এক
-শালার বাস আসে না কেন? আজকে আবার পরীক্ষা, ধুড়।
-কি পরীক্ষা? আর তুমিই বা কবে থেকে পরীক্ষা নিয়ে সিরিয়াস হলে!!!
পাশে তাকায় ত্রিলোক, শায়লা আপু।
-না মানে এই আরকি আপু, গত সেমিস্টারে গ্রেড ব্যাপক খারাপ আসছে, বুঝেনি তো। কেমন আছেন আপনি? অনেকদিন দেখা নাই, আংকেল আন্টি কেমন আছেন?
-আংকেল আন্টি আছেন ভালোই, আমিও ভালোই আছি। বোনের খবর রাখার কি আর সময় আছে আপনার।
-কি যে বলেন!!!!
-হইছে, আর আদিখ্যতা করা লাগবে না। ওই যে বাস আসছে মনে হয়।
আসলেই বাস এসেছে। গেটে পরিচিত ভাই-বেরাদার, এবং যথারীতি সবাই উত্তেজিত। বাসে উঠতে উঠতে জিজ্ঞেস করে যা জানা গেলে তা হল মিরপুরে কোন এক প্রাইভেট কারের সাথে লাগছে। ড্রাইভাররে নাইমা ব্যাপক একটা ধোলাই দেওয়া হইছে। ড্রাইভারের অপরাধ সে নাকি গালি দিসে !!!
“বোকা ড্রাইভার” ত্রিলোক ভাবে মনে মনে “আর নয় তো এই রোডে নতুন চালায়”।
গেটে কিছু নতুন পাবলিক দেখা যাচ্ছে। ফার্স্ট ইয়ার মনে হচ্ছে। এরা একটু বেশিই উত্তেজিত এবং কথা বার্তা শুনে মনে হচ্ছে গাড়ি ভাংতে না পেড়ে কিছুটা হতাশও।
-কি অবস্থা ত্রিলোক, অনেকদিন দেখি না তোমারে, কি ভার্সিটি কি ছাইড়া দিলা নাকি!!!
ঘাড় ঘুড়িয়ে তাকায় ত্রিলোক, সফিক ভাই ডিপার্টমেন্টের ফোর্থ ইয়ারের বড় ভাই।
“না ভাই” হেসে জবাব দেয় সে “একটু ব্যাস্ত ছিলাম।”
-হুমম, ফেসবুকেও তোমারে দেখি না, ঘটনা কি? কোনো সমস্যা?
-না ভাই, তেমন কিছু না, ফেসবুকে বসি নাই কারণ নেট নাই, টাকা পয়সারও টানাটানি, বুঝেনি তো। তার উপর আবার পরীক্ষা। মাইক্রো ম্যাডাম তো জান ছেড়াবেরা কইরা ফেলল।
-তোমাদের মাইক্রো যেন কে নেয়?
-নাজ ম্যাডাম।
-ও, উনি!!! উনি তো ব্যাপক পেরা দেয়। আমাদের ক্লাস নিছিল কয়দিন, একটা পরীক্ষাও নিছিল, সবাই শূন্য পাইছে সেই পরীক্ষায়। পরে কি যেন হইছিল উনি আর ক্লাস নেয় নাই।
“ওই মামা রঙ সাইড দিয়া যাও” গেট থেকে কেউ চিৎকার করল। সম্ভবত সাইক।
“চৈতালী” বাস যখন এসে পৌছল কলা ভবনের গেটে তখনও পরীক্ষার এক ঘন্টা বাকী। যদিও মিডটার্ম, কিছুই পড়া হয় নাই ওর।
“যা থাকে কপালে আগে শ্যাডোতে যাই, একটা সিগারেট টানি, মাথা ঠান্ডা করি। তারপর পড়া যাবে” ভাবতে ভাবতে শ্যাডোতে যায় ত্রিলোক। সিগারেট ধরিয়ে টানতে না টানতেই এসএমএস । কে ভাবতে ভাবতে মোবাইল বের করে দেখে অপরিচিত নম্বর, লেখা
“আই লাভ ইউ” (!!!)
বাহ!!! সকাল সকাল কার এত এনার্জি যে ফাইজলামি শুরু করল। মাথায় দুষ্ট বুদ্ধি খেলে গেল ওর, রিপ্লাই করল,
“মি টু………”
এর মধ্য বাকী গ্যাং মেম্বাররাও চলে এসেছে শ্যাডোতে সবার সিগারেট খাওয়া হলে সেমিনারে গিয়ে কিছুক্ষন দেখল তারপর পরীক্ষা দিল। কি দিল সে নিজেও জানে না, তবে পরীক্ষা শেষ হইছে এইটাই অনেক আনন্দের। তার উপর আবার কোরবানির ছুটি, মজাই মজা!!!
হল থেকে বের হয়ে আবার ক্যাম্পাস শ্যাডো, যেতে যেতে ঐ নম্বরে কল দিল, একবার রিং হওয়ার পরে কেটে দিল ওপাশ থেকে। একটু পরে আবার এসএমএস, লেখা,
“আমি তোমাকে কল দিতে চাই না, কারণ আমি তোমার পত্রমিতালী হতে চাই। সবাইতো কথা বলে, দেখা করে প্রেম করে। আমরা তাদের থেকে আলাদাভাবে প্রেম করব। তাই প্লিজ আমাকে কল দিবা না আর কখনো কল করতে অনুরোধও করবা না”
মনে মনে হাসল ত্রিলোক। লিখল,
“আচ্ছা জানেমান, তুমি যেভাবে চাইবে সেভাবেই হবে”
আর নম্বরটা ‘বেকুব’ নামে সেভ করে রাখল।
পরদিন সকাল ১১টায় এসএমএস,
“জানেমান শুভ সকাল, নাস্তা করছ?”
ক্লাস না থাকায় ঘুম থেকে দেড়ি করেই উঠেছে সে, এই মেয়ে (বা ছেলে) যে তার চাইতেও অলস(!!!) এটা ভেবে কিছুটা হতাশই হল কিন্তু কোনো রিপ্লাই করল না।
একটু পরে বের হল বাসা থেকে, মাঠে গেল সিগারেট টানল। পোলাপানের সাথে আড্ডা দিল। প্লান হল আজকে রাতে আহসানুল্লাহতে থাকবে। সেই মত রাতে ত্রিলোক আর ত্রিদিব বের হল।
ও এর মাঝে আরো দু’টো এসএমএস আসছে, দুপুরে এসেছে
“জানেমান লাঞ্চ করছ” আর রাতে “জানেমান কি করছ?” স্বাভাবিকভাবেই এইসব বিরক্তিকর এসএমএস এ ত্রিলোক একটু বিরক্ত, ওর মন মেজাজ খারাপ। ফ্রামগেট বাসস্ট্যান্ডে নেমে সিগারেট কিনছে একটু পরে রিক্সায় উঠবে এই সময়ে আবার এসএমএস। বের করে দেখে আই’টপ, দশ টাকা। আমি আবার কখন টাকা ভরলাম!!! আমার তো টাকা আছেই। সাথে সাথেই আরেকটা এসএমএস ……………
“টাকা পাঠাইছি, পাইছ? এইবার লেখ কি করছ, ব্যাল্যান্স না থাকলে বলবা, টাকা পাঠিয়ে দেব”
এইবার ঘাড়ের রগ দপদপ করে ফুটতে লাগল ত্রিলোকের, সাথে সাথেই কল দিল, ধরে না, আবার কল দিল ধরে না, আবারও কল দিল……………………ধরে না। মাথার চুল ছিড়তে ইচ্ছা করতেছিল তখন ওর।
একটা এসএমএস আসল “তোমাকে না বলছি এসএমএস করতে, কল দিতে না, প্লিজ”
নিজেকে ঠান্ডা করার চেষ্টা করল, অনেকক্ষন পরে মাথা যখন ঠান্ডা হল তখন রিপ্লাই করল,
“কে তুমি? তোমাকে কি আমি চিনি? আমাদের কি দেখা হইছে কখনো? আমার নম্বর কোথায় পাইছ?”
এর মধ্যে ওরা আহসানুল্লাহতে পৌছে গেল। রাতের আহসানুল্লাহ, অসাধারণ পরিবেশ, তার সাথে আবার অনেক পরিচিত মুখ। স্কুল আর কলেজের অনেক বন্ধু পড়ে ত্রিলোকের এখানে। সবার সাথে দেখা করে গল্প করা আর কার্ড খেলতে খেলতেই সময় পার হতে লাগল। অনেক নতুন মানুষের সাথে পরিচয় হল। আহসানুল্লাহ’র তিন তলার টেরেসে (আর্কি’র চিপায়) খুব সুন্দর একটা জায়গা আছে। খুব সুন্দর বাতাস আর উপরে বিশাল আকাশ। গানের আসর জমল। বাধন গান ধরল,
“সুন্দরীতমা আমার তুমি নীলিমার দিকে তাকিয়ে
....................বলতে পারো এই আকাশ আমার”
জেমসের গান এত সুন্দর ওঠে ওর কন্ঠে। একের পর এক গান চলল। ত্রিলোকের মনটা অবশ্য প্রথম গানটা শোনার পর থেকেই বিষন্ন হয়ে আছে। নিদ্রার কথা মনে পড়ে গেছে ওর। নিদ্রা, ওর ভালবাসা, যদিও এক-পক্ষীয়, কিন্তু তারপরও তো ভালোবাসা। শুনেছে বিয়ে হয়ে গেছে ওর। তাতে কি তারপরও তো ওর ভালোবাসাই। কি বা যায় আসে ওর ভালোবাসা বা না বাসায়, ওর বিয়ে করায়। ও তো চিৎকার করে বলতেই পারে
“হতে পারে সারা দুনিয়াটা তোমার কিন্তু তুমি আমার, শুধু আমার।”
দুই
আবার মেসেজ টোন বেজে ওঠে, রিপ্লাই এসেছে, লেখা আছে,
“আমি তোমার হৃদয়, ভালবাসা, আমি একজন মানুষ, প্লিজ রাগ করো না, শুভ রাত্রি।”
এরকম একটা মূহুর্ত নষ্ট করার অপরাধে এসএমএস দাতাকে খুন করা যায়, আর কি এসএমএসের কি জবাব!!!
যাই হোক, পরদিন সকালে বাসায় আসার পথে আরো কয়েকটা এসএমএস পেল ত্রিলোক,
“কি রাগ কমেছে? একবার ‘আই লাভ ইউ’ লিখে এসএমএস করো না প্লিজ।”,
“ আচ্ছা আমি তোমাকে এসএমএস করলে তুমি কি বিরক্ত হও, তুমি না আমাকে ভালোবাসো? প্লিজ একটা এসএমএস করো প্লিজ”,
“কি হল আমার টাকাগুলো নষ্ট করতে কি খুব ভালো লাগতেছে, তোমার কি কোনো লাভার আছে?”
পরপর তিনটা মেজাজ বিগরাণো এসএমএস পাওয়ার পর, কিছু একটা লেখা দরকার তাই লিখল,
“এতক্ষনে বুঝতে পেরেছেন, ধন্যবাদ, আসলে আমার মনের জমি খালি নাই, তাই অফ গেলে খুশি হই।”
সাথে সাথে রিপ্লাই
“আমার সমস্যা নাই, তুমি ওর সাথে লাইভ আর আমার সাথে এসএমএস এ প্রেম করবা…………”
এইটা তো ব্যাপক ‘পেইন’ ভাবে ত্রিলোক, পুরাই ত্যাক্ত-বিরক্ত কইরা ছাড়তেছে। চিন্তা করে আর কোনো এসএমএস এর রিপ্লাই করবে না ও। তারপর কি ভেবে লেখে,
“আম্মু অপরিচিত কারো কাছ থেকে কিছু খাইতে, অপরিচিত কারো সাথে কথা বলতে, এমনকি এসএমএসও করতে নিষেধ করছে”
রিপ্লাই আসে,
“তুমি তোমার আম্মুকেও বলছ???!!! আর আমি তো তোমার অচেনা না, আমি তো তোমার জনম জনমের সাথী, আমি তোমার সব”
রাস্তায় ছিল ত্রিলোক, আরেকটু হলেই গাড়ির নিচে পড়ত এই এসএমএস পড়ে। এত্ত ক্ষেত একটা মানুষ হইতে পারে!!!
এস্কেপ রুট খুজতে থাকে সে, লেখে,
“আমার সব কিছু তো একজনের জন্যে জানেমান, সেখানে তো ২ জনের জায়গা হবে না। তবে, বিয়ের পর ২/৩ জন ব্যাপার না, তখন লাইন দিও চান্স পাইলেও পাইতে পারো।”
এসএমএস টা করে মনে মনে সান্তনা দেয় যে এত অপমান করার পর নিশ্চয়ই থামবে, এসএমএস বন্ধ হবে।
সত্যি এরপর সারাদিনে আর কোনো এসএমএস আসেনি। মনে মনে হাফ ছেড়ে বাঁচে ত্রিলোক।
তিন
রাত ১২টা বাজে তখন, বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছে ত্রিলোক। চমৎকার জোৎস্না বাইরে। ঢাকা শহরের বাড়ি ঘর মানে এক খন্ড আকাশ। কোনো কোনো বাসায় তো সেই সৌভাগ্যটাও নেই।ত্রিলোকের সৌভাগ্য ওদের বারান্দা থেকে আকাশ এবং সেই আকাশে্র জোৎস্না প্রায়ই দেখা যায়।জোৎস্না ওর সবসময়ই ভালো লাগে, যদিও ওর চরিত্রের সাথে রোমান্টিকতা ব্যপারটা একদম নেই বললেই চলে তবুও চাঁদ দেখলেই ওর ভালো লাগে। জোৎস্না দেখলে দুই ধরণের অনুভূতি হয় ওর।
ওকে জোৎস্না দেখানো শিখিয়েছে নিদ্রা। প্রতি জোৎস্নাতেই ওকে ফোন করে বলত বারান্দায় গিয়ে জোৎস্না দেখতে। মজার বিষয় হচ্ছে জোৎস্না রাতে নিদ্রা ওর সাথে কথা বলত না। ওর সাথে কথা ছিল জোৎস্না দেখা হলে যে অনুভূতি হয় সেগুলো লিখে ওকে দিতে হবে। ত্রিলোক লিখত। অবাক হয়ে দেখত যেই হাতে লেখা বের হয় না, সেই হাতেই কত সুন্দর সুন্দর কথা লিখছে। কখনও সেটা গল্প হয়েছে, কখনো বা কবিতা, কখনো হয়তো কিছুই হয়নি, কিন্তু পড়তে খারাপ লাগত না কখনোই।
এখন আর জোৎস্না ভালো লাগে না ওর। নিদ্রার সাথে সকল যোগাযোগ শেষ হয়ে যাবার পর থেকেই ও জোৎস্না দেখা বাদ দিয়েছে। বাদ দিয়েছে লেখালেখিও।
তাড়াতাড়ি সিগারেটটা শেষ করে ভেতরে যায়। ‘Inception’ দেখতে হবে। পাক্কা তিন মাস এই মুভিটার জন্যে অপেক্ষা করেছে ভালো প্রিন্ট না পাওয়ায় দেখা হয়নি। আজকে দেখতে হবে। ছবিটা নাকি ব্যাপক মাত্রার ভালো হইছে। মোবাইল সাইলেন্ট করে দেখতে বসল ও।
যখন দেখা শেষ হল কেমন একটা ঘোরের মধ্যে ছিল ও। মোবাইল চেক করতে গিয়ে দেখল একটা এসএমএস,
“বাইরে কি চমৎকার জোৎস্না দেখছ? জোৎস্না তোমার কেমন লাগে??? এখন কিন্তু কেমন লাগে সেটা বলবা না, এখন শুধু চিন্তা করবা, তারপর যখন চিন্তা করা শেষ হবে তারপর লিখবা, আমি কালকে সকালে উঠে দেখব। আর একটা কথা তোমার প্রেমিকার নাম কি? সে কি আমাদের ব্যাপারে জানে?”
চার
ত্রিলোক আর নিদ্রার মধ্যে সম্পর্কটা একটু অন্যরকম ছিল। ত্রিলোক সবসময় বলত যে নিদ্রাকে সে ভালোবাসে। কিন্তু ভালোবাসা বলতে আমাদের সমাজে যা বোঝায় সেটা ওদের মধ্যে ছিল না। নিদ্রাও কখনো মুখ ফুঁটে বলেনি যে সে ত্রিলোককে ভালোবাসে। নিদ্রাকে ত্রিলোক দেখেনি কোনোদিন। নিদ্রাও দেখা করতে চায়নি। তবে ওদের মধ্যে অনেক কথা হত।
এই যে মানুষটি তাকে মেসেজ পাঠাচ্ছে কি কারণে পাঠাচ্ছে তা সে জানে না। কিন্তু গতরাতের মেসেজটা পড়ার পর থেকে সে নিদ্রার কথা ভুলতে পারছে না। পরদিন সকালে ত্রিলোক মেসেজ পাঠালো,
“দেখুন, আমি জানি আপনি কে? কি চান? তবে আমি চাই না আপনি আর আমাকে মেসেজ পাঠান। ভালো থাকবেন”
কিছুক্ষন পরে রিপ্লাই আসে,
“আচ্ছা আমি তো তোমার কোনো ক্ষতি করছি না, আমি শুধু তোমার সাথে যোগাযোগ রাখতে চাই। তুমি কি বুঝতে পারছ না আমি তোমাকে ভালোবাসি???”
“আমি আপনাকে ভালোবাসি না, এমনকি আমি চাই না আপনি আমার সাথে যোগাযোগ রাখেন”
“মানুষের সাথে এত রূড বিহেব কর কেন? তুমি না চাইলে তোমার সাথে যোগাযোগ করব না। তবে তোমাকে ভালোবাসব কারণ তোমাকে ভালোবাসা আমার রাইট”
“আপনি আমার নম্বর কই পাইছেন?”
“পাইছি যেকোন এক জায়গায়, তোমাকে বলতে হবে? তোমার কাছে মানুষের অনুভূতির কোন দাম নেই”
“আচ্ছা ঠিক আছে বলতে হবে না কোথায় পাইছেন, আপনি কে সেটা অন্তত বলেন”
“আমি অপ্সরা, বরিশালে থাকি, এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিলাম। এখন ভর্তির জন্য অপেক্ষা করছি, একজনের কাছে তোমার নম্বর পাওয়ার পর দুষ্টুমি করার জন্যেই এসএমএসটা পাঠিয়েছিলাম। আমি তোমাকে আগে থেকেই চিনি”
মাথা ঘোরে ত্রিলোকের বরিশাল শহরে ত্রিলোকের পরিচিত কেউই নেই। চেনে কিভাবে, নাকি মিথ্যা বলছে?
“দেখুন আমি জানি না আসলে আপনি কি চান, তবে আমার মনে হয় এখানে থামলে ভালো হয়”
“আমি আগেই বলেছিলাম, মানুষের অনুভূতির ব্যপারে তোমার বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা নেই। আমি তোমার বন্ধু হতে চেয়েছিলাম। তুমি থাকতা তোমার প্রেমিকাকে নিয়ে, আমি তোমার প্রেমের পথে বাধা হতাম না”
কিছুক্ষন চুপ করে থাকে ত্রিলোক্। আরেকটা মেসেজ আসে,
“মানুষকে শ্রদ্ধা করতে শেখ, আমাদের গল্প এখানেই শেষ”
হাফ ছেড়ে বাঁচে, প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে আবার।
পাঁচ
ত্রিলোকের সাথে নিদ্রার রিলেশনটা হঠাত করেই ভেঙ্গে যায়। নিদ্রা ওর সাথে সব যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় তখন। এর কারণটা ত্রিলোক জানত না। জানার সুযোগও ছিল না। তবে ধারণা করে নিদ্রার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।
ত্রিলোকের সাথে এরপরে অনেকদিন আমার দেখা হয়নি। আমিও ব্যস্ত ছিলাম। সেও তেমন একটা ফোন টোন করেনি। তো সেদিন হঠাত দেখা হতেই জিজ্ঞেস করলাম কি খবর। ও অবশ্য মাঝখানে বলেছিল আমার সাথে দেখা করতে চায়। আমার নাকি গল্পটা শেষ করা উচিত। যাই হোক গত পরশুদিন টিএসসি তে চা খেতে খেতে গল্পের শেষ অংশটুকু শুনছিলাম,
এরপরে অপ্সরা বা যে নামই হোক সেই মেয়েটা আর মেসেজ পাঠায়নি ত্রিলোকের মোবাইলে। ত্রিলোক অবশ্য পরে একটা ‘স্যরি’ মেসেজ পাঠিয়ে ছিল। অনেকদিন পেন্ডিং থাকার একদিন সেন্ট আইটেমস থেকে ডিলেট করে দেয় সে মেসেজটা। ত্রিলোকো ভুলে গেছিল।
কিন্তু, হঠাত একদিন এক মেঘলা দিনে একটা মেসেজ আসে সেই নম্বর থেকে,
“কেমন আছো, ভুলে গেছ না মনে আছে?”
ত্রিলোক অবাক হয় এতদিন পরে আবার সে নম্বর থেকে মেসেজ আসায়। তার চেয়ে বেশী অবাক হয় নম্বরটা সে সেভ করে রেখেছিল। কেন? তাহলে কি ওর এই মেয়েটার সাথে যোগাযোগ করার ইচ্ছা ছিল, কিংবা ও আশা করছিল যে মেয়েটা ওকে আবার মেসেজ পাঠাবে?
যাই হোক, ত্রিলোক আশ্চর্য ভাবটা কাটতেই রিপ্লাই করল,
“ভালো আছি, এতদিন পর !!! আপনি কেমন আছেন?”
“ভালো, তোমাকে অনেক মিস করছিলাম। পড়াশুনা কেমন চলছে?
টিএসসিতে যাও নিয়মিত?”
“হুম, যাই। এখন সেমিস্টার ব্রেক চলছে, এই তো ১৭ তারিখ থেকে ক্লাস শুরু। আপনি কোথায় ভর্তি হয়েছেন?”
“এখনো হইনি, পরের বছর চেষ্টা করব? আচ্ছা তুমি আমার উপর তখন অনেক বিরক্ত হইছিলা, না?”
“কিছুটা, এখনও অবশ্য হচ্ছি”
“হা হা হা !!! তুমি কি জান তুমি অনেক মজা করে কথা বল?”
“না, কেউ কখনো বলেনি”
“কেন, আপনার ভালোবাসার মানুষটিও বলেনি??? !!!”
রিপ্লাই দেয় না, ত্রিলোক। বাইরে চমৎকার চাঁদ উঠেছে, আচ্ছা এই মেয়েটার সাথে কি চাঁদের কোনো সম্পর্ক আছে ?
ছয়
ক্লাস না থাকায় ঘুম থেকে উঠতে একটু বেশী দেরী হচ্ছে ইদানিং ত্রিলোকের, তার উপর আজকে পহেলা বৈশাখ। চোখ ডলতে ডলতে যখন উঠল ততক্ষনে বেলা বারোটা। পিছির সামনে বসল, ফেসবুকের নিউজফিড দেখে বিরক্ত। বেশির ভাগই ইংরেজীতে বা ইংরেজী অক্ষরে বাংলা স্ট্যাটাস দিয়েছে একদিনের বাঙ্গালী তাও পুরাটা হইতে পারল না। একজনকে দেখল ইলিশ মাছ ভাজাসহ প্লেট সামনে রেখে পিক আপলোড করছে, বাহ !!! আচ্ছা যারা নিয়মিত পান্তা ভাত আর মরিচ পোড়া দিয়ে সকালের খাবার খায়, ওরা কি আজকে পান্তা পেয়েছে? নাকি ওরা আজকের দিনেও পান্তা খেতে চায়? যাদের এই একদিনের বাঙ্গালী হবার এত সখ তাদের আসলে এই মানুষগুলোর জীবন দেখানো উচিত আর কান ধরে বলা উচিত এদের সাথে যে মজা নিচ্ছ, কি করেছ এদের জন্য?
এইরকম সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে সকালের খাবারটা খেল, ভূনা-খিচুরী বাবার প্রিয় খাবার, বাবা বাসায় থাকা সত্বেও বাবার সাথে সকালের নাস্তা(!!!) করতে পারল না বলে মনে মনে নিজেকে গাল দিল।
পাশের বাসায় খুব আওয়াজ করে কেউ রবীন্দ্র সংগীত শুনছে। প্রচন্ড বিরক্ত লাগল ওর, রবীন্দ্র সংগীত যে সেটা বোঝাই যাচ্ছে না। ভাবল আবার ঘুমুবে, তারপর কি ভেবে একটা সিনেমা চালু করে দেখার ভান করতে লাগল।
সিনেমা দেখতে দেখতে যে কখন ঘুমিয়ে গেছে খেয়াল করেনি। ঘুম ভাংল মোবাইলের রিংটোনে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে ৩ টা বাজে। অপ্সরার কল…………..কল !!!
অপ্সরা কল দিয়েছে দেখে অনেক অবাক হল ও, রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ,
-তুমি কোথায়, আমি তো তোমার ক্যাম্পাসে
-আ-আমি আছি, একটু দূরে আছি।
-আসতে পারবা, প্লিজ আসো না, তোমাকে দেখতে ইচ্ছা করছে খুব। আমি আগামীকালকেই ঢাকা থেকে চলে যাব।
-আ-আচ্ছা থাকো তুমি আমি এক ঘন্টার মধ্যে আসছি।
-এক ঘন্টা!!! তুমি কি বাসায়? আচ্ছা ঠিক আছে আসো, বাই।
মাথাটা ঘুরপাক খাচ্ছে চড়কির মত। হাতের কাছে একটা গেঞ্জী পায়, জিন্সের প্যান্টটা পরেই বের হয়ে যায়। পকেটে মনে হয় ১৫০ টাকার মত ছিল……….
যখন শাহবাগে নামে তখন সাড়ে তিনটা বাজে। পরিচিত ক্যাম্পাস একটু কেমন যেন অপরিচিত লাগে। একটু বেশিই রঙ্গীন, এইজন্যে এই বিশেষ দিনগুলোতে ও ক্যাম্পাসে আসতে চায় না। যাই হোক পাবলিক লাইব্রেরী ক্রস করার সময় ফোন দিল অপ্সরাকে,
-আপনি কোথায়?
-কলা ভবনের এইদিকে? তুমি?
-এইতো চলে এসেছি? কলা ভবনের সামনের গেটে না পেছনের গেটে।
-সামনের দিকে, অপরাজেয় বাংলার কাছাকাছি।
সাত
অপরাজেয় বাংলার সামনে এসে এত মানুষ দেখে একটু ভড়কে গেল। এত মানুষ, কত রকমের ফ্যাশন। মেয়েরা সব লাল রঙ এর শাড়ি, ছেলেরা পাঞ্জাবী।
এর মধ্যে একটা মেয়েকে দেখল সালোয়ার কামিজ পরা। খুব সাধারণ সাজ, ঠিক ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। মোবাইলটা বের করে কল দিতেই মেয়েটা হাতের ইশারায় মোবাইল দেখাল। এই তাহলে অপ্সরা। মেয়েটা তো অনেক সুন্দর। কাছে যেতেই বলল,
-হাই, আমি অপ্সরা আর, তুমি ত্রিলোক। চল, আমার হাতে সময় বেশি নেই। সন্ধ্যার আগে ফিরতে হবে।
-কোথায় যাবো আমরা?
-তোমাকে নিয়ে রিক্সায় ঘুরব।
-আর
-আর তার আগে নীলক্ষেতে তেহারী খাবো। নীলক্ষেতের তেহারী তো তোমার সবচেয়ে প্রিয়।
-কে তুমি? তেহারী আমার সব জায়গারই প্রিয়।
তেহারী ত্রিলোকের সবচেয়ে প্রিয় খাবার, কিন্তু নীলক্ষেতের তেহারী যে ওর সবচেয়ে প্রিয় সেটা তো নিদ্রা ছাড়া কেউ জানে না। তাহলে কি এই মেয়েটা নিদ্রার পরিচিত?
কিছু না বলে মেয়েটার সাথে রিক্সায় উঠল, রিক্সা নীলক্ষেতে থামল। ওরা তেহারী খেল। আবার রিক্সায় উঠল এবার পুরান ঢাকার দিকে যেতে বলল রিক্সাওয়ালাকে। ঘুরছে, মেয়েটা অনেক কথা বলে, তবে সহজ সরল। ওর ফ্যামিলি, ঢাকায় থাকা, পড়াশুনা করা, কোথাও চান্স না পাওয়া সব কিছুই বলল। ত্রিলোককেও প্রশ্নে প্রশ্নে জর্জরিত করল।
ঘোরাঘুরি শেষ করে যখন প্রায় সন্ধ্যা তখন ওরা এস এম হলের পাশ দিয়ে উদয়ন স্কুলের সামনে ফুটপাতে বসে আছে। হঠাৎ করে অপ্সরা ব্যাগের ভেতর থেকে গোলাপ ফুল বের করে ত্রিলোককে দিয়ে বলল,
-শুভ নববর্ষ, তুমি তো বললা না, আমিই বললাম।
টেনশনে শুভেচ্ছা জানাতে ভুলে গেছে ত্রিলোক।
-আমি এখন যাই, তোমার অনেক বিরক্তির কারণ হলাম। কাল ঢাকা থেকে চলে যাব। হয়তো আর দেখা হবে না। ভালো থেক।
- এখনি চলে যাবেন?
-হুম যেতে যখন হবে আগে যাওয়াটা কি ভালো না?
-যাওয়ার আগে অন্তত বলে যাও আমার নম্বরটা কোথায় পেয়েছ?
-সেটা না হয় নিদ্রাকেই জিজ্ঞেস করো .........
রিক্সা ডেকে উঠে চলে যায় অপ্সরা, ল্যামপোস্টের আলোয় অবাক ত্রিলোককে আরো বেশি অবাক মনে হয়।
শেষ কথাঃ গল্পটা যখন প্রথম লেখা শুরু করি তখন নাম ছিল এসএমএস এবং একটা “সম্ভবত” প্রেমের অপমৃত্যু ।
তখন একভাবে ভেবেছিলাম গল্পটা, তবে শেষ করতে গিয়ে নামটা পরিবর্তন করতেই হল। যারা কষ্ট করে পুরো গল্পটা পড়েছেন তাদের সবাইকে অনেক ধন্যবাদ।
বিঃদ্রঃ এই গল্পের প্রতিটি চরিত্র, ঘটনা কাল্পনিক। যদি কারও সাথে মিলে যায় তবে তা অনভিপ্রেত কাকতাল মাত্র। এর জন্যে আমি “লেখক” দায়ী নই একদম।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০১১ রাত ১০:৪১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




