
আজ বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন। সকাল সাতটা থেকেই মানুষ ভোট দিতে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে বিএনপি জোট বনাম এগারো দলীয় জোট (এনসিপি ও জামায়াত)। নির্বাচনের পরপরই তরুণদের স্বপ্নের অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচিত সরকারের কাছে অতি দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। তুলনামূলকভাবে এবার ভোট দিতে মানুষ বেশ আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে। পাশাপাশি প্রায় চার-পাঁচ দিনের একটি ছুটি পেয়ে অনেকেই গ্রামের বাড়ি চলে গেছে। ঢাকায় যারা কাজের জন্য আসেন, তারা চিরকালই এমন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জনগণ এবার কাকে ভোট দিতে পারে ?
এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেই। বিগত সময়ে ক্ষমতায় ছিল এমন দল আছে— বিএনপি। আর জামায়াত-এনসিপি জোট আজ পর্যন্ত সরাসরি ভোটে জিতে নির্বাচনে জয়ী হতে পারেনি। ছত্রিশ বছর পর এবার আমরা পুরুষ প্রধানমন্ত্রী পেতে যাচ্ছি। এই কথা লিখতেই মনে পড়ে গেল— এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশের ইতিহাসে আলোচিত দুই নেতা শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া নেই; এটাই হয়তো নিয়তি। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা ভোট দিয়েছেন, নিজেরা প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। বাংলাদেশের মতো নারীবিদ্বেষী দেশে এটা একটি বিরল ঘটনা ছিল যে, দুজন নারী দীর্ঘকাল দেশ শাসন করেছেন।
তবে একসঙ্গে দুই দলের নেত্রী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না: এমন ঘটনা হয়তো আমাদের দেখতে হতো না, যদি সব সময় অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন হতো। শেষ তিনটি নির্বাচনে শেখ হাসিনা নির্বাচনী কারচুপি করলেও তিনি ভোট দিয়েছিলেন। এবারই প্রথম বাংলাদেশের দুই নেত্রী ভোট দিতে পারছেন না এবং তারা প্রধানমন্ত্রী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন না। এভাবেই আসলে সময় এগিয়ে যায়।
যাই হোক, ভোটাররা ভোট দেওয়া শুরু করে দিয়েছে। এবারে তারা কোন দলকে ভোট দিতে পারেন ? এক দিকে আছে পুরোনো দল, দেশ চালানোয় অভিজ্ঞ বিএনপি— যাদের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিপক্ষ দলগুলো মারধর এবং সহিংসতার অভিযোগ তুলেছে। অন্যদিকে তরুণ তুর্কিদের দল এনসিপির সঙ্গে জামায়াত জোট দাঁড়িয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে অতীতে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আছে, যারা নিজেদের স্বর্গের টিকিট বিক্রেতা দাবি করছে ।
ভোটাররা যা করতে পারে তা হলো: তারা পুরোনো দলের প্রতি আস্থা রাখার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু পুরোনো দল অর্থাৎ বিএনপির অতীত দেশ শাসনের রেকর্ড খুব ভালো নয়। আবার বিএনপি যে একাই সব অপরাধ করেছে, তাদের জোটের সঙ্গী জামায়াত কিছু করেনি: এমনও নয়। কিন্তু জনগণের সামনে তেমন বিকল্প নেই। আওয়ামী লীগ দেশ শাসন করেছে গত পনেরো বছর ইলেকশন কারচুপি করে । এই সময় তারা যে অন্যায় করেছে, সাধারণ মানুষের সঙ্গে যেভাবে আচরণ করেছে এতে মানুষ এমনভাবে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে যে এবার তারা নির্বাচন করতেই পারছে না।
অন্যদিকে স্বল্প স্মৃতির বাঙালি ভুলে গেছে ২০০১-২০০৬ সালের শাসনের কথা। বিএনপি কিন্তু যতটা না নিজের যোগ্যতায় ভোট পাবে, তার চেয়ে বেশি ভোট পাবে পূর্ববর্তী সরকারের খারাপ কাজের কারণে । জনগণের কাছে নতুন কোনো দল নেই। প্রচলিত দলগুলো যখন বেশি খারাপ কাজে লিপ্ত হয়, তখন তাদের মধ্যে যে কম খারাপ কাজ করেছে বলে জনগণ মনে করে, তাদেরই ভোট দেয় মানুষ। পুরোনো দলগুলো যে সংস্কার হয়েছে— এমন নয়। কিন্তু তারা নির্বাচনে সুবিধা পায়।
বাংলাদেশ ক্রিকেটে একটি মজার ঘটনা ঘটে যখন খেলোয়াড় নির্বাচন করা হয়। যেসব খেলোয়াড় পূর্ববর্তী খেলায় ভালো পারফরম্যান্স করতে পারে না, তাদের প্রথমে বাদ দেওয়া হয়। এরপর যেসব খেলোয়াড় বহুদিন আগে পারফরম্যান্সের অভাবে বাদ পড়েছিল, তাদেরকে গণমাধ্যমে দেখানো হয় কঠোর অনুশীলন করছে। ক্রিকেট ভক্তদের মধ্যে তাদের প্রতি আবেগ সৃষ্টি করা হয়। এরপর তাদের দলে সুযোগ দেওয়া হয়।
এদিকে যারা সাম্প্রতিক সময়ে বাদ পড়েছে, তারা নিজেদের সংশোধন করে না; বরং অপেক্ষা করতে থাকে— কখন যারা সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচিত হয়েছে তারা খারাপ পারফরম্যান্স করা শুরু করবে। মূল কথা , কোনো খেলোয়াড়ই তেমন ভালো নয়। কিন্তু দল নির্বাচনে যার সাম্প্রতিক সময়ে খারাপ পারফর্ম করার রেকরড আছে , তাকে বাদ দিয়ে সুদূর অতীতে যে খারাপ পারফর্ম করেছিল তাকেই আবার সুযোগ দেওয়া হয়; অথচ সারা বিশ্বে প্রতিযোগিতা থাকে এবং ভালো পারফরম্যান্স করেই দলে জায়গা পেতে হয়।
একইভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতেও প্রকৃত প্রতিযোগিতা নেই। যে দল সাম্প্রতিক সময়ে খারাপ কাজ করেছে, তারা বাদ পড়ে। আর যারা অনেক আগে খারাপ কাজ করে জনতার রোষানলে পড়েছিল, তারা ফিরে আসে। কিন্তু প্রকৃত সংস্কার বা নতুন বিকল্পের অভাবে জনগণ একই চক্রে ঘুরপাক খেতে থাকে। শেষ কথা হলো, জনগণ ভোট দিচ্ছে। তবে তারা যাদের ভোট দিচ্ছে, সেটা আসলে তাদের পছন্দ নয়— বরং সবচেয়ে কম অপছন্দের বিকল্প। এটাই আমাদের গণতন্ত্রের বাস্তবতা, অন্তত আজকের দিনে।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



