
ভোটের সময় এলেই একটি অতি পরিচিত দৃশ্য চোখে পড়ে। নির্বাচনপ্রার্থী, যিনি অভিজাত শ্রেণির প্রতিনিধি, সাধারণ মানুষের কাছে ভোট চাইতে গিয়েছেন। গ্রামের রাস্তা ধরে হাঁটছেন, বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষের সাথে কথা বলছেন। দরিদ্র কোনো নারী বা বয়োবৃদ্ধ মানুষের সঙ্গে অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে আলাপ করছেন। দিনমজুর, কৃষক, চাষি, সবজি বিক্রেতা, মুদি দোকানদার বা রিকশাওয়ালার সুখ-দুঃখের খোঁজ করছেন। এ ধরনের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে নির্বাচনপ্রার্থী নিজেকে সাদা মনের মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করছেন।
এই ধরনের ছবি দেখলে একটি প্রশ্ন সামনে আসে - নির্বাচনপ্রার্থীর সঙ্গে সাধারণ মানুষের কী নিয়ে কথা হয়? আমাকে আপনার ভোট দিন, আপনাদের সেবা করার সুযোগ দিন - কথোপকথন কি এখানেই শেষ? একজন রিকশাওয়ালা বা গার্মেন্টসকর্মী কি কখনো সাহস করে জিজ্ঞাসা করতে পারেন - ভোট তো চাইলেন, কিন্তু আপনাকে ভোট দিলে আমাদের জীবন কী বদলাবে? আমাদের জন্য আপনি কী করবেন?
এমন প্রশ্ন তুললে বিত্তশালী নির্বাচনপ্রার্থী প্রশ্নকর্তার হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে বিষয়টি সেখানেই অনেক সময় সুরাহা করেন। সেই ব্যক্তির শ্রেণি, পেশা বা সামাজিক নিরাপত্তা ও সুযোগের প্রশ্নে কোনো দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের চিন্তা করা হয় না। বর্তমান রাজনীতিতে আয় ও সম্পদের বণ্টন, এবং সেই বণ্টনের পেছনে থাকা ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা প্রায় নেই বললেই চলে। অথচ নির্বাচনের আগে, যখন জনপ্রতিনিধিরা ভোট চাইতে মানুষের কাছে যান, তখন এই প্রশ্নগুলোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত ছিল। যারা রাজনীতিতে প্রভাবশালী, নির্বাচনের পর আয়, সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধার সবচেয়ে বড় অংশ তারাই ভোগ করেন। এই শ্রেণির প্রতিনিধি কারা, তাদের ক্ষমতা কী ভাবে কাজ করে, এবং সরকারী সুযোগ-সুবিধারগুলোর বড় অংশ তারা ভোগ করার পরে অবশিষ্ট কিছু সাধারণ মানুষের জন্য থাকে কি না - এই আলোচনা প্রায়ই বাদ পড়ে যায়।
বাংলাদেশের এলিটদের মধ্যে রয়েছে পারিবারিকভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও ধনিক শ্রেণি। এদের অনেকেরই বড় পারিবারিক ব্যবসা আছে। আবার কেউ কেউ রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে সরকারি দরপত্র প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখেন। এদের মধ্যে মধ্যস্বত্বভোগী বা কমিশনভিত্তিক দালালেরাও আছেন। সরকারি চুক্তি বা প্রকল্প পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে বড় অঙ্কের কমিশন আদায় করেন। পাশাপাশি রয়েছেন সাংস্কৃতিক এলিটেরা। তারা কেউ সংবাদপত্রের মালিক বা সম্পাদক, কেউ লেখক, অধ্যাপক, আলোচক।
এদের সঙ্গে আছেন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা ও নিয়ন্ত্রকেরা, প্রভাবশালী শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী শ্রেণি। আছেন ক্ষমতাবান আমলা ও সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। সাম্প্রতিক সময়ে এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে ধর্মান্ধতাকে রাজনৈতিক পুঁজিতে রূপ দেওয়া প্রভাবশালী বক্তা ও সংগঠকরা। রাজনৈতিক দলের বড় নেতাদের আবার একটা করে নিজস্ব মাস্তান বাহিনী রয়েছে, যা অনেকটা সামন্তযুগের জমিদারদের লাঠিয়াল বাহিনীর আধুনিক সংস্করণ। স্থানীয় পর্যায়ের দলীয় নেতা-মাস্তান-মধ্যস্বত্বভোগীরাও এলিট কাঠামোর অংশ। তাদের ভূমিকা ভিন্ন হলেও একটি বৈশিষ্ট্য সবার মধ্যে এক - সেটা হলো সম্পদ ও সুযোগের বণ্টনে নিজেদের অধিকার সবার আগে নিশ্চিত করা।
রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে, তা কেবল কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্ধারণ করে না। অনেক ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ঘোষণার চেয়ে স্থানীয় ক্ষমতাই বেশি কার্যকর। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বিএনপির পক্ষ থেকে ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষক কার্ড কর্মসূচির ঘোষণা এলেও ইউনিয়ন পর্যায়ে সেই কার্ড প্রকৃত কৃষকের হাতে যাবে নাকি দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে নির্বাচিত কিছু মানুষের হাতে যাবে, তা নির্ধারণ করবেন স্থানীয় নেতারাই। অর্থাৎ কোনো সুবিধা পেতে হলে শুধু দরিদ্র বা সাধারণ মানুষ হওয়াই যথেষ্ট নয়। কার্যত নেতা বা নেতার মানুষেরা এই সুবিধাগুলো পাবে। গ্রামে কোনো দরিদ্র কৃষক গুরুতর অসুস্থ হয়ে জেলা বা বিভাগীয় শহরের হাসপাতালের মেঝেতে হলেও একটি জায়গা পেতে চাইলে, অনেক সময় সেটিও স্থানীয় নেতার সুপারিশ ছাড়া সম্ভব হয় না।
এই এলিট কাঠামো ও তাদের ক্ষমতাকে আমরা আদৌ প্রশ্ন করছি কি? একদিকে আমাদের সরকারি প্রশাসন ও পুলিশ ব্যবস্থা এখনো উপনিবেশিক ব্রিটিশ কাঠামোর ধারায় পরিচালিত হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে এর অবনতি ঘটেছে। ফলে সুশাসনের অভাব আজ একটি সংকটে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি তৈরির যে ধারণা, সেটিও কার্যত বাস্তবায়িত হয়নি। বাস্তবে আমরা জনপ্রতিনিধির বদলে শাসকই নির্বাচন করছি।
এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা নিয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজন। পলিসি ভিত্তিক রাজনীতির কথা বলা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। সেই আশাতে ৩১ দফা পড়ে আমি খুঁজে দেখার চেষ্টা করেছি, একজন শ্রমজীবী মানুষের জন্য সেখানে কী আছে।
৩১ দফায় সাধারণ মানুষ, নাগরিক, জনগণ, এই শব্দগুলো বারবার এসেছে। কিন্তু এই সাধারণ মানুষ আসলে কারা, কোন শ্রেণি বা কোন পেশার মানুষ সেটা স্পষ্ট নয়। অনেক প্রতিশ্রুতি রয়েছে, কিন্তু অধিকাংশই সময়সীমাহীন। সুশাসন, আইনের শাসন, নিরপেক্ষ প্রশাসনের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু এগুলো কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে হবে, নাকি শুধু সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করবে, তা পরিষ্কার নয়।
আয় ও সম্পদের বণ্টনের প্রশ্নে ৩১ দফা মূলত সহায়তাভিত্তিক। ভাতা, কার্ড ও সুবিধা। কিন্তু সহায়তা আর সুষম বণ্টন এক বিষয় নয়। আয় বৈষম্য কীভাবে কমবে, শ্রমের মূল্য কীভাবে বাড়বে, নারী শ্রমিক বা গার্মেন্টস কর্মীদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে - এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সেখানে নেই। ফ্যামিলি কার্ড দারিদ্র্য কমাতে কিছু ভূমিকা রাখতে পারে, কিন্তু দারিদ্র্য উৎপাদনের পদ্ধতি অপরিবর্তিত থাকলে তা স্থায়ী সমাধান নয়।
জোর, সহিংসতা ও মাস্তান নির্ভর রাজনীতির প্রশ্নে ৩১ দফা নীরব। এটি ইঙ্গিত দেয় যে ক্ষমতায় গেলে বিদ্যমান সহিংস রাজনৈতিক বাস্তবতা খুব বেশি চ্যালেঞ্জ করা হবে না। রাজনীতি যদি শক্তি প্রয়োগের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে প্রতিটি বড় নেতারই নিজস্ব মাস্তান বাহিনী থাকবে। এই সংস্কৃতি ভাঙার কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা আছে কি না, তা পরিষ্কার নয়।
৩১ দফায় খরচের প্রতিশ্রুতি আছে, কিন্তু আয়ের দর্শন দুর্বল। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদন, প্রযুক্তি, শিক্ষা - এসব বিষয়ে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক কৌশল স্পষ্ট নয়। জলবায়ু ঝুঁকি, ভূমিকম্প, বন্যার মতো বাস্তবতার সঙ্গে ভবিষ্যৎ অর্থনীতি কীভাবে যুক্ত হবে, সেটিও অস্পষ্ট। "উন্নয়ন" শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, কিন্তু উন্নয়ন কীভাবে হবে, তার উপাদানগুলো অনুপস্থিত। সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো জবাবদিহিতা। সরকার কী কাজ করল, কত খরচ করল, কোন লক্ষ্য কতটা পূরণ হলো - এই তথ্য জানার অধিকার জনগণের আছে, এবং সেটি নিশ্চিত করার বিষয়টি এখানে উঠে আসেনি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

