এক
সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরী হয়ে গেল দিগন্তের। আজ একটা বিশেষ দিন। এরকম একটা দিনে দেরী করে ঘুম থেকে ওঠাটা একদম ঠিক হয়নি । আজ ওর প্রিয় মানুষটার জন্মদিন আর আজকে ওদের প্রেমের প্রথম বার্ষিকীও। ঠিক এক বছর আগে ঠিক এইদিনে নীলিমাকে নিজের ভালোবাসার কথা বলেছিল ও।
মেয়েদের ব্যাপারে বরাবরই একটু লাজুক প্রকৃতির ও। বন্ধুরা তো আশা ছেড়েই দিয়েছিল ওর প্রেমের ব্যাপারে। ও নিজেও ভেবেছিল ওকে দিয়ে আর যাই হোক প্রেমটা হবে না। সবাই যখন মোটামুটি ধরেই নিয়েছিল যে বাবা-মা’র ইচ্ছাতেই বিয়ে করতে হবে দিগন্তের, ঠিক তখনই ওর জীবনে আগমন ঘটে নীলিমার।
প্রথম পরিচয়ের দিনটা এখনও স্পষ্ট মনে পড়ে ওর। সেদিন পহেলা ফাল্গুন ছিল। ক্যাম্পাস থেকে আড্ডা দিয়ে বাসায় ফেরার পথে বাসের জন্য দাড়িয়েছিল নীলক্ষেতে। বেশ অনেকক্ষন পর একটা বাস আসল। বাসে উঠেই একটা সিট পেয়ে বসে পড়ল। লোকাল বাসের সবচেয়ে আরাধ্য এই সিটটা পেয়ে একটু আয়েশি ভঙ্গিতে বসে তার দার্শনিক চিন্তার ঝাপি খুলে বসবে, ঠিক এই সময়ে বাসে এক সুন্দরীর আবির্ভাব। প্রচন্ড পরিশ্রান্ত, ঘামে গালের পাশে চুল লেপ্টে আছে। এত সুন্দর লাগছিল, যে আক্ষরিক অর্থেই মুখটা হা হয়ে গিয়েছিল দিগন্তের। প্রাথমিক ঝটকা কেটে যেতেই নিজে উঠে সিটটায় মেয়েটাকে বসতে দিয়েছিল। পাশের ভদ্রলোক সায়েন্স ল্যাবরেটরীতে নেমে যেতেই মেয়েটা চোখের ইশারায় বসতে বলেছিল পাশে। সেও বসে পড়েছিল মেয়েটার পাশে।
মেয়েটাই প্রথমে কথা বলেছিল। ধন্যবাদ দিল প্রথমে। এরপর কি নাম, কি করা হয়, কোথায় থাকা হয়, পছন্দের বিষয়গুলো কি কি ইত্যাদি ইত্যাদি জেনে নিয়েছিল ভাববাচ্যে। সেও এক সুযোগে ফোন নম্বরটি চেয়ে নিয়েছিল। কথা ছিল কথা হবে। নির্দিষ্ট স্টপেজ আসতে মেয়েটা নেমে গিয়েছিল আরেকবার ধন্যবাদ জানিয়ে।
এসব ভাবতে ভাবতে বাসা থেকে গিফট হাতে বের হয় দিগন্ত। বাইরে হালকা বৃষ্টি হচ্ছে। খুব বেশি না, তবে বিরক্তিকর। বাসের জন্যে অপেক্ষা করতে হবে ভাবতেই মেজাজ খারাপ হল। ইদানিং আবার বাসে উঠেও শান্তি নেই, প্রতিদিন ভাড়া নিয়ে ক্যাচাল। ঠিক করল আজকে বাসে ভাড়া নিয়ে কোন ক্যাচাল করবে না। কারণ আজকে অড় জীবনের বিশেষ একটা দিন।
বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে বাসের জন্য দাঁড়িয়ে আছে। প্রচন্ড ফাকা রাস্তা। বাস তো দূরের কথা একটা গাড়িও নেই। একটা সিএনজি দাঁড়িয়ে ছিল। জিজ্ঞেস করলে বলল যাবে না। লাট সাহেবের মত সিএনজিতে বসে চা খাচ্ছে। মেজাজ আরো খারাপ হল। তারপরও কিছু বলল না। হঠাৎ একটা শব্দ শুনে তাকিয়ে দেখল একটা গাড়ি দ্রুত তাকে অতিক্রম করে গেল। ঠিক তার পেছনেই একজন মহিলা রাস্তায় পড়ে আছেন। কি করবে না বুঝে গাড়িটাকে ধরতে দৌড় দিল। যখন বুঝল ধরা সম্ভব না, তখন আবার দৌড়ে আসল ভদ্রমহিলার কাছে। খুব বেশি বয়স না মহিলার, বেশি হলে সাতাশ কিংবা আটাশ।
দুই
গত কয়েকদিন যাবত অন্তরার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। এটা নিয়ে আনিকা ভীষন চিন্তিত। চাকুরীজীবি মায়েদের যা হয়। বাচ্চার শরীর-সাস্থ্যের দিকে খেয়াল রাখতে পারে না। ব্যাঙ্কে চাকুরী করে সে। অনেক প্রেসারে থাকতে হয় সবসময়। চাইলেও সংসারে বেশি সময় দিতে পারে না। যদিও অন্তরার দেখাশোনা করার জন্য একটা আয়া রেখে দিয়েছে। কিন্তু মায়ের কাজ কি আর আয়ায় হয়? আয়া ভদ্রমহিলা যে চেষ্টা করেন না তা নয়। তারপরও ভরসা পায় না আনিকা। মিরপুরের যে বাসায় থাকে সেই বাসার বাড়িওয়ালী নিজের মেয়ের মতই ভালোবাসেন ওকে। ছোট্ট দু’রুমের বাসা, তাতে মা মেয়ের সংসার ভালোই চলে যায়। সমস্যাটা ওই অন্তরার দেখাশোনা নিয়ে। গত মাসে মাত্র তিন বছরে পড়ল। এখনই কি সুন্দর পাকা পাকা কথা বলে !!! খালি শুনতে ইচ্ছা করে। কিন্তু বেশির ভাগ সময়ই শোনা হয় না। ঘরে ফিরে ক্লান্ত শরীরে কাজ করতে করতে ভাবে কতক্ষনে ঘুমুবে।
নয়নের সাথে ডিভোর্স হয়েছে আজ প্রায় দু’বছর। অন্তরার যখন এক বছর বয়স তখনই ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় ওদের। ওর চাকরী করা নিয়ে বেশ সমস্যা হচ্ছিল ওদের, সময়টা ভালো যাচ্ছিল না। এর মধ্যে একদিন শুনল অফিসে এক জুনিয়র কলিগের সাথে প্রেম করছে সে। জিজ্ঞেস করতেই বলছিল “তুমি তোমার অফিসে যা খুশি তাই করতে পারো আমি করতে পারব না কেন?”
ভালোবেসে বাড়ি থেকে বের হয়ে বিয়ে করেছিল নয়নকে। ওর মুখে ওই কথা শুনে সম্পর্কটা আর রাখতে চায়নি সে। সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিশ্বাসটাই সবচেয়ে বড়। সেটাই যদি না থাকে তাহলে সম্পর্ক রেখে আর কি লাভ। অনেকেই বলেছিল বাচ্চাটার কথা চিন্তা করে অন্তত অত বড় সিদ্ধান্ত না নিতে। কারো কথাই সে শোনেনি। যেহেতু পালিয়ে বিয়ে করেছিল বাবা-মা’র সাথে যোগাযোগ রাখেনি সে। মা-বাবা ওদের বিয়েটা মেনে নেননি, এমনকি অন্তরাকেও দেখতে আসেননি কখনো। স্বাভাবিকভাবেই সেখানে যাওয়া হয়নি। নয়নের বাসা ছেড়ে দিয়ে নিজের বাসা নিয়েছে। মেয়েকে নিয়ে চলে যাচ্ছে দিন।
পুরোনো স্মৃতিগুলো হাতরাতে হাতরাতে কখন যে নিজের মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিল খেয়াল করেনি। পাশের ডেস্ক থেকে বলল, “আনিকা ওই বাড়ির লোনের ফাইলটা নিয়ে স্যার তোমাকে একটু ভিতরে যেতে বলেছেন।” স্যারের রুমে যেতেই স্যার বসতে বললেন। ভদ্রলোক আনিকাকে পছন্দ করেন। নিজের মেয়ের মত দেখেন। ওর বাচ্চার খোঁজ নেন সবসময়। কোন সমস্যা হচ্ছে কিনা জিজ্ঞেস করেন। ভদ্রলোক নিঃসন্তান, তাই বোধহয় আনিকার মাঝে নিজের সন্তানকে খুঁজতে চান। বিষয়টা নিয়ে আনিকা অনেকদিন ভেবেছে। তবে কখনো জিজ্ঞেস করেনি।
“আচ্ছা আনিকা, ওই ভদ্রলোকের ফাইলটা কিরকম দেখলে? ব্যাপারটা কতদূর?”
“স্যার, অলমোস্ট ক্লিয়ার, আমরা এগুতে পারি, ওনার ফাইলে যে সমস্যাগুলো ছিল সেগুলো উনি ঠিক করে জমা দিয়েছেন। আমি দেখেছি। আমিও ওনাকে আমাদের শর্তগুলো বুঝিয়ে বলেছি। ভদ্রলোক অনেক সৎ। টাকাটা পেলে উনি কাজটা শুরু করতে পারেন”
“ওকে, ভদ্রলোককে তাহলে আসতে বলি, কি বল?”
“জ্বী স্যার, বলেন আমি গতকালই সব কাগজপত্র রেডি করে রেখেছি। এই ফাইলেই সব আছে।”
“ঠিক আছে তুমি তাহলে যাও”
নিজের ডেস্কে এসে বসল আনিকা। মনের ভেতর এক ধরণের অস্বস্তি হচ্ছে, কিছুতেই যাচ্ছে না। ক্যান্টিনে গিয়ে একবার কফি খেয়ে আসবে ভাবল। আবার পরমুহুর্তেই ইচ্ছাটাকে দমিয়ে নিল। স্যার ওই ভদ্রলোককে আসতে বলেছেন। কাজেই তার এখানে থাকাটা জরুরী।
কিছুক্ষন পর ওর বাসা থেকে একটা ফোন এল, আনিকার বাসার বাড়িওয়ালার। অন্তরাকে নাকি পাওয়া যাচ্ছে না। খবরটা শুনেই কি করবে বুঝতে পারছিল না। দৌড়ে স্যারের রুমে গেল। বলল সবকিছু। তিনি সাথে সাথেই ছুটি দিয়ে দিলেন। ভদ্রলোক গাড়িও দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু গাড়িটা তখন সাভারে, আর আনিকাও দেরী করতে চাইল না। অফিস থেকে বেরিয়েই একটা বাস পেয়ে উঠে পড়ল তাতে। পুরো পথটা চিন্তা করতে করতে এসেছে। কিনা কি হয়েছে। পাওয়া যাবে না কেন? আয়াকে ফোন দিচ্ছে, কল ঢুকছে না। যদি কিছু হয় তাহলে কি করবে? এরকম আরো অনেক চিন্তাই মাথায় আসলো। বাসস্ট্যান্ডে নেমেই অন্যান্যদিনের মত আজ আর ওভারব্রিজ দিয়ে রাস্তা পার হতে গেল না। ডিভাইডার থেকে নামতে গিয়ে সামনের পাটা হড়কে গেল। তারপর হঠাৎ কি হল। সব কিছু অন্ধকার হয়ে গেল।
তিন
প্রায় দু’মাস ঘোরার পর আজকে বাড়ির লোনের টাকাটা বরাদ্দ হয়ে যাবে। আরেফীন সাহেব বেশ খুশী। এই দু’টো মাস যে কি ঘোরাটাই না সে ঘুরেছে। সরকারী চাকুরীজীবি ছিলেন তিনি। অবসর নিয়েছেন প্রায় দু’বছর। ওনার সততার একটা সুনাম চালু ছিল অফিসে। সৎ থাকার কারণে কিংবা অতটা চালাক না হওয়ায় দু’নম্বরী টাকা পয়সা তেমন বাগাতে পারেননি। বেতনের টাকার বেশির ভাগই খরচ করেছেন সংসারের কাজে। ছেলেমেয়েদের পড়াশুনা আর সদায়পাতি কিনতে কিনতেই শেষ। যে দু’চার টাকা বাঁচতো তা চলে যেত বউয়ের সখ পূরণে। সব মিলিয়ে সব কিছুই ঠিকঠাক মত চলছিল। কিন্তু ওই যে জমানো টাকা থাকলো না তেমন। এখন চাকরী ছাড়ার পর পেনশনের টাকা যা পান তা সংসারের খুটিনাটি খরচেই শেষ হয়ে যায়।
এক ছেলে এক মেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে চারজনের সংসার, যতদিন চাকরী করেছেন, তেমন সমস্যা হয়নি। এখন অবশ্য কিছুটা হয়। তাও পরিবারের সবাই সহযোগীতা করে বিধায় সেটাও গায়ে লাগে। আরেফীন সাহেবের সম্পত্তি বলতে মিরপুরে ৫ কাঠা জমি। ওই এলাকায় ডেভলপারের দৌড়াত্ম অনেক। খালি জায়গা থাকে না বেশিদিন। ওনার জমিটার দিকেও নজর গিয়েছিল ওদের। উনি দিতে চাননি। ওনার কষ্টের টাকায় কেনা জমিতে বাইরের লোকজন এসে মালিকানা ফলাবে। তাদের সাথে বাড়ির মালিকানা ভাগাভাগি করতে হবে এটা তিনি কখনোই মানতে পারবেন না। তাই ঠিক করেছেনকষ্ট করে হলেও নিজের টাকায় বাড়িটা বানাবেন তিনি।
কিন্তু চাইলেই কি আর সব নিজের ইচ্ছামতন হয়! ব্যাঙ্কে গিয়ে কয়েকবার ফেরত এসেছেন। রাজউকের অনুমোদন আনতে গিয়ে বার বার ধরণা দিয়েছেন। ঐ এলাকার মাস্তানদের টাকা দিতে হয়েছে। আরো দিতে হবে। আর ডেভলপারেরা তো আছেই। তারা প্রথমে মিষ্টি মিষ্টি ভাষায় জায়গাটা চাইলেও এখন আর তাদের মুখটা আর মিষ্টি নেই। অনেক বেশি হিংস্র হয়ে যাচ্ছে। প্রথমে পরোক্ষভাবে বিভিন্ন সমস্যা তৈরী করছিল এখন তো সরাসরি হুমকিই দিচ্ছে। ওরাই নাকি আরেফীন সাহেবের জায়গায় বাড়িটা বানাবে, কাজেই শুধু শুধু আরেফীন সাহেবের দৌড়াদৌড়ি করে লাভ নেই, বরং জায়গাটা ওদের দিয়ে উনি নিশ্চিন্তে বাড়ি গিয়ে নাকে তেল দিয়ে ঘুমুতে পারেন।
বাসার মানুষজন বিশেষ করে ওনার স্ত্রী লুৎফুন্নাহার বেগম, অনেক ভয় পেয়ে যান। ওনার একটাই কথা, বাড়ি বানাতে গিয়ে শেষে স্বামীকের হারাতে পারবেন না তিনি। ছেলেমেয়ে দু’টোও মায়ের সাথেই থাকে সব-সময়। ওরাও মায়ের পক্ষ নিয়ে বাবাকে বোঝাল। কিন্তু আরেফীন সাহেব এক কথার মানুষ। তিনি বাড়ি বানাবেনই। বিষয়টাকে তিনি চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিয়েছেন।
প্রায় সবকিছুই তিনি গুছিয়ে এনেছিলেন কিন্তু সমস্যাটা হল টাকা নিয়ে। হিসেব করে দেখলেন যা টাকা আছে তাতে এখনকার বাজারদরে বাড়িটা দাড় করাতে রীতিমত হিমশিম খেয়ে যেবেন। বন্ধুদের সাথে কথা বলে ঠিক করলেন ব্যাঙ্ক লোন নেবেন। কিন্তু সেখানেও সমস্যা দাড় করাল ডেভলপারেরা। অনেক চেষ্টার পর এক বন্ধুর পরামর্শে এই ব্যাঙ্কে লোনের কাগজপত্র জমা দিলেন। এখানকার লোকগুলো ভালো। সুদটা একটু বেশি কিন্তু কাজে-কর্মে এফিশিয়েন্ট। তারপরও ঝামেলা হল। জায়গার মালিকানা তদন্তে ব্যাঙ্কের টিম গেলে সেখানেও বাগরা বাধিয়ে প্রমান করানো হল, মালিকানা ভূয়া। কত ঝামেলা করে উকিল ধরে গত সপ্তাহে সব ঝামেলা শেষ করে সব কাগজ আবার জমা দিলেন। এই একটু আগে ফোন এসেছে। লোন পাস করেছে ওরা, একবার যেতে বলেছে ওদের অফিসে।
প্রথমে ভাবলেন ছেলেকে নিয়েই বেরুবেন। পরে কি মনে করে আর ডাকলেন না। একাই বের হলেন ব্যাঙ্কের উদ্দেশ্যে। বাসস্ট্যান্ডে এসে দেখলেন ছোটখাট একটা জটলা। কাছে যেতে যেতে শুনলেন কিছুক্ষন আগে নাকি একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে। ভালো করে দেখতেই তিনি চিনতে পারলেন আনিকাকে। ব্যাঙ্কের লোন সেকশনে চাকরী করে মেয়েটা। ওনার বাড়ির লোনের ফাইলটা এই মেয়েটাই দেখছে। কি হয়েছে মেয়েটার কিছুই বলতে পারছে না। আরেফীন সাহেব ব্যস্ত হয়ে ফোন করলেন ব্যাঙ্কের ম্যানেজারের কাছে।
চার
অনেকদিন পর আজ সিএনজি নিয়ে বের হয়েছে আলমগীর। দোকান সামলে বের হওয়া হয়নি এই কয়দিন। বউটাও অসুস্থ ছিল। এমনি সময়ে ও কাজে বেরুলে বউ বসে দোকানে। অসুস্থ হওয়ায় ওকেই বসতে হয়েছে। দোকান আর সিএনজি চালিয়ে মোটামুটি খেয়ে পরে বাঁচতে পারে সমস্যা হয় না। তার দোকানটা চায়ের দোকান, তবে মুদী দোকান হিসেবেও চালায়। বউটাকে অনেক কষ্টে চিকিৎসা করিয়েছে। এক সপ্তাহ আগে হাসপাতাল থেকে রিলিজ করেছে। পেটে একটা ছোট খাট টিউমার হয়েছিল।
প্রথম বেশ কয়েকদিন পাত্তা দেয়নি। কিন্তু ডাক্তারকে দেখাতেই ডাক্তার বললেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অপারেশন করাতে। টিউমার থেকে নাকি ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা আছে। অনেক কষ্টে একে ধরে ওর কাছে হাত পেতে টাকা যোগার করেছে সে। ডাক্তারের পরামর্শে টাকা যোগার হতেই অপারেশন করিয়ে নিয়েছে। এই ডাক্তার ভালো ছিলেন। অন্য ডাক্তারদের মতন কষাই না। ওনার কারণেই সরকারী হাসপাতালে বেড পাওয়া গেছে। কিছু ওষুধও উনি বিনামূল্যে পাইয়ে দিয়েছিলেন। খরচ কিছুটা কম হয়েছিল তাতে। তারপরও যা খরচ হয়েছে তাও কম না। যে পরিমান দেনা করতে হয়েছে তা পূরণ করতে অনেক সময় লাগবে তাতো নিশ্চিত।
সিএনজি নিয়ে সকাল সকালই বেড়িয়ে পড়েছে সে। তবে অনেকদিন পর বের হওয়ায় যেটা হয়েছে, ট্রিপ মারার চাইতে আড্ডা দিতে ইচ্ছা করছে। পুরোনো বাসস্ট্যান্ড, পুরোনো চায়ের দোকান, সেই পুরোনো বন্ধুরা। ওর মনে হচ্ছিল সারাদিন বসে আড্ডা দেয়। পরিবেশটাও অরকম ছিল, হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল, এরকম পরিবেশে অবশ্য অন্যান্য সময়ে সে গাড়ি চালায়। তাতে লাভও হয়। কারণ এরকম সময়ে যাদের জরুরী কাজ তারা যত ভাড়া চাইবে ততই দেয়। একবারও বলেনা মিটারে যাবে। তার কিছু বন্ধু স্ট্যান্ডে থাকলেও স্ট্যান্ডে তার একারই সিএনজি ছিল। বাকীরা হয় আসেনি নয়তো ট্রিপ মারতে গ্যাছে। সে খুব খোশ মেজাজেই গল্প করছে। একটা ছেলে অবশ্য এসে জিজ্ঞেস করেছিল যাবে কিনা, সে স্রেফ না করে দিয়েছে। ইচ্ছে হচ্ছে না।
এসব কথা মনে করতে করতে চা খাচ্ছিল। হঠাৎ একটা কিছু বাড়ি খাবার শব্দ। এর আগেও শব্দটা সে আগেও শুনেছে। গাড়ির সাথে মানুষের বাড়ি খাবার শব্দ। ঘুরে তাকাতেই দেখল, একজন মহিলা পড়ে আছেন রাস্তায়। দেখেই দৌড়ে গেল। এর মধ্যে অবশ্য লোকজন জড়ো হয়ে গেছে। জায়গাটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। মনে হয় মাথায় লেগেছে।
এর মধ্যে দেখল জটলা থেকে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক বললেন তিনি ভদ্রমহিলাকে চেনেন। ভদ্রলোক ওনার অফিসেও ফোন দিলেন। আলমগীর ভাবল চেনে এরকম একজন লোক পাওয়া গেল মহিলাকে ওর সিএনজিতে উঠিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাবে। এর মধ্যে যে ছেলেটা ভাড়া করতে এসেছিল সেই ছেলেটা দৌড়ে আসল। ভালো করে দেখে বলল বেঁচে আছেন। একটা গাড়ি যোগার করে হাসপাতালে নিতে হবে। তখন আলমগীরই এগিয়ে এসে বলল, “ ভাই, ওনাকে আমার গাড়িতে ওঠান, আর চাচা আপনি যখন ওনাকে চেনেন আপনিও চলেন।”
পাঁচ
আজ নীলিমার জন্মদিন। সকাল থেকেই সে বেশ খানিকটা উত্তেজিত। জন্মদিন বলেই যে উত্তেজিত আসলে ব্যাপারটা ওরকম না। আজকের এই দিনে ঠিক একবছর আগে ওকে প্রপোজ করেছিল দিগন্ত। অনেক প্লান করে রেখেছে আজকের দিনটা উদযাপন করার।
কিভাবে যেন এক বছর পার হয়ে গেল। একটা অসাধারণ সময় কাটিয়েছে ওরা এই এক বছর। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া দু’জনের জীবনে এরকম আনন্দ করেনি ওরা। দিগন্ত ছেলে হিসেবে অনেক ভালো। এখন সে প্রথম দিনের কথা মনে পড়লে হাসি পায়। নিজে উঠে ওকে বসতে দিয়েছিল কেন যেন ভালো মনে হয়েছিল ছেলেটাকে। নিজে থেকেই কথা বলে। এমনিতে আড্ডাবাজ এই ছেলেটা মেয়েদের সাথে যে তেমন কথা বলতে পারে না, এটা অবশ্য সে এতদিনে বুঝতে পেরেছে। কিন্তু সেদিন এই ছেলেটা বেশ কথা বলছিল। নিজে থেকে নম্বর চেয়ে নিয়েছিল। ওর আসলে অবাক লাগে। সেদিন আসলে আরেকটা ছেলের সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। ফোনে কথা হত ছেলেটার সাথে। বন্ধুদের সাথে গিয়েছিল আড্ডা দিয়েছিল। তারপর অপেক্ষা করতে করতে যখন বুঝতে পেরেছিল যে আসলে ছেলেটা আসবে না। তখন একা একাই বাড়িতে চলে আসল। বাসে দেখা হল দিগন্তের সাথে।
দিগন্তের সাথে কথা বলে ওর যেটা মনে হল ছেলেটা খুব ভালো। একটু বদমেজাজী। ভাড়া নিয়ে প্রায়ই কন্টাটরদের সাথে খারাপ ব্যাবহার করে। ভাড়া বেশি চাইলে সিএনজিওয়ালাদের মারতে যায়। কিন্তু ছেলেটা ভালো। বাচ্চাদের, বিশেষ করে পথশিশুদের খুব ভালোবাসে। সত্য বলতে চেষ্টা করে। এতে যে তার শত্রু হয় না এমন না। তারপরও বলে।
দিগন্তের আরেকটা সমস্যা হল সে সব জায়গায় লেট। বন্ধুরা ওকে এই লেট করার জন্যেই দেখতে পারে না। এই যে আজকে একটা বিশেষ দিন অথচ সেই রাতে ফোনে একবার উইশ করে এখন পর্যন্ত খবর নেই। ও সেজেগুজে বসে আছে। ফোনেও কানেক্ট করা যাচ্ছে না। এই মোবাইল ফোনগুলো এখন আবার নতুন পেইন দেয়া শুরু করেছে। নেটওয়ার্ক এত বাজে!!!
-হ্যালো
-তুমি কই?তোমাকে ফোন করলে ফোন যায় না কেন?
-তোমার রক্তের গ্রুপ ও-নেগেটিভ না?
-মানে কি?কি হইছে? তোমার কারো কিছু হইছে?
-আগে বল তোমার রক্তের গ্রুপ কি? আর শেষ কবে তুমি রক্ত দিছ?
-উফ! আমি কখনো রক্ত দেই নাই”
-মানে কি??? তোমার রক্তের গ্রুপ কি ও-নেগেটিভ
-হুম
-এখানে একজন মহিলা এক্সিডেন্ট করেছেন, রক্ত লাগবে ও-নেগেটিভ। তুমি তাড়াতাড়ি চলে এসো।
-আমিতো রক্ত দেইনি কখনো।
-কিচ্ছু হবে না, আমি তো আছিই তোমার সাথে। প্লিজ তাড়াতাড়ি কর, ভদ্রমহিলার অবস্থা ভালো না। জরুরী
অপারেশন করাতে হবে।
-আচ্ছা ঠিক আছে আমি আসছি।
ছয়
-আচ্ছা ভদ্রমহিলা ভালো হবেন তো?
-অবশ্যই ভালো হয়ে যাবেন। তুমি রক্ত দিয়েছো না। তাও আবার জন্মদিনে। ভালো হতেই হবে। আর ডাক্তার সাহেব বলেছেন, বেশি কিছু হয়নি, পায়ের হাড্ডি ভেঙ্গেছে আর মাথায় চোট পেয়েছেন। আচ্ছা তুমিও কি বিয়ের পরে চাকরী করবে?
-মানে??? হঠাৎ এই প্রশ্ন ???
-না, মানে আমাদের বাচ্চার ক্ষেত্রেও তো এমন হতে পারে।
-কেন হবে??? আমাদের বাবা-মা আছেন। যদি ঢাকার বাইরে চাকরী হয় সেক্ষেত্রে অবশ্য চাকরী করব না।
আচ্ছা ধর ওই ভদ্রলোক মানে যিনি ভদ্রমহিলাকে চিনতেন তিনি যদি সেখানে না থাকতে তাহলে কি হত?
-কি আর হত, ওনার কাছে আইডি ছিল, আইডি থেকে বের করা যেত। তবে উনি থাকায় কাজটা সহজ হয়েছে। উনি সরাসরি ফোন করিয়ে ভদ্রমহিলার বসকে আনিয়েছেন।
-আচ্ছা ওই সিএনজিওয়ালা যিনি নিজে থেকে নিজের সিএনজি নিয়ে তোমাদের সাহায্য করলেন ওনার কি অবস্থা। ওনাকে তো আর দেখলাম না।
-আরে উনি তো আরেক মাল, ওনাকে আমি আগেই বলছিলাম যাবে নাকি, সে যাবে না বলে লাট সাহেবের মত চা খাচ্ছিল। সেই উনিই আবার এক্সিডেন্ট হবার পর নিজে থেকে এসে ভদ্রমহিলাকে নিয়ে হাসপাতালে এলেন। তারপর আবার চলে গেলেন। ওনার সাথে যোগাযোগ করার কোন উপায় জানা নেই। তবে ভাবছি বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে একবার খোঁজ নেব। চায়ের দোকানদার হয়ত চিনতে পারে। তবে সেটা যদি এখানকার গাড়ি হয়।
-তোমাকে আসলে অনেক থ্যাঙ্কস, প্রথমে যখন ফোন করে বলেছিলে রক্ত দিতে হবে। আমার না প্রচন্ড মেজাজ খারাপ হচ্ছিল। এখন খুব ভালো লাগছে। আমার মনে হচ্ছে আমার জীবনের এখন পর্যন্ত সেরা জন্মদিন এটা। এই কি ভাবছ???
-ভাবছি যদি বাচ্চাটা না হারাতো, কিংবা ধর যদি আই সিএনজিওয়ালাকে রাজি করিয়ে ফেলতাম, কিংবা ভদ্রমহিলা ওভার ব্রিজ দিয়ে রাস্তা পার হতেন। অথবা প্রথম থেকেই যদি ভদ্রমহিলার ডিভোর্স না হত, তাহলে গল্পটা কেমন হত, আজকে তোমার জন্মদিনটা কি এরকম হত। আর দশটা জন্মদিনের মতই হত।
-মোটেই না। এই জন্মদিনটা তোমার সাথে আমার প্রথম জন্মদিন। এটা স্পেশাল হতে বাধ্য।
-নাও হতে পারত, সকালে আমার যে মুড ছিল আমি তো ভেবেছিলাম দেখাই করব না তোমার সাথে।
-কি !!!
-এহহে আবার বৃষ্টি নামল, চল ঐ গাছটার নীচে যাই, ওখানে বৃষ্টি কম হচ্ছে।
-উহু, তার চেয়ে চল, আজকে দু’জনে বৃষ্টিতে ভিঁজি। আজকের দিনটা আরো স্পেশাল করা যাক।
----------------------------------------------------------------------------------
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০১১ রাত ১০:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




