
পুরো ব্যাপারটা আমার চোখে দেখা। আমার সামনে দিয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত মাছ ব্যবসায়ী যুবকের লাশ গেছে রিক্সাভ্যানে করে। পিছনে স্বজনদের কান্না। ঢাকার সবচেয়ে গোলযোগপূর্ণ জায়গার একটিতে স্বশরীরে উপস্থিত থেকে গভীরভাবে পরিস্থিতি পর্যপেক্ষণ করেছি। কোটাফোটার কোনও বিষয়ই ছিলো না এতে! এটা সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ। কানাডা আমেরিকা লন্ডনে আরাম কেদারায় বসে গরুর জাবরকাটা নয় এ লেখা। সরাসরি গ্রাউন্ড জিরো থেকে বলছি। সম্পূর্ণরূপে ভারত বিরোধী, বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী, ভীষণ প্রতিক্রিয়াশীল, ধর্মান্ধ, উগ্র সাম্প্রদায়িক অপশক্তির একটি পরিকল্পিত, সংগঠিত বীভৎস, নারকীয় প্রদর্শন ছিলো তথাকথিত কোটা বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নামে ঘটে যাওয়া দেশব্যাপী নাশকতা, সহিংসতার ঘটনাগুলো। যারা এখনও, এতো কিছু দেখার পরও একে কোটাফোটার সাথে মেলাচ্ছেন, তারা আগাগোড়াই বোকার স্বর্গে বাস করছেন; নাহলে নিজেরাই সেই সহিংসক উগ্র, হিংস্র, নৃশংস সাম্প্রদায়িক অপশক্তির অংশ। আদতে ছাত্রদের কোটা আন্দোলনের কোনও বিষয়ই ছিলো না দেশজুড়ে তিনদিনব্যাপী ঘটে যাওয়া এ সহিংসতা, নাশকতার মাঝে। সাধারণ ছাত্রদের দাবির সঙ্গে আমি নিজেও শুরু থেকে একমত। অত্যন্ত ন্যায্য দাবী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও কখনও বিরোধিতা করেননি। বরং সবসময় ছাত্রদের সাথে একই রেখায় অবস্থান করেছেন। শুধু তাদেরকে এর নির্দিষ্ট আইনি প্রকৃয়ার ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করে ধৈর্য ধারণ করতে বলেছেন। কোটা আন্দোলনের সঙ্গে এই পরিকল্পিত সহিংসতা, নাশকতার কোনওরকমের কোনও সম্পর্ক নেই। একে শুধু ব্যবহার করা হয়েছে দেশকে ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে, অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করতে। কয়েকমাস আগে এখানেই একটি লেখায় বলেছিলাম, আমেরিকার প্রসাশন, এদেশে তৎকালীন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের বাংলাদেশ নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত উৎসাহের কারণ কি? কোন গভীর ষড়যন্ত্রে মেতেছে বাংলাদেশ নিয়ে! আমেরিকার গুড বুকে নেই শেখ হাসিনা বহুদিন। বঙ্গবন্ধু কন্যা নত হননি তাদের অন্যায় আব্দারের কাছে। দেশকে আমেরিকার মামাবাড়ি হতে দেননি। রাষ্ট্র বিরোধী এই পরিকল্পিত নাশকতা, অরাজকতা, রক্তপাত আজ আমার দৃষ্টিতে অনেককিছুই পরিষ্কার করে দিয়েছে। এটা ছিলো পুরোপুরিভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী একাত্তরের পরাজিত শক্তির দেশকে আবার পাকিস্তান বানানোর ষড়যন্ত্রের কুৎসিত, উলঙ্গ প্রদর্শন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে আজও মেনে নিতে পারেনি যারা, সেই রাষ্ট্র বিরোধী, ভারত বিরোধী কট্টরপন্থীদের হিংস্রতা, উগ্রতা সারা দেশে দেখা গেছে এই তিনদিন। একাত্তরের পরাজিত শক্তির সেই চিন্তা, দর্শন আজও তীব্রভাবে বিদ্যমান এখানে। সেটাই ভীষণভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছিলো তথাকথিত কোটা বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আড়ালে। বাংলাদেশের পুলিশের সাহসিকতা ও বীরত্বকে স্যালুট করছি। নাশকতাকারীদের উদ্দেশ্য ছিলো পুলিশদের হত্যা করা। বারবার বলা হচ্ছিলো, পুলিশদের মেরে ফেলুন। সবাই মিলে ঝাপিয়ে পড়ুন। ওই ক’টা পুলিশ আমাদের কিছু করতে পারবে না। সবকটাকে পা’য়ে পাড়া দিয়ে মারবো। আসেন চারদিক থেকে আক্রমণ করি। একটা পুলিশও বাঁচবে না। সরকারি টাকা খেয়ে চর্বি হয়েছে। সবার লাশ ফেলবো। হাতে গোনা সেই ক'টা পুলিশই সেই সহস্রাধিক উগ্র দাঙ্গাবাজের সামনে হিমালয়ের মতো দাঁড়িয়ে গিয়েছিলো। পুলিশ যদি সেদিন সাহসিকতার সঙ্গে উদ্ভুত পরিস্থিতির মোকাবিলা না করতো, তাহলে যে আরও কি হতো, কি হতে পারতো, তা চিন্তা করলেও শিঁউরে উঠতে হয়। আরেকবার স্যালুট, সেদিনের সেই গ্রাউন্ড জিরোর বীর পুলিশদের। ঘটনা পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে নিজে কাঁদানে গ্যাসে সমস্যায় পড়েছিলাম। চোখে জ্বালাপোড়া নিয়ে দৌড়াতে হয়েছে এদিকসেদিক। একজন প্রবীণকে সেখানে তরুণদের উদ্দেশ্যে বলতে শুনেছিলাম, ভারতের সাথে ষড়যন্ত্র করে আরও ভাঙ্গেন আপনারা পাকিস্তান! মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা প্রকাশ পাচ্ছিলো। ভারতকেও তীব্রভাবে জড়ানো হচ্ছিলো এসবের সাথে। সবাই বলছিলো এগুলো ভারতের গুলি। বিএসএফের গুলি। ভারতীয়রা গুলি মারছে। ভারতীয়রা পুলিশের পোষাক পরে মাঠে নেমেছে। ভারতের নির্দেশে তাদের আক্রমণ করা হচ্ছে। অনেক কথা বললাম। এগুলো গ্রাউন্ড জিরোতে আমার চোখে দেখা ঘটনার বর্ণনা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শুধুমাত্র কৌতুহলবসত সেখানে ছিলাম। ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ায় নিজেও ছোটাছুটি করেছি। চোখেমুখে কাঁদানে গ্যাসের তীব্র জ্বালা নিয়ে জীবন বাঁচাতে দৌড়ে পালিয়েছি। আমি বলছি, এটা ছিলো আগাগোড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিরোধী, একাত্তরের পরাজিত শক্তির বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি চরম ঘৃণা, ক্রোধের সহিংসক উগ্র প্রদর্শন। বাংলাদেশ বিরোধী উগ্র ধর্মান্ধ কট্টরপন্থীদের গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ চলমান এ সহিংসতা, নাশকতা। এরা সম্পূর্ণরূপে পাকিস্তানে বিশ্বাসী। এরা বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তান বানাতে চায়। তীব্রভাবে ভারতবিরোধী ফোবিয়ায় আক্রান্ত। এছাড়াও বিরাট পরিমাণে আর্থিক লেনদেন হয়েছে এখানে। ছিন্নমূল দরিদ্র কিশোরযুবার প্রচুর উপস্থিতি দেখেছি। এরা কোনও আদর্শ নিয়ে সেখানে আসেনি। এদের টাকা দেয়া হয়েছে। ভাড়া করা হয়েছে। যারা চোখ বন্ধ করে থাকতে চান, থাকুন। সমাজ রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে আজ এতো কথা এখানে, এই সাইটের বোর্ডে লিখে যাচ্ছি। গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ ছিলো ছাত্র আন্দোলনের নামে চলমান এই সহিংসতা, নাশকতা। এই সমস্যার শিকড় বাংলাদেশের অনেক গভীরে প্রথিত। এমনকি এই ব্লগও এর বাইরে নয়। একাত্তরের পরাজিত শক্তির উলম্ফন সর্বত্র। সবাইকে সতর্ক হতে হবে।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:০১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


