somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বড় হওয়া, বুড়ি হওয়া

২০ শে জুলাই, ২০০৬ সকাল ৮:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পাশের বাসার সাত্তার আন্টি খুব সুন্দর করে সাজাতে পারতেন। তিন বছরের আমি প্রতিদিন বিকেলে আন্টির কাছে চলে যেতাম আমার লাল শাড়িটা নিয়ে। আন্টির কাছ ঘেষে দাঁড়াতেই আন্টি মতলব বুঝে যেতেন। এর ঘন্টাখানেক পরে রীতিমত বউয়ের সাজে সজ্জিত আমি বাসায় ফিরে মা বাবাকে বলতাম, 'দেখ, আমি শ্বশুড় বাড়ি যাই গা।'

আরেকটু বড় হয়ে বুঝলাম, বউ সাজাটা আসলে লজ্জার ব্যপার, শ্বশুড় বাড়ি যাওয়ার কথা এভাবে বলতে নেই। তখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মায়ের সিল্কের স্কার্ফটাকে চুল বানিয়ে ইয়া বড় খোপা বানাতাম। ঘুরে ঘুরে দেখতাম মায়ের মত বড় হয়েছে কি না। কখনও একই ওড়না দিয়ে নিকাব দিয়ে হিজাব পড়ে কল্পিত স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা দিতাম। আমি তখন স্কুল টিচার।

রিকশায় মায়ের সাথে উঠতে খুব অসহ্য লাগত। কেমন করে সামনে আড় করে হাত দিয়ে রাখত, কিচ্ছু দেখতে পেতাম না। দম বদ্ধ হয়ে আসতে চাইত। হাত সরাতে বললেই বলত, 'পড়ে যাবা তো মা।' আরে আমি ছোট নাকি? মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন মাপতাম কতটুকু লম্বা হয়েছি। আর মাত্র অত্তটুকু!

নাটক দেখা নিষিদ্ধ ছিল। হুমায়ূনের আজ রবিবারের মত কিছু কিছু নির্দোষ নাটক দেখার ডাক পেতাম বটে। মাঝে মাঝে অন্য রুমের নাটকের শব্দে কি যে কষ্ট হত! 'বড়দের' বইগুলোও পড়া যেত 'বড়' হয়ে। বড় হওয়ার জন্য এর বেশি আর কি কারণ চাই?

দুপুরে ঘুমানো ছিল ফরজ। বাসায় নানু বা খালামনিরা আসলেও ওই নিয়মের হের ফের নেই। অন্য রুমের সবাই বসে বসে গল্প করছে আর আমার কিনা শুয়ে থাকতে হচ্ছে জোড় করে চোখ মুদে? কবে যে বড় হব!

আর রাতে ঘুমানোর আগে ওই এক গ্লাস দুধ? স্রেফ আজাব। কতবার যে ঠিক করেছি, যখন বড় হব, তখন সবার আগে দুধ খাওয়া বাদ দিব। আর প্রতিশোধ স্বরুপ প্রতি রাতে মাকে এক গ্লাস দুধ খাওয়াবো! (এখন মা বলে, কতটুকু মূল্যবান উপার্জনের অংশ দিয়ে অতটুকু দৈনিক পুষ্টি নিশ্চিত করতে হত, তখন তো বুঝি নি!)

ছোট বাবুদের কোলে নিতে খুব ভাল লাগত আমার। কোন বাবু দেখলেই চিল্লাপাল্লা শুরু করতাম, আমি নিব, প্লীজ! খুব সাবধানে বসিয়ে কোলে ধরিয়ে দিত। কষ্ট হত আমাকে ছোট 'ভাবছে', তাই নড়তে দিচ্ছে না, আশ্চর্য!

প্রথম যেদিন 'বড়' কাউকে ছাড়া স্কুটারে উঠেছি, সে দিনটা এখনও মনে আছে। ক্লাস সেভেনের সায়েন্স ফেয়ার থেকে রাশার গাড়ির বাসায় পেঁৗছে দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু গাড়ি কোন কারণে আসতে পারে নি। আমরা শুধু বন্ধুরা স্কুটার করে বাসায় ফিরেছি। সে কি উত্তেজনা!

খুব 'বড়' হওয়ার শখ ছিল যে! বয়স ইচ্ছা করে বাড়িয়ে বলতাম। আট বছর ছয় মাস হতেই বলতাম, 'প্রায়ে নয়'।

আচ্ছা, মানুষ বড় হয় কখন? না, বায়োলোজিক্যাল বড় হওয়ার কথা বলছি না। একটা মুহুর্ত তো থাকেই, একটা ডায়নামিক মুহুর্ত, এক মহেন্দ্রক্ষণ যখন হুট করে বড় হয়ে যাওয়া হয়। সে কখন?

জানি না কখন, হঠাৎই টের পেলাম, সেই মিষ্টি অনুযোগ করার অধিকার হারিয়ে ফেলেছি, 'আমি ছোট বলে আমার কথা কেউ শুনে না।'

ক্লাস টুতে থাকতে অন্য ক্লাসে খাতা নিয়ে যাওয়া ছিল বিশাল প্রেস্টিজের ব্যপার। এতগুলো খাতা দিয়ে টিচার বিশ্বাস করছেন ভাবতেই কেমন বড় বড় লাগত।

টের পাই নি, কখন খাতার বদলে বন্ধক দেয়ার সময় আসল এক রাশ কান্না, পৃথিবী ভরা সুুখ, হৃদয় নামের অদ্ভূত বস্তুটা। হঠাৎই খেয়াল করলাম, আমার দু'টো বাক্য দিয়ে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ হাসিটুকু কিনতে পারি। টের পেলাম আমি একটা কথা বা মৌনতা দিয়ে তীব্র কান্না কিনতে পারি। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে জীবনকে ভালবাসা যায়। একই চোখে তাকিয়ে আবার কখনও মরে যেতে ইচছা করে।

ওই যে তিন বছর থাকতে একবার, মায়ের লিপস্টিকটা প্রথম বার হাতে পাওয়ার পরে কি নিদারুণ আনন্দে একটু একটু করে ঘুরিয়ে বড় করে খুলে ঠোঁটে নাকে মুখে লাগিয়ে শেষ করেছি, কারণ জানতাম না একবারে আস্ত লিপস্টিকটুকুই পেয়ে গেলে তা দিয়ে কি করতে হয়।

বুঝি নি সেই নিদারুণ ক্ষমতা দিয়ে কি করব। হাতে পাওয়া নিউ ফাউন্ড বস্তুটার ডেলিকেসি সম্পর্কে এক বিন্দু ধারণা ছিল না। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে, চিমটি দিয়ে, টিপে টুপে দেখতে গিয়ে দেখি লাল রঙের ছড়াছড়ি...

এর নাম কি বড় হওয়া? কি সৃষ্টি ছাড়া ব্যপাররে বাবা! কোন সে মহেন্দ্রক্ষণ যখন আমার হাতে এক সময়ের বহু আকাংখিত আলাউদ্দীনের চেরাগ ধরিয়ে দেওয়া হল? টেল মি, প্লীজ টেল মি, আমি পিছনে ফিরে ওই ক্ষণটুকু ধুয়ে, মুছে ফেলব। বিনিময়ে সব দিব! স-অ-ব! তবু ফিরে পেতে চাই আমার হারানো ইনোসেনস, অক্ষমতা!

[বড় হতে ভাল্লাগে না। এত্ত এত্ত শুভেচ্ছা উপহাসের মত শুনাচ্ছে সত্যিই।]
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
৪৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাঙালি মুসলমান সম্বন্ধে ChatGPT র মূল্যায়ন !

লিখেছেন ঢাকার লোক, ২৬ শে জুন, ২০২৬ রাত ৮:০৯

ChatGPT কে "বাঙালি মুসলমান বনাম প্রকৃত ইসলাম" এর উপর একটা প্রবন্ধ লিখতে বলেছিলাম, কয়েক সেকেন্ডে যা লিখেছে হুবুহু তুলে দিলাম ! আপত্তি থাকলে চ্যাটজিপ্ট দায়ী !!

বাংলার মুসলমান সমাজকে দেখলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন্তব্যে অনন্য রাজীব নূর

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২৬ শে জুন, ২০২৬ রাত ১০:৩২



অনন্য রাজীব নুর মন্তব্য বেলায়
পাওয়া ও দেওয়ায় লক্ষ করে পার
সম্মুখে এগিয়ে চলে গন্তব্যে অপার
প্রতিটি পোষ্টের ক্ষেত্রে তার আছে টান।
মন তার দোলে চলে আনন্দ ভেলায়
ব্লগেতে নিশ্চুপ দেখে পোষ্ট... ...বাকিটুকু পড়ুন

অপারেশন ইকারুস: জেনেভার ছায়া

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৭ শে জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০০



বালি অপারেশন শেষ করে ঢাকায় পিবিআই সদর দপ্তরে যখন আরিয়ান, তানভীর ও বর্ষা ফিরে এলো, তখনো বাইরের আকাশ থমথমে। বালি থেকে উদ্ধার করা ৬০% ডেটায় একটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

তুরাগের বুকে আমার ছোট ভাইদের লাশ ২০২৪-এর উপহার ‼️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২৭ শে জুন, ২০২৬ সকাল ৯:১৩



২০২৪ আমাদের নতুন করে শত্রু মিত্র চিনতে শিখিয়েছে। আমি কোনো করুনা, সান্ত্বনা কিংবা বিচারের দাবি নিয়ে আজকের এই ক্ষুদ্র পোস্ট লিখতে চাই না।শুধু সময়ের স্বাক্ষী হিসেবে একটু আচর কেটে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আম গেল ছালাও গেল

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৭ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৩


আমিনুল ইসলাম বুলবুল বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের এমন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যার নাম মুছে ফেলা অসম্ভব। ১৯৯৯ সালে ইংল্যান্ডের মাটিতে শক্তিশালী পাকিস্তানকে হারিয়ে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মাথা উঁচু করেছিলেন এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

×