আরেকটু বড় হয়ে বুঝলাম, বউ সাজাটা আসলে লজ্জার ব্যপার, শ্বশুড় বাড়ি যাওয়ার কথা এভাবে বলতে নেই। তখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মায়ের সিল্কের স্কার্ফটাকে চুল বানিয়ে ইয়া বড় খোপা বানাতাম। ঘুরে ঘুরে দেখতাম মায়ের মত বড় হয়েছে কি না। কখনও একই ওড়না দিয়ে নিকাব দিয়ে হিজাব পড়ে কল্পিত স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা দিতাম। আমি তখন স্কুল টিচার।
রিকশায় মায়ের সাথে উঠতে খুব অসহ্য লাগত। কেমন করে সামনে আড় করে হাত দিয়ে রাখত, কিচ্ছু দেখতে পেতাম না। দম বদ্ধ হয়ে আসতে চাইত। হাত সরাতে বললেই বলত, 'পড়ে যাবা তো মা।' আরে আমি ছোট নাকি? মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন মাপতাম কতটুকু লম্বা হয়েছি। আর মাত্র অত্তটুকু!
নাটক দেখা নিষিদ্ধ ছিল। হুমায়ূনের আজ রবিবারের মত কিছু কিছু নির্দোষ নাটক দেখার ডাক পেতাম বটে। মাঝে মাঝে অন্য রুমের নাটকের শব্দে কি যে কষ্ট হত! 'বড়দের' বইগুলোও পড়া যেত 'বড়' হয়ে। বড় হওয়ার জন্য এর বেশি আর কি কারণ চাই?
দুপুরে ঘুমানো ছিল ফরজ। বাসায় নানু বা খালামনিরা আসলেও ওই নিয়মের হের ফের নেই। অন্য রুমের সবাই বসে বসে গল্প করছে আর আমার কিনা শুয়ে থাকতে হচ্ছে জোড় করে চোখ মুদে? কবে যে বড় হব!
আর রাতে ঘুমানোর আগে ওই এক গ্লাস দুধ? স্রেফ আজাব। কতবার যে ঠিক করেছি, যখন বড় হব, তখন সবার আগে দুধ খাওয়া বাদ দিব। আর প্রতিশোধ স্বরুপ প্রতি রাতে মাকে এক গ্লাস দুধ খাওয়াবো! (এখন মা বলে, কতটুকু মূল্যবান উপার্জনের অংশ দিয়ে অতটুকু দৈনিক পুষ্টি নিশ্চিত করতে হত, তখন তো বুঝি নি!)
ছোট বাবুদের কোলে নিতে খুব ভাল লাগত আমার। কোন বাবু দেখলেই চিল্লাপাল্লা শুরু করতাম, আমি নিব, প্লীজ! খুব সাবধানে বসিয়ে কোলে ধরিয়ে দিত। কষ্ট হত আমাকে ছোট 'ভাবছে', তাই নড়তে দিচ্ছে না, আশ্চর্য!
প্রথম যেদিন 'বড়' কাউকে ছাড়া স্কুটারে উঠেছি, সে দিনটা এখনও মনে আছে। ক্লাস সেভেনের সায়েন্স ফেয়ার থেকে রাশার গাড়ির বাসায় পেঁৗছে দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু গাড়ি কোন কারণে আসতে পারে নি। আমরা শুধু বন্ধুরা স্কুটার করে বাসায় ফিরেছি। সে কি উত্তেজনা!
খুব 'বড়' হওয়ার শখ ছিল যে! বয়স ইচ্ছা করে বাড়িয়ে বলতাম। আট বছর ছয় মাস হতেই বলতাম, 'প্রায়ে নয়'।
আচ্ছা, মানুষ বড় হয় কখন? না, বায়োলোজিক্যাল বড় হওয়ার কথা বলছি না। একটা মুহুর্ত তো থাকেই, একটা ডায়নামিক মুহুর্ত, এক মহেন্দ্রক্ষণ যখন হুট করে বড় হয়ে যাওয়া হয়। সে কখন?
জানি না কখন, হঠাৎই টের পেলাম, সেই মিষ্টি অনুযোগ করার অধিকার হারিয়ে ফেলেছি, 'আমি ছোট বলে আমার কথা কেউ শুনে না।'
ক্লাস টুতে থাকতে অন্য ক্লাসে খাতা নিয়ে যাওয়া ছিল বিশাল প্রেস্টিজের ব্যপার। এতগুলো খাতা দিয়ে টিচার বিশ্বাস করছেন ভাবতেই কেমন বড় বড় লাগত।
টের পাই নি, কখন খাতার বদলে বন্ধক দেয়ার সময় আসল এক রাশ কান্না, পৃথিবী ভরা সুুখ, হৃদয় নামের অদ্ভূত বস্তুটা। হঠাৎই খেয়াল করলাম, আমার দু'টো বাক্য দিয়ে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ হাসিটুকু কিনতে পারি। টের পেলাম আমি একটা কথা বা মৌনতা দিয়ে তীব্র কান্না কিনতে পারি। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে জীবনকে ভালবাসা যায়। একই চোখে তাকিয়ে আবার কখনও মরে যেতে ইচছা করে।
ওই যে তিন বছর থাকতে একবার, মায়ের লিপস্টিকটা প্রথম বার হাতে পাওয়ার পরে কি নিদারুণ আনন্দে একটু একটু করে ঘুরিয়ে বড় করে খুলে ঠোঁটে নাকে মুখে লাগিয়ে শেষ করেছি, কারণ জানতাম না একবারে আস্ত লিপস্টিকটুকুই পেয়ে গেলে তা দিয়ে কি করতে হয়।
বুঝি নি সেই নিদারুণ ক্ষমতা দিয়ে কি করব। হাতে পাওয়া নিউ ফাউন্ড বস্তুটার ডেলিকেসি সম্পর্কে এক বিন্দু ধারণা ছিল না। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে, চিমটি দিয়ে, টিপে টুপে দেখতে গিয়ে দেখি লাল রঙের ছড়াছড়ি...
এর নাম কি বড় হওয়া? কি সৃষ্টি ছাড়া ব্যপাররে বাবা! কোন সে মহেন্দ্রক্ষণ যখন আমার হাতে এক সময়ের বহু আকাংখিত আলাউদ্দীনের চেরাগ ধরিয়ে দেওয়া হল? টেল মি, প্লীজ টেল মি, আমি পিছনে ফিরে ওই ক্ষণটুকু ধুয়ে, মুছে ফেলব। বিনিময়ে সব দিব! স-অ-ব! তবু ফিরে পেতে চাই আমার হারানো ইনোসেনস, অক্ষমতা!
[বড় হতে ভাল্লাগে না। এত্ত এত্ত শুভেচ্ছা উপহাসের মত শুনাচ্ছে সত্যিই।]
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




