কতগুলো কারণে নিজেকে 'বিতর্ক' থেকে সযতনে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করছি। কারণ, আমার খুব নিকট অতীতের উপলব্ধি হচ্ছে, বিতর্ক = ঝগড়া।
আলোচনা থেকে নিজেকে সরাই নি অবশ্য। কারণ আলোচনা আর বিতর্কের (ঝগড়ার) মধ্যে খুব স্পষ্ট পার্থক্য আছে। আলোচনা ব্যপারটা আদান প্রদানের কিন্তু বিতর্ক বা ঝগড়া একেবারেই তা না। বিতর্ক করে মানুষ [গাঢ়]নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমান করে[/গাঢ়] 'জিতে' যাওয়ার আশায়। আর ঝগড়া করে মানুষ [গাঢ়]অন্যকে নিচে নামিয়ে[/গাঢ়] 'অপেক্ষাকৃত উপরে' থাকার আসায়। সমস্যা হলো, আমাদের কাছে শব্দগুলোর অর্থ পরিষ্কার না। তাই বিতর্ক আর ঝগড়া গুলিয়ে ফেলি। যখন দেখলাম গুলিয়ে ফেলার রোগ মানুষের ডায়বেটিকসের মত প্রবল আকারে আছে, তখন চুপ থাকাই শ্রেয় মনে হল। আলোচনার ক্ষেত্রে অবশ্য চুপ নেই আমি। কিন্তু যেই মুহুর্তে দেখব কেউ বিতর্ক শুরু করতে চাইছে, তখন নিজেকে সরিয়ে আনব। বিতর্কের মূল উদ্দেশ্য থাকে জিতে যাওয়া। সত্যি বলতে কি, যখন মানুষ ঝগড়ার ঠিক মাঝখানে থাকে, তখন অনেক বলার পরেও চুপ করে যাওয়াটা সত্যিই কঠিন। সত্যিই। কারণ আমরা কখনই মানুষকে এই ধারণা দিতে চাই না যে আমরা হেরে গেছি। যদি কখনও পারি নিজেকে সরিয়ে আনতে, তাহলে নিজেকে বিজয়ী মনে হয়!
সব ধরণের আলোচনায় আমি আছি!
ঝগড়ায় বা বিতর্কে অপরপক্ষের আর নিজের মাঝে স্পষ্ট সীমানা টানি থাকে। প্রথম থেকেই জানা থাকে, সে আমার 'শত্রু', আমার বিপক্ষ। বিপক্ষের মধ্যে ভাল কিছু দেখা আসলেই সম্ভব না, বিপক্ষের ভাল চাওয়া সম্ভব না। শত্রু থাকে 'যুদ্ধে'। আর যুদ্ধে শত্রুর সাথে ভাল আচরন করাও কাপুরুষতা। আমি তাই কোন যুদ্ধ করতে রাজি নই। আমার সাথে মতের অমিল হলেও আমি 'এভরি থিং ইজ ফেয়ার' বলে যে কোন উপাত্ত হাতে নিয়ে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ব না। আমার অমিল মতের সাথে, মানুষের সাথে না। নিজের সবটুকু সততা নিয়ে বলতে পারি, মানুষের ভাল চাই। মানুষকে কষ্ট দিতে চাই না। যদি আমার কথা কারও ব্যক্তিগত কষ্টকে জাগিয়ে দেয়, তাহলে খারাপ লাগে। তাই ভুল করি নি জেনেও, চরম অভদ্রের মত দেয়া থাপপড়ের হুমকি খেয়ে নিজেরই মায়া লাগে হুমকি দাতার জন্য। অন্তত: আমার পক্ষ থেকে কষ্ট দেয়া মূল উদ্দেশ্য ছিল না, নিচে নামানো মূল উদ্দেশ্য ছিল না, তাই। আমাকে একজন ম্যাসেঞ্জারে বলেছে, মাফ চাওয়াটা আমাদের দেশে এখনও দুর্বলতার চিহ্ন। কথা ঠিক বুঝেছি ব্লগে। তবে দেশীয় স্টাইল বলেই খারাপ কিছু নিজেতে ঢুকাতে পারি না!
বিতর্ককে আলোচনা বলে ভুল করে ঢুকে পড়েছি অনেক বার। বার বার ভুলে যাই আমাদের দেশের মানুষের এখনও 'আলোচনা' করার মানসিকতা তৈরি হয় নি। প্রথমেই অপর পক্ষকে মিথু্যক ধরে নেয়। ভুল ধরে নেয় না। এটাই বিতর্কের প্রয়োজনীয়তাকে খুব বড় করে দেয় মানুষের কাছে। বিতর্ক... জনগণের সামনে প্রতিপক্ষকে ধূলোয় মিশিয়ে দেয়ার সময়... তাই বিতর্কের কথা ভেবে উল্লাসে মেতে উঠেন অপর পক্ষকে 'মিথ্যুক' ভেবে নেয়া মানুষগুলো।
ভুল বুঝাবুঝি আর সমঝোতা হতে পারে 'আলোচনা'র মাধ্যমে। অন্যে পুরাটুকুই ভুল করছে এমন ধারণা নিয়েও আলোচনার মাধ্যমেই 'সংশোধন' সম্ভব। আর আলোচনার প্রথম ধাপ হচ্ছে শোনা। অন্যের কথাই যদি না শুনলাম, তাহলে বুঝব কি করে তার সমস্যা কোথায়? যখন দেখি 'শোনা' হচ্ছে না, স্পষ্ট স্বীকোরক্তি পাই শোনা হচ্ছে না, তখন চুপ করে যাই। লাভ নেই কোন, তাই।
কখনও বা যদিও বিতর্ক করা যায়, সবার সাথে 'বিতর্ক'ও শোভন না। যে অস্ত্র হিসেবে মুখ ভর্তি ড্রেইনের পানি নিয়ে টার্গেটের দিকে ছিটায়, তার সাথে যুদ্ধে জিততে নিজেরও মুখে ড্রেইনের পানি নিতে হবে। ওটা যে রুচিতে কুলায় না!
ড্রেইনের পানিটা সামনা সামনি ছুঁড়া হলে সাহস আছে বুঝতে হবে। রাগের মাথায় করা তাও বুঝা যায়। কিন্তু পিছনে যখন ছুঁড়া হয়, তখন যাদের পক্ষ থেকে ছুঁড়া হয়, তাদের [গাঢ়]প্রত্যেকের[/গাঢ়] উপর আমার আস্থা উঠে যায়। বিতর্কের উদ্দেশ্য নিয়ে চরম সংশয়ে পরে যাই। বিতর্কে জিতে গিয়ে কি অর্জন করতে চাইছে তাই নিয়ে সংশয়ে পড়ে যাই। এবার তাই হল। তাই চুপ।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৬ রাত ৩:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


