সন্ধ্যায় প্রচন্ড বৃষ্টিতে ভিঁজতে ভিঁজতে মোড়ের চায়ের দোকানে যখন চা খাচ্ছিলাম, ভালো লাগছিল খুব । তিনদিনের এই গরমে সবার অবস্থাই খারাপ। আমারও। রীতিমত হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। বৃষ্টি ভালোই উপভোগ করছিলাম, সাথে বাতাসও। পরিচিত দোকানদার চাচা বার বার বলছিল,
"বাপ দোকানের ভিতরে আসো, একটা দূর্ঘটনা হইয়া যাইতে পারে"
এই চাচা আমাদের অনেক ভালোবাসেন। যে জায়গায় আমরা আড্ডা দেই জায়গাটা খারাপ। প্রায় পুলিশ-র্যাব আসে। আমাদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে উনি কখনোই আমাদের নামে কিছু বলেননি। অথচ এই লোককে আমরা পাঁচ বছর আগে কেউই চিনতাম না।
আজকে তেমন কেউই আসেনি। যে সময়টা সবাই বাসা থেকে বের হয়, ঠিক তার কিছুক্ষন আগে ঝড়টা শুরু হয়। আমি অবশ্য একটু আগেই বের হয়ে গিয়েছিলাম। যখন বাতাস শুরু হল তখন আমি দোকানে। চা-সিগারেট খাওয়া শেষ হলে যখন বাতাসটা একটু থামল বেরিয়ে পড়লাম রাস্তায় দোকান থেকে একটু এগোলেই মিরপুর রোড। হাঁটতে শুরু করলাম।
রাজপথে ঝুম বৃষ্টিতে ভেঁজার একটা মজা আছে। কিছু দূরের পরে আর দেখা যায় না। গাড়ি থাকলে তার লাইটে একটা অদ্ভুত রঙ্গীন পরিবেশের তৈরী হয়। রাস্তার ল্যামপোস্টের আলোতে বৃষ্টিকণা গুলো সেই পরিবেশটাকে আরো অদ্ভূত, আরো রহস্যময় করে তোলে কিংবা বলা যায় রোমান্টিক করে তোলে। রোমান্টিকতা জিনিসটা আসলে রহস্যময়ই আমার কাছে।
হেঁটে চলছিলাম রাস্তায় একা একা, মিরপুর রোড। আইল্যান্ডে সোডিয়াম বাতি। অদ্ভুত পরিবেশ। একবার চেষ্টা করলাম উপরে তাকাতে। বৃষ্টি আমার বেয়াদবি সহ্য করতে পারল না। আরো জোরে পড়তে শুরু করল। বৃষ্টির শব্দ তুমুল্ভাবে কানে লাগল। আচ্ছা বৃষ্টির শব্দও তো রোমান্টিক। কবিরা নারী, চাঁদ আর বৃষ্টি নিয়েই বোধহয় সবচেয়ে বেশি কবিতা লিখেছে।
একটা বাস পাশে এসে থামাল। কন্ডাক্টর বলল, "ভাই কই যাইবেন?" বললাম "কোথাও না" বলে "বৃষ্টিতে ভিজলে ঠান্ডা লাগবো, আহেন যেখানে যাইবেন নামায়া দেই, ট্যাকা দেওন লাগব না"
ভিতর থেকে বিরক্ত যাত্রী বলে ওঠে "গ্যালে যাইবো না গ্যালে নাই। এত তেলানোর দরকার কি?"
আমি কন্ডাক্টরের দিকে তাকিয়ে হেসে বলি "যাও, তোমার প্যাসেঞ্জারের দেরী হয়ে যাচ্ছে। আমার ভেঁজা হয়নি এখনো।"
হতাশ কন্ডাক্টর প্রায় খালি বাসটা নিয়ে এগিয়ে যায়। হয়তো মনে মনে বৃষ্টি আর আমাকে গালি দিতে দিতেই।
আমি এগিয়ে যাই। রাস্তার পাশে দোকান আর এয়ার কন্ডিশন্ড আলোক ঝলমলে অনেকেই তাকায়, কেউ বিরক্তির সাথে, কেউবা কৌতুহলি হয়ে। তাদের মাঝে কোন তরুনী হয়তো প্রেমের আবেগেও তাকিয়েছিল। যদিও সেদিকে আমার আগ্রহ খুব একটা ছিল না। আমি আমার মত বৃষ্টি উপভোগ নিয়ে ব্যাস্ত ছিলাম। হাঁটছি, হেঁটেই চলেছি।
রাস্তায় কিছু টোকাই ফুটবল খেলছিল। এই ছেলেগুলোর শৈশব একদিক থেকে সুন্দর। কারণ এরা কিছুটা হলেও প্রকৃ্তির কাছে থাকে। ফ্লাটবাড়িতে থাকা ফার্মের মুরগীগুলোর মত না যাদের কয়েকফোঁটা বৃষ্টির জলই জ্বরের কারন হয়। এরা মানুষের সাথে খুব ভালো মিশতে পারে। কাছে যেতেই হৈ-হুল্লোর করে ঘিরে ধরল।
কিছুক্ষন পরে বৃষ্টি থেমে গেল। আমাদের খেলাও শেষ হল। চায়ের দোকানে ঢুকে চা খাচ্ছিলাম, সাথে পিচ্চিগুলাও ছিল। বৃষ্টি শেষ হয়ে গিয়েছে বেশ কিছুক্ষন। আকাশের দিকে তাকালাম, আকাশভর্তি মেঘ, তার মাঝে হঠাৎ এক টুকরা চাঁদ। আমি আবার হাটা শুরু করেছি। এবার বাড়ির পথে। সেই দোকান এয়ার কন্ডিশন্ড বিপনী বিতানের সামনে এখন বাড়ি ফিরতি মানুষের ভিড়। বেশিরভাগ বাসেই জায়গা নেই। কে কার আগে যাবে তাই নিয়ে চলছে ইঁদুর দৌড়। সুন্দরী মেয়েদের কেউ ছাড় দিচ্ছে না। বাস ধরতে না পারা মানুষগুলো একবার আকাশের দিকে একবার রাস্তার দিকে তাকায় পরের বাসের আশায়।
হায় ! শহরবন্দী মেঘ। আরেকবার ঝড়তে শুরু করো, আবার মানুষগুলো দোকানে, বিপনী বিতানগুলোতে গিয়ে ঢুকুক। হয়তো কোন দুরন্ত ছেলে, একটা মিষ্টি মেয়েকে তার বাবার চোখ বাঁচিয়ে ফোন নম্বরটা প্রায় দিয়েই ফেলেছিল। তোমার ক্রন্দন থেকে যাওয়ায় দিতে পারেনি। হয়তো কোন পিচ্চি বাবু তার বাবাকে একটা খেলনা কিনতে রাজি করিয়ে ফেলেছিল প্রায়। বাবা এখন দেরী হয়ে যাবে ভেবে বাসার পথে ধরেছে।
আমি বাসায় ফিরছি, এখন অবশ্য আমার দিকে কেউ অবাক, বিরক্তি অথবা ভালোবাসার দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে নেই। আমিই তাকিয়ে আছি বৃষ্টি শেষে শহরবন্দী একদল মানুষের দিকে, কিংবা শহরবন্দী মেঘেদের দিকে।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০১১ রাত ১০:৪১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




