আন্ডারগ্র্যাডে আমার এক জাপানি ক্লাসমেট ছিল। নাম ফুজিতা (ছদ্মনাম)। চিকনা চাকনা। মাথায় লম্বা চুল। কিউট ঢালিউড নায়কি চেহারা। আমরা একই ডরমিটরিতে থাকতাম। একদিন ক্লাসটিচার বললেন- ফুজিতা ক্লাসে আসছেনা। আর একটা ক্লাস কামাই করলেই ফেইল। এই ক্লাসে তাকে আরো এক বছর থাকতে হবে। জাপানি ছেলেরা চুপচাপ। কেউ কোন কথা বলছে না। কী কারণে আমি বলে উঠলাম, আমি ছেলেটাকে ডরমিটরিতে প্রতিদিন দেখি। আমি খোঁজ নিতে পারবো।
ক্লাস শেষে ডরমিটরিতে ওর রুমে গেলাম। অসময়ে শুয়ে ছিল।
বললাম – ক্লাসে তোমার উপস্থিতি নিয়ে .. থামিয়ে দিয়ে বলল- জানি।
কাল থেকেই ক্লাস করবো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। এখন তোমাকে দেখে ভাবছি সিদ্ধান্তটা পরিবর্তন করবো। পড়াশুনা করবো না। আমাকে কেউ উপদেশ দিতে আসুক- আমি এটা চাইনা। আমার রাগ বেড়ে যায়। বলে কি? আমি আবার কী করে বসলাম? এক্কেবারে খাস বাংলা স্টাইলে ছেলেটার হাত ধরলাম।
বললাম, ভাই একটু কথা বলতে চাই। সে বলল – ক্ষুধায় পেট চাউ চাউ করছে। খেয়ে এসে তোমায় ডাক দেব। ডরমিটরির বাইরে এক সিঁড়িতে বসলাম। অনুমতি নিয়ে সে সিগারেট ধরালো। কোত্থেকে কথা শুরু করবো বুঝতে পারছিনা। আমি আমার বাবা-মা-ভাই-বোন দের কথা বললাম। “ছয় বোন দুই ভাই। বাবা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, পলিটেকনিকে পড়ান। সীমিত আয়। আমার বৃত্তির টাকার একাংশ বাসায় পাঠাই।”
আমার কথার জের ধরে সে তার পরিবারের কথা বলতে লাগলো –
“আমরা এক ভাই, এক বোন। বাবা আছেন, মা আছেন। বাবা জন্মান্ধ। বাপজান যখন ছোট ছিলেন তখন জাপানি রাস্তাঘাট তেমন অন্ধ-প্রতিবন্ধী-বান্ধব ছিলনা। রাস্তায় পার হচ্ছিলেন, এক বাস এসে তাকে পিষিয়ে দিয়ে চলে গেল। জানে বেঁচে গেল কিন্তু পা দুটো হারাল। দাদাজান বাবাকে রেখে এলেন একটা প্রতিবন্ধী হোস্টেলে। সেখানে এক সুন্দরী মহিলার সাথে পরিচয় হলো। তিনি ও জন্মান্ধ। বিয়ে করে বাবা উঠলেন আমাদের নানা বাড়িতে। আমাদের দুজনেরই জন্ম সেখানে। বোনটি মায়ের অনেক বৈশিষ্ট্য পেয়েছে। সে যথেষ্ট সুন্দরী। সে যে কত সুন্দর তা আমার মা ও জানেনা, বাবা ও জানেনা। সে নিজে ও জানেনা। কারণ সে ও জন্মান্ধ। কেবল মাত্র আমি বড় হয়েছি সম্পুর্ন সুস্থ শরীর নিয়ে। এই দেখো আমার দুই হাত দুই পা, দুই চোখ সব ঠিক আছে। বাড়িতে কেবলমাত্র আমার দৃষ্টিই রঙ্গিন। বাকিদের দৃষ্টিহীন চোখে এই পৃথিবীর পুরোটাই কল্পনার জগত। বাবা মা আর আমার বোন সরকার থেকে একটা ভাতা পায়। প্রতিবন্ধী ভাতা। সেই ভাতা থেকে আমার পড়াশুনা চলে। প্রতিবন্ধীদের আয় থেকে আমি সুস্থ শরীরের মানুষটা ব্যয় করে যাচ্ছি। এসব আর ভাল্লাগছে না। নিজেকে অকেজো লাগছে। নিজে উপার্জন করতে চাই। বিনা পরিশ্রমের সরকারি টাকাটা আমার জন্য অপমানের।“
আমি ছেলেটির চোখের দিকে তাকাতে পারলাম না। আমি এদের ট্যাক্সের টাকার সরকারি বৃত্তি নিয়ে পড়ছি। এক সময় ভাবতাম লেখাপড়া করে নিজ যোগ্যতায় এই বৃত্তি আমি অর্জন করেছি। আজ তার কথা শুনে কেমন কেমন লাগছে। তার “বিনা পরিশ্রমের সরকারি টাকা” কথাটি মগজ থেকে ফেলতে পারছিনা। বৃত্তির টাকাটা ও কেমন অপবিত্র অপবিত্র লাগছে। যুক্তিতে যাবার চেষ্টা করলাম। বললাম, ভাইরে আর দেড়টা বছর। একটা ডিগ্রি হবে, চাকুরীতে ঢুকলে ভাল একটা বেতন পাবে … আমি আমাদের সিলেবাসটুকু দেখেছি। বাকি দেড় বছরে এখানে যা শিখব, চাকুরীতে গেলে কোম্পানিতে আরো বেশি শিখবো। এর মধ্যে বেতন ও পাবো। আমি একটা করে যুক্তি দেই, ছেলে একটা করে বাণী ছাড়ে।
শেষ যে বাণীটা ছাড়লো – তা এখনো আমার কাছে রহস্য। আমি তার থিওরির নাম দিয়েছি ফুজিতা থিওরি। …স্রোতের আসল স্বাদ পেতে হলে সাঁতরাতে হবে স্রোতের বিপরীতে… আয়নার পেছন দিক থেকে কখনো নিজের চেহারা দেখেছ?
এই চেহারা আমি তুমি দেখতে পাবো না। একজন অন্ধ দেখতে পায়। আমি সেটা দেখতে চাই। দেখাতে চাই। কেমন হুমায়ুন আহমেদের হিমু মার্কা মহাজ্ঞানী কথাবার্তা। তেমন বুঝতে পারিনি। আধ্যাত্মিক কথাবার্তা এমনিতেই কম বুঝি। আমাদের ক্লাসে ছাত্র সংখ্যা ছিল ৪৪ জন। ৪৩ জন পাশ করে বের হলো, ফুজিতা চলে গেল অন্য স্রোতে। আয়নার অপর পৃষ্ঠের দর্শক হয়ে। দেড়বছর পর আমাদের গ্রাজুয়েশন সেরেমনি তে ফুজিতা এসেছিল। আমি দুর থেকে দেখলাম। কথা বলতে চাইলাম। সেই সুযোগ হলো না। আমি (একমাত্র বিদেশি ছাত্র) ব্যস্ত হলাম একটা টিভি ইন্টারভিউ তে। আয়নার সামনের পৃষ্ঠ দেখাতে। ২০ বছর পরের কথা। ২০১২ সালে একবার অইতা ন্যাশনাল কলেজ অব টেকনোলজি তে গেলাম। স্যার দের জিজ্ঞাস করলাম কে কোথায় আছে। ফুজিতা জয়েন করেছিল ছোট একটা সফটওয়ার ফার্মে। সেই ফার্মটিকে সে তিল তিল করে গড়ে তুলেছে। অন্য স্রোতের এই ছেলেটি আজ ফার্মটির সি,ই,ও। আমরা বাকি ৪৩ জন ওর ধারে কাছে ও নেই।
[সগৃহীত : জাপান কাহিনী , লেখক : ড. আশির আহমেদ ]
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ বিকাল ৫:১৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



