somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

আরিফ রুবেল
জীবন বৈচিত্রময়। জীবনের বিচিত্র সব গল্প বলতে পারাটা একটা গুন আর সবার সেই গুনটা থাকে না। গল্প বলার অদ্ভুত গুনটা অর্জনের জন্য সাধনার দরকার। যদিও সবার জীবন সাধনার অনুমতি দেয় না, তবুও সুযোগ পেলেই কেউ কেউ সাধনায় বসে যায়। আমিও সেই সব সাধকদের একজন হতে চাই।

গল্পঃ এই শহরে সুলভে মৃত্যু পাওয়া যায়

১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০১১ রাত ১:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




এক


শান্ত ওভার ব্রিজ থেকে ধীর পায় নেমে আসে, খুব আস্তে আস্তে। ফুটপাতের দোকানিরা তাঁর দিকে উৎসুক চোখে তাকায় কিছু কিনবে এই আশায়। সিডির দোকানি ইঙ্গিতে বোঝায় তার কাছে ভালো ‘কালেকশন’ আছে। ছেলেটা ভ্রুক্ষেপহীন চোখে এগিয়ে যায়। দোকানীরা হতাশ হয় হয়তো কিছুটা। শান্ত হেঁটে যায় কোলাহলের মাঝে, নিস্তব্ধতার পথে। ব্যস্ত শহর কিংবা যান্ত্রিক কোলাহলমুখর রাজপথ কোনকিছুই তাকে আজ বিচলিত করে না, সে বিব্রত হয় না রাস্তার পাশে দাঁড়ানো খদ্দেরের খোঁজে থাকা কোন রমনীর আহ্বানে। শুধু হেঁটে যায় নিজের মনে। খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে আজ সে, তাই নিজের ভেতরে প্রচন্ড রকম প্রশান্তি অনুভব করছে।


নামের সাথে তাঁর আচরণেরও অদ্ভুত মিল। ক্লাসের সহপাঠিরাও তাকে যে খুব একটা চেনে সেরকমও না। বেশিরভাগ সময়ই ক্লাসে ঢোকে সে সবার পরে আর বের হয় সবার আগে। ছোটবেলায় জুম্মার নামাজ পড়তে গেলে যেমনটা করত। মসজিদে ঢুকত খুতবা শেষ হবার সাথে সাথে আর বের হত মোনাজাত শুরু করার আগে।


তার জুম্মার নামাজ পড়াটা মূলত বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়া। এর চেয়ে বেশি কিছু না। দুপুর বেলা বন্ধুদের সাথে লাটিম ঘোড়ানো কিংবা ঝিলে গিয়ে মাছ ধরাতেই তার আগ্রহ বেশি ছিল। অন্য সময় এই সুযোগটা পাওয়া যেত না। ছোটবেলায় দুপুরবেলা বাইরে বের হওয়াতে কড়া নিষেধ ছিল। শুধু জুম্মার দিন এই নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল। সেদিন বন্ধুরা দুপুরবেলা বাইরে খেলত। এমনিতেই ইস্কুল নেই তার উপর এই দুপুরবেলার খেলতে পারার এই সুযোগের জন্য শুক্রবারের অপেক্ষাতে থাকত ওরা সারা সপ্তাহ ধরে।


শুক্রবারে দুপুরবেলা খেলার আরেকটা কারণ ছিল “পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি”। নিম্ন মধ্যবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সারা সপ্তাহ ধরে অপেক্ষায় থাকত বিটিভির পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি দেখার জন্যে। যেহেতু সবার ঘরে টিভি ছিল না। টিভি দেখা হত কয়েক পরিবার মিলে এক বাসায়। দেখতে গিয়ে ব্যপক ঝামেলা পোহাতে হত। একবার যদি কেউ কোন কারণে তার জায়গা থেকে উঠে যেত তাহলে তার জায়গা পাওয়া কষ্ট হয়ে যেত। মানুষ সেই ছায়াছবি দেখে কাঁদত, ছায়াছবির ভাড়ের কান্ড দেখে হাসত। ঠিক যেমনটা হাসে এখনকার মন্ত্রী-পাতিমন্ত্রীদের কথা শুনে। তাদের নিত্যদিনের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হয়ে উঠত এই ছায়াছবি। ববিতা-আলমগীর-শাবানা-রাজ্জাকের কিংবা সালমান শাহ-শাবনুর-ওমর সানি-মোসুমীদের জীবনই হয়ে উঠত মানুষগুলোর পরবর্তী কয়েকদিনের আলোচনার খোঁড়াক। তাদের ঠোটে ঘুরেফিরে আসত সেই ছায়াছবির গান।


ছায়াছবি দেখতে দেখতেই শান্ত একসময় স্বপ্ন দেখেছিল। অনেক বড় হবে সে। লেখাপড়া শিখে মানুষের মতন মানুষ হবে। অনেক টাকা পয়সার মালিক হবে। তারও ওই সুবিন্যস্ত কেশের অধিকারী নায়কের মত কেশ হবে। তাঁর একটা নায়িকা থাকবে। তাঁদের ঘরে একটা ফুটফুটে বাচ্চা থাকবে। সেই বাচ্চাকে কোলে নিয়ে নায়ক এবং নায়িকা গান গাইবে। তাদের সাদাকালো পর্দার দুনিয়া একদিন রঙিন হবে। ব্লা ব্লা ব্লা ..........


ছাত্র হিসেবে খুব একটা খারাপ ছিল না বরং বলা যায় বেশ ভালই ছিল। ক্লাস ফাইভ আর এইটে বৃত্তি পাওয়া এই ছাত্রটিকে নিয়ে তাঁর শিক্ষকেরা সবসময়ই আশাবাদী ছিল। বাবা মফস্বল শহরের কাপড়ের দোকানদার। দুই ঈদে আর পুজোর সময় খুব বিক্রি। ছেলে তখন বাপের সাথে সময় দেয় দোকানে। মফস্বল শহর বিধায় ওর প্রতি সবার আলাদা নজর ছিল। সবাই কম বেশি ভালোবাসত। মেয়েদের তাঁর প্রতি আলাদা একটা ক্রেজও ছিল। এস এস সি পরীক্ষার পর এলাকার চেয়ারম্যানের প্রচেষ্টায় একটা ভালো কলেজে ভর্তিও হল। সেখানে ভালো ফলাফল নিয়ে বের হয়ে ঢাকায় চলে এল ভর্তি পরীক্ষার জন্য।


ঢাকার জীবনটা তার জন্যে খুব একটা আনন্দের ছিল না কখনোই। সারা জীবনে মফস্বল শহরের হিরো হিসেবে গণ্য হওয়া যে কারো কাছে রাজধানীর এই দমবন্ধ অচেনা পরিবেশে নিজেকে টিকিয়ে রাখাটা বেশ কষ্টের। বিশেষ করে যে শহরে তাকে কেউই চেনে না, পাত্তা দেয় না। এলাকার এক বড়ভাইয়ের পরামর্শে একটা কোচিং সেন্টারে ভর্তি হল। সেখানে সে দেখল শহর গ্রামের বৈষম্য। শহরের ছেলে মেয়েরা মনে করে গ্রাম থেকে যারা আসে তারা প্রচন্ড বোকা। তাদের সাথে বন্ধুত্ব হতে পারে না। তাই তাদের এড়িয়ে যায়। এক সময়ের প্রচন্ড মিশুক শান্ত ঠিক এই সময়েই নিজেকে নিজের ভেতর গুটিয়ে নেয়। মফস্বল শহরে থাকাকালীন সময়ে সব আড্ডার কেন্দ্রে থাকা মানুষটা একসময় আড্ডা দেয়াই বন্ধ করে দিল। চুপ-চাপ ক্লাস করে যেত।


হঠাৎ গাড়ির হর্নে সম্বিত ফিরে পায় শান্ত। তার খেয়াল হয় সে দাঁড়িয়ে আছে বারডেম হসপিটালের সামনে। তাঁর সামনে দিয়ে একটা লাশবাহী গাড়ি বের হয়ে যায়। লাশ দেখলে শান্তর কেমন যেন অস্থির লাগে। তার ভেতর থাকা প্রশান্তি হারিয়ে যেতে থাকে। সে রাস্তা পার হয়ে শাহবাগের মোড়ের ফুলের দোকানগুলোর দিকে যেতে চায়। কিন্তু মোটরযানের অব্যাহত স্রোত ঠেলে তাঁর ওপারে যেতে কষ্ট হয়ে যায়। হঠাৎ তার রাজপথটাকে তাঁর নিজের চিরচেনা নদীর মত মনে হয়। যার প্রবল স্রোতের মাঝেও সে এক সময় সাঁতরে পার হত এপার থেকে ওপার। হঠাৎ ত্রিলোকের মতন কাউকে রাস্তা পার হতে দেখে।

দুই

ত্রিলোকের সাথে শান্তর পরিচয় হয় ঢাবি’র ঘ ইউনিটের ভর্তি ফরম কেনার দিন। লাইনে দাঁড়িয়ে সমানে বিড়ি ফুঁকছিল ত্রিলোক। লাইনের অন্য মানুষগুলো স্কাউটদের অভিযোগ করলে স্কাউট বড়ভাইটা এসে ত্রিলোককে দূরে গিয়ে সিগারেট টানতে বলল। ত্রিলোক দাড়িয়েছিল শান্তর ঠিক সামনে। সে শান্তর কাছে ফাইলটা দিয়ে বলল “জায়গাটা রাইখো”, এরপর কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকতে থাকে। ফিরে আসার পর ত্রিলোকই নিজে থেকে শান্তর সাথে পরিচিত হয়। সে কোথা থেকে আসছে, তাঁর বাড়ি কোথায়, তার টোটাল স্কোর কত ইত্যাদি জিজ্ঞেস করে। প্রশ্নগুলো আর দশজনের মতন স্বাভাবিক হলেও ওর কথাগুলোর মধ্যে অন্য এক ধরণের আবেগ ছিল। সেই প্রথম শান্তর সম্পূর্ণ অজানা অচেনা এই শহরে কাউকে খুব আপন মনে হয়। মন খুলে কথা বলে দু’জন। আড্ডা দেয় ডাকসুর সামনে বসে।


ত্রিলোক শহরের ছেলে। এই শহরেই তাঁর জন্ম, বড় হওয়া। কলেজ জীবন থেকে ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত ত্রিলোক স্বভাবসুলভ ভাবে অত্যন্ত মিশুক। মানুষের সাথে মেশার এক অদ্ভুত ক্ষমতা তাঁর আছে। মানুষকে কাছে টেনে নিতে পারে সে। কথা বলে মুগ্ধ করার ক্ষমতা নিয়ে যেন জন্মেছে ছেলেটা। সেই ফরম কেনার পর এরপর ওদের দেখা হয় যেদিন ঘ ইউনিটের ফল বেরুল সেদিন। যদিও ফোন নম্বর ছিল শান্তর কাছে তারপরও কেন যেন ও নিজে থেকেই ত্রিলোকের সাথে যোগাযোগ করেনি সে। আর শান্তর ফোন না থাকায় ত্রিলোকের পক্ষেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। কেন যোগাযোগ করেনি এটা ভাবতে গেলে সরাসরি কোন জবাব আসে না শান্তর মনে। ভাবে হয়তো রাজনীতি করে এটা শোনার পরেই শান্তর অবচেতন মন ত্রিলোকের সাথে শান্তর যোগাযোগ হওয়াটা ঠেকায়। কারণ বাড়ি থেকে শর্ত দেয়া হয়েছে রাজনীতি করা যাবে না এবং এই শর্ত মানলেই কেবল ঢাকায় থেকে পড়া যাবে। তাঁরা তাঁদের একমাত্র সন্তানকে হারাতে চান না। সেদিনই প্রথম ত্রিলোক ওকে নিয়ে মধুর কেন্টিনে যায়। ত্রিলোকের পলিটিক্যাল বড় ভাইরা আদর আপ্যায়ন করে। মার্বেল সাইজের রসগোল্লা আর সিঙ্গারা খাওয়ায়। কোন বিভাগে ভর্তি হতে ইচ্ছুক। কোন বিভাগে ভর্তি হলে ভালো করতে পারবে সে ব্যাপারে কথা বলে। হাসিমুখে তাদের কথার জবাব দেয় তাদের সাথে কথা বলে। এরপর হাসিমুখে তাদের থেকে বিদায় নিয়ে আসে।


মাদ্রাসার ছাত্রদের মামলার কারণে তাদের ভর্তি এবং ক্লাসের কাজ বেশ পিছিয়ে যায়। প্রায় তিনমাস। তাই সেই তিনমাসে ত্রিলোকের সাথেও তার দেখা হয়নি। ক্লাস শুরুর কয়েকদিনের মাথায় ক্যাম্পাসে সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে মধ্যে পড়ে পুলিশের টিয়ার শেলের আঘাতে মারা যায় এক ছাত্র। আবু বকর নাম। যেদিন ক্যাম্পাসে খবরটা আসে সেদিন ছাত্ররা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। পুলিশের সাথে তাঁদের সংঘর্ষ বাধে। ছাত্ররা ভিসির বাসভবন ঘেরাও দেয়। সেখানেও পুলিশের সাথে ওদের সংঘর্ষ বাধে। শান্ত এসব শুধু দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিল। এসময় সে দু’বার ত্রিলোককেও দেখে। প্রথমবার ভিসির বাংলোর সামনে পুলিশকে হঠিয়ে ছাত্রদের অবস্থান নেয়ার চেষ্টার সময়। আরেকবার পুলিশের কর্ডন ভেঙে রাজু ভাস্কর্যের দিকে যাবার সময়। কিন্তু কোনবারেই তার সাথে কথা হয় না ত্রিলোকের।


এর কয়েকদিন পর বটতলায় ত্রিলোকের সাথে দেখা। সেদিন অবশ্য অনেক কথা হয় ত্রিলোকের সাথে। সেদিনকার আলোচনায় ত্রিলোক ছিল বক্তা আর শান্ত ছিল শ্রোতা। ত্রিলোক তাঁর জীবন-দর্শণ, রাজনীতি, জীবনের লক্ষ্য ইত্যাদি বিষয়ে সেদিন শান্তর কাছে পরিস্কার করে। শান্ত খুব অবাক হয় যখন সে দেখে ত্রিলোক কখনোই তাকে রাজনীতিতে যুক্ত হবার কথা বলে না। এরপর অবশ্য যতবার শান্তর সাথে ত্রিলোকের দেখা হয় প্রতিবারই শান্তই হয় বক্তা আর ত্রিলোক মনোযোগী শ্রোতা। শান্তর সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেয় সে টিএসসি কিংবা ভিসির চত্বরে। বিভিন্ন বিষয়ে তাদের আলোচনা চলে। শান্ত ত্রিলোককে কবিতা শোনায়। প্রেমের কবিতা, বিদ্রোহের কবিতা। ওদের বন্ধুত্ব গাঢ়ো হতে থাকে।

তিন

শান্ত বেশ চমৎকার কবিতা লিখত। তাঁর কবিতাগুলো বেশিরভাগই প্রেমের। কিছু কবিতা অন্য বিষয়েও ছিল। বাবা মাকে দেখতে না পাওয়ার বেদনা তাঁর মাঝে ছিল। প্রায়ই ত্রিলোকের বাসায় ত্রিলোকের মায়ের হাতের রান্না খেতে খেতে তাঁর চোখ ভিঁজে আসতো। শান্তর কোন ভাই বোন ছিল না। সে ত্রিলোকের বোনকেই বোন ডাকতে শুরু করছিল। ত্রিলোকের বাসায় যেতে যেতে তাদের পরিবারের একজন হয়ে গিয়েছিল সে।


দ্বিতীয় বর্ষে ওঠার পর ওদের বিভাগের জুনিয়র এক মেয়ের প্রেমে পড়ে শান্ত। মেয়েটা যদিও দেখতে বেশ সুন্দর তবে একটু নাক উঁচা স্বভাবের। ভালো স্কুল কলেজে পড়লে আর বাপের টাকা থাকলে যা হয়। আর কি। স্বাভাবিকভাবেই আরো অনেক না বলা ভালোবাসার মত শান্তর এই ভালোবাসাও না বলাই থেকে যায়। তবে শান্তর মনের মধ্যে প্রেম তো তাতে কমে যায় না। বরং বাড়তে থাকে। সে তাঁর মনের ভাবগুলো কবিতার খাতায় বন্দী করতে থাকে। আর তাঁর কবিতার একমাত্র পাঠক হয় ত্রিলোক। ত্রিলোকের অনেক অনুরোধের পর সে একটা কবিতা পত্রিকা অফিসেও পাঠায়। তবে কবিতাটা ছাঁপা হয় না। এরপর অবশ্য কখনোই সে আর পত্রিকা অফিসে কবিতা পাঠায়নি সে। তার মনে অব্যক্ত কথাগুলো ছন্দ আঁকারে শুধু তার কবিতার খাতাই ভড়তে থাকে।


মেয়েটার সাথে প্রথম যেদিন দেখা হয়েছিল সেদিন শান্তর পাশ দিয়ে যাবার সময় মেয়েটা সম্ভবত ওর পোশাক আর ঘামের গন্ধেই দেখেই নাক কুঁচকেছিল, যদিও সেটা ত্রিলোকের ভাষ্য অনুযায়ী, শান্তর কখনো এমন মনে হয়নি মানে মেয়েটা যে তাকে দেখে নাক কুঁচকাতে পারে এটা সে কখনোই মানতে চায়নি। সেই থেকেই শান্তর মাঝে বেশ একটা পরিবর্তণ দেখা যায়। পড়াশুনা বাদ দিয়ে টাকা কামানোর ধান্দায় লেগে পড়ে। কোচিং এ ক্লাস নেয়া, টিউশনি, ইত্যাদি কাজে নিজেকে ব্যস্ত করে ফেলে, ক্লাস বাদ দিয়ে। নিজেকে স্মার্ট প্রমাণ করার প্রতিযোগীতায় নেমেছে যেন। ব্যপারটা ত্রিলোকের ভালো লাগে না। সে ওকে বোঝাতে যায়। কিন্তু প্রেমে মানুষ অন্ধ হয়। তাই বন্ধুর মুখের সত্য কথাও বিষ মনে হয়। সেই প্রথম ত্রিলোকের সাথে তার সম্পর্ক খারাপ হয়। বেশ কিছুদিন কথা বলা বন্ধ থাকে।


এর কিছুদিন পরেই শান্তর বাবা অসুস্থ হয়ে ঢাকায় আসেন। বেশ কঠিন অসুখ। চিকিৎসা করতে করতে অনেক টাকা বেড়িয়ে যায়। ওদের দোকানটা বিক্রি করে ফেলতে হয়। অনেক চেষ্টার পর ওর বাবা সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরে যান। তবে যেহেতু একমাত্র আয়ের উৎসটি বিক্রি করে ফেলেন সে কারণে যাওয়ার সময় সন্তানকে দ্রুত অর্থ উপার্যনের একটা উপায় করতে বলে যান। শান্তদের গ্রামে কিছু জমি আছে। সেই জমিতে ফসল করতে শুরু করে ওর বাবা। আর এদিকে ঢাকায় শান্ত নিজের আয়ের ব্যবস্থা করতে থাকে। ঢাকায় টাকা ভাসে। কিন্তু সবার হাতে ধরা দেয় না এই টাকা। বিশেষ করে শান্তর মতন সহজ সরলদের কাছে তো নাই। তাই টাকার জন্য শান্ত বেশি করে খাটতে থাকে। এবং তাঁর স্বাভাবিক জীবন থেকে ক্রমশ দূরে সরতে থাকে। জীবনটা বদলে যেতে থাকে শান্তর। তাঁর কবিতার খাতা পড়ে থাকে। হারিয়ে যায় তাঁর প্রেম। হারিয়ে যায় তাঁর কিশোরবেলার নায়ক হবার স্বপ্ন। সে এই শহরের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে থাকে।

চার

সবকিছুই বদলাতে থাকে। সবার সাথেই দূরত্ব তৈরী হয়। বিশেষ করে ত্রিলোকের সাথে। ত্রিলোক ব্যস্ত হয়ে পড়ে রাজনীতি নিয়ে, সম্পদ বাঁচানোর আন্দোলন নিয়ে। আর শান্ত ব্যস্ত হয় তার আয় আর জীবন ধারণ সংক্রান্ত ঝামেলা নিয়ে। এরমধ্যে দিয়ে বেশ কিছু সময় কেটে যায়। শান্তর বাবা মারা যান। ওদের গ্রামের জায়গা জমি ওদের আত্মীয়রা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয়। সেটা নিয়ে খুব দৌড়াদৌড়ি করে সে। বেশ কিছুদিন টিউশনীতে না যাওয়ার অপরাধে টিউশনী দু’টো চলে যায়। কোচিং এও ওর জায়গায় আরেকজন ক্লাস নিতে শুরু করে। সবমিলিয়ে বেশ একটা সংকটের মধ্যে পড়ে যায় সে। বাড়ি থেকে আসার সময় মা বলে দেন যে করেই হোক কিছু টাকা যেন সে পাঠায়। অথচ এখনও এ বছরে ভর্তি হয়নি সে। বেশ চিন্তায় পড়ে যায় সে।


একদিন ক্যাম্পাসে মিছিল দেখে “নন-কলিজিয়েট ফি পাঁচ হাজার টাকা, ছাত্র সমাজ মানে না” ব্যাপারটা কি বুঝতে পারে না শান্ত। বিভাগের অফিসে যোগাযোগ করলে জানতে পারে সে ৫ম সেমিস্টারে পরীক্ষা দিতে পারবে না। যদি পরীক্ষা দিতে চায় তাহলে তাকে চেয়ারম্যানের অনুমতিসাপেক্ষে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে তবেই পরীক্ষা দিতে হবে। চেয়ারম্যানের সাথে বিভাগের বড়ভাইদের সাথে যোগাযোগ করে শান্ত। সবাই বলে এটা নাকি আগে থেকেই বলা হয়েছে। ব্যাচের দু’একজনের সাথে কথা বলে জানতে পারে সেমিস্টারের শুরুতেই নাকি এই নির্দেশনা দিয়েছেন চেয়ারম্যান। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে নতুন ব্যাচের জন্যে। কিন্তু তাদের ফ্যাকাল্টিতে এটা কার্যকর হবে এই সেমিস্টার থেকেই। দুনিয়া অন্ধকার দেখে সে। এদিক ওদিক খোঁজ নেয়। স্যারদের সাথে কথা বলে। চেয়ারম্যানের সাথেও কথা বলে। কিন্তু সবার একই কথা জরিমানা দিতে হবে। কারণ এ বছরই নিয়মটা নতুন করা হয়েছে তাই এত কড়াকড়ি। শেষে আজকে একটা দরখাস্ত জমা দিয়ে রাস্তায় বেড়িয়ে পড়ে সে।

এরপর সারাদিন কিছু না খেয়ে শুধু হেঁটেছে রাজপথে। একটা নিঝুম পথ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় প্রচন্ড আক্রোশে ঢিল ছুড়েছে সৃষ্টিকর্তার দিকে। শেষমেষ হাঁটতে হাঁটতে একটা ওভার ব্রিজের ওপরে ওঠে। ব্যস্ত রাজপথ আর লাল-নীল বাতি দেখে তাঁর বাংলা ছায়াছবির একটা গানের কথা মনে পড়ে যায়। নিজের মনেই কতক্ষন হাসে। নিজেকে বেশ হালকা লাগে। হঠাৎ একজনে হাতের স্পর্শে পেছন ফিরে তাকায়। একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষ। ভিক্ষা চাচ্ছে। পকেটে থাকা শেষ দশটা টাকা দিয়ে নিজেকে দাতা হাতেম তাই ভাবতে থাকে।


মনটা হালকা হবার সে ঠিক করে। বিষয়টা নিয়ে আর ভাববে না। পরীক্ষা দিতে না পারলে তো সে মরে যাচ্ছে না। আর এখনো তো পরীক্ষা হয়ে যায়নি। তাছাড়া স্যারকে ওর পরিবারের অবস্থা বুঝাতে পারলে হয়তো পরীক্ষা অংশ নেয়ার অনুমতি দিতেও পারেন। আর ত্রিলোকদের উপর ওর ভরসা আছে। ওর বিশ্বাস ওরা এই নিয়মটা বাতিল করাতে পারবে। পারবে মানে ওদের পারতেই হবে। ত্রিলোকের সাথে এই বিষয়ে কথা বলবে ভাবে শান্ত।

শেষ

শাহবাগের মোড়ে ত্রিলোককে দেখতে পেয়ে বেশ উৎফুল্লই হয় শান্ত। ডাকও দেয়। ইশারায় ওকে থামতে বলে। অনেকদিন পর বন্ধুকে দেখে ত্রিলোক দাঁড়ায়। তাড়াহুড়ো করে রাস্তা পার হতে যায় শান্ত। ত্রিলোক নিষেধ করে। কিন্তু মোটর যানের প্রবল শব্দে চাপা পড়ে যায় তার কথা। সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান প্রাপ্তির আশায় চকচকে চোখে ত্রিলোকের দিকে এগিয়ে যায় শান্ত। হঠাৎ কোত্থেকে একটা যন্ত্রদানব এসে পড়ে। শেষ মুহুর্তে দেখে নিজেকে সরাতে পারে না শান্ত। কেমন মন্ত্রমুগ্ধের মত তাকিয়ে থাকে।

ত্রিলোক দৌড়ে আসতে আসতে সব শেষ। পরদিন জাতীয় দৈনিকগুলোতে এক কলামের খবর আসে,

ট্রাক চাপায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র নিহত


----------------------------------------------------------------------------------
----------------------------------------------------------------------------------
----------------------------------------------------------------------------------
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০১১ রাত ১০:৩৫
৩০টি মন্তব্য ৩০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাখি মন

লিখেছেন সামিয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:১০



রাত গভীর হলে পাখিটা বারান্দায় এসে বসে। দূরের আকাশে তখনও কিছু আলো জ্বলজ্বল করে, কিন্তু পৃথিবীর কোলাহল ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে আসে। সেই নীরবতার মধ্যে বসে পাখিটার মনে হয়, মানুষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৬


শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×