায়নীজ ভেজিটেবল কাডাকুডা সব রেডী। কতা হইলোযেন্, একটার মইদ্দে হইত্তান্ ন’।
- কেন পারবেন না? আসল কাজ হচ্ছে কাটা-কাটি, ওটাইতো কমপ্লিট। এখন শুধু মসলাপাতি মিশিয়ে সময়মতো রান্না। ব্যাস। বারোটায় লাঞ্চটাইম, সেখানে আপনাকে পুরো এক ঘন্টা বেশী সময় দেওয়া হয়েছে।
- কাইন্ডলি দুইটা ফইজ্জন্ত টাইম দেন। রেডি করি দিমু।
- একটা-তিরিশ, এর বেশী এক সেকেন্ডও নয়। ঈদ হোক আর যাই হোক অফিসারদের ডিউটিতো মাফ নেই, ক্রু রা নাহয় ছুটি করছে।

চীফ কুকের বাড়ি মীরশরাই, তবে ভাষা মাশাল্লাহ্ শতভাগ ফেণী অরিজিন। (চুপি চুপি বলে রাখি, আমার বাড়িও ফেণী, একদম মাঝখানে)
দেড়টায় নয়, ক্যাপ্টেনের আদেশে স্ট্যুয়ার্ডরা একটায়ই লাঞ্চ সার্ভ করলো। জয়েন্ট লাঞ্চ, অর্থাৎ অফিসার্স ডাইনিং রুমে ক্রুরাও আসবে এবং খাবে। যেহেতু ঈদের দিন, ইউনিফর্ম পরতে হবেনা, সবার পরনে বাহারী পাঞ্জাবী, পাজামা, চটি, খাবার সময় ছুরি কাঁটাচামচের বাধ্যবাধকতা নেই, হাত চলবে। এতো স্বাধীনতা জাহাজে এসব বিশেষ দিনেই পাওয়া যায়। তা-ও যদি সবাই বাংলাদেশী হয়।

একটায় লাঞ্চ সার্ভ করার কারনে কাচ্চি বিরিয়ানীতে মিনিট পাঁচেক কম স্টিমিং হয়েছে। তার পরও লক্ষ্য করলাম সকালের হেভী এবং আনলিমিটেড ব্রেকফাস্টের পরও সবাই গোগ্রাসে খাচ্ছে আর খালি হচ্ছে ডিশের পর ডিশ। কম স্টিমিং হওয়াতে স্বাদের ঘাটতি পড়েনি। বেশীরভাগ আইটেম ছিলো তেলসমৃদ্ধ এবং গুরুপাক। জাহাজের পোলাও বিরিয়ানী সব সময় নষ্ট হয় অথচ সেদিন একটুও উচ্ছিস্ট ছিলো না। খাওয়া শেষে লাইন ধরে গ্যালীতে (জাহাজের রান্নাঘর) গিয়ে সবাই চীফ কুক কে ধন্যবাদ দিচ্ছে। এতদিন আপনার এই যাদু কেন দেখালেন না, ইত্যাদি বলছে।

বিকেলে চীফ কুক উপরে আমার অফিসে এসে বলে,
- স্যার, আঁরে বিষ আনি দেন, খাই মরি যাই।
- কেন?
- ছত্তিরিশ বছর ধরি কুগের চাকরী করি (আমরা গ্রেটার নোয়াখাইল্লারা কুককে 'কুগ' বলি)। গোরাইয়াগো লগে (সাদা), কালাইয়াগো লগে (আফ্রিকান), ইন্ডিয়া, আম্রিকা, সুইডেন, অশটেলিয়া, জাফান, ফিলিপিন্না, চীনাইয়া, কত রংগের অফিসারেরগো খানা খাবাইলাম। ইংলিশ খানা, সাউথ ইন্ডয়ান খানা, চীনা, জাফানী, থাই, কোরিয়ান কত্ত রকমের কত্ত কিছু বানাইলাম, কেউ অবজেকশনতো দে-ই ন’ বরঞ্চ খাই খুশী অইছে, দোয়া কইচ্ছে। আর আইজ্জা আঁরেদি আন্নেরা মাহইয়াহোলার বই হড়াই হড়াই রান্দাইছেন। তারফরে কন ‘থ্যাংক ইউ!’ আঁরে বিষ দেন স্যার। মরি যাই।
- বিষতো আপনার স্টোরেই আছে। অষ্ট্রেলিয়ায় ক্যাপ্টেন সাহেব ইঁদুরের ওষুধ আনালো না? রাতে ঘুমানোর আগে চামে এক প্যাকেট খেয়ে নেবেন।
- ওম্মা? তো-ই লে ত’ ছেঁড়াইতে ছেঁড়াইতে মরুম!

আর হাসি আটকে রাখতে পারলাম না। জাহাজে ইঁদুর নিধনের জন্য যে সে বিষ ব্যাবহার করা যায় না কারন প্রচুর দূর্ভেদ্য জায়গা আছে, সেখানে মরে পড়ে থাকলে ওসব ফাঁক-ফোঁকর থেকে কিছুতেই মৃত ইঁদুর বের করা যাবেনা এবং পঁচা গন্ধ সহ্য করে যেতে হবে দিনের পর দিন। সেন্ট্রাল এয়ার কন্ডিশনের বদৌলতে গন্ধ ছড়িয়ে পড়বে জাহাজের পুরো এ্যাকমোডেশনে। তাই বিশেষ বিষ তৈরী করা হয় যেটা খেলে ইঁদুরের ভয়াবহ ডিহাইড্রেশন হয় এবং মারা যায়। পুরো শরীরে একটুও পানি থাকেনা বিধায় না পঁচে মৃত ইঁদুরটি গন্ধহীন শুকনো খড়কুটোর মত পড়ে থাকে, গন্ধতো দুরে থাক, জীবাণুও ছড়ায় না। বেচারা চীফ কুক ভাবতেও পারেনি তাকে আমি মরার ব্যাপারে উৎসাহ দেবো। হাসিমুখে বললাম,
- তাছড়া আরেকটা শর্টকাট উপায় আছে, এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে মরে যাবেন। গ্যালীতে আপনার চুলা আছে না, এর উপরের প্লেটটা খুলে ফোর-ফর্টি (440Volts) লাইন অন করে টার্মিনালগুলো খালি হাতে চেপে ধরবেন, টেরই পাবেন না কখন মারা গেলেন।
- স্যার, আঁরে ছুডি দিতেন ন’?

বিরিয়ানী খেতে বসলে সেই ঈদের লাঞ্চের কথা এখনও মনে পড়ে। শুধু কাচ্চি বিরিয়ানী নয়, চিকেন, লবস্টার্স থেকে শুরু করে বোরহানীটা পর্যন্ত নিখুঁতভাবে সিদ্দিকা কবীরের বই দেখে তৈরী করা হয়েছিলো। জাহাজের প্রবীণ এ্যাক্সপার্ট দুই কুক আরো এক্সপার্ট হয়েছে সিদ্দিকা কবীরের বই পড়ে। ঈদের কিছুদিন পর সিংগাপুরের বাংলাদেশী দোকান থেকে কেনা ইলিশ মাছ দিয়ে সর্ষে ইলিশ রেঁধেছিলো চীফ কুক। সিদ্দিকা কবীরের বই মোতাবেক। এক কথায় দারুন!

আমি নিজেও সময় পেলে বইটা পড়তাম। লন্ডনে ছাত্রাবস্থায় বাসা থেকে ক্যূরিয়ারে বইটি আনিয়েছিলাম। সত্যি এটা কিচেন বাইবেল। বইটিতে শুধু রেসিপি বা রান্নার পদ্ধতি আছে তাই নয়, কিভাবে খাবার সংরক্ষন করতে হয়, কোন ধরনের খাবারে কি ধরনের পুষ্টি তার বিববরণ আছে। উচ্চ শিক্ষিত, অধ্যাপিকা সিদ্দিকা কবীর শুধু রেসিপি দিয়ে ক্ষান্ত দেন নি, দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। সবচেয়ে বেশী ভালো লেগেছে বইটি তিনি উৎসর্গ করেছেন বাংলাদেশের পুষ্টিহীন শিশুদেরকে।

কৃতজ্ঞতা মহীয়সী সিদ্দিকা কবীরকে এমন একটি বই লেখার জন্য যা নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবার উপকার করছে। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই, তবে তাঁর এই সৃষ্টি প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম মানুষের উপকারে আসবে।

আল্লাহ্ মরহুম সিদ্দিকা কবীরকে জান্নাতবাসী করুন।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই অক্টোবর, ২০২৩ বিকাল ৫:০২
১১টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কার্ড

লিখেছেন হাসান মাহবুব, ২৬ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ রাত ৯:১৫


তার সাথে আমার যখন দেখা হয়েছিল, তখনও এই শহরে মেট্রোরেল আসে নি। লোকাল বাসে করে যাতায়াত করি মিরপুর-মতিঝিল-মিরপুর। ক্লান্তিকর। সেদিন অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও সরাসরি মতিঝিলের বাস পাই নি ।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইসলাম কখনোই ধন-সম্পদের লোভ দেখিয়ে যুদ্ধের কথা বলে না

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৬ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ রাত ১১:০৪



আমি পুরো কুরআন পড়েছি, এবং এখন পর্যন্ত যত দূর প্রিয় নবীজীর পথ শিখেছি, তা থেকে জানি যে, ইসলাম কখনোই আক্রমণ করার কথা বলে না। ইসলামের শেষ নবী (সাঁ)-এঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সহজ ভাষায় লিখলে হয় সস্তা-দরের লেখক!

লিখেছেন শেরজা তপন, ২৬ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ রাত ১১:২৭


ওপার বাংলার কথাশিল্পী সমরেশ মজুমজারের সাথে হুমায়ূন আহমেদের বেশ খাতির ছিল।তিনি ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন, রবীন্দ্রনাথ ও শরতচন্দ্রের পরে বাংলা ভাষার সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক ‘হুমায়ূন আহমেদ’।
তবে আমার মত ভিন্ন; আমি মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জনতার উচিৎ মেয়েটির কাছে ক্ষমা চাওয়া

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ রাত ১২:৪৭



কিছু হলেই অনুভূতিতে আঘাত, পান থেকে চুন খসলেই ধর্ম গেলো গেলো; মেরে ফেলো, কেটে ফেলো, পুতে ফেলো এসবই হচ্ছে ধর্মান্ধ জনগোষ্ঠীর মনোভাব। সময় এসেছে এসব সেন্টিমেন্টাল জনগোষ্ঠীর অনুভূতি... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্ম শেখানোর সুযোগ পেলে কি শিখাবেন?

লিখেছেন শূন্য সারমর্ম, ২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ সকাল ৯:৪০








কিছুদিন আগে নানু মারা যাওয়ায় জানাযারর সময় নিয়ে সমস্যা হলো,তা ছিলো ঐ দিনই বাড়ির খুব পরিচিত মুখও ক্যান্সারে অনেক মাস যুদ্ধ করে মারা যায়।মাঠ যেহেতু একটাই,পরে ঠিক হলো সকাল ১১... ...বাকিটুকু পড়ুন

×