[একটা সাময়িক মিষ্টি আকাল, একটা চরম আকাল আর দু'টো স্বপ্নময় সময়ের এলোমেলো গল্প।]
স্বপ্নময়তা এক
সাইকোলজি লেকচারে ডুবে আছি। লেকচার দিচ্ছেন এসোসিয়েট প্রফেসর রিক রিচার্ডসন। পঞ্চান্নের মত বয়সী ভদ্রলোক খুব মজার মানুষ। প্রকৃতির প্রতি অগাধ ভালবাসা। লেকচারের মাধ্যমে ভালবাসাটা ছড়িয়ে দিতে পারেন অদ্ভূত ভাবে। একটাই সমস্যা বুড়ার। লেকচারে কোন রকম অমনোযোগিতা বরদাশত করতে পারেন না একদম। একটু পুরানো দিনে আটকে আছেন এদিক থেকে। লেকচার থিয়েটারটা বিশাল। ইউনিভার্সিটির সবচেয়ে বড় অডিটরিয়াম। নয়শ পঁয়তালি্লশটা সীট। সাইকোলজিতে ছাত্র ছাত্রী হবে তিনশ'র মত। প্রথম দিনই পরিষ্কার করে দিয়েছেন তাঁর মনোভাব। থিয়েটারের সামনের দিকে বসতে হবে (পুরো পিছন দিকটা খালি থাকবে), কোন কথা বলা যাবে না, শুধু লেকচার শুনতে হবে, লেকচার শুরু হওয়ার পাঁচ মিনিট পরে আর ঢুকা যাবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। একবার লেকচার দিতে দিতে হঠাৎই থেমে গেলেন। গলার মাইকটা নামিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে দু'টো ছেলেকে বের করে দিলেন লেকচার থেকে। ওরা তাস খেলছিল, যদিওবা নি:শব্দে, ভদ্রলোকের চোখ এড়াতে পারে নি।
সেদিন পুরো লেকচার থিয়েটারে শুধু বুড়োর গমগমে কণ্ঠ। হঠাৎই লেকচার থামিয়ে দিলেন। আগুনঝরা দৃষ্টিটা অনুসরন করে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম পিছনে। একদম পিছনের সারির সবচেয়ে উপরের সিটে চলছে আরেক নাটক। এক যুগল জগৎ ভুলে আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে আদর করছে, নিচ্ছে। রিকের আগুন ঝরা দৃষ্টি কিছুই করতে পারছিল না। বোধ করি চশমার জন্যই। চশমাটা খুলে হাতে নিয়ে এবার আরও কঠিন দৃষ্টিতে তাকালো। কপোতকপোতী নির্লিপ্ত। এবার ক্রোধান্বিত বুড়ো গলার মাইকটা নামিয়ে রাখলেন প্রচন্ড শব্দ করে। কপোতকপোতী মহা ব্যস্ত। রিকের চকচকে টাক সহ পুরা মুখ লাল টকটকে হয়ে গেছে, স্পষ্টতই--লজ্জায় না, প্রচন্ড প্রচন্ড রাগে। ভূমিকম্প হবে আমার টের পাচ্ছি, কপোতকপোতী না। পুরো পাঁচ মিনিট চলে গেল এভাবে। পিনপতন নিরবতা। পাঁচ মিনিটে দোআ দরূদ পড়ে বুঝি বা একটু শান্ত হলেন রিক। মাইকটা আবার হাতে নিয়ে পড়ানো শুরু করলেন, যেন কিছুই হয় নি। তখনও কপোতকপোতীর ব্যস্ততা কমে নি। ভাবখানা: আমরা যদি এই আকালেও স্বপ্ন দেখি... কার তাতে কি!
চরম আকাল
রাত আটটার মত বাজে। ট্রেইনে বসে আছি একা। ওই সময়ে চারপাশের রঙিন মানুষদের দেখাটা মজার। আমার সামনে বসেছে এক বাঙালি ছাত্র। ফোনে খবর নিচ্ছে পাত্রীর। ভিসার জন্য খুব জরুরি! হঠাৎ পাশে উত্তপ্ত কথা শুনতে পেলাম। আমার পাশের তিনজনের সিটে একা বসে আছে পঁচিশের মত বয়সী ছেলেটা। ফোনে কাউকে ঝাড়ি দিচ্ছে। না শোনার উপায় নেই, গলা যথেষ্ট উঁচু। শীতল শোনানোর প্রান পনে চেষ্টা করছে মাঝে মাঝে কাঠখোট্টা শুকনো হাসি দিয়ে। ইংরেজির ভাবানুবাদ: 'হ্যা, প্রতিবার তো একই কথা বলো! প্রত্যেকবার একই কথা... স্যরি, স্যরি। তারপর? তারপর কি কর? আবার তোমার পিএমএস হয়, আবার একই ভুল করো। আমি অনেক বুঝার চেষ্টা করেছি, কিন্তু পিএমএসের দোহাই দিয়ে আর কত? স্যরি, আমি আর পারব না।' লাইন কেটে দিলেন ভদ্রলোক।
বিষম খেলাম।
মোটামোটি আকাল, তবু স্বপ্নময়
সকালে ট্রেইনে। চারপাশে যান্ত্রিক মানুষ পিঠ সোজা করে বসে আছে। নিরাসক্ত মানুষগুলো দেখায় আনন্দ নাই। হঠাৎই সামনের সিটেই একটু নাড়াচাড়া, ঘটনার আভাস দেখলাম। পঁয়তালি্লশের মত বয়সী ভদ্রলোক হাতের পত্রিকাটা সাধছেন মহিলাকে। ভদ্রমহিলা নিচ্ছে না। মাথা সোজা করে বসে আছেন। ভাবলাম খেয়াল করে নি। ভদ্রলোক এবার আরেকটু কাছ ঘেসে বসে পত্রিকা সাধলেন। ভদ্রমহিলা তবু নির্বিকার। না দেখার কথা না। অথচ মাথাও ঘুরাচ্ছে না! তখন দেখলাম ভদ্রলোকের চেহারায় কেমন বেচারা-বেচারা-ভাব ছুয়ে গেল। মাথা নাড়লেন, অসহায় হাসি চাপলেন আর আবার পত্রিকা পড়ায় লেগে গেলেন। একটু পরে আবার আড়চোখে তাকান। কি যেন বলতে চান, কিন্তু থেমে যান। আমার প্রচন্ড হাসি পাচ্ছিল। এতক্ষনে ঘটনাপ্রবাহ ধরতে পারলাম মনে হয়। দম্পতি, পুরানোই হবে। অভিমানপর্ব চলছে। হাসি পাচ্ছিল ভদ্রলোকের বেচারা অবস্থা দেখে আর একটা কথায় মনে পড়ায়। কে যেন উপদেশ দিচ্ছিল একটা ছেলেকে: মেয়েরা একটু অদ্ভূত ভাষায় কথা বলে। যখন দেখবা বউ কথা বলছে না, তখন বুঝবা কিছু একটা বলতে চাচ্ছে। ওই ছেলেটার মুখে যেই পাজলড দৃষ্টি দেখেছি, এই ভদ্রলোকের মুখেও তাই দেখলাম। পুরো এক ঘন্টার ট্রেইন ভ্রমনে ভদ্রলোক কিছুতেই কি যেন বলতে চেয়েও পারলেন না। একটু পর পর তাকাচ্ছেন। কিছু একটা বলতে চেয়ে মহিলার মুখ দেখে একটা ফ্যাকাশে হাসি দিয়ে আবার গিলে ফেলেন। আকাল, তবে কেটে যাওয়ার মত!
স্বপ্নময় সময় দুই
কাল লাইব্রেরির সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম খোমাইরের সাথে। আমার সাথে যারা ছিল, সবাই হিজাবী। কিন্তু পাঁচ জনের সবাই ভিন্ন ভিন্ন দেশ থেকে। খোমাইর ইসরাইলী ইহুদী ছেলে। মাথায় ইহুদীদের 'কিপা' টুপি পড়া। ও ওখানে ছিল জুইশ সোসাইটির পক্ষ থেকে। জুইশ সোসাইটি সেদিন সবাইকে ফ্রি বারবিকিউ খাওয়াচ্ছে (মুসলিম সোসাইটি খাওয়াবে আগামী সপ্তাহে)। পুরো ব্যপারটার মূল উদ্দেশ্য হল, মানুষের সাথে 'সংলাপের' রাস্তা প্রশস্ত করা। আমাদের, এক দঙ্গল হিজাবীদের দেখে খোমাইর এগিয়ে এসেছে পরিচিত হতে। আমার চেয়েও স্পষ্ট করে আমার নাম আর 'বাংলাদেশ' বলল। সাথের হিজাবীদের একজন লেবাননিজ, একজন ইরানী, একজন মিশরী আর একজন ফিলিস্তিনি-অস্ট্রেলিয়ান মিশ্রন। ফিলিস্তিনি!
আরব-মুসলিম-হিজাবী-ফিলিস্তিনি আর কিপাওয়ালা-ইসরাইলী-ইহুদী!
দারুন জমলো। দুইপক্ষেরই খুব গভীর উপলব্ধি--ওদের পৃথিবীতে যা হচেছ, সব কি ভীষণ রকমের অন্যায়। দগদগে ঘা খুঁচিয়ে গেলে সমস্যা বাড়তেই থাকবে। নতুন প্রজন্মে ঘৃনা ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে খুব কৌশলে, একদম শিশু বয়স থেকে। প্রচুর মুসলিম যেমন ইহুদী শুনলেই নাক সিঁটকে উঠে, বেশির ভাগ ইহুদীদেরও অবস্থা তাই। মুসলিমরা ভুলে যেতে ভালবাসে, রাসুল (সা) এর সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী ছিল এক ইহুদী বুড়ি, যে রাসুলের মৃতু্যতে খুব শোকাহত হয়েছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে ভাল প্রতিবেশি হারিয়ে। এসব কথাই হল পুরো আধা ঘন্টা।
মন আমার ভরে গেল, একটা স্বপ্ন অংকুরিত হতে দেখে। ভালবাসার আগে ঘৃনা করতে হয়, কিন্তু মানুষকে না। অন্যায়কে। মানুষকে ঘৃনা করা খুব সহজ। কারণ সব মানুষেরই ভুল আছে, ভ্রান্তি আছে। দুর্বলতা আছে। অসংখ্য। ইচ্ছা করলেই ওগুলো সামনে এনে ঘৃণা করা যায়। ঘৃনাটা শুধু অন্যায়ের জন্য রেখে, ভালবাসাটা মানুষের জন্য রাখতে প্রচুর সাহসের দরকার হয়। এই আকালে দুইজন সাহসী মানুষ দেখলাম চোখ ভরে। আর মন ভরে দেখলাম অনেক স্বপ্ন...
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৬ রাত ১০:১৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


