উক্তি: 'হোয়েন আব্বু ওয়াজ বকাইং নিকা, আই নিউ শি ডিজার্ভড ইট'। (বকা + ইং)
বক্তা: ব্লগার বন্ধু, ম্যানচেস্টারবাসী। খাঁটি ম্যানকানিয়ান একসেন্ট। জীবনে প্রথম বারের মত সামনা সামনি দেখা হওয়ায় কথা বলছিলাম।
উক্তি: 'দিস ইজ দ্যা ফার্স্ট টাইম আই স কাউস বিয়িং জবাইড।' (জবাই-ড)
বক্তা: আমার বিলাত বাসী মামাত ভাই। মা আইরিশ, বাংলা বুঝতেও সমস্যা হয়। 'কেমন আছ?', 'ছাগল', 'পাগল' এই জাতীয় কিছু শব্দ জানে।
উক্তি:
- হোয়াটস 'হোয়েন' ইন বাংলা?
- কখন
- হাউ কাম পিপল হ্যাভ সাচ উইয়ার্ড নেইমস এজ 'হোয়েন'?
(ব্যাখ্যা: আমার একটা মামার নাম 'খোকন'। নাদান ছেলেগুলোর কাছে কখন আর খোকনের কোন পার্থক্য নেই)।
বক্তা: চার বছরের পিচ্চি, স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে।
উক্তি:
আমি: তুমি আমাদের বাসায় আস না কেন?
- কজ আব্বু আমাকে লেট করে না।
আমি: আব্বুকে বলবা লেট করতে।
- আই ডু বাট হি ডাজনট লিসেন! (মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে...)
এরা দ্বিতীয় প্রজন্মের বাঙালি।
আমি পনের বছর বয়সে এসেছি। আমার উচ্চারণ তাই খাঁটি অজি হয় নি। কেউ বলে ব্রিটিশ ছাপ বেশি, কেউ বলে আমেরিকান, কেউ বাংলাদেশী (তবে ইন্ডিয়ান না!)। আমার বন্ধুরা সবাই সাত আট বছর বয়সে এসেছে। আসা অব্দি স্কুলে ইংরেজি, ভাবনা ইংরেজি, খাওয়া ইংরেজি। শেষ যেই পিচ্চির কথা বললাম, ওর জন্ম সিডনীতেই। মোটে স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে। এতদিন বাংলায় কথা বলত, এখন ইংরেজি ভাষা আর ভাবনার সাথে মিলেমিশে একাকার হচ্ছে।
ভাবনা কোন ভাষায় হয় সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমার ভাবনা হয় বাংলিশ ভাষায়। আরেকটু আগে আসা বেশির ভাগের ভাবনাই হয় ইংরেজিতে। বাংলায় বলার সময় ইংরেজি থেকে অনুবাদ করে তবেই বলে।
সংস্কৃতির একমাত্র নির্ধারক যদি হয় ভৌগলিক অবস্থান, তাহলে উলি্লখিত সবার সংস্কৃতি হওয়া উচিৎ পশ্চিমা।
কিন্তু অভিভাবকরা সেটা মানতে চান না। বাঙালির ছেলে, বাঙালির মেয়ে বাংলা বুঝবে না, এ কেমন কথা? মজার ব্যপার হচ্ছে, পশ্চিমা সংস্কৃতির চেয়ে ভারতীয় সংস্কৃতির গ্রহণযোগ্য তাদের কাছে বেশি। প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে বলিউডের সিনেমা খুব বিখ্যাত। তাতে অনেকের মুখে দেখি বাংলার চেয়ে হিন্দী বেশি চালু!
আমার ছোট বোন এসেছে দশ বছর বয়সে। গুজ বামসের বইয়ের পাহাড় সরিয়ে দিয়ে একবার হাতে গল্পগুচ্ছ ধরিয়ে দিলাম। অনেক কিছুই বুঝতে পারে নি। তবু পছন্দ করেছে। 'সমাপ্তি' গল্পটা পড়ে ওর অনুভূতি ছিল: 'ওয়াও! রবীন্দ্রনাথ খুব কুল ছিল!' সাতকাহন পড়েছে। শরতের উপন্যাস পড়েছে, বলেছি জেইন অস্টেনের উপন্যাস পড়ে মিলিয়ে দেখতে। আমি নিশ্চিত আমি যতটুকু মিল খুঁজে পেয়েছি, ও পাবে তার চেয়েও বেশি। কারণ দু'টো সংস্কৃতির মাঝামাঝি ওর অবস্থান।
যেই চার জনের কথা বললাম, তাদের কারও সাথে খাঁটি বাঙালি কারও বিয়ে হলে বিরোধ লাগবে সেটাই স্বাভাবিক। কেউ কাউকে এক বিন্দু বুঝবে না। আমার এক বান্ধবী সেদিন বাসায় এসেছে, দুপুরে খাওয়ার পরে মা ওকে বলল, 'খুব টায়ার্ড লাগছে তোমাকে। যাও বেডরুমে গিয়ে একটু লম্বা হও।' ও কনফিউজড হয়ে নিজের উপরে নিচে তাকাচ্ছে। পরে মা আড়াল হতে আমাকে বলে, 'ওয়াজ য়ুর মাম ট্রাইং টু ইমপ্লাই আই অ্যাম নট টল এনাফ?'
এই বন্ধুকে নিয়ে বাংলা নাটক দেখতে বসেছিলাম আর্ও কিছু বন্ধু। আমি ছাড়া সবার বাংলার অবস্থাই খারাপ, তবু নাটক দেখে এক সাথে হাসাহাসি করার আনন্দের জন্যই আয়োজন। এক পর্যায়ে জাহিদ হাসান এক পাড়াতো ছোট ভাই কিশোরকে কিছু একটা বুঝিয়ে দিয়ে গালে হাত দিয়ে আদর করে বলছে, 'কি ঠিক আছে তো? ভাল হয়ে থাকবে...' বন্ধুটা আর্ত চিৎকার দিয়ে উঠল। ওর কথা হচ্ছে, বাংলাদেশের মত একটা মুসলিম দেশে এইগুলা দেখায়? প্রচার মাধ্যমে? এত অবলীলায়। বাকি নাটক দেখা হল না হাসির চোটে, ব্যপারটার মধ্যে সমকামিতার ছিটে ফোঁটা ছিল না এটা বুঝিয়ে বেচারীর মুখের রক্ত সরাতে গিয়ে বাকি সময় কেটে গেল।
আমি চিন্তাও করতে পারি না বাংলাদেশে বড় হওয়া কোন ছেলের সাথে এদের বিয়ের কথা। অতএব বিয়েও হতে হবে প্রবাসী বাঙালী কারও সাথে, অথবা ভীনদেশী কারও সাথে। সে ক্ষেত্রে বাঙালী সংস্কৃতি খুব দ্রুত এদের থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
তারপর?
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



